কলকাতা থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে গঙ্গার ধারে হুগলিতে যেন জেগে রয়েছে টুকরো টুকরো ইউরোপ। মাত্র ২০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে পর্তুগিজ, ডাচ, ড্যানিশ, ফরাসি, আর্মেনীয় এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যের অসংখ্য নমুনা। গির্জা, চার্চ, গেট, প্রাসাদ, পার্ক, হোটেল, ঘড়ি, টাওয়ার, সমাধিস্থল, কলেজ, বিজয়স্তম্ভ সব মিলিয়ে এ যেন এক লিটল ইউরোপ, ছোট্ট ইউরোপ! এ যেন দেশের মধ্যে আরেকটা দেশ! এই ছোট্ট ইউরোপ তৈরি করেছিল বিদেশি বণিকদের বাণিজ্যিক স্পৃহা থেকেই বাংলার বুকে এই ছোট্ট ইউরোপের জন্ম।
তারা এখানে এসেছিলেন প্রাচ্যের মশলা, কাপড়, সিল্ক, আদা, তামাক, আফিং এসবের বাণিজ্য করতে। বাংলার সম্পদের হাতছানিতেই পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো ডা গামার পা পড়েছিল হুগলির মাটিতে। একই উদ্দেশ্যে এসেছিলেন ফরাসী রাজপুরুষ ডুপ্লে। ইংরেজদেরও যে এই একই কারণে এদেশে আসা এ তো আমরা সবাই জানি। বাণিজ্যিক কারণে সব বিদেশি শক্তিরই পছন্দ ছিল গঙ্গার ধারের জায়গাগুলি। সবাই এসেছিলেন জলপথে। তাই হুগলির লিটল ইউরোপ হয়ে উঠতে খুব একটা সময় লাগেনি। ব্যান্ডেল, শ্রীরামপুর, চুঁচুড়া, চন্দননগরে সেই ইতিহাস এখনও জীবন্ত হয়ে আছে। ব্যান্ডেলে উপনিবেশ করেছিল পর্তুগিজরা, ড্যানিশরা শ্রীরামপুরে, ওলন্দাজরা চুঁচুড়ায় আর ফরাসিরা চন্দননগরে। এই তো সেদিনও চন্দননগরের নাম ছিল ফরাসডাঙা।

এইরকম একটা চমৎকার জায়গা নিয়েও আমরা বিরাট কোন পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে পারলাম না, স্রেফ কল্পনাশক্তি, ইতিহাসবোধ আর উদ্যোগের অভাবে। অতীতের স্থাপত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সবকিছু জানতেই পর্যটকরা হুগলিতে আসতে পারেন। হুগলির ইতিহাস পর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, ড্যানিশ, আর্মেনীয় স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের মিলনের ইতিহাস। শ্রীরামপুরে মিশনারিদের প্রেসে প্রথম তৈরি হয়েছিল বাংলা বই ছাপানোর কাঠের বাংলা হরফ। হিতোপদেশ আর বাংলা বাইবেল ছাপা হয়েছিল সতীদাহ প্রথা নিবারণের এক নির্ভীক সৈনিক উইলিয়াম কেরির শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে। হুগলির অতীতের ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলি নষ্ট হয়ে যেতে দেখলে তাই দুঃখ হয়।

বাংলায় প্রথম খ্রিষ্টান চার্চ তৈরি করেন পর্তুগিজরা। এখন যেটা ব্যান্ডেল চার্চ, আগে তার নাম ছিল দ্য ব্যাসিলিয়া অফ আওয়ার লেডি। ১৯৫৯ সালে এটা তৈরি হয়। এই চার্চ নিয়ে ভাঙাগড়ার গল্পটাও আকর্ষণীয়। মোঘলরা এটা ভেঙে দিয়েছিল। পড়ে পর্তুগিজরা আবার বানায়। এটাই বাংলার প্রাচীনতম চার্চ। ব্যান্ডেলে ঘাঁটি গেড়েছিল পর্তুগিজরা আর তারপরে আসা ডাচ বা ওলন্দাজরা বাদশা শাহজাহানের অনুমতি নিয়ে ১৬৩৮ সালে দুর্গ গড়লো চুঁচুড়ায়। এখানে ডাচ স্থাপত্যের একটা চমৎকার নিদর্শন হল ডাচ মন্দির। আনা মারিয়া নামে ডাচ মহিলার সমাধি মন্দিরটি হল্যান্ড ও বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের মিলনের এক চমৎকার উদাহরণ। গঙ্গার ধারে সন্দেশ্বর শিব মন্দিরেও এই দুই দেশের স্থাপত্যের মিলনের একটা ছবি পাওয়া যায়। এই মন্দিরে পুজোর দিন এখনও বাজে ওলন্দাজদের দেওয়া একজোড়া ব্রাশ ড্রাম। চুঁচুড়ায় ডাচদের গড়া ফোর্ট গুস্তাফা এখন আর নেই, তবে দুর্গের সাক্ষী হিসেবে সেখানে এখনও পড়ে রয়েছে চারটে কামান।

ইতিহাস যে সবসময় বড় স্থাপত্যেই খুঁজতে হবে তার কোন মানে নেই। ৫০০ বছর আগে ওলন্দাজরা এখানে ভূগর্ভস্থ নর্দমা বানিয়েছিল, ভাবলে অবাক হতে হয় এখনও তা কাজ করছে। ওলন্দাজরা আসার কিছুপরেই হুগলির তীরে দেখা গেল আর্মেনীয় বণিকদের। তারাও ডেরা বাঁধলো চুঁচুড়ায়। অন্যদের মত আলাদা কোন শহর না গড়লেও এখানে তাদের সংখ্যা কম ছিল না। ১৬৯৫ সালে চুঁচুড়ায় তারা তৈরি করলো সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট চার্চ। এটা বাংলার দ্বিতীয় প্রাচীন খ্রিষ্টান গির্জা। চেনা কয়েকটা জায়গায় বাইরেও লিটল ইউরোপে রয়েছে দেখার অনেক জায়গা। তা নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে।