বস্তুতপক্ষে করোনার সময়ে ভাইরাস প্রতিহত করতে লকডাউন জারি করাটা সেই অর্থে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নিদান নয়। এটা সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক বা আইনগত একটা ব্যবস্থা। এর মানে হল যানবাহন থেকে শুরু করে সব ধরণের চলাচল বন্ধ রাখা। এটা সরকারের এমন একটি সিদ্ধান্ত যা জনগণকে মানতে হবে। তবে লকডাউন কথাটা নতুন নয়, বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। এর আগেও মহামারির সময়ে এই কথাটা প্রচলিত ছিল। কারণ তখনও লকডাউন জারি হয়েছিল।
লকডাউন কথাটির সরাসরি অর্থ তালাবদ্ধ করে দেওয়া। কেমব্রিজ ডিকশনারি শব্দটির ব্যাখ্যায় বলছে— কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেওয়া কিংবা সেই জায়গায় ঢুকতে নিষেধ করাটাই হল লকডাউন। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি বলছে— জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাটাই হল লকডাউন। সোজা বাংলায় লকডাউন কথাটির অর্থ হল অবরুদ্ধ।
গত বছর মার্চ মাসের শেষ দিকে আমাদের দেশে লকডাউন শুরু হয়েছিল। তখনও প্রাথমিকভাবে বোঝা যায়নি করোনার সংক্রমণ ও প্রভাব কতখানি তীব্র হতে পারে। তখন দফায় দফায় কেবলমাত্র আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে লকডাউনের সময়সীমা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়ে চলে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু মিছিল। একটা ভয় তার সঙ্গে হতাশা গ্রাস করে আমাদের।
কিন্তু ২০২০-র মার্চেই প্রথম নয়, ভারতে লকডাউন হয়েছিল ১৯১৫-তেও। তবে তার আগে এ দেশে লকডাউনের তেমন কোনও ইতিহাস নেই এমনটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। তবে তখন লকডাউন কথাটা প্রশাসনিক রেকর্ডেই থাকত। উনিশ শতকের শেষে ১৮৯৬-৯৭ সালে প্লেগ মহামারীর আকার নিয়েছিল। বিশেষ করে প্লেগ ভয়াবহ আকার নেয় মু্ম্বইতে। তখন এদেশে ব্রিটিশ শাসন কায়েম। ব্রিটিশরা এপিডেমিক ডিজিজ অ্যাক্ট তৈরি করে রাস্তা থেকে ভিড় কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করতে বন্ধ করেছিল পরিবহণ।
উনিশ শতকের শেষের দিকে এই দেশে কলেরা, প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। সেই রোগ ঠেকাতে লকডাউনের পথে হেঁটেছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার। বাস্তবে উনিশ ও বিশ শতকে ভারতে একাধিকবার কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যার ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় জনপদ, মহামারীর কবলে পড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যায়। যদিও ব্রিটিশ সরকার গোড়ার দিকে সে বিষয়ে তেমনভাবে নজর দেয় নি, কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং জটিল হয়ে ওঠে, তখন ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে। তারপর তারা বাধ্য হয়ে পদক্ষেপ করে।
১৮৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুম্বাইতে প্লেগের কারণে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দু’হাজার মানুষের মৃত্যু হতে থাকে। সেই মৃত্যুমিছিল একসময় মুম্বাই থেকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন বিদেশি সরকারও চিন্তায় পড়েছিল। বাধ্য হয়ে তারা এপিডেমিক অ্যাক্ট তৈরি করে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল অনুযায়ী অতিমারি বা মহামারী ঠেকানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে ভিড় কমানো, যে কোনও ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ করা। সংক্রমণ ঠেকাতে তাই তারা ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ১৮৯৭ সালের ২০ মার্চ এলাহাবাদে এক সরকারি প্রস্তাবে শ্রমিকদের এক মাসের বেতন-সমেত ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে সরকারিভাবে তখনও লকডাউন কথাটি ব্যবহার করা হয় নি।
শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসকরাই নয়, কলেরার সংক্রমণ ঠেকাতে হায়দ্রাবাদের নিজামও সেই একই পথে হেঁটেছিল ১৯১৫ সালে। সে বছর হায়দ্রাবাদে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল। পথেঘাটে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। চারিদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীদের পরীক্ষা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কনটেইনমেন্ট সেন্টারে। যানবাহনেও নিয়ন্ত্রণ করা হয়, জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তৈরি করা হয় বিশেষ কনটেইনমেন্ট জোন, যার ব্যবহারিক নাম ছিল করডন স্যানিটেরজ। প্রতিটি এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের অনুমতি ছাড়া সেই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন না কেউ। সেই অনুমতির ব্যবহারিক নাম ছিল প্লেগ পাসপোর্ট।
একবিংশ শতাব্দীতে নামটি হয়ত লকডাউন, কিন্তু পদ্ধতি একইরকম রয়েছে। এখন করোনা ঠেকাতে যে লকডাউন পালন করা হচ্ছে গোটা বিশ্বজুড়ে, আজ থেকে ১০৫ বছর আগে ১৯১৫ সালে সেই একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পরতেই আমাদের রাজ্যে গত ১৬ মে থেকে ১৫ দিনের জন্য লক ডাউন শুরু হয়। জুনে তাকে আরও ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে। উদ্দেশ্য করোনা ভাইরাস সংক্রমণের গ্রাফকে নীচে নামিয়ে আনা। গোটা দুনিয়াই সেই পথে হেঁটে সংক্রমণ কিছুটা হলেও রুখেছে। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ করার এটা একটা লড়াই। যার নামটা বদলেছে কিন্তু পদ্ধতি রয়ে গিয়েছে সেই আদ্যিকালেরই।
জানা ছিল না, অনেক তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেল। ধন্যবাদ।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লকডাউন নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা নজর করেছি, অধিকাংশ লেখাই কোথায় কেমন হচ্ছে চলছেতার
বর্ননা,এই লেখাটিতে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেল, তাছাড়া লেখাটিও খুব ভাল।