রোম্যান্টিসিজম বনাম ফোবিয়া কিংবা প্যানিক অ্যাটাক। বজ্রপাতকে ঘিরে অনুভূতির দ্বন্দ্ব যুগে যুগে। বজ্রগর্ভ মেঘের আড়ালে কখনও সৃজনশীলতা, কখনও বা আবার মৃত্যুর বিভীষিকা। এই অনুভূতির পথ ধরেই একদিন বিশ্বকবির সৃষ্টিতে প্রকাশ পেয়েছিল, ‘বজ্রমাণিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা/তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা’। সেই বর্ষার মেঘই আজও কোনও শিল্পীর কন্ঠে জাগিয়ে তুলতে পারে রাগ মেঘমল্লার- ‘শ্রাবণী ঐ এলো রে গুরুগুরু মেঘে/নৃত্যেরও তালে বিজলী চমকে, রুণুঝুনু পায়ে নুপূর বাজিয়ে’। আসলে আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘ মানেই মানবমনে এক অদ্ভুত অনুভূতি। কবি, গীতিকার, সুরকার কিংবা কন্ঠশিল্পীরা এর মধ্যে খুঁজে নেন মাদকতা আর সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা। কারও মন আবার ভরে যায় বিষাদে, অবসাদে। ছবিতেও আতঙ্কের আবহ মানেই বিদ্যুতের ঝলক-বাজ পড়া। এই দৃশ্যের বাইরে অন্যকিছু যেন ভাবতেই পারেন না বেশিরভাগ পরিচালকই। তবে অতিসম্প্রতি বাস্তবেও বজ্রগর্ভ মেঘের আড়ালে প্রতি মুহূর্তেই বোধ হয় মৃত্যুর হাতছানি। নিমেষের মধ্যেই সব শেষ। দিনে দিনে যেন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর দাপট।
সমীক্ষা বলছে
গতবছরে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা চালানো হয়েছিল বজ্রপাতের ওপরে। বর্ষা শুরুর ঠিক আগে থেকে মরশুমের প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় ৪ মাস ধরে চলেছিল এই সমীক্ষা। দেখা গেছে,ঐ ৪ মাসে দেশে অন্তত ১৩১১জনের প্রাণ নিয়েছে বজ্রপাত। এরমধ্যে সবথেকে বেশি মৃত্যু হয়েছে উত্তর প্রদেশে। প্রাণ হারিয়েছেন ২২৪ জন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। মৃত্যুর ঘটনা ১৭০। তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে যথাক্রমে ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড। মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ১২৯ এবং ১১৮। তথ্যসূত্র ‘ক্লাইমেট রিজাইলিয়েন্ট অবসার্ভিং সিস্টেমস প্রমোশন কাউন্সিল’। সংক্ষেপে সি আর ও পি সি। ‘ইন্ডিয়া মিটিওরোলজিকাল ডিপার্টমেন্ট’ বা দেশের আবহাওয়া দপ্তরের সঙ্গে মিলিতভাবে ৪ মাসের একটি সমীক্ষা রিপোর্ট তৈরি করেছে তারা। রিপোর্টেই উঠে এসেছে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। শুধু তাই নয়, বজ্রপাতের ওপরে সমীক্ষার ভিত্তিতে গোটা দেশের একটি ‘লাইটনিং ম্যাপ’ বা বজ্র-ম্যাপও তৈরি করেছে এই অলাভজনক সংস্থাটি। লক্ষ্য, প্রাণহানি রুখতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। ভারতে এইরকম উদ্যোগ অবশ্যই এই প্রথম।
বিপজ্জনক উত্তপ্ত অঞ্চল
বাজপড়ার ঘটনা দেশে কী ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে তা সমীক্ষা রিপোর্টেই স্পষ্ট। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা ঘটনা যে মাত্র ৪ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাইটনিং হয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ লক্ষ ৫৫ হাজার। এর মধ্যে ২৩ লক্ষ ৫৩ হাজার বার ভূমিস্পর্শ করেছে বিদ্যুৎ,যাকে প্রকৃত অর্থেই বলা যেতে পারে বাজ পড়েছে। অঙ্কের হিসেবে যা দাঁড়ায় ৩৬ শতাংশ। বাকি ৬৪ শতাংশ বাজ সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে মেঘের মধ্যেই। দু’রকম বজ্রপাতের মোট অঙ্কে দেশের মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে আছে কিন্তু ওড়িশা। গতবছরে মাত্র ৪ মাসের মধ্যে এই রাজ্যে বজ্রপাতের সংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। সেই তুলনায় উত্তর প্রদেশে বজ্রপাতের ঘটনা অনেক কম, ৩ লক্ষ ২০ হাজার। অথচ মৃত্যুর সংখ্যার বিচারে ওড়িশা কিন্তু বেশ পিছিয়ে উত্তর প্রদেশের থেকে। কারণ, বজ্রপাতে প্রাণ এবং সম্পত্তিহানি রুখতে জাতীয় গাইডলাইন মেনে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে চলেছে ওড়িশা। লক্ষণীয়, জেলা হিসেবে বজ্রপাতের সংখ্যায় দেশের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম। আদিবাসী অধ্যুষিত এই জেলায় সাম্প্রতিক বজ্রপাতের সংখ্যা ২ লক্ষেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সব অঞ্চলের আবহাওয়া সাধারণভাবে উত্তপ্ত, লু প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, বজ্রপাতের প্রবণতাও সেখানে বেশি। এরই পাশাপাশি দূষণের কারণেও উৎসাহিত হয় বজ্রপাত। মনে রাখা দরকার ছোট নাগপুর অঞ্চলও কিন্তু বজ্রপাত প্রবণতার বিচারে বেশ বিপজ্জনক।

আগাম সতর্কতা
