আকবর
আকবরের মৃত্যু ঘটে ১৬০৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর আগরা দুর্গস্থিত বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের বইএর একটি সুমারি করা হয়। উপমহাদেশে ভ্রমণে আসা সেই সময়ের দুজন ইওরোপিয়, মনরিকে এবং ডি ল্যাক্ট, সরকারি মহাফেজখানা থেকে এই সুমারি সমীক্ষার তালিকা নকল করেন। সেই তালিকায় দেখি অসাধারণ চিত্রিত ২৪ হাজার পুথির বর্ণনা দিয়েছেন দুই ইওরোপিয়। বইগুলির মোট মূল্যমান ছিল ৬৪ লক্ষ ৬৩ হাজার ১৩১ টাকা। প্রত্যেক বইএর গড় দাম ছিল ২৭ থেকে ৩০ পাউন্ড। পাউন্ডে মোট মূল্যমান ছিল ৭৩৭১৬৯ (J.R.A.S. (The Treasures of Akbar) April, 1915)। সম্রাটের ব্যক্তিগত শিক্ষক মুল্লা পীর মহম্মদ এই গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন (Tirikhi-Akbari. Ms. in the Astiatic Society of Bengal, leaf 42 as quoted by Law in Promotion of Learning in Muslim India, p. 141)।
আকবরের সময় তাঁর উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় পুস্তক সংগ্রহালয় ছাড়াও উপমহাদেশজুড়ে প্রচুর গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল। এই গ্রন্থাগারগুলি অভিজাত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বেশ কিছু রাজা ও রানীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। আকবরের অন্যতম রাজ্ঞী বিদুষী সালিমা সুলতানা বেগম ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে একটি গ্রন্থাগার তৈরি করেন (J.I.H. Vol. 31.p. 162)। তিনি মাকফি ছদ্মনামে প্রচুর ফারসি বয়েত রচনা করেছিলেন(Ain-i Akbari (Blochman), p. 322)। সালিমা বেগমের সংগ্রহের বাদাউনির অনুবাদের বত্রিশ সিংহাসন বইটি ঐতিহাসিক বাদাউনি বা অন্য কেউ পড়তে নিয়ে হারিয়ে ফেলেন (Lowe’ Badauni, p. 186, 389)। বাবরের কন্যা, আকবরের পিসি, হুমায়ুন নামা রচয়িতা গুলবদন বেগমও অসাধারণ বিদ্বান ছিলেন এবং তাঁরও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল (Humiyun NSmih, Mrs. Beveridge, p. 76)।
অভিজাতদের মধ্যে প্রথম জীবনে বিদ্বান, আহমেদাবাদের প্রশাসক, আবদুর রহিম খানইখানান, এবং শেখ ফৈজির ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার সে যুগে বিখ্যাত ছিল। খানইখানানের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার দেখাশোনার জন্য ৯৫ জন কর্মচারী ছিল। এদের মধ্যে ছিল গ্রন্থাগারিক, বাঁধাইকর, নকলনবিশ, অনুবাদক, ইত্যাদি। বহু লেখক, কবি, ঐতিহাসিক, অনুবাদক তাঁকে বই উপহার দিতেন। জ্ঞানভিখারী বহু মানুষ যারা নিজেদের আত্মপলব্ধির জন্যে পড়াশোনা করতে চাইতেন, তাঁর পুস্তকভাণ্ডারে নিয়মিত যেতেন (Society and Culture in the Moghul Age, Chopra, p. 165)। জ্ঞানী, লেখক, বইবাঁধাইকার, স্বর্ণমণ্ডক (গিল্ডার) মৌলানা ইব্রাহিম নক্স, খানইখানান আবদুর রহিমের কিতাবদার ছিলেন (I.C. Oct. 1945, p. 333)। মাখজানিআফগানির লেখক নিয়ামতুল্লা মাঝেমধ্যেই খানইখানানের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন, তারপরে তিনি জাহাঙ্গিরের দরবারে ইতিহাসকার হিসেবে যোগ দেন (Niamatullah’s History of the Afgans, N.B. Roy, p. V)।
