শাহজাহান
সম্রাট শাহজাহান যদিও ইতিহাসে বিখ্যাত স্থাপত্যকলা বিকাশের জন্যে কিন্তু তিনিও তার পূর্বজর মত শিক্ষা আর জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি জ্ঞানী আর বিদ্বানদের উপহার দিয়ে সম্মানিত করতেন। তাঁর সময়ে বহু কবি, ধর্মতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বিকশিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যাদের নাম এই মুহূর্তে উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন, পাদশানামার লেখক আবদুল হামিদ লাহোরি, পাদশানামার আরেক লেখক আমিনি কোয়াজভিনি, আমলইশাহির লেখক মহম্মদ সালেহ, শাহজাহান নামার লেখক ইনায়েত খান প্রভৃতি। সম্রাটের জৈষ্ঠ সন্তান দারা শুকোর পৃষ্ঠপোষকতায় ভিন্ন ভিন্ন ভাষা থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ হয় এবং একই সময়ে প্রচুর পুস্তকও রচনা হয়।
বিভিন্ন ক্ষেত্রের মৌলিক জ্ঞানের বই ছাড়াও শাহজাহানকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন ধারার ডিক্সনারিও তৈরি হতে থাকে। এগুলির মধ্যে আবদুর রশিদ অল তাতভির ফারলাঙ্গিরশিদি এবং মন্তাখাবউললুঘাতইশাহজাহানি, আমানুল্লার চাহার অনসার দানিশ, মহম্মদ সাদিকের শাহিদিসাদিক অন্যতম। শেষতমটি ধর্মীয়, দার্শনিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, এবং মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে রচিত (History of Shah Jahan, B.P. Saksena, pp. 252-57)।
সম্রাট দিল্লিতে একটি বিশেষ উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং দারউলবাকা নামক শিক্ষা কেন্দ্রটি সংস্কার করে নতুনভাবে কার্যকর করে তোলেন। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্রে আবশ্যিকভাবে গ্রন্থাগার ছিল। যদিও সম্রাট নিজে বই সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগার তৈরিতে খুব বেশি উৎসাহিত ছিলেন না কিন্তু তাকে মধ্যরাত্রে নিয়মিত বই পড়ে শোনানো হত। যদুনাথ সরকার লিখছেন, সন্ধ্যে সাড়ে আটটার সময় তিনি হারেমে প্রবেশ করতেন। প্রায় দু-তিনঘন্টা মহিলাদের গান ও নৃত্য উপভোগ করতেন। এরপরে পাদশাহ বিছানায় শুতে যেতেন। সম্রাটের মুল শোবার ঘরে একজন পাঠিকা (না পাঠক?) পর্দার আড়ালে থেকে ভ্রমন কাহিনী, নবী এবং সাধুসন্তদের জীবন কাহিনী এবং পূর্ববর্তী রাজাদের বিষয় শুনতেন। এগুলির মধ্যে তার ব্যক্তিগত পছন্দের ছিল বাবর আর তৈমুরের জীবনী (Anecdotes of Aurangzib and Historical Essays, J. Sarkar, p. 174)।
১৬৩৮-র এপ্রিলে সুরাটে যোহানন এলবার্ট ভন ম্যান্ডেলসলো নামক এক যুবা জার্মান উপস্থিত হন। তিনি আহমেদাবাদ, বম্বে, আগরা আর লাহোর শহর ঘুরে দেখেন। তার দিনপঞ্জীতে বলছেন শাহজাহানের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে উত্তমরূপে বাঁধাই করা ২৪০০০ বইএর কথা (Mandelslo—Harris Travels, Vol. II, p. 118)। মুল গ্রন্থাগারিকের নাম দারোগা-ই-কিতাবখানা (History of Shah Jahan, B.P. Saksena, p. 277)। তার লেখায় আবদুর রহমান, রশিদআলি, হস্তলেখাবিদ মীর সালিস, মীর সৈয়দ আলি, ইতিরমদ খান, জাফর খানের পুত্র ইনায়েত খানএর নাম পাওয়া যায়(ঐ)।
