কল্যাণ সেনগুপ্ত
সম্প্রতি আমরা দেখছি, রাহুল গান্ধী দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে। রাজনীতি করতে হলে অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা থাকা বিশেষ জরুরী। সেদিক থেকে দেখলে এটা খুবই আশাপ্রদ যে, তিনি দেশের অর্থনীতির গুরুতর সমস্যা ও তার সমাধান বিষয়ে সম্যক ধারণা গড়ে নিতে চাইছেন। কিন্তু এতে রাহুলের ভাবমূর্তি কিঞ্চিত উজ্জ্বল হলেও দেশের বিশেষ লাভ হবে না। দেশ এখন এক ঘোরতর সংকটে। সে সংকট শুধুমাত্র ‘করোনা’ সংক্রান্ত বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে নয়, অনেকবেশি সংকটাপন্ন ধর্মান্ধ রাজনীতির কারনে। ২০১৯-এর নির্বাচনে পুনর্বার জয়লাভের পর মোদি সরকার নাগরিকত্ব বিষয়ে যেভাবে দেশের প্রধান সংখ্যালঘু শ্রেণীকে নিয়ে নৃশংস রাজনীতি করছেন, তাকে প্রতিহত করতে না পারলে দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র সব স্থান পাবে শুধুই কেতাবে, বাস্তবে আর নয়। বাস্তবে চলবে মোদির স্বৈরতন্ত্রের উৎকট প্রদর্শন এবং সেই পথকে সুগম করতে বিচারব্যবস্থা ও প্রভাবশালী মিডিয়াকে প্রায় পকেটে পুরে ফেলা হয়েছে। প্রতিনিয়ত চলছে তারই অনুশীলন সর্বত্র।
এহেন সংকট থেকে উদ্ধার পেতে হলে সার্বিক বিরোধী ঐক্য ভিন্ন আর কোন পন্থা নেই। যদিও তা মোটেই সহজসাধ্য নয়। তাই প্রয়োজন উদ্যোগ ও বিস্তর আলোচনা। এবিষয়ে সমস্যা যেমন আছে, তেমনই আছেন বিভিন্ন দলের সুযোগ্য অভিজ্ঞ নেতৃত্ব। তাঁদেরকে যথাযোগ্য সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েই এগোতে হবে। আঞ্চলিক রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, পারস্পরিক শত্রুতা আছে। সে সবকেই ধরে ধরে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সম্পূর্ন না হলেও যথাসম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিৎ। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে মাথায় রেখে নিম্নবর্ণের সব জাতি, গোষ্ঠীকে এক ছাতার তলায় আনা জরুরী। সংঘের দৃঢ় সাংগঠনিক জাল কেটে যতবেশি সম্ভব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সবরকমের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবে ঐক্য প্রচেষ্টায় সামান্য সাফল্য দেখা দিলেই প্রশাসনিক দমন পীড়নের তৎপরতা দেখা যাবে। আরও কোন অন্যায় অপরাধমূলক পদক্ষেপ যে নেওয়া হবেনা, এমন নিশ্চয়তাও নেই। এই ধরণের আক্রমণ শুরু হলেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধরূপে রাস্তায় নামতে হবে, মানুষকে সুযোগ দিতে হবে এই উদ্যোগে সামিল হবার।
এই মরণপণ লড়াইয়ে জয়ী হতে না পারলে, ২০২২-এ দেশবাসীকে (আসলে সঙ্ঘ নেতাদেরকে), মোদীজি ‘নতুন ভারত’ উপহার দেবার যে অঙ্গীকার করেছেন অর্থাৎ স্বাধীনতার ৭৫বছর পূর্তিতে সংবিধান সংশোধন করে ‘ধর্মনিরপেক্ষ-সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের বদলে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ ঘোষণায় সফল হবেন এবং এরপর দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। তার আগেই আমরা যদি এর প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদেরকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আজকের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে। মোদিকে ঠেকানো যে কারও একার কম্মো নয়, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কর্তব্যে ঢিলেমি দিলে বহু শহীদের ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আমরা হারাবো। আর দেশ শাসন করবে একদল ধর্মান্ধ মৌলবাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন কাপালিকের দল। অতএব স্বাধীনতা রক্ষার এই লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হলে সর্বাধিক জরুরী ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্দ্ধে উঠে সার্বিক বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার মহান ব্রতে সামিল হওয়া।