কত বই ইওরোপে গিয়েছে পলাশীর আশেপাশের সময় থেকে শুরু করে? প্রসন্নন পার্থসারথী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টসের সুমারি অনুসরণ করে বলছেন কম করে ৩কোটি পুথি, বই এবং অন্যান্য জ্ঞানচর্চা নথিপত্র পশ্চিমের গ্রান্থাগারগুলিতে মুখ লুকিয়ে আছে। শেলডন পোলক দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইওরোপের গ্রন্ত্রহাগারগুলোয় লুঠ হয়ে যাওয়া বই সংগ্রহ সম্বন্ধে লিখছেন এই বইগুলোর একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আমরা পড়তে পেরেছি – বাকি সব মুখ লুকিয়ে আছে, কোনও নথিকরণ বাদ দিন ইন্ডেক্সিংই হয় নি। দক্ষিণ এশিয়ার শুধু যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চকদের হাতে পুথি ছিল সেটা বলা যাবে না, কপিল রাজ বলছেন ইওরোপিয়দের নথিকরণের জন্যে জ্ঞানের ঝুড়ি খুলে দিয়েছিলেন দাক্ষিণাত্যের ভিষগেরা, যে নথিকরণের মাধ্যমে পশ্চিমে শুরু হল এলোপ্যাথিক চিকিৎসার নবদিগন্ত। তামিল জাহাজ প্রস্তুতকারকদেরও বই ছিল। পুলাশীর পরে পরেই রেনেল যে পূর্ব ভারতের মানচিত্র তৈরির কাজ করা শুরু করেন, সেটি সামগ্রিকভাবে দাঁড়িয়েছিল মুঘল জমি জরিপ জ্ঞান, দক্ষতা আর প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। উপনিবেশযুগে বিশ্বের প্রথম মানচিত্র তৈরি হল ভারতীয় জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই – রেনেল এটা স্বীকার করেগেছেন। পাঠকেরা যেন মনে রাখেন বাংলা বা পূর্ব উপকূলের বণিক আর ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম থেকে পিপলি অবদি বন্দর থেকে নিয়মিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে গিয়েছেন খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকেই। ৪৮ সনে অযোধ্যার রাজকুমারী শ্রীরত্ন কোরিয় রাজা সুরোকে বিবাহ করেন জলপথে গিয়েই। আরবের সঙ্গে, পারস্যের সঙ্গে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলা তথা ভারতের বহুকালের যোগাযোগ। আরব দেশের বাইরে কেরলে প্রাচীনতম মসজিদটি তৈরি করেন আরবি ব্যবসায়ীরা। মিশরিয় গেনিজায় পাওয়া যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার বহু বছরের বাণিজ্য যোগাযোগের সূত্র। তা সত্ত্বেও ভারতের নাবিকেরা ইওরোপিয়দের মত ভারত আবিষ্কার করতে আমেরিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেন নি। আমাদের পূর্বজ নাবিকেরা যে জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন সেই জায়গাতেই পৌঁছেছিলেন। এতই তাদের জ্ঞানচর্চায় জোর ছিল। এই জোরটা ধ্বংস হয়ে গেল। উপনিবেশ আমলে এই সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ধ্বংস করে দেশ সম্পদ আর জ্ঞান লুঠ এবং ধ্বংস করা হল।
সে সময়ের ভারতীয় পড়াশোনায় কি ধরণের অঙ্ক শিক্ষা হত তার উদাহরণ পাই চন্দ্রকান্ত রাজুর ভারতীয় অঙ্কের ইতিহাসে। যেহেতু তিনি মনে করতেন ভারতীয় ছোটলোকেরা জ্ঞানচর্চার কুড়টা ধরে রেখেছিলেন, সেটা অনেকের অপছন্দ। আর্যভট(আর্যভট্ট নয়) নিজে শূদ্র ছিলেন। ফলে তথ্য যখন উন্মুক্ত হয় ভদ্রদের আঁতে ঘা লাগে। যে যাককে যাক – শুধু উদাহরণ দেব ১৯৯১ সালের ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্ট্রি অব সায়েন্সে লিখত কে ভি শর্মা আর এস হরিহরণের লেখা জৈষ্ঠদেবের যুক্তিভাষা নামক প্রবন্ধটি, যেখানে ২নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, দ্য ওয়ার্ক ফাইন্ডস ইটস ফার্স্ট রেফারেন্স ইন মডার্ন রাইটিং ইন এন আর্টিকল বাই সি এম উইশ ইন ১৮৩৫ হওয়ার ইট ইস রেফার্ড টু টুওয়ার্ডস দ্য ভেরিফায়িং দ্য অথার অব তন্ত্রসংগ্রহ। উইশ হ্যাড কন্টেমপ্লেটেড ‘আ ফারদার একাউন্ট অব যুক্তিভাষা, ইত উইল বি গিভন ইন আ সেপারেট পেপার’ (সূত্র https://web.archive.org/…/insa/INSA_1/20005ac0_185.pdf)। অর্থাৎ রামমোহন আর বিদ্যাসাগর যখন পশ্চিমি বিদ্যাচর্চার ওকালতি করছেন তখন সে সময়েই এদেশেই যুক্তিভাষার মত কলন বিদ্যা পড়ানো হচ্ছে।

আজ এই কলনবিদ্যার[ক্যালকুলাস] শিক্ষা দিচ্ছেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রকান্ত রাজু ক্যালকুলাস উইদাউট লিমিটস নামে – যার দুটি মানে – ১) কেরল থেকে যখন জ্ঞানটা জেসুইটসরা ইওরোপে নিয়ে গেল নকল করে, নিউটন বা লিবনিতজ এই অঙ্কবিদ্যার মূল সূত্র বুঝতে পারছেন না, ফলে তারা লিমিটএর ধারণা নিয়ে এলেন কলন বিদ্যায়, ভারতে যে বিদ্যা মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়ানো হত, সেটা ইওরোপে গিয়ে দুর্বোধ্য উচ্চশ্রেণীর অঙ্কে রূপান্তরিত হল, এই নিয়ে চন্দ্রকান্ত রাজুর ক্যালকুলাস উইদাউট লিমিটস লেখা পড়তে পারেন (সূত্র – http://ckraju.net/…/calculus-without-limits-background…)। আর ২) কলন বিদ্যার প্রয়োগ আসীম কারণ তাঁর মতে ভারতে দুটি পেশা কলন বিদ্যা প্রায়োগিক/ফলিত চর্চা করত কৃষক – যাদের মৌসম বুঝতে কলন চর্চা করতে হত আর নাবিক – যারা দিনের বেলায় তারা ছাড়া আলোকোজ্জ্বল আকাশে যখন মাঝ সমুদ্রে যাত্রা করতেন তখন দিক খুঁজে পেতেন। এইগুলো আমাদের ভদ্রদের গায়ে লাগবে যারা খুব কষ্ট করে কলনবিদ্যা অর্জন করেছি, সেটা ছোটলোকেরা কিভাবে শিখতে পারে এই বিতর্কে। যাই হোক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্মমূলক হাস্যকর এই অভিযোগে রামমোহন-বিদ্যাসাগর পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। হায় তারা জানার চেষ্টা করেন নি, এদেশে কয়েক হাজার বছর ধরে কলনবিদ্যা চর্চার শেকড় সেদিনও শেষ হয়ে যায় নি।
ফলে ব্রিটিশপূর্ব সময়ের দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধি বুঝতে সে সময়ের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সময়ের হস্তাবলেপনে অনেক তথ্য ধ্বংস হয়েছে। তবুও যা আছে সেটাও আজকে এই ভেঙ্গেপড়া সময়ে আমাদের নতুন পথ দেখাতে পারে। বিমল কুমার দত্ত মশাইএর অসামান্য লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া বইতে গ্রন্থাগার, গ্রন্থাগারের নানান বিষয় আলোচনা করেছেন। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে আমরা বইএর একাংশের ভাবানুবাদ উপহার দিলাম। এটা এমনই এক অনালোচিত ক্ষেত্র যা আমাদের উপনিবেশপূর্ব সময়ের দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রসারিত করতে পারে।
প্রাথমিকভাবে এই বিষয়ে উদ্যোগী হতে বাধ্য করেছেন বাংলার কারিগর, চাষী এবং কারিগরেরা। আর উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সাথী মহম্মদ নাহিদ হোসেন এবং পুলিন বকসী মশাই। তাঁরা তাড়া না দিলে কাজটা শেষ হত না। প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল ভাইকে কৃতজ্ঞতা এই রকম একটি বিষয় প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ার জন্যে। (চলবে)