| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফিরে দেখা—অন্য অর্থনীতির সন্ধানে (তৃতীয় কিস্তি) : সুতনু ভট্টাচার্য

Reporter
সুতনু ভট্টাচার্য / ১০২০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২০

অন্য পথের ভাবনা

মানবসভ্যতার বিকাশ, নির্মাণ, অগ্রগতি, যাই বলি না কেন, সবের পিছনে আছে উদ্বৃত্ত উৎপাদন। এই উদ্বৃত্ত উৎপাদন আসে কৃষি থেকে। গত চারশ বছরের কেন্দ্রিকরণের অর্থনীতির ফলে একদিকে গ্রামকে ক্রমাগত উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করে শহরে চালান দিতে হয়েছে আর অন্যদিকে স্থানীয় আর্থব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে গ্রাম থেকে ক্রমাগত মানুষকে জীবিকার খোঁজে আসতে হয়েছে শহরে। একেই আত্মসাৎ করে শহরের শিল্পবাণিজ্য ও যাবতীয় কর্মকাণ্ড ক্রমশ ফুলেফেঁপে উঠেছে। এই সহজ সত্য আধুনিক অর্থশাস্ত্রের চোখে দেখলে ধরা পড়বে না। তাই আমাদের ফিরে দেখতে হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসী অর্থনীতিবিদদের (ফিজিওক্র্যাট) চোখে।

এঁদের মূল কথা হল, শিল্পপণ্য, পরিষেবা ইত্যাদির উৎপাদন ও ব্যবসাবাণিজ্য আদৌ কোনও উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করে না। প্রকৃত অর্থে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয় একমাত্র কৃষিক্ষেত্রে। শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা শুধু কম মূল্যে কিনে (অথবা বেশি মূল্যে বিক্রি করে, বা দুই-ই) মুনাফা লাভ করে, যা এক একটি স্তরের অর্থনৈতিক নির্মাণ মাত্র। ফ্রান্সিস কেনে তাঁর বিখ্যাত সার্কিট সারণিতে (১৭৫৮) এটাই দেখিয়েছিলেন যে শিল্পপণ্য, পরিষেবা ইত্যাদির উৎপাদন ও ব্যবসাবাণিজ্যের এক একটি স্তরে মুনাফা লাভ দেখা গেলেও সার্বিকভাবে সমগ্র ব্যবস্থায় কোনও উদ্বৃত্ত বা লাভ থাকে না কারণ, এই বিনিময়ে যে ব্যক্তি কম মূল্যে বিক্রি করেছে (অথবা বেশি মূল্যে কিনেছে) তার ঠিক সমপরিমাণ লোকসান হয়। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রের উদ্বৃত্ত কোনও অর্থনৈতিক নির্মাণ নয়, তার উৎপাদন হয় প্রকৃতির নিয়মে (ওয়ে অভ নেচার)। তাই উচিত হল, প্রকৃতির নিয়মগুলি বুঝে কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের অর্থনৈতিক নির্মাণের (ওয়ে অভ ম্যান) চলা। স্বভাবতই, কলকারখানার শিল্পোৎপাদন ও তাকে ঘিরে ব্যবসাবাণিজ্যের বৃদ্ধি ও শহুরে আধুনিকতার বিকাশে মুগ্ধ ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদদরা এই ভাবনাকে কোনও আমলই দিতে চাননি। গত দেড়শ বছর ধরে শহুরে আধুনিকতার প্রতি মুগ্ধতার খেসারৎ আমরা দিয়ে চলেছি প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করে এক বিষাক্ত পৃথিবীর জন্ম দিয়ে।

