কেন্দ্রিকরণ থেকে ক্রমাগত আরও কেন্দ্রিকরণ। এর যেন শেষ নেই। গত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে এসে পড়ল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আর বিশ্বায়ন। আর্থিক সম্পদের হিসাবে যে যত নগণ্যই হই না কেন, সকলেই বাঁধা পড়লাম বিশ্বব্যাপী এক অদৃশ্য বাজারের আন্তর্জালে। জীবন-জীবিকা বা রুটি-রুজির সংস্থান, সবই যেন অদৃশ্য বাজিকরের হাতে পুতুল নাচের মতো বাঁধা। কেন্দ্রিকরণ যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া তা নয়। স্থানীয় মানুষের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভাষা, পোশাকপরিচ্ছদ, আচারব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি ভাবনাচিন্তাও একই শহরসভ্যতার ছাঁচে ঢালাই হয়ে চলেছে। পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে হাজারে হাজারে আদিবাসী জনজাতি, স্থানীয় ভাষা, খাদ্য, জীবিকা, পেশা, ধর্ম, উৎসব, পরব, সংস্কৃতি নিয়ে মানবসভ্যতার যাবতীয় বৈচিত্র্য। সেইসঙ্গে ভেঙে গেছে স্বনির্ভর স্থানীয় আর্থব্যবস্থা বা লোকাল ইকনমিগুলো। কেন্দ্রিকরণের নিয়মটাই যে তাই—সকলকে একই ছাঁচে ঢালাই করে একই সুতোয় গেঁথে আত্মসাৎ করা। তবেই না বাজার বাড়বে, অর্থনৈতিক চক্রটা ক্রমাগত ফুলেফেঁপে নিয়ে আসবে আরও বৃদ্ধি–-এই চক্রের আন্তর্জালেই ঘটতে থাকবে যাবতীয় আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, পুঁজি, ও বিনিয়োগ। স্বনির্ভর হয়ে স্থানীয় আর্থব্যবস্থাগুলো নিজস্ব পণ্য উৎপাদন, বিনিময়, আর কৃষ্টি, সংস্কৃতি নিয়ে এর বাইরে থাকলে তো চলবে না।
আত্মসাৎ করে বেড়ে ওঠাই কেন্দ্রিকরণ। টাকাপয়সা জমিয়ে বালিশ বিছানার নিচে রেখে নিশ্চিন্ত সুখে নিদ্রা দেবেন সে হতে দেওয়া যাবে না। এমনটা হলে আপনার ওই টাকা তো আর্থিক চক্রটার বাইরে চলে গেল। তা হবে না, সব টাকা ব্যাংকেই জমা পড়তে হবে—ডিমানিটাইজেশনের উদ্দেশ্যই ছিল সেটা। ডিজিটাল ইকনমি এই ব্যাপারটাকে আরও স্পষ্ট করেছে। আপনার আমার যাবতীয় আয়, ব্যয়, সঞ্চয়কে ডিজিটাল, মানে ব্যাংকের মারফৎ হতে হবে। আপনার আমার একক আয়, ব্যয়, সঞ্চয় যত নগণ্যই হোক, বিন্দু বিন্দু জলেই হয় যে সাগর। তাই যাবতীয় অর্থকে প্রতি মুহূর্তের জন্যেও ব্যাংকে, মানে আর্থিক চক্রের খাতাতে থেকে যেতে হবে আর তাকেই ব্যাংক থেকে নিয়ে প্রতিনিয়ত বিশ্বপুঁজিতে লগ্নি করে কর্পোরেট ব্যবসাবাণিজ্যের বৃদ্ধি ও মুনাফা আসবে।
মোড় ঘোরার সঙ্কট
পৃথিবী তো অসীম নয়। একমুখি কোনো প্রক্রিয়াই তাই চিরকাল চলতে পারে না। চূড়ান্ত পর্যায় এসে সে নানাভাবে নানাদিক থেকে সঙ্কটে পড়ে। একবিংশ শতাব্দীতে আমরা হয়ত কেন্দ্রিকরণ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ের এই সঙ্কটের দোরগোড়ায়। গত কয়েক দশক ধরে তারই ইঙ্গিত মিলছিল ক্রমাগত বেড়ে চলা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অর্থনৈতিক সঙ্কটে। এমন আশঙ্কাও কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন যে, মানুষেরই অবিমৃশ্যকারী কর্মকাণ্ডে এবার ষষ্ঠবার পৃথিবী থেকে জীবজগৎ বিলুপ্ত হতে চলেছে। এর আগের পাঁচবারের বিলুপ্তির কারণ ছিল নিতান্তই প্রাকৃতিক (রিচার্ড লীকি ও রজার লেউইন, ১৯৯৫, দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন)।

