আমার চারপাশে জাল ফেলে বৃষ্টি
না, গল্পটা বৃষ্টির নয়। কিন্তু সে ভিজিয়ে দিয়েছিলো প্রথম দেখার মেঘাক্রান্ত বিকেল। শ্লোকের ছোটপিসি নার্স,তখনো বিয়ে হয়নি,কোয়াটার নিয়ে একা থাকে। তাই প্রায়ই শ্লোককে যেতে হয় ছোটপিসির কোয়াটারে। সাধারণত সপ্তাহের বাজার কিংবা মাসকাবারী নিয়ে গেলে শ্লোক বিকালে গিয়ে বিকালেই ফিরে আসে কিন্তু তার ভাই শাক্যের স্কুল বন্ধ থাকলে মা,ভাই আর সে দিন সাতেক তার পিসির সাথে থাকে। শ্লোক ও শাক্যের খুব পছন্দ এই জায়গাটা। বাবার বদলির চাকরীতে তারা কম জায়গায় থাকেনি কিন্তু ছোটপিসির এই কোয়ার্টার তাদের খুব প্রিয়। দুই পাশে তিনতলা কোয়াটার, তার চারদিকে ঢালাই রাস্তা মাঝে সবুজ মাঠ, কোয়াটারের বাউন্ডারী গেটের পাশেই পিচঢালা পথ, হাসপাতালের পেছন দিকটায় কোয়াটার বলে হাসপাতালের গেইট দিয়েও ঢোকা যায়। শ্লোক শহরের নামকরা স্কুলে পড়ে, তার উপর ভাল ক্রিকেটার। সদ্য শেষ হওয়া জেলা স্কুল ক্রিকেটে তার নামের পাশে দুটো রেকর্ড জ্বলজ্বল করছে। পত্রিকাতেও বেরিয়েছিলো সেই কৃত্তি, মফস্বল এই শহরতলিতে তাই সে রীতিমত দর্শনীয়।
সেবার কি একটা লম্বা ছুটিতে শ্লোক প্রায় মাসখানেক ছিলো ছোট পিসির সাথে। কোয়াটারের ছেলেদের সাথে এরই মধ্যে তার খুব ভাব হয়েছে। এত লম্বা সময়ের জন্য তাকে কাছে পেয়ে কোয়াটারের ছেলেগুলো যেন ক্রিকেট গুলে খেতে চাইছে। সারাদিন কেবল ক্রিকেট আর ক্রিকেট। খুব মজা পেয়ে শ্লোকও নিজের সমস্ত শিক্ষা যেন উজার করে দিতে চাইছে ওদের।
দুইদলে ভাগ হয়ে ওরা খেলছে। শ্লোক ব্যাট করছে, ওর দলের তখন শেষ ওভারে বার রান দরকার। বল করতে এসেছে দিব্য, দিব্য খুব ভাল বল করে, দিব্যর বলিং অ্যাকশনটা ঠিক মনোজ প্রভাকরের মত, শ্লোক একমাত্র দিব্যর বলকেই সমীহ করে, তাছাড়া শ্লোক কোয়াটার মাঠে যে চার পাঁচ বার আউট হয়েছে তা ওই দিব্যর করা বলেই। টান টান উত্তেজনা। বড়রা অনেকেই ব্যালকনিতে বসে, কেউ কেউ ঢালাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু-দলের খেলা দেখছে। বিকালের মেঘাক্রান্ত আকাশ পিচ রাস্তার ওপারে বিদ্যামন্দির বালিকা বিদ্যালয়ের মাথায় ধীরে ধীরে কালো হচ্ছে। দিব্যর প্রথম বলটা লেগ ষ্টিকের উপর পড়ে শ্লোকের পায়ে আঘাত করতেই চিৎকারে ফেটে পড়ে দিব্য ও তার সাথীরা। আম্পায়ারিং এ দাঁড়ানো ছেলেটা চুপ করে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে বলে, নট আউট, হল্লা বাড়ে, কেউ কেউ তেড়ে আসে। তিনতলার হরেন বাবু ব্যালকনি থেকে কেন আউট নয় বুঝিয়ে বলার পর আবার খেলা শুরু হয়।পরের বলটা পয়েন্টে ঠেলে দিয়ে দুটি রান।