এখানকার স্থানীয় পরব বা অনুষ্ঠান
এখানকার স্থানীয় আদিবাসীরা যেসব পরব বা অনুষ্ঠান পালন করে তাদের মধ্যে ‘করম পরব’ বা ‘জাউলা করম’ অন্যতম। করম মূলত মানভূম এলাকার আদিবাসীদের অনুষ্ঠান বা পরব। মানভূম বলতে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চল কে বোঝায়। এমনকি ঝাড়খণ্ডের বুণ্ডু তামাড় এলাকার আদিবাসীদের জনপ্রিয় উৎসব হল এই করম। এই পরব তিথি নির্ভর। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে পালন করা হয়। এইদিন করম ডাল পুঁতে করম ঠাকুরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। অবশ্য এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই। বিষ্টুগঞ্জ গ্রামের আদিবাসী মুন্ডারী বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই করম পরবের প্রচলন রয়েছে। এখানে অবশ্য একে বলে ‘জাওলা করম’ বা ‘ডালা পুজো’। মূলত অবিবাহিত কুমারী মেয়েরাই এই করম ঠাকুরের উপাসক। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীর পাঁচ দিন বা সাত দিন আগে কুমারী মেয়েরা একত্রে বাঁশের বোনা ‘ডালা’ বা ‘ঝুড়ি’-তে বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য বীজ যেমন- মটর, কলাই, মুসুরি, সরিষা, ছোলা, গম, যব, ধান ইত্যাদি নিয়ে জড়ো হয় পার্শ্ববর্তী কোন পুকুর, খাল বা বিলে। খাল, পুকুর বা বিলের যে অংশে স্নান করতে নামবে তার পাশে মাটি দিয়ে নিকোতে হবে। তারপর বেনা গাছটা পুঁতে দিতে হয়। তিনটি পান পাতার উপর আস্ত সুপারি সিদুঁরের ফোঁটা, বাতাসা দিয়ে পাশে ধূপকাঠি ধরিয়ে দিতে হবে। অনেকে পানের উপর বাতাসা, সুপারি ছাড়াও ফল, মিষ্টিও দেয়। তারপর এক ডুব দিয়ে ভেজা গায়ে উঠে আসতে হবে এবং মাঠ থেকে টুপা বা ঢালা ভরে বালি মাটি নিয়ে আসতে হবে। বাড়ি এসে উঠোনে যে জায়গায় পুজো হবে সেই স্থানটা ভালো করে গোবর দিয়ে নিকিয়ে নিতে হবে ও বালিমাটি ভর্তি ডালা বা টুপাটি সেই স্থানে রেখে দিতে হবে। এবার ঝুড়িটার উপর মটর, কলাই, মসুর, সরিষা, ছোলা, গম ও যব-সহ অন্যান্য শস্য বীজ গুলি ছড়িয়ে দিতে হবে। একে বলে ‘জাওয়া পাতা’। ঝুড়ি বা টুপাটি সুন্দর করে কাদা দিয়ে লেপে দিতে হয় ও ঝুড়ির গায়ে তিনটি সিঁদুরের ফোঁটা দিতে হবে। ফুল, বেল পাতা দিয়ে পুজো দিতে হবে। তারপর ঝুড়িতে জল দিয়ে দেওয়া হয়, যা শস্য বীজগুলির অঙ্কুরোদগমে সাহায্য করে। তারপর এক সপ্তাহ ধরে ‘জাওয়া পাতা’ সেই কুমারী মেয়েগুলো পালন করে বেশ কিছু নিয়ম কানুন। যেমন — এ কদিন তারা শাক খায় না, মাথায় তেল দেয় না, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ায় না, তাছাড়া হলুদ, তেল, মাছ, মাংস খায় না। খালি পায়ে বেড়াতে হবে, খেতে হবে আলু সিদ্ধ ভাত। দুবেলা স্নান করতে যেতে হবে জাওয়ার শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য। যেখানে পূজো হয় সন্ধ্যাবেলায় সকলে সেখানে জড়ো হয় এবং জাওয়াকে কেন্দ্র করে চলে নাচ ও গান। সেরকমই একটি সংগ্রহের গান নীচে দিলাম। গানটি ওদের মুখে গাইতে শুনেছি।

“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
যব হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
যব হল বেরোয়া।”
#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
ছোলা হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
ছোলা হল বেরোয়া।”
#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
কলাই হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
কলাই হল বেরোয়া।”
#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
সরিষা হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
সরিষা হল বেরোয়া।”

