শুরু হল নতুন ধারাবাহিক, সুলতানি এবং মুঘল আমলে গ্রন্থাগার। আমি মূলত বিমল কুমার দত্তের লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এন্সিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া বইএর শেষাংশ প্রায় অনালোচ্য সুলতানি এবং মুঘল আমলটি অনুবাদ করেছি। এই একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছি। তারপরে মূল আলোচনায় ঢুকব। আজ ভূমিকার প্রথম কিস্তি
ভূমিকা
উপনিবেশ আন্দোলনের সাথী কারিগর সঙ্গঠন-প্রকাশনা কলাবতী মুদ্রার মধ্যমাস আলোচনার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত আন্দোলনের সাথী এবং পরিবেশবাদী লেখক প্রশ্ন তোলেন মুঘল সম্রাটেরা বিশ্বজোড়া রাজনীতি ইত্যাদির খোঁজ খবর রাখতেন কী না। নানান ‘প্রামাণ্য’ ঐতিহাসিক নথিপত্র, গবেষণা পড়ে তার স্থির বিশ্বাস হয়েছিল সম্রাট, অভিজাত এবং অন্যান্য ধনী সে সময় মূলত হারেমে বেলেল্লাপনা করে, আর কিছুটা দেশজুড়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের কাটাকাটি, লুঠপাট করে পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করেই জীবনসময় কাটিয়েছেন। আকবর বা আওরঙ্গজেবের মত দু’একজন ব্যতিক্রমী বাদ দিলে মুঘল আমলের পাদশাদের বিশ্বদৃষ্টি ছিল না। হরবংশ মুখিয়া, যিনি ইওরোপিয় সামন্ততন্ত্রের অনুরূপ ভারতীয় সামন্ততন্ত্র বলে কিছু হয় না প্রমান করেছেন ‘অন ফিউডালিজম’ নামক একটি সম্পাদিত গ্রন্থে, তাঁর লেখাতেও উঠে এসেছে সম্রাট আর অভিজাতরা কীভাবে মুঘল সম্রাটেরা হারেমে মহিলা আর দাসেদের নিয়ে বেলেল্লাপনা চালাতেন তার বর্ণনা।
ব্রিটিশপূর্ব দক্ষিণ এশিয়া আদৌ সামন্ততান্ত্রিক ছিল কি না, এই বিতর্কটি আহমদ ছফা, তাঁর প্রবাদপ্রতীম শিক্ষক গুরু রাজ্জাক সাহেবের কাছে উপস্থিত করেছিলেন। রাজ্জাক সাহেব যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেই তত্ত্ব আমাদের মুঘল যুগকে বুঝতে সহায়ক হবে। অসামান্য আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু…’ থেকে একটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি তুলে দিলাম…
“একদিন বিকেলবেলা রজ্জাক স্যারের কাছে গিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করলাম। বললাম, স্যার বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থান কোথায়? এটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ একথা সত্যি?
“…বললেন, ইন দ্য স্ট্রিকটেস্ট সেন্স অভ দ্য টার্ম ইন্ডিয়াতে কোন ফিউডালিজম আছিল না। বেঙ্গলের কথা ত এক্কেবারে আলাদা। বেঙ্গলের কথায় পরে আইতাছি। তার আগে রেস্ট অভ দ্য ইন্ডিয়ার খবর লই।
“ফিউডালিজম অইল একটা ক্লোজড সিস্টেম। বংশপরম্পরা একটা পরিবার স্থায়ী অইয়া একটা জায়গায় বাস করব। তার ধোপা, নাপিত, কামার, কুমার সব আলাদা। এক জায়গার মানুষ অন্য যায়গায় যাইবার পারব না। কাঁঠালের যেমন কোয়া, ফিউডাল সিস্টেমের সামন্তের জমির সঙ্গে সকলের তেমন সম্পর্ক। সামন্তরা অইল নিজের জমিদারিতে সমস্ত দণ্ডমুণ্ডের মালিক। রাজসভায় ঠিকমত হাজিরা দিতে পারলে আর যুদ্ধের সময় ঠিকমত সৈন্য পাঠাইবার পারলে এক্কেবারে সাত খুন মাফ। ইন্ডিয়াতে মোগল আমলের কথা ধরেন, জমিদারি এখানে বংশানুক্রমিক আছিল না। সম্রাট ইচ্ছা করলে জমিদারের পোলারে জমিদার নাও বানাইতে পারতেন।
“আর যদি বেঙ্গলের কোথায় আইয়েন, তাহলে এক্কেবারে অন্য কথা বলতে অয়। পুরানা বাংলা পুঁথিতে দেখা যায় বাংলার বাণিজ্যবহর জাভা সুমাত্রা এইসকল অঞ্চলে যাওয়া-আসা করছে। যেখানে বাণিজ্য এইরকম সচল থাকে সেই সমাজটারে অন্য যা ইচ্ছা কইবার চান কন, কিন্তু ফিউডালিজম বলবার পারবেন না। ভইটফোগেলের হাইড্রলিক থিয়োরি বেঙ্গলের বেলায় এক্কেবারে খাটে না।
“আমি বললাম, তা হলে বেঙ্গলের সমাজের নেচারটা কী?