মুঘল আমলের শেখেরাও জ্ঞানের প্রত্যাশী ছিলেন। শেখ ফৈজির নিজস্ব গ্রন্থাগারের বইএর সংখ্যা ছিল ৪৩০০। ১৫৯৫তে তাঁর মৃত্যুর পর তার বইগুলি আগরার রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে নিয়ে যাওয়া হয় (Ain-l-Akbari (Blochman) Vol. I, p. 550)। আকবরের সময় জৌনপুরের প্রশাসক, সিপাহসালার মুনিম খান খানইখানান জ্ঞান ও জ্ঞানীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং গোমতির ওপরে একটি সেতু তৈরি করে দেন। বই সংগ্রহ তার নেশা ছিল। বন্ধু বাহাদুর খান উজবেগ তাঁকে কুলিয়া সাদি উপহার দ্যান। দেওয়ান মির্জা কামরানের মত তিনিও বই কিনতেন গ্রন্থাগারের জন্যে (I.C. Oct. 1945, p. 337)।
জাহাঙ্গির
আকবরের মৃত্যুর সাত দিনের মাথায় পুত্র সেলিম, নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গির বাদশা গাজি নাম নিয়ে আগরার সিংহাসনে আরোহন করেন। দৈহিক সুখে অনেকটা উৎসাহী জাহাঙ্গির পাদশা পিতা এবং পিতার পিতামহের বেশ কিছু গুণাবলী অর্জন করেন। বাবরের আত্মকথন বাবরনামার মতই, জাহাঙ্গির রচিত জীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি তাঁর সাহিত্য দক্ষতার অবিসংবাদী চিত্র। বিশ্ব সাহিত্যে এ এক অমর সৃষ্টি। জাহাঙ্গির জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং শিক্ষার অনুরাগী ছিলেন। তাঁর নির্দেশে শিক্ষিত উত্তরাধিকারহীন ধনীরা মাদ্রাসা, ধর্মস্থান এবং গ্রন্থাগার তৈরি এবং সারানোর কাজ করেছেন। ত্রিশ বছর ধরে যে সব মাদ্রাসায় কোন কাজ হয় নি, যেগুলি পশুপাখিদের আস্তানা হয়ে আছে, বা যে সব মাদ্রাসায় পড়ুয়া আর বিদ্বানের পদক্ষেপ পড়ে না, সেই সবগুলি সারানোর নির্দেশ দেন ( Tarikhi-Jan-Jahan by Jan Jahan Khan Ms. in the Asiatic Society of Bengal as quoted by Law in Promotion of Learning in Muslim India, p. 175)। সাম্রাজ্যের নিরন্তর জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষণার জন্যে আগরা শহর এশিয়ার অন্যতম প্রখ্যাত শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র হিসেবে বহুদূর এগিয়ে যায়। তিনি শুধু অসাধারণ বিপুল গ্রন্থাগার উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জন করেছিলেন তাই নয়, প্রচুর চিত্রও উত্তরাধিকার সূত্রে পান। সেই চিত্রগুলিকে প্রদর্শন করার জন্যে তিনি একটি চিত্রশাল তৈরি করেন (Tuzuki’Jahangiri, Rogers and Beveridge, p. 12)।
রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার ছাড়াও, প্রথামেনে সম্রাটের একটি নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল। তিনি বই এত ভালবাসতেন যে যখনই গুজরাট বা অন্যান্য জায়গায় যেতেন, তাঁর সঙ্গে একটি চলমান গ্রন্থাগার যেত। গুজরাটে তাঁকে সম্মান জানাতে আসা উলেমাদের তার গ্রন্থাগার থেকে বই উপহার দিয়েছেন। বই উপহারের একটি চিত্র জাহাঙ্গিরের তুজুকে পাচ্ছি, “১৬ তারিখ, মঙ্গলবারে, গুজরাটের অভিজাতরা আমার কাছে দ্বিতীয়বার এলেন। আমি তাদের খেলাত, রাহাখরচ, জমির অনুমতি দিলাম। প্রত্যেককে আমার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে তাফসিরি কাশাফ, তাফসিরি হুসেইনি, রাহুজালতুলআহবাবএর মত পুস্তক উপহার দিলাম এবং প্রতেক পুথির পিছনে আমার গুজরাট আসার তারিখ উল্লেখ করে প্রত্যেককে সম্মান জানালাম (I.C. Oct. 