পথ চলতে চলতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়ানো — সামনে কী আছে ভাবা ও ফিরে দেখা, এ পথে কেন এলাম, অন্য পথ কি আর নেই। করোনা বা কোভিড-১৯ অতিমারীর এই ২০২০ সালটা যেন এমনই। এই অতিমারী বিদ্যুৎ গতিতে সারা বিশ্বের শহরগুলোতে ছড়িয়েছে আর একে প্রতিরোধ করতে দেশে দেশে দীর্ঘকাল যাবতীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা বা লকডাউনের ফলে হোঁচট খেয়েছে জাতীয় আর্থব্যবস্থা। এতকালের মন্ত্র, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা “গ্রোথ” কোথায়, এখন তো চলছে সংকোচন! সারা বিশ্বে কৃষি ছাড়া সবক্ষেত্রেই উৎপাদন কমেছে, আয় কমেছে, রুটিরুজি হারিয়েছেন শহরাঞ্চলের জীবিকা-নির্ভর অসংখ্য মানুষ। সমস্যা শুধু দিন-আনি-দিন-খাই মানুষের নয়, অকূলপাথারে পড়েছেন মাস-আনি-মাস-খাই মানুষেরাই আরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ অবস্থাই আপাতত চলবে। আগামী দু-এক বছরে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির কোনও সম্ভাবনা নেই। অর্থনৈতিক সংকোচন একবার শুরু হলে আর্থিক ঘূর্ণাবর্তে আরও সংকোচন আসে। এদিকে করোনা অতিমারী রোধেরও কোনও পথ পাওয়া যায়নি। এ রোগের চিকিৎসা কী আজও জানা যায়নি, প্রতিষেধকও (ভ্যাকসিন) পাওয়া যায়নি। আর সে পেলেই বা কী। আগামী দিনে “করোনা” যে রূপ বদল করে “মরোনা” হয়ে দেখা দেবেনা তার কী নিশ্চয়তা আছে? এই পথে এতকালের মানবসভ্যতাটাই কি তাহলে ধ্বংসের দিকে? এসব প্রশ্ন এসেই পড়ে। তাই অন্য অর্থনীতির সন্ধানে ফিরে দেখতে হয় — বেঁচে থাকার আর অন্য কোনও পথ কি নেই?
ফিরে দেখা—কেন্দ্রিকরণের অর্থনীতি
সময়টা ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ধরলে মোটামুটি চারশ বছর। এই চারশ বছরে গড়ে উঠেছে আমাদের আজকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সারা পৃথিবী জুড়ে এর একটাই রূপ আর তার পেছনে একটাই প্রক্রিয়া — কেন্দ্রিকরণ। শুরুটা হয়েছিল ইউরোপে পুঁজির কেন্দ্রিকরণ দিয়ে — অনেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে টেনে নিয়ে মূলধন বা পুঁজিতে রূপান্তরিত করে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির বড় হওয়া আর সে যুগের রাষ্ট্র বা দেশিয় রাজতন্ত্রের সহায়তায় ঔপনিবেশিক ব্যবসা বাণিজ্যে ফুলেফেঁপে ওঠা, যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এমনটাই দেখা গিয়েছিল মূলত ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্র উপকূলবর্তী ও সমুদ্র অভিযানে পারদর্শী স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, বৃটেন, ও হল্যান্ড (আজকের নেদারল্যান্ডস), এই পাঁচটা দেশে। পঞ্চদশ শতাব্দীর (১৪০০—) শেষভাগ থেকে একের পর এক সমুদ্র অভিযানে নতুন নতুন উপনিবেশ স্থাপন ও সমুদ্র পথে ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের এরাই ছিল পথিকৃৎ। এই পথে হঠাৎ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের এক