এই যুগে আগরা আর দিল্লিতে জেসুঈটরা গ্রন্থাগার তৈরি করেন। বিভিন্ন ফাদারের লেখা বই এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রাচ্য ভাষার বই ছিল এই গ্রন্থাগারে। শাহজাহানের নির্দেশে প্রথমবার লুণ্ঠিত হয় আগরার জেসুঈটদের গ্রন্থাগটি, দ্বিতীয়বার লুণ্ঠিত হয় আহমদ শাহ আবদালির সময় ১৭৫৯ সালে। তখন বই ছাড়া সব কিছুই লুঠ হল (The Jesuits and the Great MoghuL Maclagna, p. 139)। ১৬৫০ সালে ফাদার হেনরি বুসি প্রথমবার দিল্লি যান। তার উদ্দেশ্য ছিল দরবারে খ্রিষ্ট মিশন, সম্রাটকে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষা দান নিয়ে দরবার করা। কাজ সম্পাদনের জন্যে যুবরাজ দারা এবং আরও কিছু অভিজাতর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেছেন, সে সময় বহু মুসলমান অভিজাত ইওরোপিয় ধর্মতত্ত্বের বই তাদের গ্রন্থাগারে রাখতেন। এক বড় গ্রন্থাগারওয়ালা শিক্ষিত মুসলমানের সঙ্গে ফাদার বুসি ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তার বাড়িতে দেখেন, সেই ব্যক্তির গ্রন্থাগারে প্রখ্যাত আরবি জ্ঞানীদের মত খ্রিষ্ট ধর্ম বিষয়ে প্রচুর বই সংগ্রহ ছিল (ঐ, ১১৬)।
আওরঙ্গজেব
১৬৫৬ সালে আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রের ভার নেন। তিনি অসাধারণ বিদ্বান বুদ্ধিমান ছিলেন, অসাধারণ লেখক ছিলেন, দক্ষ প্রশাসক ছিলেন অসাধারণ সেনানী ছিলেন আর ধর্মীয় রাজা ছিলেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণা করেন। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র খোলেন, পুরোনো ভেঙেপড়া মাদ্রাসা সারান। তার প্রশাসকদের হিন্দু মন্দির এবং হিন্দু বিদ্যালয় ধ্বংস করতে আর হিন্দুদের ধর্ম পালনে বাধা দিতে প্ররোচিত করে নির্দেশ দেন (যদিও লেখকের এই তথ্যটি সম্বন্ধে উল্টো মত পোষণ করি, এখন অনেক ধারনাই পাল্টে যাচ্ছে। যদুনাথ সরকারের মত ঔরঙ্গজেব বিরোধী ঐতিহাসিকদের কাজে এই সম্পূর্ণ ভুল ধারণাটি জন্মেছে। লেখকের বই যখন প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৬০ সালে, এই ধারনাটা তখন প্রবল ছিল — অনু) (Anecdotes of Aurangzib and Historical, Essays, J. Sarkar p. 11)। আওরঙ্গজেব গোঁড়া ধর্মান্ধ ছিলেন। রাত দুটোয় প্রার্থনার পর তিনি কোরাণ অনুবাদ করতেন, তার পর আরবি বিচারব্যস্থার বই বা নানান ধরণের প্রচারপত্র থেকে ইসলামি ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করতেন (ঐ, ১৩১)। তার শেষ ইচ্ছাপত্র থেকে পরিষ্কার এই কোরাণ নকলের কাজ বিক্রি করে তিনি ৩০৫ টাকা রেখে যান (ঐ, ৫২)। নিজে যেহেতু ধর্মান্ধ মুসলমান ছিলেন, তাই তিনি মুল্লা নিজামকে দিয়ে ফতোয়াইআলমিগিরি সঙ্কলন করান। এছাড়াও হাদিস, ফিক ইত্যাদির তফসির বইও সংগ্রহ করেতেন (Promotion of Learning in Muslim India, Law, p. 193)। বিদরের মুহম্মদ গাওয়ানের গ্রন্থাগারটি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে জুড়ে দিয়ে গ্রন্থাগারের আয়তন বাড়ান (J.I.H. Vol. 31,p. 165)।
পূর্বজদের মতই আওরঙ্গজেব হস্তলেখাবিদদের রাজসভায় সাদরে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। শাহজাদা দারাশুকো বা পাদশাপুত্রী জেবউন্নিসাকে হস্তলেখায় বিশেষভাবে পারদর্শী করে তোলা হয় প্রখ্যাত হস্তরেখাবিদ আকা আবদুর রশিদের অধীনে। স্বয়ং সম্রাটও তালিম নেন রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক সৈয়দ আলি তবরেজির অধীনে ( I.A. Vol. 8, No. 2, p. 44)। রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের নিজাম ছিলেন মুহম্মদ সালেহ এবং মহম্মদ মনসুর এবং সঈদ আলিঅলহুসেইনি মুহতমিম ছিলেন। মহম্মদ মনসুরকে মকরমাত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয় (l.C. Oct. 1945, p. 339)। সম্রাটের কন্যা জেবউন্নিসা কবি বিদুষী এবং কৃষ্টিশীল ছিলেন। তাঁর অনুরোধে ইমাম রাজির কবিতা তফসিরেকবীর ফারসি অনুবাদের নাম দেওয়া হয় জেবুততফসিরে। তিনি পাগলের মত বই সংগ্রহ করতেন। তাঁর বিপুল বিশাল গ্রন্থাগারের নাম ছিল মাসিরিআলমগিরি এবং সেটি বিদ্বানেরা হামেশাই ব্যবহার করতেন (Medieval Indian Culture, Yussuf Hussain, p. 91)।
আওরঙ্গজেব কি সঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছিলেন?
