টিপু সুলতানের গ্রন্থাগার
পিতা হায়দার আলির মৃত্যুর পর ১৭৮২তে মহীশূরের সিংহাসনে আরোহন করেবন টিপু সুলতান। টিপু সাহিত্য এবং জ্ঞানচর্চার প্রভূত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তিনি বিভিন্ন বিদ্যাচর্চার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি গ্রন্থাগারেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বই পছন্দ করতেন তাই প্রচুর বই সংগ্রহও করেছেন, “After the first sieze of Seringapatam Tipu always slept on coarse canvas instead of on a bed and at his repasts listened to some religious books which was read out to him (Haider Ali and Tipu Sultan (Rulers of India) ; L. B. Bowrig, p. 224) (শ্রীরঙ্গপট্টনমের প্রথম অবরোধের পর টিপু বিছানায় না শুয়ে মোড়া কাপড়ের[ক্যানভাস] ওপর শুতেন এবং তাকে সে সময় বেশ কিছু ধর্মীয় বই বারবার পড়ে শোনানো হত)। প্রাসাদে সুলতানের নিজস্ব গ্রন্থাগারও ছিল, “In the library of the castle is a copy of the Koran, formerly belonging to Emperor Aurangzeb. It is said to have cost 9,000 rupees and is beautifully written in the Naskh character with elegant ornamentation(ঐ) (প্রাসাদে গ্রন্থাগারে নক্স অক্ষর আর অসামান্য চিত্রণে শোভিত ওরঙ্গজেবের হাতে লেখা কোরানের নকল ছিল। সে সময়ে এর দাম ছিল ৯০০০ টাকা)। অনেকে বলেন বইটি এখন উইন্ডসর ক্যাসেল লাইব্রেরিতে রয়েছে।
১৭৯৯ তে বীরের মৃত্যু বরণ করায় ব্রিটিশদের হাতে শ্রীরঙ্গপত্তনমের পতন ঘটে। তারা টিপুর সম্পদ লুঠের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল গ্রন্থাগারও দখল করে (I. C. Vol. XX, p. 3), লুঠ করে এবং ধ্বংস করে। বহুকাল টিপুর রাজকীয় গ্রন্থাগার মনুষ্য অগম্য স্থান হয়ে ছিল। এই গ্রন্থাগারের বিপুল পুস্তকের জ্ঞান সম্পদ লুঠ হয়ে চলে যায় লন্ডনের নানান গ্রন্থাগারে আর কিছু আসে ফোর্ট উইলিয়াম লাইব্রেরি, কিছু কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির অধিকারে “Among the papers found in his library was a register of his dreams” (Haidar Ali and Tipu Sultan, p. 226) (সেখানে কাগজপত্রে টিপুর স্বপ্নের বয়ান পাওয়া গিয়েছে)। প্রায় দশ বছর পরে মেজর স্টুয়ার্ট, লুঠ হয়ে যাওয়ার পরে পড়ে থাকা বইএর তালিকা কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপান নানান শিরোনামে, সেগুলো হল — Quran—44 volumes; commentaries on Quran—41 volumes; Prayirs— 35 volumes; Traditions—46 volumes; Theology—46 volumes; Sufyism (Mystic writings) —115 volumes; Ethics—24 volumes; Jurisprudence—95 volumes; Arts and Sciences— 19 volumes; Philosophy— 62 volumes; Philology—45 volumes; Lexicography—29 volumes; Hindi and Deccani poetry—23 volumes . . . and Deccani prose—4 volumes; Turkish prose —2 volumes; Tables— 18 volumes। এর মধ্যে কিছু বই বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডার সুলতানের গ্রন্থাগার থেকে দখল করা। অধিকাংশ বই চিত্তুর, সাভানুর এবং কাডাপ্পা থেকে লুঠ করে আনা (ঐ, ২০২)। ড্রেস্ক্রিপটিভ ক্যাটালগে মেজর স্টুয়ার্ট লিখছেন The library consisted of nearly 2,000 volumes of Arabic, Persian and Hindi manuscripts in all the various branches of Mohammadan literature. . . . Theology or Suffism was his (Sultan’s) favourite study. But the Sultanwas ambidous . of being an author; and although we have not discovered any complete work of his composition, no less than forty-five books, on different subjects, were either composed, or translated from other languages under his immediate patronage or inspection (গ্রন্থাগারে মুসলমান বিদ্যার অন্তত ২০০০ বই ছিল আরবি, পারসিক এবং হিন্দি ভাষায় লেখা… ধর্মতত্ত্ব এবং সুফিবিদ্যার তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল; সুলতান নিজে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক ছিলেন। যদিও তাঁর নামে লেখা সম্পূর্ণ বই পাওয়া যায় নি, বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ৪৫টা বই তিনি লিখেছেন, সরাসরি অন্যান্য ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন)। এর থেকে প্রমান হয় টিপু তার গ্রন্থাগারের জন্য পুস্তক লেখা এবং অনুবাদের কাজে প্রবল উৎসাহ দিতেন।

সুলতান প্রাসাদের গ্রন্থাগারের বইগুলি মূলত চামড়া দিয়ে বাঁধাতেন। ফলে শ্রীরঙ্গপত্তম হয়ে ওঠে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং চামড়া দিয়ে বই বাঁধাইয়ের অন্যতম কেন্দ্র All the volumes that had been rebound in Seringapatam have the names of God, Mohammad, his daughter Fatima and her sons, Hassan and Hussain, stamped in the medallion on the middle of the cover, and the names of the first four Khalifs on the four corners. At top is Sirokare Khodabad (Govt given by God); and at the bottom Allah Kafy (God is sufficient). A few were impressed with the private signet of the Tipu Sultan (২৩) (সব কটা বই শ্রীরঙ্গপত্তনমে নতুন করে বাঁধাই করা হয়েছে সর্বশক্তিমানের নামে, নবির নামে বা তাঁর কন্যা ফতিমা এবং তাঁর সন্তান হাসান এবং হুসেইনের নামে; প্রচ্ছদের মধ্যিখানে একটি পদক বসিয়ে একটি সিলমোহর দিয়ে ছাপ দেওয়া হত; চার কোণে থাকত প্রথম চার খলিফাত নাম। ওপরে লেখা থাকত সিরোকারি খোদাবন্দ — সর্বশক্তিমানের দেওয়া সরকার, নিচে লেখা থাকত আল্লা কাফি — সর্বশক্তিমানই পর্যাপ্ত)।
গ্রন্থাগার কর্মী
১০৫৮খ্রির নাগাই লেখ আমাদের চালুক্য সময়ের গ্রন্থাগার কর্মীদের পদমর্যাদা এবং তাদের বেতন সম্বন্ধে তথ্য জানতে সাহায্য করে। এই লেখতে নাগাই অঞ্চলের একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে কিভাবে জমির উদ্বৃত্তে শিক্ষকদের এবং গ্রন্থাগারিকদের বেতন কাঠামো হবে সেই তথ্য আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, শিক্ষক এবং গ্রন্থাগারিক উভয়েই একই সম্মান পেতেন, যে বেতন শিক্ষকদের দেওয়া হত সেই পরিমান বেতন গ্রন্থাগারিকেরা পেতেন।
সুলতানি আমলে রাজারা নিজের বাড়িতেই একটা আলাদা গ্রন্থাগার বা কিতাব খানা রাখতেন, যে সচিবের অধীনে সেই গ্রন্থাগার থাকত তার পদের নাম ছিল কিতাবদার। খলজি বংশের সুলতান জালালুদ্দিন জ্ঞানচর্চার উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে প্রখ্যাত কবি আমির খুসরুকে নিযুক্ত করেন। সে সময় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গ্রন্থাগারিকদের বিপুল সম্মান ছিল। তাই আমীর খুসরুকে গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিযুক্ত করতে গিয়ে তিনি তাঁকে তার দরবারের রত্ন ঘোষিত করে তার সম্মান বৃদ্ধি করেন।
মুঘল আমলে নিজাম ছিলেন গ্রন্থাগারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী। মুল্লা পীর মুহম্মদ এবং শেখ ফৈজী পরপর আকবরের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হয়েছিলেন। জাহাঙ্গিরের সময় তাঁর দরবারের প্রখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত মক্তব খানও গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন।
তবে দিনে দিনে গ্রন্থাগারের আকার কাজকর্মের বহর বাড়তে থাকায় মুঘল এবং মুঘল পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের উপযোগী নানান সব কর্মী/পদাধিকারী নিযুক্ত হতে শুরু করেন। সে সব পদের নাম এবং যোগ্যতার বর্ণনা দেওয়া গেল

১) কিতাবখানার প্রধান দায়িত্বে সচিবের পদের নাম ছিল নিজাম। আজকের দিনের বড় রাষ্ট্রপোষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁকে অবশ্যই বিদ্বান এবং উপযুক্ত প্রশাসকও হতে হত
২) নিজামের অধীনে ছিলেন দারোগা — প্রশাসনিক এবং প্রযুক্তিগত বিভাগ দেখার জন্যে। তার দায়িত্ব ছিল বই নির্বাচন, শ্রেণীবিন্যাস এবং খরিদ করা।
৩) সাহাফ এবং ওয়ারাক দারোগার নির্দেশে কাজ করতেন। তাদের কাজ ছিল গ্রাহককে উদ্দিষ্ট বই দেওয়া এবং বইটি ফেরত পেলে সেটিকে ঠিক জায়গায় আবার রেখে দেওয়া।
৪) পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, দেখাশোনা, পরিমার্জনকরার কাজ করতেন মুসাহিহ। পুথি পোকায় কাটলে সেটিকে পূর্বাবস্থায় ফেরত দেওয়ার দায় ছিল এই পদাধিকারী ব্যক্তির। তাঁকে অবশ্যই একাধারে বিদ্বান এবং প্রযুক্তিবিদ হতে হত। না হলে তার পক্ষে ক্ষতি হওয়া বইটিকে ঠিকভাবে মেরামত করা অসম্ভব হত। বৈরাস্ম খানের পুত্র খানইখানান রহিমের কিতাবখানায় মৌলানা সুফিী এই পদ অলঙ্কৃত করতেন।
৫) আর ছিলেন আবশ্যিকভাবে অনুবাদক।
৬) কাতিব বা সাধারণ নকলনবিশ যিনি দুর্লভ/যেকোনও পুথি নকল করতেন।
৭) খুশনবিশ বা হস্তলিপিবিদ।
8) কাতিব আর খুশনসিবের কাজ নিরীক্ষণ করতেন মুকাবিলানবিশ। তিনি নকল পুথি মুল পুথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।
৯) বই বাঁধাইকার।
১০) চিত্রশিল্পী।
১১) কাগজের প্রান্তে নানান রকমের কাজ করার জন্যে দক্ষ কারিগরের পদের নাম ছিল জিদওয়াল সাজ।
১২) করণিকের কাজ ছিল হিসাব করা ও মোট বইএর হিসাব রাখা।
১৩) ধুলা ও অন্যান্য কিছু পরিষ্কারের জন্যে ছিল অন্যান্য কর্মচারী।
(চলবে)