অসীম সুযোগ এসে পড়লেও সে যুগে দরিদ্র এই দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের কারোই নিজের এত পুঁজি ছিল না যে একক বা যৌথ উদ্যোগে এই সুযোগ নিতে পারে। ফলে এল অন্য অনেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কেও পুঁজিতে কেন্দ্রীভূত করার ব্যবস্থা — মূ্লধনের অংশীদারিত্ব হিসাবে শেয়ার, শেয়ার কেনাবেচা ও শেয়ারের দাম নিয়ে ফাটকা খেলার শেয়ারবাজার (স্টক এক্সচেঞ্জ), ও মুনাফার লভ্যাংশ হিসাবে শেয়ার প্রতি ডিভিডেন্ড দেওয়া।

১৫০০ শতকের লন্ডন
সমুদ্র অভিযানে খুঁজে খুঁজে সম্পদ-সমৃদ্ধ দেশে উপনিবেশ স্থাপনের আগ্রাসী বাসনা আর সেই কাজে অনেকের সঞ্চয় নিয়ে বৃহৎ পুঁজির কোম্পানি গঠন করা — ইউরোপের ওই পাঁচটি দেশে দারিদ্র থেকেই জন্ম নিল সমৃদ্ধি সন্ধানের এই আগ্রাসী পথ, সুচনা হল ইতিহাসের এক বিশেষ যুগের। সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসে এক একটা যুগের উদ্ভবের পেছনে মূল ভূমিকায় দেখা যায় ঘটনাচক্রে কোনও বিশেষ ঘটনা বা অবস্থার সৃষ্টি (চান্স ফ্যাক্টর) ও সেই থেকে তৈরি হওয়া সুদূরপ্রসারী প্রয়োজনসমূহ (নেসেসিটি ফ্যাক্টর)। ইউরোপের এই বিশেষ যুগের সূচনায় চান্স ফ্যাক্টর হল ১৪৫৩ সালে ওসমানী তুর্কী (অটোমান টুর্ক) আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যে কনস্টান্টিনপল শহরের পতন ও প্রাচ্য থেকে পণ্য আমদানির রেশম পথ (সিল্ক রুট) অবরুদ্ধ হওয়া। এর ফলে শুকিয়ে যেতে থাকে ইতালির বাণিজ্য নগরীগুলো, যার মারফৎ আমদানি হতো প্রাচ্যের উৎকৃষ্ট পণ্য ও যা নিয়ে ইউরোপের ব্যবসাবাণিজ্য ও রাজতন্ত্রের ভোগবিলাস চলত, কারণ সেই যুগে দরিদ্র ইউরোপের নিজস্ব কোনও উৎকৃষ্ট পণ্য বা ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য উদ্বৃত্ত উৎপাদন তেমন কিছুই প্রায় ছিল না। স্বভাবতই ইউরোপের ব্যবসায়ীকুল ও রাজা-রাজড়াদের প্রয়োজন হয়ে উঠল (নেসেসিটি ফ্যাক্টর) প্রাচ্য থেকে পণ্য নিয়ে আসার অন্য কোনও পথ খুঁজে বের করা। এর সাথে যুক্ত হল আরেকটা চান্স ফ্যাক্টর। অতীতে (৮০০-১১০০) বারে বারেই ইউরোপের উত্তর থেকে এসে সমুদ্র অভিযানে পারদর্শী নর্সম্যানরা লুঠতরাজ চালাত ইউরোপের পশ্চিম উপকূলে। জলদস্যুতা বা ভাইকিং ছিল এদের মূল কাজ। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এরা পশ্চিম উপকূলের দেশগুলোতে থিতু হয়ে বসবাস শুরু করে। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই ইউরোপের পশ্চিম উপকূলের ওই পাঁচটা দেশের সমুদ্রপথে আগ্রাসনের বিশেষ পারদর্শীতা ছিল। রাজতন্ত্রের ভোগবিলাস, ভাইকিংদের সমুদ্র অভিযান ও লুঠতরাজ, আর ব্যবসায়ীদের পুঁজি বিনিয়োগে মুনাফার বাসনা, এই ত্র্যহস্পর্শে ঘটল ইউরোপীয় কোম্পানি যুগের কেন্দ্রিকরণের সূচনা।