তারপরের বলেই স্কয়ার কাটে চার।দুটি ডট বল হতেই উত্তেজনা চরমে। শেষ বলটা স্টেপাপ করে সৌরভ গাঙ্গুলির মত স্টেইটে পিচ রাস্তায় লম্বা ছয় হাঁকাতেই উত্তেজনায় ফেটে পড়লো গোটা মাঠ। কয়েকজন ছেলে এসে শ্লোককে কাঁধে তুলে ধরলো। শ্লোক বাউন্ডারি গেইটের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি কাঁধ থেকে নেমে পিচ রাস্তার দিকে ছুটে গেল। তাকে কাঁধে তোলার পরই সে খেয়াল করলো বিদ্যামন্দির বালিকা বিদ্যালয়ের গেইটের সামনে একটি মেয়ে, মেয়েটি মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, তার মাথায় গিয়ে লেগেছে বলটি। মেয়েটির লেডিবার্ড সাইকেল রাস্তার পাশে পড়ে আছে। শ্লোক সাইকেলটা উঠিয়ে স্ট্যান্ড করল, মেয়েটির পায়ের কাছে পড়ে থাকা বলটি তুলে নিয়ে অপরাধীর মত মাথা নিচু করে সরি বলতেই। মেয়েটি রুদ্র মূর্তি ধারন করলো।
—কিসের সরি। যতসব ফালতু ছেলেপেলে, মেয়ে দেখলেই বাঁদরামো।
—না, আসলে ছক্কা মেরেছিলাম ওদিক থেকে, আপনার খুব কি লেগেছে, বরফ এনে দেবো?
—কি এসেছেন শচীন রে, ছক্কা মেরেছিলাম। এটা খেলার জায়গা? খেলতে হলে মাঠে যা, এখানে কি?
তুই সম্বোধনটা শ্লোক আশা করেনি, মেয়েটির ভেঙচি দেয়া মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিলো ছেলেপেলে ও বড়রা এসে ঘটনা সামাল দিলো। শ্লোকের কানে কিচ্ছু যাচ্ছে না। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মেয়েটির রূঢ়তা তাকে কষ্ট দিলেও মেয়েটির পোশাক ও স্মার্টনেস তাকে মুগ্ধ করেছে। কিছুদিন আগেই স্কুল পালিয়ে দেখা কুচ কুচ হোতা হ্যাঁ-র কাজলের মত মাথায় ব্যান্ড, পড়নে জিন্স আর হলুদের ওপর বল বল ফতুয়া পড়া এমন মেয়ে যে মফস্বল শহরে থাকতে পারে তা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। সে তার জেলা শহরে এমন পোষাক পড়ে যে তিন চারজন আছে তাদের চেহারা মনে করতে চেষ্ঠা করে।
ঘোর কাটে না শ্লোকের। ঘটনার পরেরদিন সে ফিরে এসেছিলো বাড়ীতে কিন্তু মেয়েটির মুখ যেন চোখে লেগে আছে। শ্লোকের অনেক বান্ধবী, যতবার তাদের দিকে তাকায় সেই মেয়েটি ভেসে ওঠে। রাগারাগির সময় দেখে ফেলা নাভির সরলতা তাকে তরঙ্গে কাঁপায়, শ্লোক সে কথা ভাবতে চায় না, কিন্তু বারবার মনে পড়ে। কাউকে যে বলবে সেটাও পারে না। যখনই ভাবে কাউকে বলবে সেই মেয়েটির মুখরিত মুখ তাকে ভয় দেখায়। তার কানে শুধু বাজে ‘কিসের সরি। যতসব ফালতু ছেলেপেলে, মেয়ে দেখলেই বাঁদরামো।’
তুমি হও কাদামাটি
শ্লোক অনেকবার চেষ্ঠা করেছে কথা বলতে, নাম জিজ্ঞাসা করতে কিন্তু সাহসে কুলায়নি। শহুরে শ্লোক যখন দিব্যদের কাছে শুনেছে এলাকার সব ছেলে মেয়েটিকে ভয় পায়, সে সেই কথায় ততটা পাত্তা দেয়নি কিন্তু অনেকদিন পরে শ্লোকের এক বন্ধুর মামা যখন তার এলাকার ঐ ঘটনা শুনে বললো, ‘মেয়েটি তা হলে নিশ্চিত আমাদের ৪৪০ ভোল্ট, আর যেখানে যেতে চাও যাও ভাগ্নে ওই মেয়েটিকে কিছু বলতে যেও না, নির্ঘাত মারা পড়বে। আমরা সিনিয়াররাই ওকে ঘাটাই না। আমাদের বাড়ীর পাশেই ওর মামার বাড়ী, সেখানে থেকেই ও পড়ালেখা করে। মেয়ের মত দেখতে যদিও আদতে ও একটা ছেলে, ভগবান নিশ্চিত ভুল করেছে ওকে পাঠানোর সময়। তবে মেয়েটি খুব গুণী, খুব ভাল নাচ করে, গান গায়, শুনেছি ভাল কবিতাও লেখে। যেতে যেতে মামা জানিয়ে গেলো মেয়েটি কিন্তু ক্যারাটে শেখে মামা, খুব সাবধান। ‘নামটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করলো না শ্লোক। তারপর থেকে মেয়েটিকে কিছু বলা তো দূরে থাক, ওর ধারে কাছেও যায় না শ্লোক। কিন্তু মেয়েটিকে তার ভাল লাগে। মনের কথা বলতে না পারলেও সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মেয়েটি নিশ্চিত জানে এখানে এলেই সে তাকে দূর থেকে ফলো করে। এবং নিশ্চিত বোঝে কেন সে ঘুরঘুর করে।
সেবার সরস্বতী পূজায় সে দেখলো এতদিনের চেনা মেয়েটি শাড়িতে। যদিও টাইটানিকের রোজের সাথে মেয়েটির কোন মিল নেই, না পোশাকে, না চেহারায়, তবু তার মনে হলো এ যেন সেই টাইটানিকের নায়িকা রোজ। মেয়েটিকে এই প্রথম সে দেখলো লেডিবার্ড সাইকেল ছাড়া, শ্লোক মনে মনে খুব খুশি হলো, ভাবলো, যাক আজ অন্তত অনেকটা সময় দেখা যাবে হাঁটতে হাঁটতে। মাঝে মধ্যে পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শরীরের গন্ধ নেয়া যাবে। কথাটা ভেবে শ্লোক যতটা পুলকিত হলো ঠিক ততটাই মেঘ তাকে ঘিরে ধরলো। তার মনে হলো মেয়েটি যদি ডাকে, যদি ডেকে জানতে চায় কেন পিছন পিছন ঘুরছে কিংবা সেই যে সেদিন সে নাভির সরলতা দেখে ফেলেছিলো তা যদি মেয়েটি বুঝে থাকে আজ যদি তার কাছে জানতে চায় সে অমনটা কেন করেছিলো। ঘোরের মধ্যেই সে খেয়াল করলো মেয়েটি তার দিকেই হনহন করে আসছে। কোন রকমে ঢোক গিলে মনে মনে সে কি উত্তর দেবে ঠিক করতে লাগলো। পলকে তার মনে পড়লো বাবা লোকনাথের অভয় বাণী, মনে পড়ে যেতেই সে একনাগাড়ে বিড়বিড় করতে লাগলো জয় বাবা লোকনাথ, জয় বাবা লোকনাথ…।
মেয়েটি তার সামনে দিয়ে হনহন করে নির্বিকার হেঁটে চলে গেলো। সে খেয়াল করলো অভ্যাসহীন শখের শাড়ি লুটিয়ে পড়ছে, মেয়েটি কিছুতেই সামলাতে পারছে না। শ্লোকের খুব ইচ্ছে করছিলো খসে পড়া শাড়ি তুলতে তুলতে গিয়ে বলে জানো আমি খুব ভাল শাড়ি পড়াতে জানি। তোমায় পড়িয়ে দিতে পারি যদি বলো। কিন্তু সে যে শাড়ি পড়াতে পারে না কথাটা মনে হতেই সে দেখলো মেয়েটি একটি বাসে উঠে গেছে। মেয়েটির সাথে একসাথে যাবার কথা যখন তার খেয়াল হলো সে ছুটলো, কিন্তু ততক্ষণে বাস চলতে শুরু করে দিয়েছে।
শ্লোকের বাবা বদলি হয়ে এখানে এসেছেন অনেকদিন। নতুন জায়গায় নিজেদের বেশ মানিয়ে নিয়েছে শাক্য আর শ্লোক। শাক্য এখানেই মাধ্যমিক দিল, শ্লোকও বি.বি.এম শেষ করবে আগামী বছর, নতুন বন্ধু বান্ধবীদের ভিড়ে শ্লোক দম ফেলবার ফুসরত না পেলেও প্রায়ই মেয়েটির কথা তার খুব মনে পড়ে। উপহার পাওয়া নোকিয়া মোবাইলটি হাতে নিলেই শ্লোক ভাবে ইস এখন যদি সেই মেয়েটির সেল নম্বর থাকতো, কল করে সংকোচহীন সব মনের কথা বলে দিতে পারতো সে। কিন্তু সেল নম্বর তো দূরে থাক, সে কোথায় আছে কেমন আছে সেই খবরটাও তার কাছে নেই। যদিও সেই মেয়েটির খোঁজে রোজ রাতে সিম বদলে একান্ত গোপন নম্বর থেকে প্রতিদিন কত নম্বরে কল করছে সে। মামার জোগাড় করে দেয়া নম্বরে কল করে কতবার খুঁজেছে, বানিয়ে নেয়া কত আজানা নম্বরে কল করে শুনতে চেয়েছে মেয়েটির গলার স্বর। কোথাও পায়নি কেবল নিজের কাছে নিজে হাসির খোরাক হয়ে রয়ে গেলো, একটা দীর্ঘশ্বাস রাতের নির্জনতা ভেঙে দেয়। হাতে ধরা ফোনটা বেজে ওঠেই থেমে গেল। শ্লোক মোবাইলে তাকলো, দেখলো একটা অচেনা নম্বর, শ্লোক নিজেই নিজেকে বলার মত করে বিরক্তিতে বললো উফ, আবার!
ইয়াং জেনারেশনের হাতে মোবাইল ফোন আসার পরে নতুন একটা ট্রেন্ড এসেছে, ইচ্ছে মত নাম্বার বানাও বানিয়ে মিসকল কর নয়ত টেক্সট মেসেজ। শ্লোক এখন বেশ বিরক্তই হয়। প্রথম প্রথম বেশ মজা পেলেও, ঘটনাটির পর থেকে সেই ভাল লাগাটা এখন আর তার নেই। গতবছর প্রতিরাতের মতই কমন সিমটা বদলে একান্ত গোপন সিমটা চালু করতেই নাম্বারটিতে বড় একটা টেক্সট মেসেজ পায় শ্লোক। ‘আজ যত ফুল ফুটবে সব ফুল তোমায় দিলাম। হৃদয়ের উষ্ণতা নিও, কেমন আছো? কথা বলা যাবে কি?’ শ্লোক প্রথমে ভাবলো মেসেজ করবে পরক্ষণই তার মনে হলো যদি সেই মেয়েটি হয়, যেই ভাবা অমনি কল। রিং বেজে বেজে থেমে যায় কেউ তোলে না। অনেকবার কল করে থামে শ্লোক, কিছুক্ষণ পরেই একটা মেসেজ ‘কল করো না, কথা বলতে চাও, আমরা না হয় মেসেজই কথা বলি।’ এখন চিঠি লেখার চল অনেকটা কমে এসেছে। শ্লোকের যেসব পেন ফ্রেন্ড ছিলো তারাও খুব একটা লেখে না আজকাল। তা নিয়ে শ্লোকের একটা শূন্যতা ছিলোই তার উপর অচেনা মেয়ের মেসেজ। যদি সেই মেয়েটিই হয় তাই মেসেজ লিখতে দেরি করলো না সে।
তোমার নাম কি?
আমি তরুনিমা। তোমার কি নাম? কি কর পড়ালেখা নাকি চাকরি?
ইচ্ছে করেই নাম পরিচয় এড়িয়ে গিয়ে তরুনিমার মাঝে সে খুঁজে চলে সেই মেয়েটিকে। লিখতে লিখতে সে ডুবে যায়। মেসেজ চালাচালি বেশ জমেও উঠেছিলো। মন দেয়া নেয়ার প্রস্তাবও এসে গেছে, এরই মধ্যে শ্লোক জানতে পারে নাম্বারটায় কোন তরুনিমা নেই, আছে তার বন্ধু মাইসা। বন্ধুদের কাছে যদিও ব্যাপারটি কেবলই মজার শুধুই হেঁজানো। কিন্তু শ্লোকের কাছে এটা যে ছিলো ফেলে আসা মুখ খুঁজে তাকে ছুঁয়ে দেবার ইচ্ছা। তা শ্লোক তার বন্ধুদের বলতে পারে না। মাইসা কিংবা বন্ধুরা যদিও বোঝেনি তরুনিমা সেজে তারা শ্লোককেই মেসেজ করছিলো, শ্লোকও তা কাউকে বুঝতে দেয়না, কেবল সেদিনের পর থেকে মাইসার নাম্বারটায় সে আর কোন মেসেজ করে না।
আমার কণ্ঠীতে বাজাও তোমার মেঘমল্লার
পর পর কয়েকদিন নিয়ম করে মিস কল এলো অচেনা নম্বরটি থেকে। শ্লোক রেসপন্স করে না। রাতে সেই অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ।
কেমন আছেন? এক বন্ধুর কাছে আপনার নাম্বার পেলাম, অচেনা নম্বরে কল করেন, মেসেজ লিখেন নিজের নাম বলেন না কেন?
শ্লোক মনে মনে হাসে। সে মনে মনে ঠিক করে এবার সেও মজা করবে। ওদের বুঝিয়ে দেবে সেও মস্তি কম জানে না।
সে লেখে, ভালো কি আর থাকা যায়? এই বর্ষায় খুব একা লাগছে মাইরি!
কেন? তিনি নেই?
থাকবে না কেন?
তাকে জড়িয়ে ধরুন। একা লাগবে না। হা হা হা।
আপনার হাসিটা সুন্দর।
মিথ্যে কথা। আমার হাসি কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন?
মনের চোখে পাচ্ছি।
তাই? বেশ তো মন ভোলানো কথা বলতে পারেন। আপনার নামটা কি? আমাকে কি বলা যায়?
নাম দিয়ে কি হবে?
কেন বলতে মানা? নাকি বিশ্বাস করতে পারছেন না। কথা দিচ্ছি কাউকে বলবো না, এমন কি সেই বন্ধুটিকেও না যে নম্বর দিয়েছে।
শ্লোক নিজের নামটা লিখে কেটে দেয়, তারপর টাইপ করে সমৃদ্ধি।
সুন্দর নাম।আমার নাম নীলাক্ষী
মাইসা কে চেনেন?
কোন মাইসা? মাইসা আপনার কে হয়?
শ্লোক মেসেজটা পেয়ে নিশ্চিত হয় এটা তার বন্ধুদেরই নতুন কোন প্ল্যান তাকে হেঁজানোর।
কি হলো ঘুমিয়ে গেলেন নাকি?
না, আপনাকে ভাবছি।
কি ভাবছেন?
শ্লোকের চোখে মুখে দুষ্টুমির হাসি সে টাইপ করে, ভাবছিলাম এমন রাতে আপনার মত কেউ যদি থাকতো বিছানায় ঈশ্বর যাকে তার নিপুণ হাতে সৃষ্টি করেছেন। পুরাণের দেবী সরস্বতীও যার চেয়ে কম সুন্দরী।
যাতা একদম। আপনারা সব ছেলেপেলে একই রকম নাকি? মেয়ে পেলেই হলো অমনি ভন্ডামি শুরু, চলুন গুড নাইট।
সেই শুরু। তারপর রোজ রাতে অচেনা নম্বরে মেসেজ করাটা অভ্যাসে পরিণত হলো শ্লোকের। রাত দেড়টা-দুটো বেজে যায়, মেসেজ আদান প্রদান চলতেই থাকে, ঘুমানোর কথা খেয়ালে থাকে না। কিছুদিন পরে মেসেজ বাদ দিয়ে তারা কল করতে লাগলো কত কী কথা হয় তাদের। রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম, দর্শন, খেলা, এমনকি সেক্স — কোনো কিছুই বাদ যায় না। কেবল শ্লোক তার আসল নামটা বলবো বলবো করেও বলে না।
আজ তুমি ফুঁ দিয়ে নেভাও, নেভাও আমার সোনালি রূপালি
নীলাক্ষীর ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট আছে কথাটা মনের হতেই শ্লোক ফেইসবুক খুলে বসেছে, তারা কেউ কাউকে এখনো দেখেনি শুধু কথাই হয় রোজ, নীলাক্ষীর অনুরোধেই আজ বিকালে প্রথম তারা সরাসরি দেখা করবে। নীলাক্ষীকে সরাসরি দেখার আগে তাকে দেখে নেয়া দরকার। শ্লোকের এখনো মাঝে মাঝে মনে হয় গোটা ঘটনাটা মেইটেন্ড করছে তার বন্ধুবান্ধব। শ্লোক খুঁজতে থাকে, সে কেবল জানে হলুদ শাড়ি পড়া একটা প্রোফাইল পিক আছে, এছাড়া আর বেশি কিছু সে জানে না। বেশ কয়েকটা নীলাক্ষী নামের প্রোফাইলের নিচে হলুদ শাড়ি পড়া একটা প্রোফাইল পেলো সে, নীলাক্ষীর প্রোফাইলে ঢুকে অ্যাবাউটে ক্লিক করে দেখে পেশা কিংবা থাকে কোথায় তার কিছু লেখা নেই। ফটো অপশনে ক্লিক করে দেখে কয়েকটা ছবি। টাইমলাইন ফটোসে অনেক ছবি, কিন্তু একটিও তার নয়। প্রোফাইল পিকচার মাত্র তিনটি। প্রথমটিতে নীলাক্ষী কোনো এক পাহাড়ে সূর্যাস্তের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে, দ্বিতীয়টিতে গালে হাত দিয়ে ড্রইংরুমের সোফায় বসা চোখ দুটোতে যেন সমুদ্রের ঢেউ এবং তৃতীয়টিতে হলুদ শাড়ি পরে কোন একবাড়ীর ব্যালকনিতে দাঁড়ানো।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল। শ্লোকের সময় যেন কাটছে না। মনে মনে সে ঠিক করল আজ নিজের আসল নামটা নীলাক্ষী কে বলতেই হবে। সময়ের অনেক আগেই কফিশপের বাইরে এসে অপেক্ষা করছে শ্লোক, কথামত যে রঙের পোষাক পড়ার কথাছিল সে তার কিছুই পড়েনি। নীলাক্ষী ঢুকছে, ফেইসবুকে দেখা ছবির নীলাক্ষী আর এই নীলাক্ষী হুবহু এক দেখতে। নীলাক্ষী যা বলেছিলো তেমনই পিংক টপ আর ব্লু ডেনিম প্যান্ট পড়েছে। এসেছে। শ্লোক চুপচাপ দাঁড়িয়ে কিছুসময় চারপাশটা ভাল করে খেয়াল করল। নীলাক্ষী কফি শপে ঢুকে একটু পরেই বেরিয়ে এসে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো, শ্লোক এগিয়ে গেলো।
চল, ভেতরে বসি।
নীলাক্ষী একদৃষ্টিতে শ্লোকের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি সমৃদ্ধি? তোমার তো শার্ট পড়ার কথা ছিলো!