1945, p. 338)।” বইপ্রেমী জাহাঙ্গির গ্রন্থাগারের জন্যে উচ্চমূল্যে বই খরিদ করতেন। মার্টিন লিখছেন “যে পুথির জন্যে জাহাঙ্গির ৩০০০ স্বর্ণমুদ্রা খরচ করছেন, যার দাম ১০ হাজার পাউন্ড, সেটি আজকের প্যারিসে ২০০০ পাউন্ডেও বিক্রি হবে না; যদিও সংগ্রাহকেরা পুরোনো বই আর চিত্রের জন্যে বিপুল দাম দিতে প্রস্তুত, ঠিক যেমন আমেরিকিয়রা রেম্ব্রাঁ এবং ভ্যান ডাইকসের ছবির জন্যে দেয়” (Miniature Paintings and Painters of Persia, India and Turkey, Vol. L p. 58)।
জাহাঙ্গিরের সময়ে বইচিত্রণের কাজ আরও সমৃদ্ধ হয় এবং তিনি তা যথোচিত পৃষ্ঠপোষণাও করেন। আকবরের পছন্দ ছিল প্রায়-জীবন্ত চিত্রকলা, জাহাঙ্গিরও একইরকমভাবে চিত্রাঙ্কনে জীবনকে তুলে ধরতেন। তিনি বলতেন হাজার বর্ণনা দিয়ে যা বোঝানো যায় না, সত্যিকারের জীবনের ছবি পাঠককে বিস্ময়াবিষ্ট করে তুলতে পারে। জাহাঙ্গির-নামায় চিত্রাঙ্কনের জন্যে চিত্রশিল্পী নিয়োগ করেন। গোয়ার সমুদ্র বন্দরে পর্তুগিজদের সঙ্গে ইওরোপ এবং অন্যান্য প্রান্ত থেকে যেসব বিচিত্র পশুপাখি আসৎ, মুঘল প্রতিনিধি মুকরব খান সে সবগুলো মুঘল দরবারে বয়ে নিয়ে আসতেন। সেই পশু-পাখিগুলি তিনি, তাঁকে দিয়ে জাহাঙ্গিরনামায় আঁকিয়ে নেন (Waqiati-Jahangiri, Elliot, V.T, p. 331)।
গ্রন্থাগার চালু রাখার জন্যে বিপুল সংখ্যক আমলা বিশেষ করে নকলনবিশ নিয়োগ করেন। জাহাঙ্গির তুজুক লেখা শেষ করলে, গ্রন্থাগারের নকলনবিশদের সেটি নকল করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে নির্দেশ দ্যান। প্রথম নকলটি উপহার পান পুত্র শাহজাহান। তাঁর সময়ের প্রথা মেনে জাহাঙ্গির হস্তলেখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর সময়ের প্রখ্যাত লিপিকারদের দরবারে ডেকে আনিয়ে প্রথামত সম্মানও দিয়েছেন। প্রখ্যাত লিপিকার শেখ ফরিদ বাখরিকে তিনি রত্নখচিত তলোয়ার, খেলাৎ, কলম, দোয়াতদানি উপহার এবং মীর বক্সী উপাধি দিয়ে সম্মাননা জানান। তিনি বলেন “আমি আপনাকে কলম আর তরবারির সর্বশক্তিমানরূপে স্বীকার করলাম (শাহিবুস-সাইফ-ওয়াইকালাম)” (TQzuki-Jahdngiri, Rogers and Beveridge, V. I, p. 13)। জাহাঙ্গিরের প্রখ্যাত বিদুষী রাজ্ঞী নুরজাহানও বই-এর অনুরাগী ছিলেন এবং একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন। তিনিও চড়া দামে বই কিনতেন। কামরানের দিওয়ান নামক বই তার গ্রন্থাগারের জন্যে তিন স্বর্ণ মোহর দিয়ে কেনেন। এটির একটি নকল পাটনার খুদাবক্স গ্রন্থাগারে রাখা আছে। দিওয়ানের প্রথম পাতায় লেখা আছে এই সম্পদের দাম তিন মোহর — নবাব নুরুন্নিসা বেগম (Ms. of Diwan-i-Kamran. Khuda Bux Library, Patna)। রাজ্ঞীর পড়াশোনার উৎসাহ থেকে আমরা জানতে পারলাম, রাজ্ঞীরাও নবাব উপাধি ধারণ করতে পারত। জাহাঙ্গিরের দরবারের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন অভিজাত শেখ ফরিদ বখরি। তিনি লাহোর আর আহমেদাবাদে বহুকাল প্রশাসকের দায়িত্বভার সামলেছেন। তিনিও একটি বিশাল ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন। এই গ্রন্থাগারের জন্যে তিনি হাসান দেহলভির দিওয়ান নামক বই বিপুল দাম দিয়ে কেনেন। এই বইটিও পাটনার খুদাবক্স গ্রন্থাগারে রাখা আছে (Catalogue of the Mss of Khuda Bux Library, V.I, p. 248)। (চলবে)