তাই আমাদের ধরে নিতে হবে ছয়মাস এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে এই চার হাজার গোসলখানার পানি উত্তপ্ত হত অর্থাৎ এত অধিক গ্রন্থ ছিল যে ঐ গ্রন্থ দিয়ে ( চার হাজারের সাথে ছয়মাস অর্থাৎ ১৮০ দিন গুন করলে দাঁড়ায় ৭২০০০ দিন বা দুই হাজার বছর) দুই হাজার বছর চলত। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো ওই গ্রন্থগুলো শুধু দর্শণ ও বুদ্ধি বৃত্তিক বই ছিল, অন্যকোন গ্রন্থ নয়। এখন চিন্তার বিষয় যে সভ্যতার জন্ম হতে ছাপাখানার সৃষ্টি পর্যন্ত যদি অনবরত দর্শণ ও বুদ্ধি বৃত্তিক বই বের করা হয় তাহলেও তা চার হাজার গোসলখানার ছয় মাসের পানি উত্তপ্ত করার জন্য যথেষ্ট হত কি?
আরো চিন্তা করার দরকার এই পরিমান বইয়ের জন্য কি পরিমান স্থানের প্রয়োজন! গ্রন্থ সমূহ খড়ের গাদার মত স্তুপীকৃত অবস্থায় নিশ্চই থাকতো না কারন সেগুলো পড়া হতো সুতরাং তাক বা আলমারীতে সেগুলো সাজানোই থাকতো। চতুর্থ খৃষ্ট শতাব্দীতে রোম সম্রাটের পক্ষ হতে গ্রন্থাগার সমূহ ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ধর্মজযাজক আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার সম্পর্কে এরূপ বিবরন দিয়েছেন,’ আমি ঐ গ্রন্থাগারের আলমারীতে কোন গ্রন্থই পাইনি।‘[ আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার- শিবলী নোমানী]
শিবলী নোমানী এবং আরো কিছু পাশ্চাত্য গবেষক বলেছেন, ততকালীন সময়ে গ্রন্থ সমূহ চামড়ায় লিখিত হত এবং কখনোই তা পোড়ানোর কাজে লাগানো সম্ভব না। তাই সেগুলো জ্বালানী হিসেবে ব্যাবহার অযৌক্তিক। শিবলী নোমানী মস্যিয়ে দ্যা পিয়ের নামক এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন,’ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পানি গরমের জন্য যখন অন্য জ্বালানী পর্যাপ্ত ছিল তখন গোসলখানার কর্মচারীরা চামড়া নির্মিত গ্রন্থ সমূহ জ্বালানী হিসেবে ব্যাবহার করতে পারে না।‘

৩। ইবনে খালদুন তাঁর ইতিহাস গ্রন্থের ‘আল উলুমুল আকলিয়া ওয়া আছনাফুহা’য় বলেছেন, “বলা হয়ে থাকে আলেকিজান্ডার ইরান আক্রমনের পর সম্রাট জারাকে হত্যা করেন এবং বৃহৎ এক রাষ্ট্রের ওপর তিনি প্রভূত্ব লাভে সক্ষম হন ও প্রচুর গ্রন্থ তাঁর হস্তগত হয়। সে সময়েই বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞ্যান ইরান হতে গ্রীসে স্থানান্তরিত হয়। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ইরান জয়ের পর খলীফা উমরকে পত্র লিখেন…(বাকী অংশ পূর্বেকার বিবরনের মত, তাই আর পুরোটা তুলে দিলাম না)”।
ইবনে খালদুনের মত ইতিহাসবিদ যদি লেখেন “বলা হয়ে থাকে” তাহলে বুঝতে হবে তিনি নিজেও এ-বিষয়ে সন্ধিহান আর সেকারনেই তাঁর এই লিখাটিতে কোন রেফারেন্স বা কথকের নাম উল্লেখ করেননি। আবার তিনি বললেন আলেকজান্ডার ইরান হতে গ্রীসে বিভিন্ন গ্রন্থ নিয়ে গেছেন ও তার মাধ্যমে ইরান বিজিত হওয়ার ফলে গ্রীস নতুন এক জ্ঞ্যানভান্ডারের অধিকারী হয়েছিল। এ বিষয়ে অন্যকোন ঐতিহাসিকের বয়ান আমরা পাইনা। মজার বিষয় হলে পুর দাউদ নামক এক ঐতিহাসিক খালদূনের এই পুস্তক যখন অনুবাদ করেন তখন তিনি ইবনে খালদুন উল্লেখিত “বলা হয়ে থাকে” শব্দটি আর লিখেন নাই।
৪। আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠাগার ধ্বংসের মূল হোতা খৃস্টান মৌলভীরা এবং তাদের গোড়াপন্থীরা। এই ঘটনার বিবরণ পূর্বেও দিয়েছি এখন আবার আইজ্যাক আজিমভ লিখিত বহুল প্রচারিত বই “ মিশরের ইতিহাস” থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছিঃ
“কনস্টান্টিয়াস চিরজীবী ছিলেন না তিনি ৩৬১ খৃষ্টাব্দে মৃত্যূবরণ করেন। তাঁর মৃত্যূর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জুলিয়ান ক্ষমতার উত্তরাধিকার লাভ করেন এবং অবিলম্বে তিনি সমগ্র সম্রাজ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। ৩৬৩ খৃষ্টাব্দে পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি নিহত হন। … ৩৭৯ সালে প্রথম থিওডোসিয়াস সম্রাট হন, তিনি ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক। ৩৮১ সালে তিনি কনস্টানটিপোলে একটি খৃষ্টীয় ধর্ম সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে এরিয়ানবাদকে নিষিদ্ধ করা হয় আর এবার রাষ্ট্রশক্তি পূর্ণশক্তিতে ক্যাথলিকবাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। এরিও এবং এসব বিধর্মী ধর্ম সম্প্রদায়ের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের গীর্জা অধিকার করে নেয়া হয়। ক্যাথলিক মতবাদের বাইরে অন্যসব খৃষ্টীয় মতবাদের আর ধর্ম চর্চার কোন অধিকার রইল না।
প্রথম থিওডোসিয়াস যেমন পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে তেমন খৃষ্টান ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও খড়গহস্ত ছিলেন। ৩৮২ খৃষ্টাব্দে সহ-সম্রাট গ্রেশিয়ান সিনেট থেকে পৌত্তলিক বেদী অপসারন করেন, ৩৯৪ সালে থিওডোসিয়াস অলিম্পিক ক্রীড়ার সমাপ্তি ঘোষনা করেন যা প্রায় বারো শতাব্দী ধরে পৌত্তলিক গ্রীকদের একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব ছিল, ৩৯৬ সালে এথেন্সের কাছে সেরিসের মন্দির ধ্বংস করে এতে করে গ্রীকদের চির শ্রদ্ধেয় ধর্ম-বিশ্বাস এলুসিয়ান রহস্যের চির অবসান ঘটে।

বহুযুগের মিশরীয় ধর্মও থিওডোসিয়াসের আমলে রেহাই পায়নি… তারা ৩৯১ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় ছয় শতাব্দী টিকে থাকার পর সম্রাটের আদেশে সেরাপিয়ান ধ্বংস করা হয়… আলেকজান্দ্রিয়ার ভাগ্যে এর চেয়েও বড় দুর্ভোগ ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার সবচেয়ে বড় প্যাগান দার্শনিক শিক্ষক ছিলেন হাইপেসিয়া। সিরিল তাঁকে বিপদজনক ভাবতো, সিরিল ৪১২ খৃষ্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ নিযুক্ত হন। ধারনা করা হয় সিরিলের উস্কানিতেই একদল খৃষ্টান সাধু ৪১৫ সালে হাইপেসিয়াকে হত্যা করে এবং তারা আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীর অনেক কিছুই ধ্বংস করে দেয়…’ [পৃষ্ঠা-১৭৩]
আইজাক আজিমভ তাঁর বইয়ের ১৮৩ পৃষ্টায় মুসলিমদের সাথে আলেকজান্দ্রিয়ার বিষয়াদি নিয়েও লিখেছেন, তিনি লিখেছেনঃ “প্রবাদ আছে যে, আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরী এই সময়ে (৬৪২ খৃষ্টাব্দে) চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা হয়। লাইব্রেরীর গ্রন্থ সমুহ আমরের সামনে নিয়ে আসা হয়। কথিত আছে তিনি বলেছিলেন, “এই বইগুলি যদি পবিত্র কোরানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে এগুলি অপ্রয়োজনীয় আর যদি পবিত্র কোরানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে এগুলো ক্ষতিকর। অতএব উভয় ক্ষেত্রেই এগুলি ধ্বংস করা প্রয়োজন।“ তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন এটা নেহায়েত গল্প, সত্য নয়। কয়েক শতাব্দী ধরে মিশরের খৃস্টান শাসকদের পৌত্তলিক বিরোধী শক্ত অবস্থানের ফলে ধ্বংস করার মত খুব কম গ্রন্থই (মুসলিম বিজয়ের সময়) টিকে ছিল।“
পরিশেষে এটাই বলবো আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ধ্বংস মানব ইতিহাসের এক কলংকজনক অধ্যায় এবং সেই ধ্বংস কার্যক্রম যারা করেছে তারা মানেবতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে শুধুমাত্র ধর্মকে এস্টাবলিস্ট করতে গিয়ে।
গ্রন্থ সহায়তাঃ
১। মিশরের ইতিহাস— আইজাক আজিমভ।
২। হিস্টোরী ওফ সাইন্স — জর্জ সার্টন।
৩। হিস্টোরী অফ সিভিলাইজেশন— উইল ডুরান্ট
৪। ইমানদার দামানে সাসানিয়ান— ক্রিস্টেন সেন।
৫। আল ফেহেরেসত- ইবনুল নাদিম।
৬। আল ইফাদা ওয়াল হাওয়া ফিল উমুরিল মুশাহাদা ওয়াল হাওয়াদিসিল মায়াইনাহ বি আরদে মিশর— আব্দুল লতিফ বাগদাদী।
৭। তারিখে তামাদ্দুন— জর্জ জাইদান।
৮। ইসলাম ও আরব সভ্যতা— গুসতাভ লুবুন।
৯। মুকতাছারুদ দোয়াল— ডক্টর পোকুক।
১০। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার— শিবলী নোমানী।
১১। তারিখে ঊলুমে আখলিদার ইসলাম— ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফাহ।
১২। ইসলাম ও ইরানের পারষ্পরিক অবদান— শহীদ আয়াতুল্লাহ মূর্তাজা মুতাহারী।