শ্লোক হাসে, তারপর এটা সেটা বলতে বলতে ভেতরে ঢোকে।
ওরা কফি শপের কোনার দিকের টেবিলটাতে মুখোমুখি বসলো। শ্লোক কফিশপের দরজার দিকটায় মুখ করে বসেছে, সে জানে হয়ত এখনই তার বন্ধুরা এসে তাকে চমকে দিয়ে বলবে, ‘ডুবে ডুবে জল খাস দেখ কেমন ফাঁসিয়েছি।‘কথাটা ভাবতে ভাবতে সে নীলাক্ষীর দিকে তাকায়, সে খেয়াল করলো নীলাক্ষীর দৃষ্টি তখন থেকে তার দিকে স্থির। ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না কী দেখছে। শ্লোক বলল, কী ভাবছ?
তোমার চেহারাটা কেন জানিনা খুব চেনা চেনা লাগছে, মনে হয় আমি কোথাও তোমাকে দেখেছি।
আমাকে! কোথায়?
সেটাই মনে করতে পারছি না।
ওদের কথার মাঝেই কফি এলো। কফিতে চুমক দিতে দিতে শ্লোক বললো, এখানে যে কাজে এসেছো সেটা হলো?
কথাটা যেন শুনতেই পায়নি নীলাক্ষী, শ্লোক আবার কিছু বলতেই যাচ্ছিলো, অমনি নীলাক্ষী বললো, তুমি স্কুল টিমে ক্রিকেট খেলতে?
শ্লোকের মুখের হাসিটা কথাটা শোনা মাত্র ফিকে হয়ে গেলো। কয়দিনই আগেই সে মাইসা ও বাকী বন্ধুদের বলছিলো তার স্কুল ক্রিকেটের কথা। সে বিস্ময়ে তাকায় তারপর খুব সরলভাবে মিথ্যা বলে দেয়, না তো।
না উত্তরটা যেন আশা করেনি নীলাক্ষী। সে আশা ভঙ্গের স্বরে বলে, ও খেলতে না, না। কথাটা বলতে বলতে কফির মগে হাত রাখে কিন্তু দৃষ্টি তখনো শ্লোকের দিকে স্থির।
শ্লোকের খুব অস্বস্ত্তি হচ্ছিলো মুখের উপর ডাহা মিথ্যা কথাটা বলে, সে প্রসঙ্গ পাল্টাটে বললো, এখানে যে কাজে এসেছো সেটা হলো কি না তো বললে না?
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে নীলাক্ষী বলল, জানো, অনেক বছর ধরে মনে মনে আমি একজন কে খুঁজছি। তোমার কোন পিসি কি নার্স ?
হ্যাঁ। আশ্চর্য! তুমি কীভাবে জানো?
কোন বিকালে পিসির সেই কোয়াটার মাঠ থেকে ছয় মেরে একটি মেয়ের মাথায় আঘাত করে সরি বলে খুব গালাগাল খেয়েও তার পেছন পেছন ঘুরঘুর করতো যে ছেলেটি সে নিশ্চয় তুমিই?
শ্লোক চমকে উঠল। মুখ হাঁ করে নীলাক্ষীর দিকে তাকিয়ে রইল।
কে তুমি? শ্লোকের বুকের গভীর থেকে উঠে আসা জিজ্ঞাসা।
শ্লোকের পলক পড়ে না। বিস্ময়ে সে রুদ্ধবাক। নীলাক্ষীর চোখদুটো ভিজতে শুরু করেছে। শ্লোকের হাত জড়িয়ে ধরে নীলাক্ষী মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়া রোদের মত হাসতে শুরু করল। শ্লোকও আর কান্না রুখতে পারল না। বিগলিত অশ্রুতে ভেসে যেতে লাগল দুজোড়া চোখ। কিন্তু শ্লোক ঠিক বুঝতে পারে না নীলাক্ষীর কান্নার কারণ। কেন কাঁদছে সে? সেই মেঘাক্রান্ত বিকালের জন্য, নাকি সেই ঘুরঘুর করা ছেলেটির জন্য?
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক। স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা এবং ওয়েবজিন।বর্তমানে ইরাবতী ডেইলি ওয়েবজিনের সাথে যুক্ত।
বৃষ্টি সন্ধ্যা, ১ মে ২০১৮