এতক্ষণের বিশদ আলোচনায় আমরা স্পষ্টভাবে বুঝলাম, দাস সুলতানেরা সাম্রাজ্য চালানোর উদ্দেশ্যে একদল সর্বক্ষণের প্রশাসনিক আধিকারিকের দেখাশোনায় নিয়মিত গ্রন্থাগার রক্ষণাবেক্ষণ করাতেন। দিল্লির সুলতানেরা গজনভি শাসকদের কৃষ্টি, শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণা অনুসরণ করে দরবারের সম্মান রক্ষা এবং ইসলামি শিক্ষা আর জ্ঞানচর্চার দীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক এবং কবি জালালুদ্দিন খলজির নাম উল্লেখ অবশ্যই করতে হবে। তিনি আমীর খসরু, তাজউদ্দিন ইরাকি, খাজা হাসান, মুয়াইদ দিওয়ানা, আমীর আরসালান কুলি, ইখতিকারুদ্দদিন ইয়াঘি এবং বাকি খাতিরের মত প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগীদের সঙ্গ অর্জন করেছিলেন (Promotion of Learning in India During the Muhammadan Rule : N.N. Law, p. 30)। জালালুদ্দিন দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার স্থাপন করেন। সেই গ্রন্থাগারটি দেখাশোনার ভার দেন প্রখ্যাত জ্ঞানী, পণ্ডিত আমীর খসরুকে। খসরু সম্বন্ধে বলা হয় তিনি জ্ঞানচর্চার ধারে ও ভারে স্বয়ং সুলতানের বন্ধুত্ব অর্জন করেছিলেন। সে সময় রাজপরিবারের বাইরের তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে সাদা পোষাক পরিধান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কাইকোবাদ যখন শাহজাদা, সুলতান পদে বৃত হন নি, আমীর খুসরুকে রাজকীয় সম্মান এবং অবসরভাতা দিয়েছেন। ওপরের স্তবকগুলি থেকে পরিষ্কার, সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রধান গ্রন্থাগার এবং গ্রন্থাগারিকের অসামান্য সম্মান ছিল এবং সামাজিক আর রাষ্ট্রিক সম্মানের দিক থেকে গ্রন্থাগারিক নামক পদটির গুরুত্ব অপরিসীম ছিল (Tarikhi-Firuj-Shrhi, Elliot III, p. 144)।
পরের দিকের সুলতানেরা তাদের রাজত্বের প্রথম দিকে, বিশেষ করে শিক্ষা বিস্তারে, খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না, কিন্তু রাজত্বের পরের সময়ে তারা ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী হয়ে নানান পৃষ্ঠপোষণার কাজ করেছেন (Archaeology of Delhi : Car Stephen, p. 56)। এই সময় যে সব কবি আর দার্শনিক প্রখ্যাত হয়েছেন তাদের মধ্যে প্রধানতম ছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। তার সমাধিস্থান এত দিন পরেও দক্ষিণ এশিয়দের কাছে অতি পবিত্র গন্তব্য স্থান হিসেবে গণ্য হয়। তারও একটি সুবৃহৎ গ্রন্থাগার ছিল। গ্রন্থাগারটি ছিল ওয়াকফ সম্পত্তি। সেই গ্রন্থাগারের দরজা সাধারণ মানুষের জ্ঞানার্জনের জন্যে সারাক্ষণ খোলা থাকত।
দিল্লির মুহাদিত, শাইখ আবদুল হক সিরাজ উথমান বিষয়ে লিখতে গিয়ে বলেন, তিনি মৌলানা রুকরুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে কাফিয়া, মুফসসল কাদুরিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। শেখ নিজামুদ্দিনের প্রয়াণের পরে তিনি তিন বছর ব্যাপী আরও বিস্তৃতভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং শাইখের ওয়াকফি গ্রন্থাগার থেকে বেশ কিছু পুথি, কাপড় এবং খিলাফতনামা সংগ্রহ করেন (Akhbar-ul-Akhyar, p. 81, Printed at Meerut 1178 A.H. as quoted in Islamic Culture, Vol. 19, No. 4, 1945)। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার প্রথম শিষ্য শাইখ সিরাজ উসমানের আরেক নাম ছিল মাকদুম সিরাজুদ্দিন। মাজার ছেড়ে লখনৌএর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে তিনি গুরুর গ্রুন্থাগার থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুঁথি সংগ্রহ করে সঙ্গে নিয়ে যান (Promotion of Learning in India During the Muhammadan Rule : N.N. Law, p. 37)।
তুঘলক বংশও দিল্লির সার্বিক জ্ঞানচর্চা বিকাশে নতুন অধায়ের সূচনা করে। প্রথম সুলতান গিয়াসুদ্দিন শান্তি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে প্রখ্যাত, পণ্ডিত এবং জ্ঞানীদের সম্মান এবং পৃষ্ঠপোষণা করা শুরুকরেন। খুব কম সময়ে রাজত্ব চালাবার ফলে তিনি বিভিন্ন জ্ঞানচর্চা শিক্ষা কেন্দ্রে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও স্থায়ী খুব একটা কিছু করে যেতে পারেন নি। বংশের দ্বিতীয় সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক জ্ঞানচর্চা এবং হস্তলেখার দক্ষতা বিকাশে উৎসাহী ছিলেন। তিনি হস্তলেখবিদও ছিলেন “The versatility of his genius surprised those who came in contact with him. A lover of the fine arts, a cultured scholar and an accomplished poet, he was equally at home in logic, astronomy, philosophy, mathematics and the physical sciences. He was thoroughly acquainted with literary works like Sikandarnamah and the Tarikhi-i-Mahmude. No one could excel the Sultan in composition. He had at his ready command a good deal of Persian poetry of which he made a large use in his writings and speeches” (History of the Qarannah Turks in India : Iswari Prasad, p. 31 1.) [প্রতিভার বহুমুখীতা, সুলতানের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বিস্মিত করেছিল। এক দিকে চারুকলা প্রেমিক, অন্যদিকে অসামান্য সংস্কৃতিমনা পণ্ডিত, অতুলনীয় দক্ষ কবি, তাছাড়া যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, গণিত এবং ভৌত বিজ্ঞানেও সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। সিকন্দরনামা এবং তারিখ-ই-মাহামুদির মত সাহিত্যিক সৃষ্টি তার কণ্ঠস্থ ছিল। লেখালিখিতে তাঁর ধারে পাশে আসার মত মানুষ ছিলেন না। পারসিক কবিতার তার অসামান্য দক্ষতা ছিল এবং তিনি সে সব তার সাহিত্যকর্মে এবং বক্তৃতা করার সময় ব্যবহার করতেন]। খান আজম কুতলুঘ খান ছিলেন খরিতাদার — সুলতানের কলম এবং কাগজের রক্ষক এবং আমীর নুকবা ছিলেন তার কালিদানির রক্ষক(ঐ)।
দিল্লি হয়ত দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র, শিক্ষাদান কেন্দ্র এবং সাহিত্য চর্চার উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠত, কিন্তু সুলতানদের খামখেয়ালিপনা এবং খারাপ মনমেজাজে দরুন দিল্লি কিছু দিনের জন্যে সেই সুযোগ হারাল। মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে দেওগিরিতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় দিল্লির সুনাম ধ্বংস হয়, বিভিন্ন পরিকাঠামো এবং জ্ঞানচর্চা সংগঠন নষ্ট হয়ে যায়। ১৩৪১-এ দিল্লি ঘুরতে আসা ইবন বতুতা দিল্লিকে মরুভূমির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফিরোজ শাহ দিল্লির কাছে নতুন শহর ফিরোজাবাদ স্থাপন করে নিজের ক্ষমতাকে আরও জোরদার করলেন। তিনি পণ্ডিত ছিলেন এবং জ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তার লেখা বইএর নাম ফাতুয়াত-ই-ফিরোজশাহী। মজহারের মত ঐতিহাসিক এবং তাতার খানের মত পণ্ডিত তার সঙ্গী ছিলেন। সুলতান জ্ঞানী এবং পণ্ডিতদের জন্যে মদ্রাসা এবং মসজিদ তৈরি করে দেন এবং তাদের ভরণপোষণের জন্যে অছি সঙ্গঠনও স্থাপনা করেন। পুরোনো জরাজীর্ণ গণকাঠামোগুলি সংস্কার করান এবং সেগুলি যাতে নিয়মিত কাজকর্ম করে সে বিষয়ে নজরদারি করতেন। সুলতানের জ্ঞানচর্চায় প্রমান পাওয়া যায় তার সাম্রাজ্যের দাসেদেরও শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত থেকে। তার চেষ্টায় এবং উৎসাহে দাসেদের মধ্যে কয়েকজন পুণ্য পুথিগুলি নিয়মিত পড়তে পারত এবং সেগুলি নকলও করত (Promotion of Learning in India During the Muhammadan Rule : N.N. Law. pp. 54-55)।
আপাত অপ্রাসঙ্গিক হলেও উল্লেখ করে রাখা দরকার সুলতানি আমলে বিশেষ করে আফিফের লেখায় ফিরোজ শাহের রাজত্বে কারিগরদের/শ্রমিকদের গুরুত্বের উদাহরণ পাওয়া যায়। ফিরোজ শাহের রাজত্বের ইতিহাসে আফিফ লিখছেন, কোনও কারিগর, কাজের মানুষ কাজ পাচ্ছে না দেখলেই, কোতোয়ালকে নির্দেশ দেওয়া ছিল, তাকে ধরে সুলতানের সামনে নিয়ে আসতে। সুলতান তাঁর সঙ্গে কথা বলে, তাকে দরবার বা অন্য কোথাও কাজ দিতেন। আর যদি দেখতেন তার অন্য কিছু ইচ্ছে, যা কোনও অভিজাত বা আমীরকে দিয়েই সমাধান হবে, তিনি স্বয়ং তার জন্যে সুপারিশ পত্র লিখেদিতেন। শামসইসিরাজ আফিফএর তারিখ-ই-ফিরোজশাহী সূত্র অবলম্বন করে এলিয়ট এন্ড ডসন দ্য হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া এজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ান্স বইএর ১০৪ পাতায় হেনরি মেয়ার্স এলিয়ট এবং জন মার্স ডসন লিখছেন, ‘সুলতানের কঠোর নির্দেশ ছিল শহরে প্রত্যেক বেকার কারিগর শ্রমিককে তার কাছে পাঠাতে হবে। সম্রাটের সামনে কোতোয়াল, জেলার আমলাদের ডেকে সে বিষয়ে খঁজখবর করতেন। যে সব সম্মানীয় মানুষ কাজ পাচ্ছেন না, তারা ভয়, লজ্জা দূরে ফেলে দরবারের দপ্তরে এলে কাজের খোঁজ পেতেন… এই ধরণের এবং অন্যান্য কাজ না পাওয়া মানুষকে সুলতানের দরবারে নিয়ে আসা হত এবং তারা কাজ পেতেন। কলমচিদের (মেন অব পেন) সরকারি দপ্তরে (কার-খাম) কাজ দেওয়া হত, নানান ধরণের দক্ষ বুদ্ধিমান মানুষকে খানইজাহানের অধীনে কাজ দেওয়া হত। কেউ, কোনও ব্যক্তি অভিজাতর অধীনে (বান্দা) কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তাকে সুলতান স্বয়ং চিঠি লিখে সেই অভিজাতর কাছে পাঠিয়ে দিতেন; যদি কেউ ইকতায় কাজ করা নির্দিষ্ট কোনও আমীরের অধীনে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করতেন, তাহলে তাকে ফরমান লিখে সেই শিকের আমলার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হত। সম্রাটের এত উদ্যম এতদসত্ত্বেও কিছু মানুষ কাজ পেতেন না; কিন্তু যদি বেকার কাউকে দরবারে কাজের খোঁজে পাঠানো হত, তাহলে তাকে নিশ্চই কোনও একটা কাজে লাগিয়ে দেওয়া যেত…’। (চলবে)