| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেদেদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপনের কথা : মনোজিৎকুমার দাস

Reporter
মনোজিৎকুমার দাস / ২২১৩ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

বাংলাদেশের এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাম বেদে। তারা বাইদ্যা নামেও পরিচিত। বেদে মহিলাদেরকে বেদেনি বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে তারা যাযাবর ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

পৃথিবীব্যাপী রহস্যময় মানুষেরা হলো জিপসি। মনে কর হয় বাংলাদেশের বেদেরা জিপসি সম্প্রদায়ের মানুষ। এরা যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায় এখানে-ওখানে। দেশে দেশে বা অঞ্চলভেদে তাদের একেক নাম, আর বেঁচে থাকার জন্য বিচিত্র সব পেশা। ১৪২৭ সালের দিকে প্যারিস নগরীতে হঠাৎ হাজির হয় একদল মানুষ। নর-নারী, শিশু-অদ্ভুত তাদের চেহারা, অদ্ভুত তাদের কথাবার্তা, উৎকণ্ঠিত প্যারিসকে তারা আশ্বস্ত করে লিটল ইজিপ্ট হিসেবে। পরে ইউরোপের নানা শহরে এদের দেখা যায়। পরিচয় দেয় লিটল ইজিপ্টের মানুষ হিসেবে। ইউরোপ তখন একবাক্যে মেনে নেয় এরা ইজিপ্টের মানুষ। ওদের পোশাক, ওদের ভাষা, ওদের চালচলন সব ইজিপশিয়ানদের মতোই বটে। এই ইজিপশিয়ান থেকে ক্রমেই এদের নাম হয়ে গেল জিপসি।

মনে করা হয়, আমাদের অঞ্চলের জিপসিরা বেদে নামেই পরিচিত, বেদে মানেও ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে। নদীনির্ভর বাংলাদেশে বেদেদের বাহন তাই হয়ে ওঠে নৌকা। নৌকায় সংসার আবার নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দেশ-দেশান্তরে।

মনে করা হয় বাংলাদেশের বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের একটি অংশ। বেদেরা দাবি করে তারা মোগল আমলে ১৬৩৮ সালে আরাকান থেকে এ দেশে এসেছিল। ঢাকা থেকে প্রথমে বিক্রমপুর অঞ্চল, পরে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এরা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। বেশির ভাগ বেদেই হাতুড়ে চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে অভিহিত হয়। বেদে শব্দটির অবজ্ঞাসূচক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), পরিমার্জিত বৈদ্য (চিকিৎসক) থেকে উৎপত্তি। কালক্রমে চিকিৎসা অর্থাৎ কবিরাজিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় বৈদ্য, বাইদ্যা থেকে বেদে হয়ে যায়। এরা নৌকায় ঘুরে বেড়ায় গ্রাম থেকে গ্রামে, বন্দর থেকে বন্দরে যেয়ে এক সময় স্থলে নোঙর ফেলে টোল বা তাঁবুতেও থাকে।

বেদেদের নিজস্ব ভাষা আছে। এই ভাষার নাম ঠেট বা ঠের। স্বগোত্রীয়দের সাথে কথা বলার সময় এরা এই ভাষা ব্যবহার করে থাকে। তবে বাংলা ভাষাভাষীর সাথে তারা বাংলা ভাষাও ব্যবহার করে। এই ঠেট ভাষার সাথে আরাকানদের ভাষার মিল আছে। তাদের ভাষায় ব্যবহৃত বেশির ভাগ শব্দই বাংলা ভাষার আদি রূপ থেকে উদ্ভূত। বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। যুদ্ধ ও শিকারে অতিশয় দক্ষ বেদেরা কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। এদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই।

বেদেরা মোট ৯টি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হলো- লাউয়ো বা বাবাজিয়া, চাপাইল্যা, বাজিকর, বেজ বা মিচ্ছিগিরি, গাইন, ম্লেছ, বান্দাইরা, মাল ও সাপুড়িয়া। বিক্রমপুরের বিয়নিয়া, নারায়ণগঞ্জের চারার ঘোপ, কুমিল্লার আমিরাবাদ, মাইছাখালী, হুরাইল, নারগাঁও, নারায়ণপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও মেহের কালীবাড়ি এলাকায় এদেরকে বেশি দেখা যায়।