“স্যর বললেন, যা ইচ্ছা কন, কিন্তু ফিউডালিজম কইবার পারবেন না। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রোভিন্সে যেটুকু ফিউডালিজমের চিহ্ন খুঁইজ্যা পাওন যায়, বেঙ্গলে তার ছিটাফোঁটা পাইবেন না। গ্রামগুলার ফরমেশন দেখলেই বুঝতে পারবেন। এইখান থেইক্যা বিহারে যান, দেখবেন সীন এক্কেবারে পাল্টাইয়া গেছে। ফিউডালের অবস্থানের চাইর পাশেগোটা গ্রামবাসীর বসবাস। বেঙ্গলে সেই সব আপনে পাইবেন না। আপনে কি মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের কাহিনী পড়ছেন?
“আমি বললাম, এক সময় বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, সেই সুবাদে বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়েছে।
“তা অইলে চাঁদ সওদাগরের কাহিনী আপনার জানা। বেবাক বাংলা সাহিত্যে এইরকম শিরদাঁড়ার মানুষ একটাও দেখছেন?
“আমি বললাম, না, চাঁদ সওদাগরের মতো শক্তিশালী চরিত্র বাংলা সাহিত্যে একেবারে বিরল। মাইকেলের মেঘনাদকেও চাঁদ সওদাগরের পাশে ম্লান দেখায়।
“স্যর বললেন, চাঁদ সওদাগরের চরিত্রের এই যে ঋজুতা এইডা অইল সমুদ্র বাণিজ্যশক্তির প্রতীক।
“আমি আমার মূল প্রশ্নে ফিরে গেলাম, উনারা(মকমরেড আবদুল হক) যে বলছেন, পূর্ববাংলা আধা-সামন্তবাদী আধা-উপনিবেশবাদী।
“স্যর ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, ওরা যদি গায়ের জোরে কইবার চায় আপনে কী করবেন, মারামারি করবেন নিহি?
রাজ্জাক সাহেব থেকে থেকে ফিরে আসি আমাদের মূল বিতর্কে, যেখানে প্রখ্যাতর প্রতিপাদ্য ছিল মুঘল আমীর অভিজাতরা ভারতবর্ষ নামক একটা ভূখণ্ডে মরুভূমির উটের মত বালিতে মাথা গুঁজে থাকতেন এবং ইওরোপিয় ভূখণ্ডে জ্ঞানচর্চায় যে সব আমূল পরিবর্তন আসছিল, সেই সব পরিবর্তনকে বোঝার চেষ্টা করতেন না। আমরা তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম আজকের দক্ষিণ এশিয়া কয়েক হাজার বছর ধরে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এলাকা ছিল। ভারতবর্ষের সম্রাটই হোক বা বাংলার নবাবই হোক বা গোলকুণ্ডার সুলতানই হোক, সকলকেই বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির দিকে নজরদারি করতে হত। সারা বিশ্ব এই এলাকায় আসত দৈনন্দিনের ভোগ্য সামগ্রী এবং ধনীদের বিলাসদ্রব্য সংগ্রহ করতে। আজকে যদি ইওরোপ এবং আমেরিকাকে বিশ্বকেন্দ্র হিসেবে গণ্য করি, ব্রিটিশ উপনিবেশপূর্ব সময়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ছিল বিশ্বকেন্দ্র। ভারত, চিন আর পারস্য ছিল বিশ্ব বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা এবং পাণ্ডিত্যের সর্বোত্তম এলাকা। ইওরোপের খুব বেশি বিদ্বান গুণী ছিলেন না যারা এই অঞ্চলের বিদ্বানদের পাল্লা দিতে পারেন, ইওরোপের একটাও পণ্য ছিল না সেগুলি এই অঞ্চলে বিক্রি হতে পারে, ইওরোপের একটাও জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র ছিল না যেখানে এই অঞ্চলের গবেষক শিক্ষার্থী গিয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারে, বিশ্বের একন কোনও প্রযুক্তি ছিল না যা এই অঞ্চলের প্রযুক্তির সমান হতে পারে। এই অঞ্চলে ব্যবসা করতে এসে ইওরোপিয় কর্পোরেটেরা বিশ্ব লুঠের রূপো, সোনা ইত্যাদি রাজকোষে জমা করে তুমুল ঘাটতি বাণিজ্য সম্পাদন করতে বাধ্য হত। তারা এমন কোনও পণ্য বিক্রি করতে পারত না যা তারা দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বিক্রি করে যথেষ্ট লভ্যাংশ রোজগার করতে পারে। ফলে পলাশীর আগে পর্যন্ত ইওরোপ-দক্ষিণ এশিয়া বাণীজ্যে ইওরোপ বরাবই অধমর্ণ থেকে গেছে। আমদানি হওয়া এক কণা দামি ধাতুও ভারতবর্ষের বাইরে বেরত না। তাই পাদশহদের পক্ষে বিশ্ব রাজনীতির থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকার জো ছিল না। ঠিক যেজন্যে জেসুঈট সন্তরা আকবরের গ্রন্থাগার দেখতে এলে আকবর তাদের খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে এমন কিছু বই উপহার দেন, যেগুলির প্রতিলিপি ইওরোপের কোনও গ্রন্থাগারেও ছিল না।
আরও বড় কথা ইওরোপ বহু কাল ধরে নানানভাবে বাণিজ্য ঘাটতি পাল্টাতে চেষ্টা করেছে। এই প্রকল্পের একটা উদ্যম ছিল আরবের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধ। যেহেতু আরবের ভূমিতে এশিয় পণ্যগুলি হাতবদল হত, সেহেতু ইওরোপিয়দের ভাবনাছিল আরব ভূমি দখল করলেই এশিয় ব্যবসা দখল করা যাবে। সেই আলেকজান্ডারের সময় থেকে শুরু করে শয়ে শয়ে বছরের যুদ্ধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইওরোপ থেকে এশিয়ায় আসা দামি ধাতুর একমুখী প্রবাহ রোখা গেল না বরং উলটে ইওরোপভূমিতে ইসলাম প্রসারিত হল। আমরা লেখককে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যেহেতু দক্ষিণ এশিয়া কয়েক হাজার বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়েছে, তাই তার ভিত্তি ছিল সাম্রাজ্যগুলির বিশ্ব দৃষ্টি এবং জ্ঞানচর্চার বিস্তার। দক্ষিণ এশিয়ার স্বচ্ছলতা এবং জ্ঞানচর্চার জন্যে ইওরোপিয়রা মুঘল রাজত্বকে যেমন ঈর্ষা করত, তেমনি উসমানিয়[তুর্কি, অটোমান] সাম্রাজ্য বা মধ্য এশিয়ার অভিজাতদেরও শেষতম অবলম্বন ছিল মুঘল রাজত্ব। এই অঞ্চল থেকে শুধুই রাজনৈতিক কারণে অভিজাতরা ভারতে চলে আসতেন না, বহু সেনানী, প্রশাসক ইত্যাদি বিশ্বের ধনীতম এলাকা মুঘল রাজত্বে অভিবাসিত হতেন গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে। জস গোমানস, মুঘল ওয়ারফেয়ারঃ ইন্ডিয়ান ফ্রন্টিয়ার্স এন্ড হাই রোডস টু এম্পায়ার ১৫০০-১৭০০ গ্রন্থে মন্তব্য করছেন, মধ্য এশিয়ার কোনও রাজত্বের সার্বভৌম রাজা হবার থেকে ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের সাধারণ মনসবদারি অসামান্য স্বচ্ছলতা সূচক ছিল। গোমানস বলছেন, সমগ্র ট্রান্স্যাক্সনিয়া, তুর্কিস্তান, বলখ এবং বাদাকশানের প্রশাসক ইমাম কুলি খান এবং নজর মহম্মদ খান বছরে রাজস্ব তুলতেন ১ কোটি ২০ লক্ষ খানি অর্থাৎ ৩০ লক্ষ টাকা। এই রাজস্বের থেকে অনেক বেশি রোজগার করতেন মুঘল হিন্দুস্থানের এক এক জন আমলা। হিন্দুস্তানের প্রতি ৭ হাজারি মনসবদার ১ কোটি দাম[তামার মুদ্রা, ৪০ দাম = ১ টাকা], আড়াই লক্ষ টাকা পেতেন। প্রধানমন্ত্রী আনিমুলদৌলা আসফ খানের বাৎসরিক জায়গির ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। দীর্ঘকাল ধরে এই সুদৃঢ় আর্থিক বনিয়াদ তৈরি করা ছিল বলেই দিল্লির বাদশাই হোক বা দক্ষিণ এশিয়ার নানান এলাকার স্বাধীন বা করদ সুলতানই হোক, প্রত্যেককেই বিশ্ব দৃষ্টি অবলম্বন করে অসামান্য এই এশিয় জ্ঞানচর্চার ধারাকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। এই ধারা বহন করার অন্যতম মাধ্যম ছিল গ্রন্থাগার তৈরি করা এবং সেগুলিকে লালন পালন করা। (চলবে)
প্রচ্ছদের ছবি হুমায়ুন-এর লাইব্রেরী