মোটামুটিভাবে ষোড়শ (১৫০০—) থেকে অষ্টাদশ (১৭০০—) শতাব্দী হল স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, বৃটেন, ও হল্যান্ড, এই পাঁচটা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ (গোল্ডেন এজ), যদিও তা কালিমালিপ্ত উপনিবেশগুলোতে (সুসভ্য?) ইউরোপীয়দের অকল্পনীয় বর্বরতা, অকথ্য অত্যাচার, শোষণের ইতিহাসে। আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় মধ্যে কোম্পানিগুলোর মূল ব্যবসা চলত ঔপনিবেশিক বাণিজ্য ত্রিভুজে (ট্রায়াংগুলার ট্রেড) দাস চালান, দাস কেনাবেচা, আর দাস নিয়োগ করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য আর শিল্পজাত পণ্যের কেনাবেচা নিয়ে। কোম্পানির ব্যবসা বিস্তারে স্বভাবতই এল পণ্য উৎপাদন ও কেনাবেচার বাজারের কেন্দ্রিকরণ। ঔপনিবেশিক ব্যবসা-বাণিজ্যের এই পরিকাঠামোকে ভিত্তি করেই ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, ১৮৩০ নাগাদ, ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লব জন্ম দিল কোম্পানির মালিকানায় বাজারের জন্য শিল্পপণ্য উৎপাদনের আধুনিক কলকারখানা (মডার্ণ ইন্ডাস্ট্রি)। পুঁজির কেন্দ্রিকরণ থেকেই সৃষ্টি হল যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রিকরণ। উপনিবেশগুলোতে স্থানীয় আর্থব্যবস্থার পণ্য উৎপাদন ও বিনিময় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গড়ে উঠল কোম্পানির উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা।

এই জাহাজ নিয়ে ডাচেরা বাংলা থেকে পণ্য কিনতে আসত ১৬৩০এর পরে
কেন্দ্রিকরণের পথ চলায় এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ একে একে এসে পড়ল লিমিটেড লায়াবিলিটির কর্পোরেট ব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্যের পণ্য পরিবহণে রেলওয়ে ব্যবস্থা, বিস্তৃত শৃঙ্খলে বাঁধা কেন্দ্রীভূত বাজারব্যবস্থার শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার আধুনিকতা, আর সর্বোপরি গড়ে উঠল সবকিছুর দেখভালের জন্য এক একটা দেশ জুড়ে একই আইনকানুন জারি রাখার সাংবিধানিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যার ইউরোপীয় নাম হল ‘নেশন স্টেট’। সবই যেন একই সূত্রে গাঁথা — কেন্দ্রিকরণ। এরপরের দেড়শ বছরে আরও কেন্দ্রিকরণের পথে বিশ্ব জুড়ে এই ব্যবস্থারই বিস্তার ঘটল, দেশে দেশে মূল মন্ত্র হিসাবে স্থাপিত হল শহরসভ্যতার শিল্পায়ন-উন্নয়নের পথে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যের বাজারের ক্রমাগত বিস্তৃতি ঘটিয়ে রাষ্ট্রের জাতীয় আয় বৃদ্ধি করে চলা।
এই মন্ত্রকেই তত্ত্বায়নে স্থাপনা দিতে জন্ম আধুনিক অর্থশাস্ত্রের। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে স্মিথ, ম্যালথাস, রিকার্ডো, মার্ক্সের ধ্রুপদী (ক্লাসিকাল) ধারার তত্ত্বালোচনার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে এল মার্শাল, মেঞ্জার, জিভন্স, ওয়ালরাস ইত্যাদির নব্য ধ্রুপদী ধারা (নিও-ক্লাসিকাল), ও তারপর ১৯৩০ দশকের অর্থনৈতিক সঙ্কটে কেইনসের তত্ত্বালোচনা থেকে জন্ম হল কেইনসীয় ধারা। সকলেরই মূল ভাবনাধারা একই— “গ্রোথ”, বা শহরসভ্যতার শিল্পায়ন-উন্নয়নে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্রমাগত বিস্তৃত ঘটিয়ে রাষ্ট্রের জাতীয় আয় বৃদ্ধি করে চলা।
অথচ এর বিপরীতে সুগঠিত গবেষণায় অন্য অর্থনৈতিক ভাবনা যে ছিল না তা নয়। কিন্তু তা হারিয়ে গেল আধুনিক অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বালোচনার স্রোতে। এই অন্য ভাবনা ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ফরাসী অর্থনীতিবিদদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখায়, যার দেখা মেলে সেযুগের অর্থনীতি গবেষণার বিভিন্ন পত্রিকায়। দুর্ভাগ্য হল, ব্যবসাবাণিজ্যের বাজার ও কলকারখানা ঘিরে আধুনিক শিল্পসভ্যতার বিকাশের চমৎকারিত্বে আচ্ছন্ন পরবর্তীকালের ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় একে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হল না। উল্টে এই ফরাসী অর্থনীতিবিদদের আর অর্থনীতিবিদ নয়, অভিহিত করা হল ফিজিওক্র্যাট নামে, যাঁরা অর্থনীতি নয়, প্রকৃতির নিয়মনীতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন। ফলে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ভাবনাধারার ইতিহাসের আলোচনায় এই অন্য অর্থনীতির উল্লেখই মেলে না, বড়জোর ফিজিওক্র্যাট সম্বন্ধে একটা পাদটীকা ছাড়া। এ প্রসঙ্গে আমরা পরে আসছি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির পরের দেড়শ বছরে ক্রমাগত কেন্দ্রিকরণে শহরসভ্যতা কেবলই বেড়ে উঠেছে। মূলত বাজার ব্যবস্থার পণ্য কেনাবেচা, পণ্য পরিবহন, ও আর্থিক লেনদেন আর তার প্রয়োজনে ক্রমাগত নগর নির্মাণ ও পরিষেবা বৃদ্ধি, এই হল শহরের কর্মকাণ্ড। নির্মাণ ও পরিষেবা শিল্প ছাড়া প্রকৃত অর্থে শহর তেমন কিছুই উৎপাদন করে না, শুধু কেনাবেচা করে। অথচ মানুষের ভিড়ে আর অর্থের স্রোতে ফুলেফেঁপে ওঠা এই শহুরে কর্মকাণ্ডেই জীবিকার দায়ে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ (৫০ শতাংশের বেশি) আজ শহরবাসী, যা হাজার হাজার বছরের মানবসভ্যতার ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। শহরবাসীর খাদ্যের যোগান স্বভাবতই আসে গ্রামাঞ্চল বা কৃষিক্ষেত্র থেকে। অতএব, অর্থনৈতিক সত্য হল, মানুষের মূল প্রয়োজনে উদ্বৃত্ত উৎপাদন করে গ্রাম বা কৃষিক্ষেত্র আর বাজারব্যবস্থার কেন্দ্রিকরণে তাকে আত্মসাৎ করে ফুলেফেঁপে ওঠে শহরসভ্যতার শিল্পোৎপাদন, পরিষেবা, ও নির্মাণ শিল্প। অধিকাংশ মানুষ আজ যে শহরবাসী, এটা কেন্দ্রিকরণেরই এক ফসল।
লেখক কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক
(আগামীকাল দ্বিতীয় কিস্তি)
I do not agree. There is so much variety in the responses of nations, communities and individuals that this kind of generalisation does not provide a complete picture.
Coronary has shown that despite the adversities, there have been many kinds of reactions and innovations. And that is how humankind has been responding over the centuries.
RSEN