#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
মসুর হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
মসুর হল বেরোয়া।”
#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
গম হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
গম হল বেরোয়া।”
#
“ইতি ইতি জাওয়া
কিয়া কিয়া জাওয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
মটর হল বেরোয়া।
জাওয়াকে জাগলো মা,
মটর হল বেরোয়া।”
এভাবে সাতবার কথাটার পুনরাবৃত্তি হবে। শুধু শস্য বীজগুলির নামের পরিবর্তন হবে। করম ঠাকুরকে জাগানোর এই যে উৎসব একে বলে ‘জাগ্ রন’। কথাটা এসেছে ‘জাগরণ’ থেকে।পূর্ববঙ্গে মনসামঙ্গলের গানকে ‘জাগরণ পালা’ও বলা হত। কারণ রাত জেগে জেগে পালাগুলি হত। এভাবে দিনে অন্তত দুবার ‘জাগরণ’ হবে। সাত দিন চলবে এই রীতিনীতি। তারপর আসে শুক্লা একাদশী তিথির করম পূজার দিন। এই দিন মেয়েরা সকাল থেকে উপবাস থেকে একসাথে জঙ্গলে গিয়ে ফুল তোলে, জাওয়া গীত গাইতে গাইতে। সারাদিন চলে নৃত্য-গীত। সন্ধ্যাবেলায় তারা উঠোনে করম ডাল পুঁতে করম ঠাকুরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে অর্থাৎ ‘জাগরণ’ দেয়। পুজোর অর্ঘ্য রূপে কেয়া ফুল, হলুদ ফুল, বাঁশপাতা, বেনা গাছ, ঢ্যাপের (শালুক) ফুলের মালা নিয়ে পুজোয় বসতে হয়। ধুমধাম করে পুজো হয়। কুমারী মেয়েরা কামনা করে সোহাগী স্বামী পাওয়ার এবং সন্তানবতী হওয়ার। তবে বিষ্টুগঞ্জ গ্রামের বিবাহিত মেয়েরাও এই পুজো করত। এখন অবশ্য অবিবাহিত মেয়েরাই এই উৎসব করে। যারা করম পুজো করে তাদের বলে ‘কর্মতি’/’করমতী’।তারপর সেই ডালা বা টুপাকে কেন্দ্র করে হাতে হাত রেখে কর্মতীরা গান ধরে, যা করম গান নামে পরিচিত। সঙ্গে চলে নাচ এবং গান। দু-একটি গান এখানে উদ্ধৃত করলাম, যে গানগুলি এখানকার মেয়েদের মুখ থেকে শুনেছি —
১.
“ঝিঙা ফুলের সাজে
হৃদয় নিয়ে আসে।
ঝিঙা ফুলের সাজে
হৃদয় নিয়ে আসে।।
আসে তো আসে
মুচুক মুচুক হাসে।
আসে তো আসে
মুচুক মুচুক হাসে।।

#
“কিয়া ফুলের সাজে
হৃদয় নিয়ে আসে।
কিয়া ফুলের সাজে
হৃদয় নিয়ে আসে।।
আসে তো আসে
মুচুক মুচুক হাসে।
আসে তো আসে
মুচুক মুচুক হাসে।।”
২.
“ইঁদুর মুসা দুদুর মুসা
না কাটবে জাওয়া
জে না কাটবে জাওয়া
পাঠেতে শিঘলী বিগলী
ফুলের বেহলা।
পাঠেতে শিঘলী বিগলী
ফুলের বেহলা।।”
#
“চাঁদবিলের অই আগরে
ফুলের মা সরষে রে
ফুলের মা সরষে।
পাঠেতে শিঘলী বিগলী
ফুলের বেহলা।
পাঠেতে শিঘলী বিগলী
ফুলের বেহলা।।”

