বইটির অনুবাদ শেষ হল। আমি এবারে ব্রিটিশপূর্ব গ্রন্থাগার সংলগ্ন বেশ কিছু কাজ জোড়াপাতায় জুড়ব।
আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার ধ্বংস সম্পর্কে ঐতিহাসিক উইল ডুরান্টের ‘হিস্টোরী অব সিভিলাইজেশন’ থেকে কিছু তথ্য উল্লেখ করিঃ
*** আলেকিজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ৩৯২ খৃষ্টাব্দে আর্চ বিশপ তুফিনসের সময় মৌলবাদি খৃষ্টানরা পুড়িয়ে দেয় অর্থাৎ মুসলমানগণ আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের ২৫০ বছর পূর্বেই এই গ্রন্থাগারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রন্থ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
*** ধারনাকৃত ঘটনাটির সাথে আব্দুল লতিফ রচিত গ্রন্থের পাঁচ শতাব্দীর অধিক সময়ের ব্যাবধান ছিল এবং ইতিপূর্বে কোন ইতিহাসবিদই এই বিষয়টি উল্লেখ করেননি। অথচ ৯৩৩ খৃষ্টাব্দে (৩২২ হিজরী) আলেকজান্দ্রিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত খৃষ্টান আর্চ বিশপ ‘উতকিউস’ আরবদের হাতে এ শহর বিজিত হওয়ার ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। সেখানেও উল্লেখিত লতিফ সাহেবের বিবরন খুজে পাইনা। [তারিখে তামাদ্দুন- জর্জ যাইদান] উইল ডুরান্ট উক্ত গ্রন্থে আলেকজান্দ্রিয়ার ধ্বংসের বিস্তারিত বিবরন দিয়েছেন যা ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম খন্ডে পাওয়া যাবে]
গুসতাভ লুবুন তাঁর ‘ইসলাম ও আরব সভ্যতা’ গ্রন্থে বলেছেনঃ ‘আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারটি ধ্বংসের জন্য মুসলমানদের অভিযুক্ত করা হয় এটি আশ্চর্যের বিষয় যে, কিভাবে এমন একটি বানোয়াট ও অসত্য বিষয় এতকাল ধরে প্রচারিত ও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু বর্তমানে বিষয়টির অসত্যতা প্রমানিত হয়েছে; বরং এ সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইসলামের পূর্বে খৃষ্টানরাই আলেকজান্দ্রিয়ার সকল উপাসনালয় ও মূর্তিসমূহ ধ্বংস করেছিল সেই সাথে এই মূল্যবান গ্রন্থাগারটিও জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ইসলামী শাষনামলে আলেকজান্দ্রিয়া বিজিত হওয়ার সময় তেমন কিছুই সেখানে বিদ্যমান ছিলনা যা মুসলমানেরা পুড়িয়ে দিতে পারে।‘
সম্রাট আলেকজান্ডারের প্রতিনিধিগণদের মিশরে ‘বাতালাসাহ’ বলা হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার এই গ্রন্থাগারটিতে মূলত এই বাতালাসাদের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল দার্শনিক ও পন্ডিত ব্যক্তিদের আনা হয়েছিল। তারা সেখানে শিক্ষাকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু এ উন্নয়ন বেশীদিন থাকতে পারেনি। খৃষ্টপূর্ব ৪৮ সালে সিজারের নেতৃত্বে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে হামলা করা হয় ও এই জ্ঞ্যানকেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। অবশ্য রোমানদের রাজত্বে ও পরিচালনায় শহরটি পুনরায় উন্নত হয় ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় পৌছায়। কিন্তু তাও বেশিদিন টিকে থাকেনি। কারন সেখানের বাসিন্দাদের মধ্যে ধর্মীয় দাঙ্গা দেখা দেয় এবং রোম সম্রাটের পক্ষ হতে রক্তক্ষয়ী দমন অভিযান পরিচালনার পরেও সেটা অব্যহত ছিল। এমতাবস্থায় রোমে খৃষ্টবাদ রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গৃহীত হয়। রোম সম্রাট থিওডর মূর্তিপুজকদের সকল খোদা, তাদের উপাসনালয়, গ্রন্থাগার সমুহ জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন। [উইল ডুরান্ট]