ক্যাথেরিন বাটলার আওরঙ্গজেবের সঙ্গীত নিষিদ্ধ করণ বিষয়ে লিখেছেন ডিড আওরঙ্গজেব ব্যান মিউজিক? প্রবন্ধে। তিনি প্রমান করেছেন, ঐতিহাসিকেরা মানুচি এবং কাফি খাঁর লেখা থেকে সূত্র নিয়ে এই আকাশকুসম তত্ত্ব রচনা করেন। কাফি খাঁ আওরঙ্গজেবের সঙ্গীত নিষিদ্ধকরণের বক্তব্যটি মানুচির লেখা থেকে নিয়ে নিজের বয়ান তৈরি করেছেন। ক্যাথেরিন বলছেন দুটোই স্ববিরোধী এবং অনৃত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাছাড়া উদ্দেশ্যপূর্ণও বটে।
১৭০৭-এর ৩রা মার্চে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল জ্ঞানচর্চা, কৃষ্টি পৃষ্ঠপোষণার ধার ধরে রাখার কিছুটা চেষ্টা হলেও তার প্রয়াণের সত্তর বছরের মধ্যে বিশ্বে ধনীতম উপমহাদেশটি লুন্ঠনের ক্ষেত্র এবং অজ্ঞান আর মৃত্যুর উপত্যকা হয়ে ওঠে। পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের রক্তক্ষয়ী লড়াই চলে। তিন উত্তরাধিকারী বাহাদুর শা (১৭০৭-১৭১২) মুহম্মদ শাহ (১৭১৯-৪৮), দ্বিতীয় শাহ আলম (১৭৫৯-১৮০৬) জ্ঞানী এবং পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষণা করতেন এবং ১৭৩৩এ নাদির শাহের অভিযান সত্ত্বেও তাঁরা উজ্জ্বলতম পূর্বজদের কৃতিগুলির পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন।
বাহাদুর শা বেশ কিছু মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং প্রখ্যাতদের পৃষ্ঠপোষণা করতেন। তার পরের শাসনকর্তার সময় নাদির শাহ দিল্লি লুন্ঠন এবং দিল্লিকে মৃত্যু উপত্যকায় রূপান্তরিত করেন। তিনি সম্রাটের মণিমাণিক্য, সোনাদানা এবং প্রখ্যাত কোহিনুর হিরে এবং ময়ুর সিংহাসনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার থেকে মূল্যবান বহু ফারসি পান্ডুলিপি বহন করে নিয়ে যান। দ্বিতীয় শাহ আলম মুঘল গ্রন্থাগারের উজ্জ্বল দিনগুলি ফেরাবার উদ্যম গ্রহন করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি প্রচুর পুস্তক সংগ্রহ করেন। It is mentioned in the ’Ibrat-Nama that Ghulam Qadir, the fiend in human shape, who had most cruelly deprived the monarch of his eyes only three days before, went into the jewel house and took out a chest and a box of jewels, several copies of the Quran and eight large baskets of books out of the Imperial library”’ (Promotion of Learning in India During the Muhammadan Rule, Law, pp. 198-99)।
সে সময়ের অন্যান্য অঞ্চলের রাজাদের প্রখ্যাত গ্রন্থাগারগুলির মধ্যে ছিল মহীশূরের মহারাজা চিক্কা দেব রায়া (১৬৭২-১৭০৪) এবং জয়পুরের দ্বিতীয় মহারাজ সোয়াই মান সিংহ (১৬৯৯-১৭৪৩)। এই সময়ে এই দুই শাসকের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে কারণ চিক্কা দেবের গ্রন্থাগারে বিপুল সংস্কৃত বই ছিল যেগুলি টিপু সুলতান ধ্বংস করেন। জয় সিংহের উৎসাহ ছিল জ্যোতির্বিদ্যায়। তিনি ইওরোপ থেকে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক বই সংগ্রহ করান। তার গ্রন্থাগারে ইউক্লিডের এলিমেন্ট, স্থানিক এবং গোলাকার ত্রিকোণোমিতির বই, লা হায়ারের টাবুলি এস্ট্রোনমিক্যাল, ফ্লেমস্টিডের হিস্টোরিয়া প্রভৃতি ছিল (উক্ত জয় সিংহের আমলে মানমন্দিরগুলি তৈরি হয়েছিল, যার অক্ষহৃদয় বুঝতে ব্রিটিশদের বহু কষ্ট করতে হয়েছে – অনুবাদক) (Society and Culture in Mughal Age, Chopra, p. 165)। তাঁর প্রয়াণের পরে “Jai Singh’s son Jagat Singh gave this valuable library to a courtesan and it was thus destroyed and its books distributed among its base relations (Astronomical Observatories of Jai Singh, Kaye, p. 2)। এই তথ্যটাও উল্লেখ করা যাক মুঘল রাজত্বের শেষের দিকে বহু ফ্রান্সের জেসুইট পাদ্রি চতুর্দশ লুই (১৭২৯-১৭৩৫)-এর গ্রন্থাগারের জন্যে প্রচুর পুথি সংগ্রহ করে নিয়ে যান (J.B.H.S. Vol. VI. pp. 68-93)। (চলবে)