গুজরাটের স্বাধীন সুলতানদের গ্রন্থাগার
তুঘলক সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের পরে ১৪০৭-তে মুজফর খান গুজরাটে প্রথম স্বাধীন সুলতানি পরম্পরার শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই শাসন চলে একাদিক্রমে একশ আশি বছর। এই প্রবাহের শাসকেরা শুধুই গুরুত্বপূর্ণ এবং দক্ষ প্রশাসক ছিলন না, গ্রন্থানুরাগী হিসেবে বিপুল বইএর সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষা ব্যবস্থা বিকাশে তাঁদের পৃষ্ঠপোষণা দৃষ্টান্তমূলক ছিল। মুজফর খানের পৌত্র আহমদ শাহ ১৪১১-য় ঐতিহাসিক আহমেদাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গুজরাটি সুলতানদের পৃষ্ঠপোষণায় বিপুল সংখ্যায় বই লিখিত হয় এবং ইয়ামান, হিজাজ, মিশর আর পারস্য থেকে জ্ঞানীগুণীরা তার দরবারে আদরে গৃহীত হতেন। বহু বৈদেশিক জ্ঞানী তাদের বহু কাজ শাসকদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত করেছেন।
সুলতান মাহামুদ বেগদা (১৪৫৮-১৫১১) বহু মসজিদ এবং মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি স্বয়ং প্রখ্যাত পড়ুয়া ছিলেন। তিনি শাম্মি বুরহানি ওরফে সৈয়দ উসমানকে তার নিজস্ব গ্রন্থাগার রক্ষনাবেক্ষণের ভার দেন। এই গ্রন্থাগারটি আহমেদাবাদের অদূরে ওসমানপুরে একটি মাদ্রাসায় রক্ষিত ছিল (Literary and Cultural Activities in Guzarat under the Khaljis and the Sultanate : Muhammad Ibrahim Dar, p. 45)।
পরের শাসক দ্বিতীয় মুজফর (১৫১১-২৬) লিখনবিদ্যায় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং লেখকদের তিনি উদারহস্তে পৃষ্ঠপোষণা করতেন। তিনি জ্ঞানের এতই পিপাসু ছিলেন যে মান্ডুর সৈয়দ আলি খান বড়া নহর, ইবন হাজার আসকালানির ফাতা-অল-বাহারির টিকার প্রথম সহজলভ্য পুথিটি তাঁকে উপহার দিলে সম্রাট সৈয়দকে বরোদার প্রশাসকের পদ উপহার দেন। সোনার জলে স্বহস্তে নকল করা কোরাণের দুটি পুথি তিনি দুটি তীর্থ স্থান মক্কা মদিনার প্রশাসকদের উপহার দেন (ঐ)।
সুলতানদের সমাজ পৃষ্ঠপোষণার পদচিহ্ন ধরে গুজরাটের অভিজাত এবং প্রশাসকেরা কলা, কৃষ্টি এবং শিক্ষা প্রচারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তৃতীয় সুলতান মহম্মদ শা (১৫৩৮-১৫৫৪) আসফ খানকে পবিত্র শহর মক্কা থেকে আনিয়ে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুর্যোগে পড়া রাজ্যটির ভার নিতে অনুরোধ করেন। প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠে আসফ খান তার ওপর অর্ষিত দায়িত্ব এমন সুচারুভাবে পালন করলে রাজ্যে তাঁর সম্মান চতুর্গুণ বৃদ্ধি পায়। তিনি বইএর গুণগ্রাহী ছিলেন। মক্কা থেকে ফেরত আসার সময় তিনি বহু নির্বাচিত পুথি নিয়ে আসেন। গুজরাটের তীরে জাহাজ ভেঙে পড়ায় তার সঙ্গে বয়ে আনা অমূল্য বইগুলি নষ্ট হয়ে যায় (A History of Gujarat, M.S. Commisariat, p. 426)। এই বইগুলির মধ্যে প্রখ্যাততমটি ছিল মিশখাত, একটি প্রখ্যাত পরম্পরা বিষয়ক বর্ণনা (Literary and Cultural Activities in Gujarat, p. 49)।
১৫৭২-৭৩এ আহমেদাবাদের সিদ্দি সৈয়দ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত স্থপতি সিদ্দি সৈয়দের একটি খুব বিস্তৃত গ্রন্থাগার ছিল(ঐ)। তার গ্রন্থাগারে সংগ্রহে পছন্দের বই আনার জন্যে মিশরে জাহাজ পাঠিয়েছিলেন। ফেরার সময় জাহাজটি ক্যাম্বের বন্দরের অদূরে ভেঙ্গে পড়ায় বইগুলি নষ্ট হয়ে যায়(ঐ)। তার সময়ে গুজরাটে প্রচুর পণ্ডিত, মহাত্মা, লেখক এবং সম্পাদকের আবির্ভাব ঘটে। অল মুয়াতাকি তাদের মধ্যে প্রখ্যততম। শিক্ষার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং প্রখ্যাত শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছাত্রদের পুস্তক এবং কালি তৈরি করে দিতেন। তিনি ছাত্রদের সহযোগিতায় এবং তাদের উপযোগী করে সুয়ুতির জুম্মা জওয়ানি নতুন করে সঙ্কলিত করেন এবং এই কাজটি ফিক বিষয়ে অধ্যয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিল(ঐ)।
মুঘল, অন্যান্য মুসলমান রাজ্যের শিক্ষাকেন্দ্র এবং গ্রন্থাগারসমূহ
বাবর
তৈমুর বংশধরদের কৃষ্টির ইতিহাসের গোড়াপত্তন ঘটেছিল তুর্কো-আফগান সময়ে। তৈমুরী বংশধরেদের প্রত্যেকেই জ্ঞানচর্চার ধারক বাহক ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের সময় বাদ দিলে প্রত্যেক শাসকই শিল্পকলা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের বিকাশে বিপুল সহযোগিতা করেছেন। বই প্রকাশনায় এবং গ্রন্থাগার তৈরি করতে তাঁদের অবদান সুপ্রচুর। জাহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর ছিলেন জ্ঞানী, বিদ্বান এবং সাহিত্যসাধক। ব্যবহারশাস্ত্র এবং ছন্দ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর বেশ কিছু কিতাবও রয়েছে (Ferishta, Vol. II, pp, 61 and 65 ; এছাড়া দেখুন Muntakhabul-Tawarikh. V. I. (Ranking), p. 449)। লিপিবিদ্যার তিনি গুণগ্রাহী ছিলেন। বাবরি লিপি নামক একটি নতুন ধরণের লিপি আবিষ্কর্তা তিনি (Talbot’s Memoirs of Babur, p. 97)।
বাবর কিতাবের গুণগ্রাহী ছিলেন এবং নিজস্ব গ্রন্থাগার তৈরিতে মন দেন। ১৫২৫ সালে গাজি খানের গ্রন্থাগার অধিকার করেন এই আশায় সেখানে তিনি মনের খোরাক পাবেন। কিন্তু তিনি লেখেন “আমি যা ভেবেছিলাম তা পেলাম না”। সেই গ্রন্থাগার থেকে বেশ কিছু বই তিনি হুমায়ুন আর কামরনকে উপহার দেন (ঐ, ১৭৬)। বাবর যে শিক্ষিত এবং বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষণা করতেন, তাঁদের মধ্যে খ্বোয়ান্দামীর ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি হিরাটের গ্রন্থাগারিক ছিলেন এবং পদশাহের সঙ্গে বাংলা অভিযানেও অংশ নেন (Elliot’s History of India (as told by its own historians) iv. pp. 141 and 143)। তাঁর নির্দেশে সুরতেআম বা জন কৃত্য দপ্তর বহু মক্তব (বিদ্যালয়) এবং মাদ্রাসা (উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র) (Tawarikh of Sayyid Maqbar Ali, As stated in advanced History of India, p. 578) তৈরি করে দেয়। প্রত্যেক মাদ্রাসার সঙ্গে আবশ্যিকভাবে একটি গ্রন্থাগার রাখতে হত (Society and Culture in Moghul Age, Chopra, p. 162)। বাবর রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারও (Babur Nama (Beveridge), p. 460) তৈরি করেন। তিনি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে (I.C. Oct. 1945. p. 331) চিত্রবিচিত বই নিয়ে প্রচুর সময় কাটাতেন এবং আয়েশ করতেন। তিনি পুথি চিত্রণে প্রচুর উৎসাহ দান করেছেন এবং তাঁর পুত্র এবং নাতি-পুতিরা (Promotion of Learning in India During the Muhammadan Rule: Law, p. 126) এই বিষয়টিকে মহীরুহের আকার ধারণ করান।
হুমায়ুন
বাবরের জৈষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহন করেন ১৫৩০ সনে। তিনি কৃষ্টি, জ্ঞানচর্চা রক্ষায় পরিবারিক ঐতিহ্যের রেণুগুলি বংশের ঐতিহ্য সূত্রে অর্জন করেন। পিতার মতই তিনি শিক্ষা বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন বিশেষ করে শিল্পকলা এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে তাঁর উৎসাহ অসীম ছিল (ঐ, ১২৭)। পারস্যে প্রবাস জীবন কাটানোর সময় শাহ তামাসপাসের রাজ দরবারে সাহিত্য, শিল্পকলা চর্চায় প্রভূত প্রভাব ফেলেন (ঐ ১২৮)। মৌলউপাদানগুলির (এলিমেন্ট) চরিত্র নিয়ে বই লেখা ছাড়াও তিনি ভূগোল এবং জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও পুথি রচনা করেন। তাঁর অন্য উৎসাহের বিষয়গুলি ছিল সাহিত্য এবং শায়েরি। তিনি পূর্বজদের মতই গুণিজনদের কদর এবং আদর করতেন। এই বিষয়গুলি নিয়ে কবি আর দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনায় সময় কাটাতেন। ফরিস্তা সূত্রে জানতে পারছি, সাত গ্রহের নামে সাতটি বিশাল কক্ষ তৈরি করেছিলেন তিনি। শণি এবং বৃহস্পতি নামাঙ্কিত ঘরে তিনি হিরাটের গ্রন্থাগারিক খ্বোয়ান্দামীর, লেখক জওহর, তুর্ক বিদ্বান এবং নৌ সেনা নায়ক সিদ্দি আলি রঈস ইত্যাদিদের সঙ্গে মিলিত হতেন। রঈস তার যাত্রার দিনপঞ্জীতে লিখছেন, … আমি রাতদিন এক করে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক নীরিক্ষণ লেখা শেষ করলাম… সেটি শিল্পকলা এবং শায়েরির বিকাশের সময় ছিল এবং আমাকে প্রায়শই পাদশার সঙ্গ দিতে হত (I. C. Oct. 1945, p. 332.)।
পিতৃসূত্রে গাজিখানের গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া বইএর চর্চার সঙ্গে গ্রন্থাগার তৈরি বা সময় কাটানোর নেশা বাবরের মত হুমায়ুনেরও ছিল। তিনি সেটি লালনপালন করেছেন আমৃত্যু। এমন কি যুদ্ধক্ষেত্রেও কিছু পছন্দিদা বই তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বাংলা এবং গুজরাট অভিযানে তিনি এই ধরণের গ্রন্থাগার সঙ্গে নিয়েছিলেন (ঐ)। শের শাহের কাছে হেরে যখন তিনি ক্যাম্বেতে থানা গেড়েছেন, সেখানেও তার সঙ্গে বইএর ভাণ্ডার এবং একজন গ্রন্থাগারিক ছিল (Noer’s Akbar (Beveridge), p. 136)। পালিয়ে বেড়াবার সময় কোলি আদবাসীরা আক্রমন করে তাঁবু লুঠ করে যে সব সম্পদ নিয়ে যায় তার সঙ্গে তৈমুরলঙ্গের ইতিহাসটাও ছিল বলে ইতিহাস জানিয়েছে (Akbar Nama (Beveridge) Vol. I. pp. 309-310)। এই ঘটনার সত্যতা পরে আবুল ফজলেরও লেখায় পাই “বহু প্রাচীন বই তার আমৃত্যু সঙ্গী ছিল এবং তার প্রচুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ (এই আক্রমনে) নষ্ট হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে তৈমুরনামা অন্যতম। এটি মুল্লা সুলতান আলির অনুবাদ এবং উস্তাদ বিহজাতের হাতে চিত্রিত এবং এটি এখন শাহেনশাহের গ্রন্থাগারে রয়েছে।”(ঐ)
গ্রন্থাগার স্থাপনের বাদশার উৎসাহ আমরা বুঝতে পারি এই ঘটনায় — তার মৃত্যুর কিছু দিন আগেই পুরাতন দিল্লির একটি বিলাস ভবনকে তিনি গ্রন্থাগারে রূপায়িত করেন। এই বাড়িটি ১৫৪১ সালে শেরশাহ তৈরি করেন এবং এটির নাম দিয়েছিলেন শের মণ্ডল (Cambridge History of India, Vcl. IV, p. 309)। লালা বেগ বা বাজ বাহাদুরের পিতা নিজাম তার অন্যতম গ্রন্থাগারিক ছিলেন (Tuzuki-Jahangiri (Rogers and Beveridge), p. 21)। হুমায়ুন আগরায় একটি মনোহরা প্রাসাদ, খানাইতিলিসিম তৈরি করেন। এই প্রাসাদের মুল কাঠামোয়, তিনটি বাড়ির মধ্যে, মধ্যেরটি একটি ছিল আটটকোণা বাড়ি, নাম খানাইসাদাত। ওপরের ছাদে গ্রন্থাগার, একটি নামাজের গালিচা (জাই নামাজ), পুথির তাক, সোনার জলে চোবানো কলম দানি (কলমদান), পোর্টফোলিও (জুজদান), চিত্রিত পুথি, এবং হস্তলিপির বিপুল সম্ভার ছিল (I. C. Vol. 33, p. 55)। হুমায়ুনের হৃদয়বিদারক মৃত্যূর ঘটনাও জড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় গ্রন্থাগারের সঙ্গে। পুরাণা কিলার গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়ে ১৫৫৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রবিবার সূর্যাস্তের সময় মারা যান (Cambridge History of India, Vol. IV, p. 69)। তার জীবনের বৃহদংশ কেটেছে পালিয়ে বেড়িয়ে বা প্রবাসে বা উপমহাদেশে যুদ্ধবিগ্রহে। তার মধ্যেও গ্রন্থাগার তৈরি অথবা বইএর প্রতি ভালবাসা থেকে সারাজীবন নানান শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িয়ে থেকেছেন। (চলবে)