আলেকজান্ডার ও তাঁর পরবর্তীদের শাসনামলে মিশর গ্রীকদের রাজনৈতিক অধিকারে ছিল। কিন্তু গ্রীক সভ্যতা পতনের দিকে ধাবিত হলে রোম সম্রাজ্য-যার রাজধানী বর্তমানের ইতালীর রোম ছিল- যুদ্ধে গ্রীসকে পরাজিত করে তখন মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়াও রোমের রাজনৈতিক অধিকারে চলে যায়। রোম সম্রাজ্য চতুর্থ খৃষ্ট শতাব্দীতে দু’ভাগে বিভক্ত হয়। যথাঃ পূর্ব রোম যার রাজধানী কনস্টানটিপোল (বর্তমান তুরষ্কের ইস্তাম্বুল) এবং পশ্চিম রোম –যার রাজধানী ছিল বর্তমান ইতালীর রোম। পূর্বরোম খৃষ্টবাদ গ্রহণ করে। খৃষ্টবাদ গ্রীস ও রোম উভয় সভ্যতার উপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রোমের বিভক্তির সময় হতেই ইউরোপের মধ্যযুগ (অন্ধকার যুগ) শুরু হয়। পূর্বরোম খৃষ্টবাদ গ্রহণ করার ফলে তৎকালীন খৃষ্টবাদী চিন্তার প্রভাবে-যারা বিজ্ঞান ও দর্শণ চর্চাকে মৌলনীতি বিরোধী মনে করত এবং দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের অধার্মিক ও বিচ্যুত বলে ফতোয়া দিত তারাই আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষা কেন্দ্রটির উপর খড়গহস্ত হলো। ৪৮ খৃষ্টাব্দে সিজারের আক্রমনের পর রোমের শাসকবর্গ দ্বিতীয় বারের মত এই শিক্ষাকেন্দ্র ও গ্রন্থাগারটিতে অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংস প্রক্রিয়া চালাল। কনস্টানটাইন পূর্ব রোম সম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট যিনি খৃষ্টবাদ গ্রহন করেন। কনস্টান্টাইনের প্রতিনিধিগণের মধ্যে অন্যতম জাস্টিসিয়ান ষষ্ঠ খৃষ্ট শতাব্দীতে এথেন্সের জ্ঞ্যানকেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিক ভাবে বন্ধ ঘোষনা করেন এবং ইতিপূর্বে চতুর্থ খৃষ্ট শতাব্দীতে আলেকিজান্দ্রিয়ার শিক্ষাকেন্দ্রটিও বন্ধ ঘোষিত হয়েছিল। এথেন্সের শিক্ষাকেন্দ্রটি ৫২৯ খৃষ্টাব্দে বন্ধ ঘোষিত হয় অর্থাৎ নবী মুহাম্মদের জন্মের ৪১ বছর, নবুয়ত ঘোষনার ৮১ বছর, হিজরতের ৯৪ বছর, তাঁর মৃত্যুর ১০৫ বছর এবং মুসলিমদের হাতে আলেকিজান্দ্রিয়া দখলের ১২০ বছর পূর্বে এই ঘটনা ঘটেছিল।
এখান থেকে স্পষ্ট বঝা যায় আলেকজান্দ্রিয়া তৈরী হয়েছিল গ্রীক প্যাগানদের দ্বারা এবং ধ্বংষ্প্রাপ্ত হয়েছিল খৃষ্টবাদের মৌলভীদের বদৌলতে।
২) এবারের আলোচনা আবুল ফারাজ ইবরীর বর্নিত মুসলিমদের দ্বারা আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার ধ্বংসের বিবরণ নিয়েঃ
আবুল ফারাজ ইবরী একজন ইহুদী চিকিৎসক যিনি ৬২৩ হিজরীতে এশিয়া মাইনররের মালাতিয়ায় জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টবাদ গ্রহন করেন। ফারাজ ইবরী নিজেও জীবনের প্রথমভাগে খৃষ্টবাদ অধ্যয়নে সময় ব্যয় করেন। তিনি আরবী ও সুরিয়ান ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি সুরিয়ান ভাষায় এক ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেন যার তথ্য সমুহ আরবী, সুরিয়ান, গ্রীক ভাষার গ্রন্থ সমূহ হতে নেয়া হয়েছে। ঐ গ্রন্থে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ধ্বংসের বিবরনই নেই।

পরে গ্রন্থটি আরবী ভাষায় ‘মুকতাছারুদ দোয়াল’ নামে প্রকাশিত হয় যা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর পোকুক নামক এক অধ্যাপক কতৃক অনুদিত হয়েছে এবং সেখানে মুসলমানদের দ্বারা আলেকজান্দ্রিয়া ধ্বংসের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে আর এই বিবরনই মূলত ইউরোপে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
‘মুকতাছারুদ দোয়াল’ গ্রন্থে অর্থাৎ ডক্টর পোকুকের অনুদিত গ্রন্থে আলেকজান্দ্রিয়া ধ্বংসের বিবরন এভাবে এসেছেঃ
