ছোটবেলায় খবরের কাগজে পড়তাম বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিও হতে পারে। আর তা ছিল নেহাতই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস। তাতে রেনি ডে’র ছুটি পাওয়ার আনন্দের আভাস থাকতো। সেই আনন্দ এখন বদলে গেছে আতঙ্কে। বজ্রপাতের আভাস থাকলে ভয় হয়। তার কারণ তা শুধু পিলে চমকানো শব্দ আর আকাশ থেকে নেমে আসা নীল আলোর ঝলকানিতেই থেমে থাকছে না – হয়ে উঠেছে মৃত্যুর কারণ। পশ্চিমবঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। গ্লোবাল ওয়েদার ইনটেলিজেন্স এজেন্সি, তাদের সাউথ এশিয়া লাইটনিং রিপোর্টে জানিয়েছে ২০২০তে পশ্চিমবঙ্গে প্রতি স্কোয়ার কিলোমিটারে ৮টা বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯-র এপ্রিল থেকে ২০২১ এর মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বজ্রাঘাতে মারা গেছেন ১০৮ জন মানুষ।

ওয়েদার ইনটেলিজেন্স এজেন্সির দেশজোড়া বিশাল নেটওয়ার্ক। অসংখ্য সেন্সরের সাহায্যে তারা বজ্রপাতের ঘটনার ওপর লাগাতার নজরদারি করেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে রাজ্যে বজ্রপাত বাড়ার ঘটনা জানা গেছে। বজ্রপাত শুধু পিলে চমকানো আওয়াজ আর আকাশে নীল আলোর ঝিলিক হয়েই থেমে থাকেনি তা হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের দুঃখের কারণ। সেসময় মাঠে ঘাটে কাজ করা বা বাইরে থাকা বহু মানুষজন আচমকাই মারা গেছেন বজ্রাঘাতে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এঘটনা সব থেকে বেশি। এই দুটি জায়গায় প্রায় ২০ লক্ষ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে গতবছরে। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশই বিপজ্জনক। এমনটা আগে কখনো হয়নি।
২০২০ সালে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১৬৯৭ জন মানুষ। বজ্রপাতের কারণ অনুসন্ধান ও এর ফলে এরাজ্যের মানুষের কি ক্ষতি হচ্ছে, এর কোন প্রভাব আবহাওয়ায় পড়ছে কিনা, এসব ব্যাপারে যৌথ সমীক্ষা চালিয়েছে – ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট অবজারভিং সিস্টেম প্রমোশন কাউন্সিল, ভারতের আবহাওয়া দপ্তর, কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। তাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুটোই বেশি। ভারত-বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কায় সব মিলিয়ে ৫৭ মিলিয়ন বজ্রপাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই আকাশ থেকে সরাসরি মাটিতে নেমে এসেছে মৃত্যু, ক্ষতি হয়েছে মানুষের।

সারা বিশ্বে এই ধরণের বজ্রপাতের প্রায় ৮৯ শতাংশই আমাদের দেশে হয়। এই তথ্যটাই তো বিনা মেঘে বজ্রপাত! অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় বজ্রপাতের ঘটনা খুব একটা কম নয়। কিন্তু তাতে বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার ঘটনা কম। কারণ তা খুব কমই মাটি স্পর্শ করে। আমাদের দেশে বজ্রপাতের ঘটনা অবশ্য বিহার, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পন্ডিচেরি ইত্যাদি রাজ্যে খুবই বেড়েছে। কিন্তু সবার ঊর্ধ্বে আছে হিমাচল প্রদেশ, তারপরেই পশ্চিমবঙ্গ। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন বজ্রপাত বৃদ্ধির মূল কারণ।