মানুষের কর্মকাণ্ডে শহরসভ্যতার অস্বাভাবিক স্ফীতির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। ক্রমাগত ধ্বংস হয়েছে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, আর প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগতের বৈচিত্র্য। এমনিতেই সারা বিশ্বে বিপুল জনসংখ্যা ও জনঘনত্বের অতিকায় শহরগুলোকে পরিষেবাসহ বাঁচিয়ে মানুষের বসবাসের যোগ্য করে রাখাই সমস্যা হয়ে উঠছে—পরিবেশ দূষণ আর জলসংকট বেড়েই চলেছে। তার ওপর গত শতাব্দী থেকে এতকাল অজানা একের পর এক ভাইরাস ও ড্রাগ রেজিস্টেন্ট ব্যাকটেরিয়ারা নতুন নতুন রূপে এসে বার বার সৃষ্টি করছে মহামারী থেকে অতিমারী, যার আঘাত পড়েছে মূলত শহরবাসীর ওপর। সম্প্রতি ২০২০ সালে বিশ্ব জুড়ে করোনা বা কোভিড-১৯ ভাইরাসের অতিমারী ও তার প্রতিরোধকল্পে দেশে দেশে যাবতীয় কর্মকাণ্ডের লকডাউন সৃষ্টি করেছে এক সার্বিক সঙ্কট, যা শহরবাসীর জীবনযাপনের প্রায় প্রতিটা দিককেই বিপর্যস্ত করেছে, নিয়ে এসেছে এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
এই অতিমারীর প্রকোপের কয়েকটা বিশেষত্ব লক্ষ করার মতো। এক, আবির্ভাব চীনের উহান অঞ্চলে হলেও রোগটা ছড়িয়েছে মূলত উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে ও সেখান থেকে অন্যান্য দেশে। দুই, রোগের বিস্তার দেখা গেছে মূলত শহরাঞ্চলে, গ্রামাঞ্চলে নয়। তিন, শহরাঞ্চলেও প্রকোপ দেখা গেছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের আবাসন বা বহুতল ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে। গরীব মানুষের ঘন বসতিতে রোগ ছড়ালেও প্রকোপ তেমন দেখা যায়নি। চার, ইউরোপ, আমেরিকার উচ্চ আয়ের দেশে এই রোগে মৃত্যুর হার নিম্ন আয়ের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। পাঁচ, মেদজনিত স্থূলত্ব, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ইত্যাদি নিয়ে শহুরে রোগগ্রস্তদের ক্ষেত্রেই করোনার প্রকোপ বেশি। ছয়, কোভিড-১৯ ভাইরাস ক্রমাগত নিজেকে পরিবর্তন করে রূপ বদলাচ্ছে। ভবিষ্যতে সে কী রূপ নেবে বা অন্য কোনও ভাইরাস যে আরেক অতিমারী আনবে না, তা বলা যাচ্ছে না।
এই বিশেষত্বগুলো থেকে এক কথায় বলা চলে, এ হল শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিশ্বায়নের রোগ—যেখানে উন্নয়ন সেখানেই এর প্রকোপ। এই রোগে সারা পৃথিবী জুড়ে মরছে ঠাণ্ডা ঘরে বসে কোক, পিৎজা, বার্গার, চিপস, ইত্যাদি ফাস্ট ফুড খাওয়া মেদবহুল শহুরে মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তরা। তারাই আসল হটস্পট, মাঠেঘাটে রোদেজলে খেটে খাওয়া গরিব মানুষেরা নয়। গরিব মানুষদের এই রোগ কবে হচ্ছে আর কবে আপনি সেরে যাচ্ছে তাদের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতার জোরে (ভিটামিন ডি-য়ের ভূমিকা হয়তো) তা আমরা জানিইনা, কারণ এরা তো শহরের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতাতেই নেই। অবশ্য উন্নত দেশের শহরাঞ্চলের গরীব মানুষদের মধ্যেও করোনার প্রকোপ দেখা গেছে। তার কারণ হয়তো এটাই যে এদের খেতে হয় মূলত বরফে জমানো আর খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের প্রক্রিয়াজাত বাক্সবন্দী খাদ্য, যেমন ম্যাকডোনাল্ডস ইত্যাদি। রাসায়নিকহীন টাটকা শাক-সব্জি ইত্যাদি এদের কল্পনার অতীত।

মানবসভ্যতাকে আপাতত করোনা নিয়েই বাঁচতে হবে। তাই স্বাস্থ্যবিধি হল, মাস্ক পরে, স্যানিটাইজার ব্যবহার করে, বারে বারে সাবান জলে হাত ধুয়ে, আর “সামাজিক দূরত্ব” বজায় রেখে চলা। তা সত্ত্বেও করোনাকে যে আটকানো যাবে সেটা নিশ্চিত নয়। তাই মাঝে মাঝেই শহরের এলাকায় বা কাজকর্মের ক্ষেত্রে লকডাউন হবে, যেমন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ করতে চলেছে করোনা অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায়। সব মিলে এটা স্পষ্ট যে শহরকেন্দ্রিক আর্থব্যবস্থা ক্রমাগত স্ফীত হয়ে এতকাল যে আর্থিক বৃদ্ধি এনেছে তা আর আগামী দিনে “সামাজিক দূরত্ব” ও লকডাউন নিয়ে সম্ভব হবে না।
এবার শহরসভ্যতার স্ফীতি ও মেদ ঝরার পালা। করোনা অতিমারীর প্রকোপ খানিকটা কমলেও আর্থব্যবস্থা আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। শিল্পোৎপাদন, নানাবিধ পরিষেবা, পরিকাঠামো নির্মাণ, আর্থিক পণ্যের লেনদেন, ও সেসব নিয়ে শহরবাজারের ব্যবসাবাণিজ্য, সবেতেই মন্দা ও ফলে কর্মসংস্থান প্রায় তলানিতে। একমাত্র ভরসা কৃষিক্ষেত্র। লকডাউনের ঠেলায় শহরের অসংগঠিত ক্ষেত্রের জীবিকা কর্মীরা (পরিযায়ী শ্রমিক?) অনেকেই যে যার গ্রামে ফিরে গেছেন। অবস্থা খানিকটা ঠিক হলে কেউ কেউ হয়ত ফিরে আসবেন শহরে জীবিকার খোঁজে। কিন্তু শহরে কি আর সেই আগের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? গ্রামকেই বাড়তি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন এক অন্য আর্থব্যবস্থার বিকাশ, যা গড়ে উঠবে বিকেন্দ্রিক স্থানীয়করণের পথে কৃষিকেই মূল ভিত্তি করে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসে মূল ভূমিকায় দেখা যায় ঘটনাচক্রে কোনও বিশেষ ঘটনা বা অবস্থার সৃষ্টি (চান্স ফ্যাক্টর) ও সেই থেকে তৈরি হওয়া সুদূরপ্রসারী প্রয়োজনসমূহ (নেসেসিটি ফ্যাক্টর), যা থেকে শুরু হয় নতুন পথে চলা। করোনা অতিমারী সম্ভবত এমনই এক চান্স ফ্যাক্টর, যা থেকে তৈরি হয়েছে অন্য পথে চলার প্রয়োজন (নেসেসিটি ফ্যাক্টর)। এর অর্থনীতির সন্ধান অবশ্য আধুনিক অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বকথায় মিলবে না।
লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক