স্বেন বেকার্ট, চন্দ্রকান্ত রাজু, কপিল রাজ বা ধরমপাল এবং পশ্চিমের শুরু করা পরম্পরা ধ্বংসের অন্যতম কারিগর, কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার ধারক-বাহক উপনিবেশিক আধুনিকতাকে প্রশ্ন করা আশিস নন্দী স্পষ্ট দেখিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ এবং জ্ঞানচুরির পর সাম্রাজ্য, যা আদতে ছিল যুদ্ধপুঁজি, তার একটাই কাজ উদ্দিষ্ট ছিল, সেটা হল পপশ্চিমিয় যতগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞানচর্চা কাঠামো ছিল, সেগুলো থেকে জ্ঞানের রেণু না বলে চুরি করে, সে সব জ্ঞানচর্চাকে অকেজো করতে, সে সব উপনিবেশের ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রবিত্তকে লেলিয়ে দিয়ে অশিক্ষিত পুরোনো ছাপ মেরে ধ্বংস করা যাতে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা কোনও দিনই ইওরোপের জ্ঞানচর্চার প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় বহু প্রতীক্ষিত পলাশীর চক্রান্ত সফল হওয়ার পরে বাংলায় সম্পদ লুঠ চলল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যমে ঘটানো হল এশিয়ার প্রথম গণহত্যা — ছিয়াত্তরের গণহত্যা — যাকে ভদ্রবিত্তরা আজও মন্বন্তর অভিধা দিয়েছে। গণহত্যা শুধু যে একটা সমাজের জ্ঞানী মানুষের দৈহিক এনিহিলেশনই নয়, এটা মানসিক, জ্ঞান এবং দক্ষতারও গণহত্যাও বটে। অর্থাৎ যে ১ কোটি কারিগর, চাষী হকার, অন্যান্য পেশাদার বাঙালি মারাগেল ছিয়াত্তরের গণহত্যায়, তারা কবরে বা শ্মশানে, তাদের সঙ্গে নিয়ে গেল হাজার হাজার বছরেরে অধীত দক্ষতা, অসান্য জ্ঞান আর সামাজিক পরম্পরা, যেগুলো বাংলাকে সোনার বাংলার হিসেবে তৈরি করার জন্যে দায়ি ছিল। তৈরি হল বিশাল শূন্যতা। ছিয়াত্তরের গণহত্যায় অনেকটাই শেষ হয়ে গেল বাংলার হাজার হাজার বছরের অধীত জ্ঞান, দক্ষতা আর সমাজ বন্ধন। গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য, কারিগর, চাষী, হকার শূন্য হয়েগেল! তার দুদশক পরে আরেকটা সাম্রাজ্যবাদী পেরেক। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে প্রয়োগ করে কেড়ে নেওয়া হল বাংলার জনগণের হাতে থাকা সম্পদ। কারিগর, হকার কৃষকদের বিপুল কৌম জমি কেড়ে নেওয়া হল। কেড়ে নেওয়া হল ব্রহ্মোত্তর পীরোত্তর লাখেরাজ ইত্যাদি কর ছাড় পাওয়া জমিগুলো। জমি দিয়ে দেওয়া হল ব্যক্তি মালিকানায়।
‘লাখেরাজ, মদদইমাশ, চাকরান, পীরোত্তর, ব্রহ্মত্তোর ইত্যাদি’ শীর্ষক প্রকাশনায় স্বপন চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন ‘বাংলার নবাবী আমলে এমন নিষ্কর জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০%। এর আয় থেকেই গ্রামের পালা-পার্বন, বিদ্যালয়, মন্দির মায় ক্ষুদ্র সেচ চালানো হতো।’ আমরা দক্ষিণ ভারতে মান্যম জমির কথা জানি যেটি মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে থাকত, সেই জমির আয় দিয়ে সমাজের বহুকাজ সম্পন্ন হত। ভগিনী নিবেদিতার সূত্র তুলে আইআইটি চেন্নাইএর পত্রিকা ভারতীতে রবি কুমার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন DESTRUCTION OF THE INDIAN SYSTEM OF EDUCATION। সেই প্রবন্ধে রবি কুমার উল্লেখ করছেন, ব্রিটিশ পূর্ব ভারতে রাজস্বমুক্ত জমি ছিল ৩৫-৫০%, ‘In India 35% to 50% of village lands were revenue free and that revenue was utilised for running schools, conducting temple festivals, producing medicines, feeding pilgrims, improving irrigation etc. The British in their greed brought down the revenue free lands down to 5%.’ যেমন এজমালি পুকুর, যেমন নয়নজুলি, যেমন রাস্তার ধারের ফলের গাছ, যেমন শ্মশান, যেমন জঙ্গল, যেমন পশুচরানোর ঘাস জমি, যেমন রাজপথ, যেমন মাটির তলার সম্পদ, মসজিদ মন্দির এলাকা আর তার সম্পত্তি, গ্রামের মেলা হাট বাজারের স্থান ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি — এগুলো সামগ্রিক সমাজের সম্পত্তি ছিল, আজও আছে। প্রচুর পরিবার খেদানো মানুষ, দূর থেকে আসা মানুষ, সমাজ ছাড়া মানুষ, গোষ্ঠী ইত্যাদিরা এখানে আশ্রয় পেতেন, কর, শুল্ক ছাড়া জীবনধারণ, জীবিকা নির্বাহ করতেন। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অধিকার থাকত না, এই মানুষ, গোষ্ঠীদের এই এজমালি সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দেওয়ার। সম্পত্তিহীন, সমাজ বিচ্ছিন্ন/পরিত্যক্ত মানুষ/পরিবার এই সব এজমালি সম্পত্তি থেকে খাবার পুষ্টি আহরণ করতেন, অস্থায়ী মাথার ছাদও পেতেন। এগুলির নাম ছিল দেবোত্তর, পীরোত্তর, চাকরাণ, লাখেরাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। নবাবি আমল অবদি এই ধরণের সম্পত্তি ছিল ৫০%এর বেশি এবং রাজস্বমুক্ত।
ব্যক্তি অধিকার মুক্ত সম্পত্তিতে প্রথম হাত দেয় ব্রিটিশ। সে এক লম্বা ইতিহাস। এগুলি কর যোগ্য করে, প্রচুর রাজস্ব নিয়ে যায় লন্ডনে। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম রাষ্ট্র জঙ্গল জমি, পার্বত্য জমি দখল করে। তারপর হাত দিল ১৯৭০এর দশকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্ট সরকার। সে যে পাট্টা দিয়েছিল, সেগুলোর অনেকটা ছিল এই ধরণের জমি, যেখানে গৃহপালিত পশু চরত, শ্মশান ছিল, খালের ধারের নয়নজুলির ধারের জমি এগুলির অনেকটা ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়ে গেল। ফলে যে সব অসহায়, সহায় সম্পদ জমিহীন মানুষ, পরিবার পশু পালতেন, তারা এজমালি ঘাস জমির অভাবে পশু বিক্রি করে দিলেন, যারা এজমালি জমির গাছ, পুকুর খাল থেকে খাদ্য পুষ্টি সংগ্রহ করতেন, তারা তা আর করতে পারলেন না।
ধ্বংসযজ্ঞ কতদূর বিস্তৃত ছিল সেটা একটা উদাহরণেই স্পষ্ট হবে, বিশ্বপ্রখ্যাত মসলিনের ধাত্রীভূমি ঢাকা শহর ১৮২০তেই প্রায় জনশূন্য হয়ে গেল এবং বাংলার অন্যতম পরিচিতি মসলিন প্রযুক্তিকে ধ্বংস করল যুদ্ধপুঁজি চাষীকে মসলিনের তুলো ফুটি তুলো চাষ করার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ফুটি কাপাসের বীজ। এই ধ্বংসকর্ম বাংলায় শুরু হয়ে ক্রমে ক্রমে গোটা দক্ষিণপূর্ব এশিয়াজুড়েই ঘটেছে। এই তথ্য সাধারণ বিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাসে পড়ানো হয় না, ফলে প্রখ্যাত ব্যক্তিরা আজও নবজাগরণ-মুগ্ধ। তাই আমরা বিশদে জানি না ব্রিটিশপূর্ব সময়ের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রসন্নন পার্থসারথী হোয়াই ইওরোপ গ্রিউ রিচ এন্ড এশিয়া ডিড’নট বইতে বলছেন ব্রিটিশ বিজয় এই প্রথম জ্ঞানচর্চায় রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষণায় ছেদ ঘটাল। জ্ঞানচর্চার ধ্বংসের মুখড়া হিসেবে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে দীর্ঘকাল পোষিত গ্রন্থাগারগুলিকে ধ্বংস করল। সাম্রাজ্য তাদের নব্য ক্ষমতাশালী ভদ্রবিত্ত সঙ্গীদের বুঝিয়ে দিল, দক্ষিণ এশিয়া অজ্ঞানের অন্ধকারে পড়েছিল এবং ব্রিটিশরা এসে এই উপমহাদেশ উদ্ধার করেছে। এই প্রকল্পের প্রথম দফায়, অর্থাৎ উপনিবেশের প্রথম যুগে গ্রন্থাগারগুলির লুঠ হল। মহীশূর, বাংলা, দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, আগ্রা ইত্যাদি অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তি পোষিত গ্রন্থাগারগুলির বই, পুথি, এবং নানান নথি বেশ কিছু নষ্ট করে ফেলা হল। বাকি অংশ চলে গেল পশ্চিমের নানান গ্রন্থাগারে। ইকবাল গণি খানকে উদ্ধৃত করে প্রসন্নন পার্থসারথী আমাদের জানাচ্ছেন লন্ডন, প্যারিস, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ, দাবলিন, গ্লাসগো, বার্লিন এমন কী Aberystwyth-এর গ্রন্থাগারগুলোয় ফারসি পুথির একটা বড় অংশই একদা ভারত জোড়া গ্রন্থাগারে নিয়মিত ব্যবহার হত জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে। অষ্টাদশ শতাব্দ অবদি যে বিপুল উজ্জ্বল জ্ঞানচর্চার ধারা চলছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়, গ্রন্থাগারগুলি ধ্বংস করে সেই ধারাকে মাটি ধরিয়ে দিল সাম্রাজ্যের যুদ্ধপুঁজি, যারা প্রথম বড় কারখানা তৈরি করবে ১৭৮০তে ভারতীয় বস্ত্র সম্পর্কিত জ্ঞান আর প্রযুক্তি নকল করেই। (চলবে)