করোনা-আক্রান্ত শহরসভ্যতা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। কৃষিকেই মূল ভিত্তি করে এক অন্য আর্থব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিলেও তা সহসা গড়ে উঠবে না। হঠাৎ একদিনে চারশ বছর ধরে গড়ে ওঠা আর্থব্যবস্থা ভেঙে পড়ে না, তার বিকল্পও গড়ে ওঠে না। তাহলেও, পুরনোর ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই নতুনের সৃষ্টি, আবার নতুনের সৃষ্টি বিনা পুরনোর ধ্বংসও হয় না। তাই অতি ক্ষুদ্র প্রয়াস হলেও আজকের প্রয়োজন অন্য অর্থনীতির সন্ধান ও বিকল্প আর্থব্যবস্থা নির্মাণের বীজ বপনের পথে চলা শুরু করা।

এই অন্য অর্থনীতির পথ কেন্দ্রিকরণ নয় বিকেন্দ্রিকরণ, বিশ্বায়ন নয় স্থানীয়করণ। অদৃশ্য বাজারশৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়া ‘বাজারের জন্য উৎপাদন’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় প্রয়োজনের পণ্য উৎপাদন, বিনিময়, ও নিজেদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কৃষ্টি, সংস্কৃতি নিয়ে স্থানীয় আর্থব্যবস্থাগুলোর গড়ে ওঠা এবং প্রয়োজন অনুসারে তাদের পারস্পরিক বিনিময় মিলিতভাবে জন্ম দেবে এক বিকল্প আর্থব্যবস্থার।

হয়তো এ অনেক দূর ভবিষ্যতের কল্পনা। তাহলেও প্রশ্ন জাগে, এক একটি স্থানীয় আর্থব্যবস্থার ভৌগোলিক পরিধি কীভাবে ঠিক হবে। এতকাল ইউরোপীয় “নেশন স্টেট”-য়ের ধারণা থেকে আমরা যাবতীয় বৈচিত্র্যকে দুরমুশ করে গড়তে চেয়েছি এক রাষ্ট্র, এক জাতি, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি (এক ধর্ম?)। রাজনীতির প্রয়োজনে রাজনৈতিক সীমানা নির্দিষ্ট করতে আমরা গণ্ডী টেনেছি রাষ্ট্রের, প্রদেশের, জেলার, মহকুমার, ব্লকের, পঞ্চায়েতের, গ্রামের। আর সে নিয়ে কাটাছেঁড়া ও জোড়া দেওয়া করেই চলেছি। এ ভাবে নয়, এক একটি গ্রামের মিলিত উদ্যোগ থেকে শুরু করে স্থানীয় আর্থব্যবস্থার পরিধি স্বাভাবিক ভাবেই নির্ধারিত হয়ে যাবে প্রাকৃতিক ও স্থানীয় জনজাতির বৈশিষ্ট্য অনুসারে, যার কিছুটা প্রতিফলন হয়ত আজও মেলে জেলাগুলির ঐতিহাসিক বা নৃতাত্ত্বিক চিহ্নিতকরণে।

বিকল্প আর্থব্যবস্থার এই কল্পনায় অতিকায় শহর, যাবতীয় সম্পদ শোষণ করে যা কেবলই স্ফীত হয়, তার কোনও স্থান নেই, আছে আঞ্চলিক আর্থব্যবস্থাগুলোর সংযোগস্থলে যোগাযোগ, পণ্য বিনিময়, ও কারিগরি পণ্যের প্রয়োজনে ছোট ছোট গঞ্জ শহর। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বলতে যোগাযোগ, সেচ, জল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের পরিকাঠামো নির্মাণ, এবং আইন-শৃঙ্খলা, উচ্চতর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা ইত্যাদি পরিষেবার কথা ভাবা যেতে পারে। এই ব্যবস্থায় না থাকবে কর্পোরেট সংস্থা ও তার মালিক-শ্রমিক, না থাকবে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি; থাকবে উৎপাদক, কারিগর, পেশাদার, পরিষেবা কর্মী, ও নিজস্ব পুঁজির ব্যবসায়ীরা। এসবই কিছু আন্দাজ মাত্র। সুদূরপ্রসারী এই কল্পনাকে আরও বেশিদূর বয়ে নিয়ে যাওয়া নিরর্থক, কারণ ভবিষ্যতের পথ ভবিষ্যৎই গড়ে নেয়। পরিকল্পনা করে তা গড়া যায় না। তাহলেও প্রশ্ন জাগে, কোন পথে শুরু হতে পারে আজকের সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প আর্থব্যবস্থার বীজ বপন।

কৃষিকর্মের অভিমুখ

বর্তমান শহরকেন্দ্রিক সঙ্কটে একমাত্র ভরসা কৃষিক্ষেত্র। শহরে আর সেই আগের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, গ্রামকেই বাড়তি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু তা আসবে কীভাবে? এতকালের কেন্দ্রিকরণে গ্রামীণ অর্থনীতির “পুল-পুশ ফ্যাক্টর” যে উল্টোটাই ঘটিয়ে এসেছে। শহরের চাকচিক্য ও বাড়তি রোজগারের সম্ভাবনা গ্রাম থেকে মানুষকে টেনে এনেছে শহরে শ্রমিক করে (পুল ফ্যাক্টর)। আবার কৃষিকাজে নতুন নতুন প্রকৌশল (টেকনোলজি) ও যন্ত্রের ব্যবহার, বিশেষত বড় জোতের খামারে, ক্রমাগত কর্মসংস্থান কমিয়ে জীবিকার খোঁজে মানুষকে ঠেলে দিয়েছে শহরে (পুশ ফ্যাক্টর)। একটা ফ্যাক্টর জন্ম দিয়েছে আরেকটার, সৃষ্টি হয়েছে এক দুষ্টচক্রের। মজার কথা হল এই করেই কিন্তু শহর আরও বেড়ে ওঠে। গ্রাম থেকে মানুষ শহরে চলে এলে গ্রামের উৎপাদিত খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়, যা চলে আসে শহরে।  এদিকে গ্রামে থাকলে যে চাল হয়তো ২৫ টাকা কিলো দরে মিলত, গ্রাম থেকে আসা জীবিকা কর্মীকে সেই চালই কিনতে হয় শহরে এসে ৩৫ টাকায়। এই বাড়তিটা হল শহরবাজারের মাশুল, যা শুষে নিয়ে ফুলে ওঠে শহর।

বড়, মাঝারি ও ছোটখাট জোতের কৃষিকাজ আজ পুরোপুরি শহরের বাজার-নির্ভর। বাজারে ফসল বিক্রি করে টাকা আয় করাই এর লক্ষ্য। যতদূর সম্ভব কম খরচে বেশি উৎপাদন করো—বাজারের এই নিয়মেই আসে নানাবিধ প্রকৌশলের উচ্চফলনশীল প্রজাতির বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, নলকূপ সেচের জল, আর ট্র্যাক্টর ইত্যাদি যন্ত্রের ব্যবহার। এ পথে তো কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়েনা। এদিকে সাধারণ চাষি পড়ে যায় বাজারের টাকার চক্রে। বাজার থেকে টাকা ঋণ নিয়ে বছর বছর চাষের এতসব উপকরণ কেনা, আর ফসল ফলিয়ে আবার সেই বাজারেই বিক্রি করে টাকা আয় করা—আশা এই যে ধারদেনা মিটিয়ে খেয়েপরে বাঁচার মতো কিছু টাকা রোজগার হবে। বাজারের এই টাকার চক্রে প্রতি বছর দেশে হাজারে হাজারে চাষি সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যা করে, ফসলের উপযুক্ত দাম না পেয়ে, ঋণ মেটাতে না পেরে। উপায় নেই তাই চাষিরা বাঁধা পড়ে আছে কৃষিকাজে। সরকারও তাঁদের এই পথেই থাকার আশা যোগায় নানাবিধ কৃষিঋণ, শস্যবীমা, ফসলের সরকারি সহায়ক মূল্য, ও কখনো হয়তোবা ঋণ মকুব প্রকল্প করে। কিন্তু কথায় যে আছে, আশায় মরে চাষা। অগত্যা অনেকেই বাধ্য হচ্ছে বড় বড় কোম্পানির চুক্তিচাষে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কোম্পানির চুক্তিচাষ থেকেই মূলত শহরের বাজারের জন্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও চালান আসবে। বেশি দামের এই খাদ্যপণ্য উৎপাদন কিন্তু গ্রামের জন্য নয়। ভবিষ্যতে এর এক ভয়ানক পরিণতি হতে পারে—গ্রামেই খাদ্যপণ্যের অভাবজনিত দুর্ভিক্ষ।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের সমস্যা আরেক রকম। বাজার থেকে টাকা দিয়ে চাষের উপকরণ কেনার মতো টাকা অনেকেরই থাকে না। আবার, সে হলেও জমি ছোট বলে বাজারে ফসল বিক্রি করে তেমন আয়ের সম্ভাবনাও থাকে না। এদের অনেকেই তাই বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে অবস্থাপন্ন চাষির কাছে জমি বেচে বা ইজারা দিয়ে (আসলে বন্ধক) পরিণত হয় খেতমজুর বা শহরের দিনমজুরে। তাহলেও, একান্ত বাধ্য না হলে, এরা চেষ্টা করেন যা হোক ২-৪ বিঘা জমি পারিবারিক শ্রমে চাষের জন্য ধরে রেখে বছরের খাওয়ার চাল, মুড়ি, আলু উৎপাদন করে নিতে । এই ধরনের পারিবারিক চাষে ফসল বিক্রির জন্য বাজার-নির্ভরতা না থাকলেও কিন্তু বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদি কেনার জন্য টাকার দরকার ও বাজার-নির্ভরতা থেকেই যায়। আজকাল বাজারের চাষের বীজ, যা কোম্পানি বিক্রি করে, এমনই যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদি ছাড়া ফলন পাওয়াই দুষ্কর।

সম্প্রতি চল হয়েছে রাসায়নিক বা বিষমুক্ত জৈব চাষের। সে আরেক বিপদ। শহরের বাজারে জৈব খাদ্যপণ্য বেশ চড়া দামে বিকোয়। তাই দেখা যায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জৈব চাষে সংগঠিত করছেন বেশ কিছু সংগঠক সংস্থা। এই সংগঠকরা নানান জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে জৈব চাষের শংসাপত্র এনে অনুমোদিত চাষ পদ্ধতি বলে দেন ও সেই কাজে তাদের সংগঠনে চাষিদের নথিভুক্ত করান। এক একটা সংগঠনে হাজার খানেক চাষিকেও নথিভুক্ত হতে দেখা যায়। গ্রামে বিক্রি নয়, শংসাপত্রসহ উৎপাদিত পণ্য সংগঠকরা চড়া দামে বিক্রি করেন শহরের বাজারে ও তার থেকে চাষিদের টাকা দিয়ে থাকেন। শহরের বাজারের জন্য এ হল আরেকভাবে চুক্তিচাষ। এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা জৈব চাষের সংগঠনে এসে নিজের জমিতে নিজেই আসলে খেতমজুর হয়ে পড়েন। তথাকথিত এই জৈব চাষ পদ্ধতিগতভাবে প্রায় একই, শুধু রাসায়নিকের বদলে জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যার বেচাকেনার বাজারও তৈরি হয়ে আছে।