পুজোর দিন কর্মতীরা সারারাত জাগবে। পুজো শেষ হলে তারা লুচি, ছোলার ডাল খাবে ও সাথে অন্যান্য প্রসাদও খেতে পারে। কিন্তু সেদিন ভাত খাওয়া মানা। এভাবেই তারা পালন করে ‘জাওলা করম’ বা ‘ডালা পুজো’।ডোম, মুচি, সর্দার, খেড়িয়া, বাউরি ইত্যাদি আদিবাসী অধ্যুষিত বাঁকুড়ার গ্রামগুলিতে করম গানের উল্লেখ প্রসঙ্গে সৌমেন রক্ষিত মহাশয় বরুণ কুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’ বইতে কয়েকটি করমগীতের উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে কয়েকটি গান আমি উদ্ধৃত করলাম।
১.
“কাঁসাই নদীর বালি এ জাওয়া পাতাব গো।
আমদে জাওয়া তালগাছের পারা। সুরজ উঠে খিনি খিনি আমার জাওয়া উঠে না।
জাওয়ার লাগ্যে সাতদিন উপাস গো।”
২.
“বাবা আমার বিহা দিল খলা ঘর দেখে গো
জনম গেল ঢালা মাড় খা’তে।
খা’তে ত ঢালা মাড়,শুতে ত ছিঁড়া কাঁথা গো।
ছারপকায় শুষে সারারাতে।”
৩.
“ভাদর মাসে গাদব জুনার লাল টুপার খাব গো।
আর কি মাঞ তর ঘরে বিটি জনম পাব গো।।”
সবশেষে ‘জাওয়া পাতা’ টুপার অঙ্কুরিত বীজগুলি কর্মতীরা ভাগাভাগি করে বাড়ি নিয়ে যায় ও বাড়ির পাশে ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই এই পরব সমাপ্ত হয়। তাছাড়া বিষ্টুগঞ্জের আদিবাসীরা ভাদ্র মাসে ভাদু পরব ও টুসু পরবও পালন করে। তবে বর্তমানে এগুলোর পাট উঠেই যাচ্ছে। কিন্তু ‘করম পরব’ বা ‘জাওলা করম’ উৎসবটা এখনো যেভাবে এলাকার মানুষরা টিকিয়ে রেখেছে তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।তাছাড়া এখানকার ঝুমুর নাচ একালায় যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে।তাদের নিজস্ব ঝুমুর দলও আছে।বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিষ্টুগঞ্জের ‘বিশ্বমুণ্ডা ঝুমুর দল’ ও ‘শ্রী শ্রী মা লক্ষ্মী সম্প্রদায় আদিবাসী ঝুমুর নৃত্য’ সাঁওতাল নৃত্য বা ঝুমুর নাচ পরিবেশন করে।

মেলা
প্রতিবছর লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে এখানকার স্কুল মাঠে মেলা বসে। প্রায় পাঁচ দিন ধরে চলে মেলা। আশেপাশের গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ এখানে আসেন এর আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। এই মেলা উপলক্ষে একটি বস্ত্রদান শিবির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৃত্যানুষ্ঠান এবং বাউল গানের অনুষ্ঠান হয়। কোন কোন বছর রক্তদান শিবিরেরও আয়োজন করা হয়। মেলার উদ্যোক্তা ‘আদিবাসী যুব সংঘ’। মেলা মানে মিলন, আবাল বৃদ্ধ বনিতার মিলন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ মেলায় উপস্থিত হন। এ কদিন এখানে জমজমাটি একটা ভাব থাকে।
আজ গ্রামের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে এ গ্রাম ও গ্রামের মানুষ যেন অনেক আধুনিক হয়ে উঠেছে। বিষ্টুগঞ্জের মত নদীয়া জেলার একটা সীমান্তবর্তী গ্রামও যে শিক্ষার আলো দেখেছে, তারা আজ পাল্লা দিয়ে চলছে অন্যান্য গ্রামের সঙ্গে তা সত্যিই অভিনব। এখানকার সহজ সরল মানুষেরা এখনও সকলের কথা ভাবে, বিপদে পড়লে সবাই মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই সুন্দর মানসিকতা, বিবেকবোধ, সৌজন্যবোধ অন্য কোনো গ্রামে খুব কমই পাওয়া যাবে। দীর্ঘ দশ বছর এই গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করার সুবাদে প্রত্যেকটি মানুষের সঙ্গে যে আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি তার তুলনা মেলা ভার।
তথ্যসূত্র
১. ‘নদিয়ার সংস্কৃতি-চর্চা’ — সম্পাদনা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল।
২. ‘স্বপ্নের ভেলা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বেতাই’ প্রবন্ধ,প্রাবন্ধিক শ্রী লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস।
৩. বরুণ কুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’ গ্রন্থ থেকে সৌমেন রক্ষিত মহাশয়ের উদ্ধৃত করম গান।
৪. উইকিপিডিয়া।
৫. ক্ষেত্র সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য।