এখন প্রশ্ন হচ্ছে,বজ্রপাত বিষয়ে এমন তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার এই উদ্যোগ কেন? মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে গণচেতনা গড়ে তোলা। তথ্যভান্ডারকে সামনে রেখে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সুবিধেজনক। কোথায় কোথায় বাজ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা মানুষকে অন্তত কিছুটা আগে জানিয়ে দিতে পারলে অনেকটাই কমে যায় প্রাণহানির আশঙ্কা। তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে পারেন মানুষ। সাধারণভাবে দেখা গেছে বছরে গড়ে ২০০০-২৫০০ মানুষ মারা যান বজ্রাঘাতে। অথচ বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি বা আধুনিক প্রযুক্তিতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে বুঝে ওঠা সম্ভব যে বাজ পড়তে পারে কোথায়। মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই প্রায় সঠিকভাবে অনুমান করা যায় ব্যাপারটা। কালক্ষেপ না করে মোবাইলের টেক্সট মেসেজ বা অন্য কোনও প্রযুক্তির মাধ্যমে সতর্কবার্তা এলাকার সমস্ত স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই থমকে দাঁড়াবে মৃত্যু। পরিতাপের বিষয়, আবহাওয়া দপ্তর এব্যাপারে একটি পাইলট প্রোজেক্ট নেওয়ার পরে গত বছর থেকে ১৬টি রাজ্যে মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে সতর্কতা জারি করার ব্যবস্থা করলেও সব অঞ্চলে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি এখনও। ফলে সম্ভব হয়নি প্রত্যাশিত গণজাগরণও।
বজ্র-নকশা
কী বলছেন সি আর ও পি সি-র চেয়ারম্যান সঞ্জয় কুমার শ্রীবাস্তব? তাঁর মুখ থেকেই জানা গেল,বজ্রপাত-প্রবণ এলাকাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য আবহাওয়া দপ্তরের পাশাপাশি পুনের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’, ইসরো, এন আর এস সি-র তথ্যভাণ্ডার এবং বিশেষজ্ঞদেরও সাহায্য নেওয়া হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য দেশজুড়ে যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে তাতে যুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন রাজ্য সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমকে। এইভাবেই ঝুঁকিবহুল অঞ্চলগুলোকে ম্যাপের মধ্যে বিশেষভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি জানালেন,আবহাওয়া দপ্তর দেশজুড়ে সেন্সর বসিয়ে গত এপ্রিল থেকেই আমজনতাকে সতর্ক করার ব্যবস্থা করেছে। বাকি দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে এস এম এস-এর মাধ্যমে তা জেলাস্তরে জরুরি ভিত্তিতে পাঠিয়ে দিতে হবে রাজ্যকেই। তাই বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন বজ্র-বিপর্যয়ের মোকাবিলাতেও। তা না হলে গতিরোধ করা যাবে না মৃত্যুর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওড়িশা, অন্ধ্র আর কর্ণাটকের মতো কয়েকটি রাজ্যে অবশ্য সবকিছু চলছে সঠিক পদ্ধতি আর নিয়ম মেনেই। ফলে ঝুঁকি কমছে। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তা পেয়েই এইসব রাজ্যে তা দ্রুত এস এম এস-এর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরেই দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে মানুষকে সাহায্য করছেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা। নিরাপদ আশ্রয়ও তৈরি হচ্ছে সরকারি উদ্যোগেই। জায়গায় জায়গায় লাগানো হচ্ছে বজ্রনিরোধক।
বদল বাড়ির নকশায়
যেমন ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ। গত বছরেও বজ্রাঘাতে এই জেলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫২ জন। এবছরে কিন্তু এখনও পর্যন্ত মৃত্যু-সংখ্যা মাত্র ১৭। কারণ, রাজ্য সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। বজ্রাঘাত এড়াতে এখানে বহু বাড়ির নকশাই বদলে দেওয়া হচ্ছে। রোপন করা হচ্ছে প্রচুর তালগাছ। সবথেকে বড় কথা প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে প্রান্তিক জনতাকেও। বজ্র কী, বজ্রগর্ভ মেঘ কীভাবে কখন ঘনিয়ে আসে, ‘ডাইরেক্ট হিট’ কিংবা ‘ইনডাইরেক্ট হিট’ কীভাবে এড়ানো যায়, উঁচু বাড়ির ছাদ, খেত, মাঠ এবং জলাশয়ের ঝুঁকিটা ঠিক কতটা, জমা জল, বৈদ্যুতিক তার, সাজ-সরঞ্জাম কতটা বিপজ্জনক, বিদ্যুতের সুপরিবাহী এবং অপরিবাহী কী কী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গাছের নিচে বা অস্থায়ী শেডের নিচে আশ্রয় না নিয়ে কেন কংক্রিটের ছাদের নিচে আশ্রয় নিতে হয়- এইরকম নানা প্রয়োজনীয় বিষয় বোঝানো হয় মানুষকে।
কাটিয়ে উঠতে হবে দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এক বছরে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার বার বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি হয়। প্রতিবার মেঘের ভেতরে এবং মেঘ থেকে ভূমি স্পর্শ করা মিলিয়ে অন্তত ১০০টি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তাল মিলিয়ে প্রাণ এবং সম্পত্তিহানির ঘটনাও বেড়ে চলে। প্রতিরোধের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্যোগের অভাব নেই জাতীয়স্তরে। কিন্তু মূল কেন্দ্র থেকে কমিউনিকেশন গ্যাপ রাজ্য এবং জেলাস্তরে। প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব। এই দুর্বলতাটাই দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি।