আজকে যেটা শ্রীরামপুর একসময় তার নাম ছিল ফ্রেডরিকস নগর। প্রশ্ন আসতে পারে কে এই ফ্রেডরিকস? তিনি হলেন ডেনমার্কের রাজা। এই নামের মধ্যেই রয়ে গেছে হুগলিতে ড্যানিশদের আগমনের স্মৃতি। তারা ডেরা বেঁধেছিলেন শ্রীরামপুরে। ১৭৫৫ সালে সেখানে উড়েছিল ড্যানিশ পতাকা। স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজরা ড্যানিশদের এই আধিপত্য স্বীকার করেনি, ইংরেজ আর ড্যানিশদের মধ্যে যুদ্ধে ড্যানিশরা হেরে যায়, ইংরেজরা ফ্রেডরিকস নগর দখল করে। সেন্ট ওলে চার্চ, হেনরি মার্টিন প্যাগোডা, শ্রীরামপুর কলেজ এখনও বাংলায় ড্যানিশ ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ড্যানিশদের আরেকটা ঐতিহ্য হল, ২০১৫ সাল থেকে নতুনভাবে চালু হওয়া ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। একসময় এখানে খেতে কলকাতা থেকেও পর্যটকরা আসতেন। দারুণ খাবার তো বটেই এই ট্যাভার্নের আরেকটা বৈশিষ্ট হল, অনেকটা কলকাতার কফি হাউসের আদলে ছাদের ওপর কাটআউট। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস যে ড্যানিশরা তৈরি করেছিলেন তা তো আগেই বলেছি। নতুনভাবে চালু হওয়ার পরও ড্যানিশ ট্যাভার্ন লোক টানছে তার স্থাপত্য আর পরিষেবার গুণেই।

বিদেশি পতাকা এদেশে সবচেয়ে বেশি দিন উড়েছে চন্দননগরে, এমনকি ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরেও। চন্দননগরে ফরাসি ঐতিহ্যের নানা স্মারক এখনও ছড়িয়ে রয়েছে। ১৯২০ সালে তৈরি চন্দননগর স্ট্র্যান্ড এখনও গঙ্গাতীরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। এই স্ট্র্যান্ডের কাছেই রয়েছে ড্যুপ্লে ম্যানসন। চন্দননগরের ফরাসি গভর্নর ড্যুপ্লের বাড়ি। এখন তার নাম হয়েছে চন্দননগর মিউজিয়াম ও ইনস্টিটিউট। এখানে ড্যুপ্লের ব্যাক্তিগত সংগ্রহ ছাড়াও চন্দননগরের ফরাসি ঐতিহ্যের নানা স্মারক রয়েছে। অর্ধেক জলে ডুবে থাকা পাতালবাড়ি এখানে ফরাসি স্থাপত্যের আরেকটি নমুনা। স্যাক্রেড হার্ট চার্চ বাংলায় ফরাসি ইতিহাসের আরেকটি স্মৃতি। এই চার্চের জানলায় কাচের ওপরে আঁকা ছবিগুলি এখনও মানুষকে অবাক করে। সত্যি বলতে কি, চন্দননগরের বহু বাড়িতে ইন্দো–ফরাসি স্থাপত্যের প্রভাব এখনও স্পষ্ট।

বিদেশি শাসকদের মধ্যে ভারতে ইংরেজরা এসেছে সবার পরে। কিন্তু তারা শাসন করেছে সবচেয়ে বেশি দিন। স্বাভাবিক কারণেই হুগলির এই লিটল ইউরোপে ইংরেজরা একটা বড় অংশ। হুগলির যে ঐতিহাসিক নিদর্শনটি লোকের মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হল চুঁচুড়ার ক্লক টাওয়ার। রাজা ষষ্ঠ এডওয়ার্ডের স্মরণে চুঁচুড়া শহরের রাস্তার মাঝখানে এই টাওয়ার বসানো হয়েছে। এখন জায়গাটার নাম হয়েছে ঘড়ির মোড়। ইংরেজরা চলে গেছে বহুদিন কিন্তু ঘড়ি এখনও চলছে।

হুগলির এই লিটল ইউরোপকে দেখতে হবে ঘুরে ঘুরে, একটু সময় নিয়ে। মানুষের ভাবনা আর সৃষ্টির ক্ষমতা দেখে অবাক হবেন আপনি। যত বেশি দেখবেন আনন্দের পাশাপাশি আপনার দুঃখও হবে। মনে হবে জায়গাটা আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারতো। ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলি ছাড়াও ব্যান্ডেল, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, চন্দননগরের বহু বাড়িতে বিদেশি স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। এখানেই ইতিহাস জেগে রয়েছে। দুঃখের কথা হল, এইধরণের বহু বাড়ির মালিক চড়া দামে বাড়িগুলি বিক্রি করে দিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আমাদের ইতিহাস ও পর্যটন।

পর্যটন মানে কিন্তু শুধু লোক আসা নয়, যেসব জিনিস দেখতে লোক আসে তা দেখার মত করে না রাখলে পর্যটক আসবে না। যা আছে তা হয়ে যাবে ধ্বংসস্তূপ। গঙ্গার ধারে এই ছোট্ট ইউরোপ যেন দেশের মধ্যে দেশ। একটা দেশের মধ্যে জেগে থাকা আরেকটা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। এই দেশ না দেখলে বাংলায় পর্যটন সম্পূর্ণ হবে না।