ব্রিটিশপূর্ব আমলের গ্রন্থাগারগুলির আলোচনা আমরা শুরু করব তুর্ক-আফগান (১২০৬-১৫২৬ খ্রিঃ) সময় থেকে। এ সময় সুলতানেরাই ছিলেন জনগণের শাসক, রক্ষক এবং পৃষ্ঠপোষক। The Sultan controls affairs, maintains rights, enforces the criminal code; he is the Pole Star round whom revolve the affairs of the world and the Faith; he is the protection of God in his realm; his shadow extends its canopy over His servants, for he forbids the forbidden, helps the oppressed, uproots the oppressor and gives security to the timid (Administration of the Sultanate of Delhi: I.H. Qureshi, p. 47) [সুলতানেরা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেন, অধিকার রক্ষা করেন এবং দণ্ডসংহিতা প্রয়োগ করেন; তিনিই হলেন তৎকালীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার অক্ষহৃদয়, তাঁকে ঘিরেই সুলতানি বিশ্ব এবং রাজত্বের বিশ্বাসীর বিশ্ব আবির্তিত হয়; তিনি তার রাজত্বে ধর্মের প্রতিপালক; তাঁর ছায়া তাঁর রাজত্বের ভৃত্য/সেবকদের ওপর বিস্তৃত হয়ে সুরক্ষা দেয়, হারামকে নিষিদ্ধ করে, শোষিতকে বাঁচতে সাহায্য করে, শোষককে উচ্ছেদ করে এবং অশক্তকে নিরাপত্তা দেয়]। ওপরে উল্লিখত বক্তব্যটি তৎকালীন প্রখ্যাত বিচারক, আহমদ বিন মুহম্মদ বিন আবদ রবের। তাঁর আলোচনা থেকে পরিষ্কার, সুলতানই ছিলন প্রশাসনিক কাঠামো, ধর্মীয় আচার আচরণ এবং কৃষ্টিগত উদ্যোগের প্রধান শক্তি। তিনি রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা। তিনি সাহিত্য এবং শিক্ষা বিষয়ে বিষয়ে উৎসাহ প্রকাশের মাধ্যমে কবি, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিকদের পৃষ্ঠপোষণা করেন এবং তাঁর রাজত্বে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগার স্থাপনা, বিকাশ এবং উন্নতি ঘটান। উলটোদিকে এ সব বিষয়ে সম্রাটের অনুৎসাহ, রাজ্যের ব্যক্তি, কাঠামো এবং সংগঠনের পক্ষে ক্ষতিকারক চিহ্নিত হয়। মনে রাখা দরকার, সেই সব দিনগুলোয় শহরে বসবাসকারী মানুষদের কাছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং উৎসাহ দান, রাজ্যের কৃষ্টি এবং কাঠামো আর সঙ্গঠনগুলির বেড়ে ওঠা এবং বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠত। যেহেতু সুলতান ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা, তাই এ সব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করা হত।
দিল্লির সুলতানেরা, তাঁর শাসিত রাজত্বের নানান এলাকার ছোটখাট রাজ্যর শাসক এবং অভিজাতরা জনগণের জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিয়ে মক্তব (প্রাথমিক বিদ্যালয়), মাদ্রাসা (উচ্চশিক্ষার বিদ্যালয়), গ্রন্থাগার এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠা করাতেন। তৎকালীন সুলতানি শাসকদের রাজধানী প্রথমে গজনি থেকে লাহোর, তারপরে লাহোর থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। দিল্লির শাসকদের জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষণার ধরণ অনেকটা গজনির জ্ঞানচর্চা ঐতিহ্য আর পদ্ধতির সক্রিয় অনুসারী হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানী এবং প্রখ্যাতরা দিল্লি, জলন্ধর, ফিরোজাবাদ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরে অভিবাসিত হয়ে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করলে এই এলাকাগুলি প্রখ্যাত জ্ঞানচর্চা এবং কৃষ্টিচর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে। কন্সটানিনোপল, কায়রো বা বাগদাদের পণ্ডিত, জ্ঞানী এবং ধার্মিক সন্তরা দিল্লির জ্ঞানচর্চা, সুশাসনের আকর্ষণে আসতে শুরু করায় এই শহর উন্নত শহরগুলির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে শুরু করে the capital of Delhi by the presence of these unrivalled men of great talents had become the envy of Bagdad, the rival of Cairo and the equal of Constantinople (Advanced History of India : Mazumdar, Roychoudhury and Datta, p. 409)।
খলজি সুলতানদের শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চার অসামান্য পৃষ্ঠপোষকতার নিদর্শন ছিল দিল্লির গ্রন্থাগার। তুঘলক এবং লোদি শাসকদের মধ্যে অসামান্য শিক্ষিত মহম্মদ বিন তুঘলক, ফিরোজ শাহ এবং সুলতান সিকন্দর লোদি বিভিন্ন জ্ঞানী, কবিদের, মসজিদ এবং মসজিদের কাজ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয় স্থাপন এবং পালন করতে সহায়তা করেছেন। আলাউদ্দদিন খলজি সম্বন্ধে আলাই দরোয়াজায় খোদিত আছে Upholder of the pulpits of learning and religions and strengthener of the rules of colleges and places of worship (Archaeology of Delhi : Car Stephen, p. 56) [শিক্ষা ও ধর্মের যাজকদের/প্রচারকদের ধারক এবং উচ্চতর শিক্ষাদানের বিদ্যালয় ও উপাসনালয়ের নিয়ম-কানুন শক্তিশালীকারী]। মধ্যযুগে ইওরোপিয় ধর্মকেন্দ্র চার্চ এবং সন্তদের মঠগুলির মত, সে সময়ের দক্ষিণ এশিয়ার মসজিদ এবং খানকাগুলি বিস্তৃত বিদ্যাদান, জ্ঞানচর্চার জনকাঠামো তৈরি করেছিল।
আমাদের আলোচ্য সময়ে, সুলতানি আমলে জ্ঞানচর্চার প্রতিটা বিভাগে বিপুল বিস্তার ঘটেছিল। শাসকেরা স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি বিভাগে ফারসি এবং আরবি সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ দিলেন (তবে আওরঙ্গজেবের জীবন নিয়ে অসামান্য কাজ করা অড্রে ট্রুস্কে মুঘল দরবারে সংস্কৃত চর্চা বিষয়ে বই লিখেছেন কালচার অব এনকাউন্টার্সঃ স্যাংস্কৃট এন্ড দ্য মুঘল কোর্ট। এখন আরও জানা যাচ্ছে দেশজুড়ে স্থানীয় ভাষাতেও বিপুল জ্ঞানচর্চা, প্রশাসনিকবিদ্যা চর্চা, গান বাঁধা হয়েছে মুঘল এবং সুলতানি আমলে)। এই উৎসাহদান ইতিহাস, সাহিত্য এবং ধর্ম চর্চায় বিপুল প্রভাব ফেলেছে। এই সময়ের ইতিহাস লেখায় নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরনের কাজ শুরু করা হয়। বিপুল পরিমানে দেশিয় সঙ্গীত, নৃত্য, জ্যোতির্বিদ্যা এবং রোমান্টিক কবিতা ফারসি ভাষায় অনুদিত হতে থাকে। বিজয়নগর, ওয়ারঙ্গল এবং গুজরাটের শাসকেরা সংস্কৃত চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এই সময়ে জৈন সাহিত্যও বিপুল বিকশিত হয়। এই কৃষ্টিগত কাজকর্মের ফলে অসংখ্য পুথি লিখিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সেই সব কাজ নথিকরণ সংগৃহীত হতে থাকে (The History and Culture of the Indian People; Mazumdar, Vol. 6 Ch. XV)।
তুর্ক-আফগান শাসকদের সময়ে শিক্ষা এবং সাহিত্যে বিপুল বিকাশ ঘটতে থাকে। কিন্তু অভিযোগ যে রকমভাবে ইওরোপের রিফর্মেশন আন্দোলনের ফলে চার্চ অব রোম বিভিন্ন সন্ন্যাসীদের গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনি এই শাসকেরাও কিছু কিছু হিন্দু বৌদ্ধ গ্রন্থাগার ধ্বংস করেন। বাংলা, জৌনপুর, মালওয়া, গোলকুণ্ডা, আহমেদনগর এবং বিজাপুরের শাসকেরা দিল্লির সুলতানদের দেখানো পথ অনুসরণ করে স্থানীয় জ্ঞানী, শিক্ষিত, কৃষ্টিবানদের পৃষ্টপোষণা করতে থাকেন। এই সময়ের বিখ্যাত জ্ঞানী সাহত্যিকদের মধ্যে প্রধানতম ছিলেন ফারসি ভাষায় সাহিত্য রচনা করা আমীর খুসরু। তিনি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক পদে বৃত হন। ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দিন এবং জিয়াউদ্দিন বারনি, হুসেইনি তলখিস এবং মুফতি বিষয়ে টিকাকার মুয়ায়ানুদ্দিন উমরানিও এই সময়ের প্রখ্যাতগুণী। এদের সঙ্গে গ্রন্থাগার আর জ্ঞাননচর্চার প্রত্যক্ষ্য যোগ ছিল।
তথাকথিত দাস সাম্রাজ্যের সময় সুলতানদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা এবং শিক্ষা বিস্তারে এবং পৃষ্ঠপোষণায় যে সব শাসক উদ্যমী হন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ফিরোজ শা ইলতুতমিস, সুলতানা রিজিয়া, নাসিরুদ্দিন এবং বলবন। শোনা যায় সুলতান নাসিরুদ্দিন নিজের দৈনন্দিনের খাইখরচের অর্থ জোগাড় করতেন হাতের লেখা পুথি বিক্রি করে। বলবনের সময় ইরাণ এবং খোরসানের ষোলজন পলাতক শিক্ষিত এবং জ্ঞানী শাহজাদা মোঙ্গলদের হাত থেকে বাঁচতে দিল্লিতে অভিবাসিত হয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। গিয়াসুদ্দিনের জৌষ্ঠ পুত্র শাহজাদা মুহম্মদের পৃষ্ঠপোষণায় অসংখ্য সাহিত্যিক উৎসাহিত হন, বিপুল পরিমানে সাহিত্যচর্চা সংগঠন গড়ে ওঠে। শাহজাদা শাহনামা, দিওয়ান-সানাই, দিওয়ানি খাকানি ইত্যাদি পুস্তক থেকে স্বয়ং শাহজাদা নিয়মিত আবৃত্তি করতেন। এই তথ্য থেকে পরিষ্কার, দাস সুলতানদের রাজত্বের সময় দিল্লি প্রধানতম শিক্ষাচর্চা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। লিপিবিদ্যা (Penmanship) সে সময়ের সমাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। এর ফলে হাজারে হাজারে পুথি নকল হতে আরম্ভ করে এবং বিভিন্ন গ্রন্থাগারে যথাযোগ্য পদ্ধতি এবং মর্যাদায় এই সব বই রক্ষিত হতে থাকে।
সুলতানী প্রাসাদের দৈনন্দিন গৃহস্থালীর প্রশাসনিক পদ্ধতি বিষয়ে আমরা যদি কিছুটা নজর দিতে পারি তাহলে হয়ত তাদের রোজকার ভাললাগা মন্দলাগা বিষয়গুলি বুঝতে পারব। তারা বিপুল বিশাল প্রাসাদ প্রতিপালনের জন্যে নানান প্রশাসনিক বিভাগ তৈরি করেছিলেন। দপ্তরগুলির নাম ছিল কারখানা। প্রত্যেক কারখানার দায়িত্বে থাকতেন একজন আধিকারিক। ফিরোজ শাহের সময় সাম্রাজ্যের প্রাসাদে প্রতিপালিত এই কারখানার সংখা ৩৬টিতে পৌঁছায়। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সুলতানের সময় এই কারখানার সংখ্যাটা বেড়েছে, কমেছে। ঐতিহাসিক আফিফের লেখা থেকে এই রকম একটা কারখানার উল্লেখ পাচ্ছি যার নাম ছিল কিতাবখানা, এটি সরাসরি বই প্রযুক্তি চর্চা এবং প্রয়োগ, সংরক্ষণ এবং গ্রন্থাগার কাজ করেছে। কিতাবখানার আধিকারিকের নাম ছিল কিতাবদার বা গ্রন্থাগারিক এবং সেই পদের আরেক প্রশাসকের নাম ছিল মুসাফবরদার (Administration of the Sultanate of Delhi : I.H. Qureshi, p. 67)। (চলবে)