কেন্দ্রিকরণের বিপরীত প্রক্রিয়ায় স্থানীয়করণের পথে স্থানীয় আর্থব্যবস্থার মূল কথাটাই হল অদৃশ্য বাজারশৃঙ্খলের আন্তর্জাল থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় প্রয়োজনে স্বনির্ভর পণ্য উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে পণ্য বিনিময়। বড় বা মাঝারি চাষি বা তথাকথিত জৈব চাষের সংগঠন এ পথে আসবে না, কারণ তাদের অস্তিত্বই হল ‘বাজারের জন্য উৎপাদন’। গ্রামে গ্রামে ছোট জমির ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা, যাঁরা পারিবারিক শ্রমে যতটা সম্ভব নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করে থাকেন, তাঁদের মিলিত সামাজিক উদ্যোগে, স্থানীয় কারিগরদের নিয়ে এ পথে চলা শুরু হতে পারে। এই মিলিত উদ্যোগই স্থির করবে, বাজারে বিক্রি নয়, নিজেদের প্রয়োজনে কে কোন ফসল বা পণ্য কতটা করবে ও কীভাবে বিনিময় করে নেবে।

স্থানীয় আর্থব্যবস্থার এক বিশেষ দিক হল নিজেদের প্রয়োজনের পণ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা। উৎপাদনের উপকরণ (যেমন বীজ, সার ইত্যাদি) পেতে বাজারের দ্বারস্থ হতে হলে সেই একই সমস্যা এসে পড়ে। সে সব কিনতে হাতে টাকা (বাজারের প্রচলিত মুদ্রা) নিয়ে যেতে হয়। সুতরাং, ওই বাজারেই কিছু না কিছু বিক্রি করে সেই টাকা রোজগার করতে হয়। ঘুরে ফিরে সেই বাজারের কেনাবেচার যাঁতাকলে পড়ে যেতে হয়। স্বনির্ভরতা নয়, এসে পড়ে বাজার-নির্ভরতা। স্বনির্ভরতার পথ হল, বাজার থেকে কিনতেই হবে এমন পণ্যের প্রয়োজনীয়তা পরিহার করে চলা। স্থানীয় আর্থব্যবস্থায় ফসল চাষের এই স্বনির্ভর পথ হল কোনও সার, কীটনাশক ও জমি কর্ষণ ছাড়াই শ্রমনিবিড় প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতি (ফুকোওয়াকা) ও তার জন্য অতি অবশ্যই স্থানীয় প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ।

স্থানীয় আর্থব্যবস্থার উৎপাদকরা নিজেদের মধ্যে পণ্য বিনিময় করবে। আবার একটি স্থানীয় আর্থব্যবস্থা তার উদ্বৃত্ত উৎপাদন বিনিময় করতে পারে অন্য একটি স্থানীয় আর্থব্যবস্থার সাথে। প্রশ্ন হল, এই বিনিময় হবে কী হিসাবে বা কীভাবে। বাজারের প্রচলিত মুদ্রা বা টাকা দিয়ে তো এই কাজ হবে না, কারণ এই মুদ্রা দিয়ে বেচাকেনা মানে সেই বাজারের সাথেই যুক্ত হয়ে পড়া। নিজেদের মধ্যে বিনিময়ের সুবিধার জন্য স্থানীয় আর্থব্যবস্থাকে তার নিজস্ব কোনও বিনিময় মাধ্যম বা “কমিউনিটি মানি” বা হিসাব রাখার ব্যবস্থা করে নিতে হবে।

শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিশ্বায়িত বাজারশৃঙ্খল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে স্থানীয় প্রয়োজনে উৎপাদন, বিনিময় ও বিনিময় মাধ্যমের ব্যবহার কোনও সুদূরপ্রসারী কল্পনা নয়। ইতোমধ্যেই কিছু দেশের কোথাও কোথাও লোকাল প্রোডাকশন, লোকাল এক্সচেঞ্জ ট্রেডিং সিস্টেম, ও কমিউনিটি মানির আবির্ভাব ঘটেছে। চারশ বছরের কেন্দ্রিকরণে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ানো মানবসভ্যতাকে হয়ত আবার এই পথেই যেতে হবে। এ কোনও নতুন পথ নয়। এটাই ছিল সভ্যতার আদিকাল থেকে আর্থব্যবস্থার যাত্রা শুরুর পথ।

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev