নকলনবিশ
উপমহাদেশে ছাপাখানা আসার আগে পুথি নকল করা বহু মানুষের জীবিকা ছিল। সব থেকে পুরোনো যে সাহিত্যে নকলনবিশদের নাম পাওয়া যায় সেটা হল জাতক, লেখক নাম সেখানে উল্লিখিত হয়েছে। অর্থশাস্ত্রেও একই নাম পাচ্ছি। তারপরে অশোকের ১৪ তম শিলালেখতে লিপিকার বা লিবিকার নাম পাচ্ছি। সিদ্দপুর লেখতে লেখ লেখক নিজেকে লিপিকার বলছেন। সাঁচী শিলালিপিতে দেখছি রাজলিপিকার পদ। এই পদটা পাণিনিতেও পাচ্ছি (৪ খ্রী:পূ)।
ফারসি দিবির অর্থাৎ লেখক পশ্চিমভারত আত্তীকৃত করে। বহু ৭-৮ শতকের পহলবি লেখতে দিবিরা বা দিবিরাপতি শব্দটা পাচ্ছি। হিউএনসাং কাশ্মীরে গেলে রাজা ২০ লিপিকার নিযুক্ত করেছিলেন পুথি তৈরির জন্যে। কাশ্মীরে লেখকদের দিবিরা নাম ১১ শতকের রাজতরঙ্গিনীতে পাচ্ছি। ১২ শতকে ক্ষেমেন্দ্র লোকপ্রকাশে দিবিরাকে কয়েকটিভাগে ভাগ করেন গঞ্জ দিবিরা, গ্রাম দিবিরা, নগর দিবিরা, খাসা দিবিরা ইত্যাদি।
৮ শতকে উত্তর এবং পূর্ব ভারতে লেখকেরা কায়স্থ নামে পরিচিত হলেন। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে এই শব্দটা প্রথম পাচ্ছি। লেখকদের অন্যান্য নামগুলিও করণ, করণিকা, করনিন, শাসনিকা এবং ধর্মলেখিন মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হত। সমাজে কায়স্থরা বেশ ভাল সম্মান অর্জন করতেন। চান্দেলা লেখতে বুঝতে পারি ১১ শতে তারা বেশ গুরুত্বপুর্ণ পদ হয়ে উঠছেন। এই সময়ে চান্দেলা দেশে তারা কিরকম শক্তি হয়ে উঠছে তা নিচের লেখাতেই বোঝা যাবে — “মোট ৩৫টা শহর; সত্যি বলতে কি লেখক জাতিরা সেই শহরগুলিতে বাস করেন (করণ-কর্ম-নিবসপুত) (এবং) তারা (অন্যান্য শহরেও) বেশ স্বচ্ছলভাবে বাস করে। তাদের মধ্যে প্রখ্যাততম হলেন তক্ষরিক, যিনি অন্যদের কাছে ঈর্ষার পাত্র… (এবং) শহরগুলির (ছাত্রদের) ভিড়েতে বেদের শ্লোকের উচ্চারণ শোনা যায়, …যে সব কায়স্থ বাস্তব্য পরিবারে জন্মেছেন তাদের সৌরভ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধকার দূর করছে”।
গুজরাটের জৈন শ্রীসিদ্ধরাজা ছাত্রদের মধ্যে ১ লক্ষ ২৫ হাজার সিদ্ধহেম ব্যাকরণ বিতরণ করার জন্যে ৩০০ লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন। প্রভাকর চরিত্র এবং কুমারপাল-প্রবন্ধে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে গরীব ছাত্রদের বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহের। তুর্কি-আফগান সুলতান এবং অভিজাতরাও জ্ঞান, বিদ্যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময় বিপুল পরিমান পুথি লিখত, নকল এবং অনুদিত হয়েছে। তারা বিপুল পরিমান লেখক নিযুক্ত করতেন এবং বহু সময় দাসেদের শিক্ষিত করিয়ে রোমকদের মত নকলনবিশের কাজে নিযুক্ত করতেন।
বিপুল পরিমান কাগজের ব্যবহারের জন্যে মুঘল রাষ্ট্র কাগজনির্ভর রাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। এই যুগে বিপুল পরিমান নকলনবিশ, করণিক এবং খবর লেখক বা ওয়াকিয়া নবিশ নিযুক্ত হন। কারকুনদের মাসে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হত। প্রত্যেক গ্রামের গ্রাম প্রধান পাতিলের সঙ্গে একজন করে করণিক দেওয়া হত। এদের নাম কুলকার্ণি বা গ্রাম-লেখক। তাদের সম্মান পাতিলদের পরেই। গ্রামের রাজস্ব দিয়েই তাদের বেতন হত। এছাড়াও তেল থেকে কালি পর্যন্ত নানান দৈনন্দিনের দ্রব্য গ্রামীনেরা তাদের দিয়ে সাহায্য করতেন।
আসামের রাজারা তাদের প্রাসাদে গ্রন্থাগার রাখতেন। রাজার প্রধান গ্রন্থাগারের প্রধানের নাম হল গান্ধিন বড়ূয়া। সরকারির হিসেবে তার ব্যাপক সামাজিক সম্মান। তার পরের আধিকারিকের নাম হল লিক্ষকর বড়ুয়া — তিনি বিশাল সংখ্যক লেখক, করণিকের ব্যবস্থাপনা করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ছাপাখানা আসার আগে রাইটার বা করণিক নিযুক্ত করত। বাংলা, মাদ্রাজ এবং বম্বের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুধু আর্থিক লেনদেনের কাজগের পরিমান ছিল ১৩০০ বিশাল খণ্ড — এই কাজে বিপুল সংখ্যক দেশিয় করণিক নিযুক্ত হত।
হস্তলেখাবিদ
হস্তলেখাবিদ হলেন সেই সব করণিক যাঁরা কলমের মোচড়ে লেখায় শিল্প ফুটিয়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। তারা শুধু যে পুথি নকল করতেন তাই নয়, তারা পুথির লেখার সৌন্দর্যকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলার কাজে তাদের অর্জিত দক্ষতাকে নিবেদন করতেন। হস্তিলেখবিদের প্রাথমিক কাজ লেখার সৌন্দর্যবর্ধন। ইসলামি যুগে হস্তলেখার বিপুল বৈচিত্র উদ্ভাবন হতে থাকে। এবং সমাজের সর্বস্তরে এই শিল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া হত। ১২০৩ খ্রি: এক প্রখ্যাত হস্তলেখবিদের নাম তাকত মুস্তাসামি এবং নকশ লেখক হিসেবে তাঁর বিপুল সম্মান ছিল। ১৩২৪ সালে তিনি আভেন্নার শাফা নকল করে মহম্মদ তুঘলককে পাঠান। রাজা ব্যাপক খুশি হয়ে তাঁকে ২০০ মিলিয়ন মিসকুয়াল মূল্যের সোনা পাঠান। হস্তলেখবিদ এই দান তুচ্ছ মনে করে ফিরিয়ে দ্যান।
প্রখ্যাত হস্তলেখাবিদ খালিলুল্লা শাহ নউ-রসের একটি নকল দাক্ষিণাত্যের আদিলশাহকে পাঠান। এই কাজে তিনি এতই মুগ্ধ হন যে তিনি শুধু তাকে কলমের রাজা উপাধি দ্যান তাই নয়, তার সিংহাসন শিল্পীর বসার জন্যে কিছু সময়ের জন্যে ছেড়ে দ্যান। নানান মুসলমান দেশের মতই ভারতে হস্তরেখাশিল্প যথোচিতভাবে বিস্তারলাভ করে। তবে তার আগের সময়ের কিছু নিদর্শন সময়ের ভ্রুকুটি সয়েও থেকে গিয়েছে। হস্তলেখাশিল্প মুঘল সময়ে শৈল্পিক দক্ষতার চূড়ান্ত শীর্ষে ওঠে। উপমহাদেশ সে সময় বিপুল পরিমান দক্ষ ও যোগ্য হস্তলেখাবিদ তৈরি করেছিল যাদের কাজ আজও বিশ্বজুড়ে নানান জাদুঘর গ্রন্থাগার এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে শোভা পাচ্ছে। দক্ষ এবং যোগ্য হস্তলেখাবিদ তাদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানিত হতেন। তাদের যে সব উপাধি দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে ছিল জারিন-রাকম (সোনার লেখক), শিরিন-রাকম (মিষ্টি লেখক), রৌশন-রাকম (উজ্জ্বল লেখক) মুসকিন-রাকম (সুগন্ধিত লেখক)।
শাহজাহানকে যে সব হস্তলেখাবিদ নানান ধরণের উপহার দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি ঈয়াক-সুতি (শতজীবি) উপাধি দিয়েছেন। হস্তলেখার উচ্চাঙ্গের শিল্প হিসেবে যখন সমাদৃত হচ্ছে সে সময় বহু অনামী এবং ছাত্র প্রখ্যাত শিক্ষকদের নাম ধার করে লেখা তৈরি করতেন। জইনুদ্দিনের মোসলেমএর ক্যালিগ্রাফি বইতে আমরা পাচ্ছি, মুল্লা মীর আলির নামে বহু নকল তৈরি করেছিলেন মৌলানা খ্বাজা মুহম্মদ। তার ছাত্র সম্বন্ধে, ছাত্রদের কাছে লিখিতভাবে মীর আলি অভিযোগ করছেন, কিছু সময়ের জন্য খ্বাজা মুহম্মদ আমার ছাত্র ছিল, যতক্ষণ না তার হাতের লেখা একটা স্তরে বিকাশ লাভ করছে। আমি তার বিরুদ্ধে যাই নি, সেও আমার কোন ক্ষতি করে নি, কিন্তু সে প্রচুর ভাল খারাপ রকম লেখালিখি করে আমার নামে স্বাক্ষর করে।
যে সব হস্তলেখাবিদ তাদের কাজ চরম দক্ষতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, নিজেদের দক্ষতা সম্পর্কে প্রভূত সচেতন ছিলেন। তার জন্যে তাঁরা জানও দিতে প্রস্তুত থাকতেন। জাহাঙ্গীরের প্রাণের হস্তরেখাবিদ মুল্লা মীর আলি লিখছেন — আমার কলম চমৎকার সৃষ্টি করে, এবং সে শিল্প শব্দের মানের থেকেও অতিরিক্ত স্তরে উঠে যায়। আমার অক্ষরের বাঁক শেখানো মানে স্বর্গীয় দাসত্ব স্বীকার করে নেওয়া, এবং প্রত্যেক রেখার মূল্য অসীমের দ্যোতক। মুঘল আমলের শেষের দিকে সাধারণ শিল্পকলা উৎসাহিত করা হতে থাকে। বাহাদুর শাহ নিজে শিল্পকলার অনুগামী ছিলেন, এবং দাক্ষিনাত্যের সুলতানেরা যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন তা হায়দারাবাদের নিজাম বহুকাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন। (চলবে)