‘তৎকালীন সময়ে ইয়াহিয়া নাহভী ব্যাকরণবিদ উপাধিধারী ছিলেন তিনি আরবদের মাঝে বিশিষ্ট অবস্থান লাভ করেছিলেন। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ছিলেন। প্রথমদিকে তিনি খৃষ্টান ধর্মের জ্যাকবি ধারার আভেরী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু পর খৃষ্টধর্ম ত্যাগ করেন। ফলে মিশরের সকল খৃষ্টান ধর্মযাজকেরা তাঁর নিকট এসে উপদেশ দানের মাধ্যমে তাঁকে তাঁর পূর্বের ধর্মে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। ধর্মযাজকগণ তাঁর একগুয়েমীর জন্য তাঁকে তাঁর পদ থেকে অপসারন করেন। এরূপ অবিশ্বাসী অবস্থায়ই তিনি কিছুদিন অতিবাহিত করেন। এ সময়ই মুসলিম সেনপতি আমর ইবনে আস মিশরে আসেন।
একদিন ইয়াহিয়া আমর ইবনে আসের নিকট উপস্থিত হলে আমর তাঁর জ্ঞ্যান সম্পর্কে অবহিত হন এবং তাঁর প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখান। এই বিশিষ্ট জ্ঞ্যানী ব্যক্তি সেখানে প্রজ্ঞাজনোচিত এমন এক বক্তব্য দান করেন যা আরবরা কোনদিন শোনেনি। তাঁর বক্তব্য আমরকে এমন প্রভাবিত করলো যে, তিনি তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে গেলেন। যেহেতু আমর একজন চিন্তাশীল এবং বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তি ছিলেন সেহেতু তাঁকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করলেন এবং সবসময় তাঁকে নিজের কাছে রাখতেন।
একদিন ইয়াহিয়া আমরকে বললেনঃ আলেকজান্দ্রিয়ার সবকিছু আপনার অধিকারে আছে। তন্মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় বস্তু সমুহ আমরা চাই না কিন্তু যেগুলো আপনাদের কোন প্রয়োজন নেই তা আমাদের অধিকারে দিন যাতে আমরা তা থেকে অধিক উপকৃত হতে পারি। আমর প্রশ্ন করলেনঃ ঐ বস্তু কি? তিনি বললেনঃ দর্শণ ও বুদ্ধি বৃত্তিক জ্ঞ্যান সম্পর্কিত গ্রন্থ সমূহ যা সরকারী গ্রন্থাগারে বিদ্যমান।
আমর বললেনঃ আমি নিজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু করার অধিকার রাখি না। তাই মদীনায় খলীফার( উমর) নিকট হতে এ বিষয়ে অনুমতি চাইব। আমর খলীফার নিকট অনুমতি চেয়ে পত্র লিখলেন এবং খলীফা উত্তর দিলেনঃ যদি এই গ্রন্থ সমূহ কোরানের মতের অনুরূপ হয় সে ক্ষেত্রে এগুলো আমাদের প্রয়োজন নেই আর যদি কোরানের মতের পরিপন্থী হয় তাহলে এগুলো ধ্বংস করে দাও। এই উত্তর পাওয়ার পর আমর গ্রন্থাগার ধ্বংসের কাজে ব্রতী হলেন এবং আলেকিজান্দ্রিয়ার গোসলখানাগুলোর কর্মচারীদের মধ্যে গ্রন্থ সমূহ বন্টনের নির্দেশ দিলেন। এভাবে ছয় মাসের মধ্যে সকল গ্রন্থ গোসলখানার পানি গরমের কাজে পুড়িয়ে ফেলা হল।’ [আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার— শিবলী নোমানী]
প্রথমত, উপরোক্ত বর্ণনা আবুল ফারাজ ইবনুল ইবরীই বা প্রফেসর পোকুক যেই করে থাকুন না কেনো তাদের বর্ণয়ায় শুরুতেই একটি গলদ রয়ে গেছে। সেটা হলো প্রসিদ্ধ দার্শনিক ইয়াহিয়া নাহভী। গবেষনায় দেখা গেছে তিনি মুসলিমদের আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের একশ বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন সূতরাং তাঁর সাথে আমর ইবনে আসের সাক্ষাৎ ঘটার কোন সুযোগই নেই। [তারিখে উলূমে আখলিদার ইসলাম— ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফাউ]
দ্বিতীয়ত, কাহিনীতে বলা হয়েছে খলীফার নির্দেশ পৌছারপর আমর ইবনে আস গ্রন্থগুলোকে গণ গোসলখানার কর্মচারীদের মধ্যে বন্টন করেন এবং ছ’মাস ধরে সেগুলো গোসলখানাতে ব্যাবহৃত হয়। আলেকজান্দ্রিয়া সেসময় মিশরের সবচেয়ে বড় শহর ছিল এবং পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শহর বলে পরিগনিত হত। স্বয়ং আমর ইবনে আস এই শহরের বর্ণনা লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘এ শহরে চার হাজার গোসলখানা, চারহাজার ভবন ও ইমারত, চল্লিশ হাজার জিজিয়া দানকারী ইহুদী, চার’শটি সরকারী বিনোদন কেন্দ্র, বারো হাজার সবজী বিক্রেতা রয়েছে’। (চলবে)