গাইন বেদেরা সুগন্ধি মশলা বিক্রয় করে, এদের নিবাস নেত্রকোনায়। বেজ বেদেরা (মিচ্ছিগিরি) বরিশাল, পিরোজপুর ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে থাকে। এদের পেশা চোখের চিকিৎসা করা। এরা ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে চোখে অস্ত্রোপচার করে। চাপাইল্যা বেদেদের (সাজদার) পেশা হচ্ছে বিষ-ব্যথা নিরাময়কারী মাছের কাঁটা, বাঘের থাবা ও পাখির হাঁড়ের মালা বিক্রয় করা। এ ছাড়া এরা আফিম, মুক্তার অলঙ্কার, চুড়ি, শাঁখা, হাঁসুলি ও ঝিনুক বিক্রয় করে। এরা তাঁতী ও জোলাদের মতো সুন্দর সুন্দর সানা (বুনানি শলা) তৈরিতে পারদর্শী। এরা দক্ষ ডুবুরিও। এদের নিবাস ঢাকার টঙ্গী, ডেমরা ও বাড্ডা, মানিকগঞ্জের সাটুরিযা এবং কুমিল্লার আমিরাবাদে।

বাজিকর বেদেরা শিয়ালের হাড় ও ধনেশ পাখির তেল বিক্রয় করে। শিয়াইল্যা বেদেরা সর্বভুক বলে অন্য বেদেদের সাথে তাদের লেনদেন হয় না। এরা গরু, শূকর, সাপ খায় এবং হিন্দু দেবদেবীর উপাসনা করে। এরা থাকে লালমনিরহাট ও ভারতের সীমান্ত এলাকায়। বান্দাইরা বেদে ওষুধ বিক্রয় করে ও বানরের খেলা দেখায়, বিভিন্ন ভোজবাজি ও শারীরিক কসরত উপস্থাপন করে। এরা রামণ্ডলক্ষণ বন্দনা-গীত গায় এবং রাম-রাবণের শৌর্যবীর্য ও হনুমানের কীর্তির বর্ণনা করে। লালমনিরহাট ও ভারতের কলকাতায় এদের বসবাস।

মাল বেদেদের (মাল বৈদ্য) পেশা সাপের বিষ ঝাড়া, দাঁতের পোকা ফেলা, রসবাতের তেল বেচা এবং শিঙা ফুঁকা। এরা সাপ ধরে বিক্রয় করে কিন্তু সাপের খেলা দেখায় না। সাপুড়িয়া বেদেরা সাপের তাবিজ কবজ ও ওষুধ বিক্রয় করে এবং সাপ ধরে। এরা সাপের খেলা দেখায় কিন্তু সাপ বিক্রয় করে না। এরা মনসা দেবীর ভক্ত।

বেদেরা নিজেদের মাঙতা বা মানতা নামে ডাকে। মাঙতা অর্থ মেগে বা ভিক্ষা করে খাওয়া। তারা সাপ, বাঁদর, ভাল্লুক ইত্যাদি নাচিয়ে, শারীরিক কসরত- জাদুর খেলা দেখিয়ে, পোক-জোঁক ফেলে, শিঙ্গা বসিয়ে, শেকড়-বাকড় ও তাবিজ-কবজ বিক্রি করে, তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে লোকজন থেকে যা পায়, তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে। তাই এরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী। বলে তারা নিজেদের মানতা নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

বেদেরা জমিতে কায়িক পরিশ্রম করাকে অমর্যাদার কাজ বলে মনে করে। হাটবাজারে সাপের খেলা দেখিয়ে ও নানা রকমের বুনো লতাপাতা আর শেকড়-বাকড় ভেষজ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে অর্থ রোজগার করে। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে মন্ত্র অর্থাৎ ঝাড় ফুঁকের প্রয়োগ অত্যন্ত বেশি। বেদেদের পেশার মধ্যে আছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, তাবিজ কবজ বিক্রি, সাপের কামড়ের চিকিৎসা করা, সাপের খেলা দেখানো, মাজা-কোমড়, হাত-পায়ের বাতের ব্যথা নিরাময়ের জন্য সিঙ্গা লাগানো, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, মৃত পশুর শরীরের অংশ ব্যবহার করে বা গাছপালা দ্বারা ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করা, বানর খেলা দেখানো, জাদু দেখানো ইত্যাদি।

বেদেরা বেশ সাজগোজ করে। কোমরে বিছা আর গায়ে ইমিটেশন গহনা পরে। খোপায় ফুল গুঁজে রাখে মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যই। সহজ-সরল জীবনযাপনকারী বেদেরা খুবই সৎ প্রকৃতির। অপরাধ করে গুরুতর শাস্তির ভয় থাকলেও সর্দারের কাছে তারা অপরাধ স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় না। এদের জীবন ধারণের মান অত্যন্ত নিম্ন ও অপরিচ্ছন্ন। এদের খাদ্য তালিকায় বাছবিচার নেই। বিভিন্ন ধরনের মাদকেও এরা আসক্ত।

বেদে পুরুষরা লুঙ্গি পরে। মহিলারা দশহাত কাপড় দুই টুকরা করে এক টুকরা কোমরের নিচে দুপ্যাঁচ দিয়ে, অন্য টুকরা গলায় ওড়নার মতো ঝুলিয়ে রাখে এবং গায়ে পরে ফতুয়া অর্থাৎ আঙ্গি। বর্তমানে অনেক মনতং নারী ও পুরুষ বাঙালি নারী-পুরুষের মতেই পোশাক পরতে শুরু করেছে।

আগেই বলা হয়েছে বেদেরা ঐতিহ্যগতভাবে নদীতে বসবাস করে, ভ্রমণ করে এবং তাদের জীবিকা অর্জন করে, তাই তাঁরা “জল যাযাবর” বা “নদী যাযাবর” নামেও পরিচিত।

বেদেরা ইউরোপীয় যাযাবরদের অনুরূপ। এখন বেশীর ভাগ বেদেরা নদীতে থাকতে পারে না। বহু নদী ভরাট হয়ে গেছে। চলাচলে সমস্যা। এখন নদীতে কালভার্ট তৈরী করা, বাঁধ দেয়া, জমি দখল করে ভরাট করার কারণে নদীতে সবসময় পানির প্রবাহ থাকে না। বর্তমানে অনেক বেদে পরিবারই তাদের নিজস্ব পেশা ত্যাগ করে স্থলভাগে বসবাস করছে।

তারা দল বেঁধে ভ্রমণ করে এবং কখনো এক জায়গায় কয়েক মাসের বেশি থাকে না। জলপথে এসে হাট বাজারের কাছে তাবু খাটিয়ে টোল ফেলে। বেদেদের প্রায় ৯৮% দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং প্রায় ৯৫% বেদে শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। ঐতিহাসিকভাবে বেদেরা ভোট দিতে পারতো না কারণ তাদের স্থায়ী আবাস ছিল না, একই কারণে তারা ব্যাংক ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণের জন্য আবেদনও করতে পারতো না।

২০০৮ সালে বেদেরা বাংলাদেশে ভোটাধিকার অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বেদেদের অধিকাংশই পুরুষ মহিলা সাপ সম্পর্কিত ব্যবসায় জীবনযাপন করে, যেমন সাপখেলা, সাপ ধরা, সাপ বিক্রি ইত্যাদি। তাঁরা ভাগ্যবতী গুল্ম এবং ভেষজ ওষুধও বিক্রি করে, যা তাঁরা দাবি করে যে এতে যাদুকরী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বেদেদের অন্যান্য পেশা হলো বিনোদন পরিষেবা (যেমন বানরখেলা, জাদুখেলা) এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা। বেদেরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে থাকে। গ্রামবাসী বেদেদের জাদুকরী শক্তিতে বিশ্বাস করে। তাঁরা বিশ্বাস করে বেদেরা জাদুকরী ক্ষমতার মাধ্যমে অশুভ আত্মাদের কারও শরীর ত্যাগ করাতে পারে। তাঁদের কেউ কেউ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো বড় শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ভিক্ষা করতে দেখা যায়।

বেদেরা সম্মিলিতভাবে একত্রে লবসবাস করতে ভালোবাসে। বেদেদের পরিবারের মহিলারা গ্রামের গ্রামে গঞ্জে ঘুরে সাপ খেলা, ভেলকি বাজি ইত্যাদি করে থাকে।

বেদে পরিবারের পুরুষরা সাধারণত পাখি শিকার , সাপ ধরা, জল থেকে হারানো গয়নাগাটি খোঁজার কাজ করে। বেদের সম্প্রদায়ের আচার আচরণ দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম আছে। বেদে মেয়েরা প্রায় সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী হয়। ওই সমস্ত মহিলারা যখন গ্রামে তখন তারা সুর করে ডাক ছেড়ে ও গান গান

গেয়ে গ্রামবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

সাধারণত তারা গ্রামের মহিলাদেরকেই আকৃষ্ট করতে সামর্থ্য হয়।

অধিকাংশ বেদেদের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এবং তাঁরা চিকিৎসা সুবিধা ব্যবহার করে না। তাঁদের অধিকাংশই বাংলা ভাষায় কথা বলে। তাঁদের বেশিরভাগই মুসলিম কিন্তু ইসলামের সাথে হিন্দুধর্ম, আধ্যাত্মবাদ এবং সর্বপ্রাণবাদ অনুসরণ করে। তাঁরা অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় যাযাবর গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত, যেমন ডোম্বা এবং বুনো জনগোষ্ঠী।এরকম জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের একটি অকৃত্রিম যোগাযোগ আছে বলে মনে করা হয়।

বেদে জনগোষ্ঠী বিয়ের সময় নাচগান হয়। তাদের বিয়েতে বিচিত্র রীতি রীতিনী রয়েছে। বিয়েতে বর ভয়ে গাছের ডালে উঠে থাকে। তাদের স্ত্রী তাদের এই আশ্বাস দিয়ে নামায় যে বিয়ের পর তাকে সংসার নিয়ে চাপ দিবে না। কারণ বেদে মেয়েরা রোজগার করে আর ছেলেরা সংসার সামলায়। একেক বেদে সম্প্রদায়ের একেক রকম পেশা। যেমন কোনো সম্প্রদায় সাপুরে, অন্য একটি সম্প্রদায় আবার গাইন যারা সুগন্ধি মসলা বিক্রি করে। আবার শান্দার বেদেরা মেয়েদের সাজগোজের জিনিস বিক্রি করে। বাজিকর বেদেরা জাদু ও সার্কাস দেখায়। এ ছাড়াও কিছু বেদেরা হারানো জিনিস খুঁজে দেয়, কেউ বানরের খেলা দেখায়, আবার কেউ টিয়া পাখি দিয়ে মানুষের ভাগ্য গণনা করে।

বেদেরা বাঙালিদের সাথে বাংলায় কথা বললেও তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। নিজেদের মধ্যে তারা ঠেট বা ঠার ভাষায় কথা বলে থাকে,আগেই বলা হয়েছে। বেদেরা অস্ট্রালগোত্রীয়। কিন্তু তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি (সাক-লুইশ) ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ ভাষার কোনো লিপি নেই।

বাংলা সাহিত্যে বেদে জনগোষ্ঠীদের নিয়ে লেখক এবং কবি – সাহিত্যিক অনেক গল্প কবিতা, যাত্রা গান, নাটক, উপন্যাস লিখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তাদের জীবনযাপন ক্রিয়াকর্ম জীবিকা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের লেখা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের অমর কীর্তি।

বেদে সম্প্রদায়ের জীবন ব্যবস্থা এবং তাদের হাসি-কান্না, আনন্দণ্ডবেদনা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গল্প-উপন্যাস-সিনেমা। ১৯৩৯ সালে দেবকী বসু বেদে জনগোষ্ঠীর নিয়ে জীবন যাত্রা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার নাম দেয়া হয় সাপুরে। এরপর লখিন্দর, নাগিন কন্যার কাহিনী, নাগিন, সর্প রানী, সাপুড়ে মেয়ে-সহ অসংখ্য সিনেমা নির্মাণ হয়। বাংলাদেশে সাপের গল্প নিয়ে প্রচুর সিনেমা তৈরি হয়েছে। বেদের মেয়ে জোছনা একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। ১৯৮৯ সালে মুক্তি লাভ করে। তবে সর্বশেষ বেদের মেয়ে জোসনা বাংলাদেশের লোকজ ধারার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ইলিয়াস কাঞ্চন ও অনজু ঘোষ অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি এতদকালের সর্বাপেক্ষা ব্যবসা সফল ছবি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে অন্যতম ব্যবসাসফল ছায়াছবি।

সাভারের রেডিও কলোনি পাশে বেদে পল্লী। মূলত অমরপুর, পোড়াবাড়ি, কাঞ্চনপুর ও বক্তারপুর এলাকা নিয়ে গঠিত এই বেদে পল্লী। এখানে প্রায় ১৫ হাজার বেদের বসবাস। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় নারী বেদেদের হাত পাততে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই থাকেন সাভারে। এই জনগোষ্ঠীর মেয়েরাই সংসারের চালিকাশক্তি। আর সন্তান লালন-পালন করে অলস সময় কাটান। বছরের পর বছর এ চিত্র সাভারের বেদে পল্লীতে দেখা গেলেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পেশা পাল্টাচ্ছে তারা। বেদেরা মাতৃতান্ত্রিক হলেও বর্তমানে তাদের সমাজ ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। সওদাগর শ্রেণী নাম দিয়ে তারা এখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করেছে।

পরিশেষে আবারো বলতে হয়, বেদে মানে ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে। নৌকাতেই ঘরবাড়ি, নৌকাতেই বসতি একদল রহস্যময় মানুষ। যাযাবরের মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায় এরা। আর বেঁচে থাকার জন্য বিচিত্রসব পেশা। নদীনির্ভর বাংলাদেশে এখনও বেদেদের বাহন নৌকা। নৌকায়ই তাদের সংসার। এদের জীবন বৈচিত্রময়। তবে কালের প্রভাবে ও নদ নদী ভরাট হয়ে যাওয়া বেদেদের জীবনে এসেছে পরিবর্তন, আর এতে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

তাছাড়াও বর্তমানে বেদেদের এ কাজের তেমন একটা চাহিদা নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলছে তাদের অসহায় জীবন-যাপন। আগের মতো দেখা যায় না মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিঙ্গা লাগানো, সাপ খেলা দেখানো। দিনেমদিনে হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র — ১)উকিপিডিয়া, ২) বিভিন্ন পত্রিকায় বেদেদের উপরে প্রকাশিত লেখা, ৩) সোজন বাদিয়ার ঘাট : পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।

মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev