লোকে অন্যদের কত জিনিসই না দেখায়! বিত্ত, চিত্ত, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, পান্ডিত্য, শক্তি, দুর্বলতা – হিসেব করতে বসলে পাহাড় হয়ে যাবে। কিন্তু এত দেখার মাঝেও অনেক কিছুই অদেখা রয়ে যায়। সেই অদেখার আপসোস নিয়ে আমরা জেগে ঘুমোই, ঘুমিয়ে জাগি। আবার ঘুম থেকে উঠে না পাওয়ার হিসেব করতে বসি। কিন্তু সবথেকে বেশি অদেখা থেকে যায় মানুষের ছোট ছোট দুঃখ, সুখ।

শহর যত তার বহর বাড়াচ্ছে ততই এসব চোখে পড়ছে কম। হয়তো ছোট বলেই তা তেমনভাবে চোখে পড়ে না। কিংবা আমরা বদলে ফেলেছি ছোট কিছু দেখার অভ্যাস। যে যতই হাসাহাসি করুক না কেন আমার তো মিটিং দেখতে আসা লোকজনের দলবেঁধে কালীঘাটের মন্দিরে যাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগে। চোখমুখ লক্ষ্য করেছেন? যেন খুশির বাণ ডেকেছে। এই সেদিন মেট্রোতে দেখছিলাম একটা শিশু মা’র হাত ছাড়িয়ে বারবার কামরার মাঝখানের রডটা ধরার চেষ্টা করছে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে মা তো তাকে ছাড়তে নারাজ। আমি হাত ধরে পুঁচকেটাকে রডটার কাছে নিয়ে গেলাম। প্রথমে আলতো করে রডটা ছুঁয়ে দেখলো সে, তারপর আঁকড়ে ধরলো ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে। হঠাৎই এক হাতে সেটা ধরে দ্রুত একটা পাক খেয়ে নিল। মা তো তটস্থ। কিন্তু সে তখন শান্ত হয়েছে। মুখে ফুটে উঠেছে স্বর্গীয় এক হাসি।

ক’দিন আগে লেক গার্ডেনস মোড়ে কথা হচ্ছিল প্রবীরেন্দ্র আর বেলা ধরের সঙ্গে। প্রবীরেন্দ্র বেশ কয়েক বছর ধরে চলৎশক্তিহীন। স্ত্রী বেলা তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। সে এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। নিজেরা কাউকে কিছু বলেন না, এগিয়ে এসে কেউ কিছু দিলে তা গ্রহণ করেন। বলাই বাহুল্য কোভিড এই দম্পতির জীবন যন্ত্রণা আরও বাড়িয়েছে। সেদিন দেখা হতেই বেলার মুখে একগাল হাসি। লক্ষ্য করলাম, রাস্তায় যেখানে তারা বসে আছেন তার পাশেই রাখা একটা হুইলচেয়ার। পরম মমতায় সেটার হাতলে হাত বোলাতে বোলাতে বেলা জানালেন, ‘পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা দিয়েছে। ওর চলাফেরায় ভারি সুবিধা হয়েছে এতে। আগে খুব কষ্ট হত, আমি আর পারছিলাম না’। সামান্য সহায়তা, একটু মনোযোগ, খানিকটা এগিয়ে দেওয়া, একটু এগিয়ে যাওয়া যে কত লোকের মুখে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বেলে দিতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন। পৃথিবীর সব আলো তখন ম্লান হয়ে যায়। অধঃপাতে গোল্লায় যাওয়া শহরকে তখন খুব সুন্দর দেখায়।