কলকাতার বড়িশা অঞ্চলের সখেরবাজারে বিখ্যাত চন্ডী পূজা প্রায় ২৩২ বছরের পুরোনো। বরিশায় দেবীচণ্ডীর মাঠে চণ্ডীর বার্ষিক পূজা ও মেলা অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা অষ্টমী আর নবমীতে দেবী চণ্ডীর পুজো হয়। এখানে দেবীর মৃৎমূর্তিটি চতুর্ভূজা ত্রিনয়নী রক্তবর্ণা ও রক্তবসনা। পাঁচটি নরমুন্ডের আসনে অধিষ্ঠিতা দেবীর গলায় নরমুণ্ডমালা, চার হাতে রয়েছে পুস্তক রুদ্রাক্ষমালা, বরমুদ্রা ও অভয়মুদ্রা। দশমীতে দেবীর ঘট বিসর্জন হয়। একসময় পূজোয় মোষ বলি হতো। সুখসমৃদ্ধি, সন্তান, ইত্যাদি কামনায় দেবী চণ্ডীর পূজা করা হয়।

বরিশায় দেবীচণ্ডী
সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের মহেন্দ্র রায় চৌধুরী ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল চন্ডী দেবীর বার্ষিক উৎসবে সূচনা করেছিলেন। মহেশচন্দ্র ও তার পুত্র হরিশচন্দ্রকে নিয়ে গল্প আছে। চণ্ডীর মাঠের পাশে যে পুকুর আছে সেখানে থেকে অষ্টধাতুর এক কলসপাওয়া গিয়েছিল। দেবী চণ্ডী স্বপ্ন দিয়ে জানান ওই ঘটে তিনি আছেন। মহেশচন্দ্র রায় চৌধুরী বাড়িতে আজও সেই ঘট নিত্য পুজো হয়। মহেশচন্দ্র ও তার দ্বিতীয় পুত্র হরিশচন্দ্র ছিলেন মাতৃসাধক। শোনা যায় দেবী দুর্গা নুপুরের ধ্বনি তুলে সাধকের গোটা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন নিজের অস্তিত্ব বোঝাতে।
বেতাইচন্ডী : হাওড়ার শিবপুরে বেতাইতলার বেতাইচন্ডী শিলামূর্তি নিত্য পূজা পায়। খ্রিষ্টীয় পনেরো শতকের শেষদিকে রাঢ় বঙ্গের কবি বিপ্রদাস পিপলাই এর লেখা মনসামঙ্গল বিজয় কাব্যধারায় দেবী বেতাইচন্ডীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন বেতরের দেবী বেত্রচন্ডিকার পুজো করে সপ্তডিঙ্গা সমুদ্রে ভাসানো হতো। জনৈক ইউরোপীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডরিক বানিজ্যের দৌলতে এখানে এসে লিখেছিলেন, বেতরে এক বিশাল এলাকাজুড়ে বাজার বসতো। নদীর পশ্চিম পাড়ে ছিলো সমৃদ্ধ বেতর বন্দর।

বেতাই চন্ডীর পুজো ও প্রতিষ্ঠা কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক প্রামাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রবীনদের থেকে শোনা যায়, একদিন শেওড়াফুলির রাজা নদীবক্ষে বজরা ভ্রমণ করবার সময় মা চন্ডীর স্বপ্নাদেশ পান। রাজা সেখানে নৌকাথামিয়ে চণ্ডীর প্রস্তর মূর্তি খুঁজে পায়। ঘন বেতবনে দেবীকে পাওয়া যায় এবং বেতবনেই প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে এই দেবীর নাম বেতাই চন্ডী। সম্ভবত শিবপুরের জমিদার রায়চৌধুরী পরিবারে দেবী বেতাইচন্ডীর পুজো করে আসছেন।
জাগ্রতা এই শিলারূপিনী দেবী সিঁদুরে সজ্জিত। সোনা রূপোয় অলংকৃত। সামনে পিতলের চরণ যুগল। ১লা জানুয়ারি বড় করে দেবীর বাৎসরিক উৎসব হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে দেবীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে চড়ক মেলা বসে। রথযাত্রায়ও মেলা হয়। সুখে দুখে আনন্দে উৎসবে মা বেতাই চন্ডী এখানকার মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন যুগ যুগ ধরে।
বোঁয়াই চন্ডী : বাঁকুড়া বর্ধমান সীমান্তে খন্ডঘোষের বসন্তচন্ডী, কালের প্রবাহে ধনতাত্ত্বিক পরিবর্তনে বসন্তচন্ডী বোঁয়াই চন্ডী নামে বিখ্যাত হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে আসেন মায়ের কাছে পুজো দিতে। অথচ আজকের ইন্টারনেটের যুগেও কষ্টিপাথরের মায়ের একটি ছবিও গুগল সার্চ করলে খুঁজে পাওয়া যায় না। শোনো যায় কোন এক চিত্রগ্রাহক কষ্টিপাথরের মায়ের মূর্তির একবার ছবি তুলেছিলেন। তারপরে তার জীবনে নেমে আসে ভয়ংকর অঘটন। এমনকি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বহুবার। সেই থেকে মায়ের ছবি তোলা নিষিদ্ধ। বাইরে থেকে মন্দিরের ছবি কেবলমাত্র পাওয়া যায়।

কুলে গ্রামের শ্যাওড়া গাছের তলায় বসন্তচন্ডী বিগ্রহ পাওয়া গেছিলো স্বপ্নদেশে। দেবী বুদ্ধিমন্ত খাঁকে স্বপ্নে নির্দেশ দেন কিভাবে বিগ্রহ নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পালকিতে করে বুদ্ধিমন্ত খাঁ কুলে থেকে বোঁয়াই আনলেন দেবী চণ্ডী কে। পরে বর্ধমানের দানবীর মহারাজ মহাতাবচন্দ দেবীর মন্দির বানিয়ে দিয়ে ছিলেন। অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর শিলারূপ নিত্য পূজো পায় ।নীলকন্ঠ রক্তভৈরব শিব লিঙ্গ রয়েছে মন্দিরে, আষাঢ়ে অম্বুবাচীর তিন দিন, শারদ নবমীতে বোঁয়াইচন্ডীর মেলা বসে। বসন্ত ,কলেরা ও বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির হাত থেকে দেবীকে রক্ষা করেন বলেই দেবীর নাম বসন্ত চন্ডী। প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো এই পুজো।
ঘাগড়বুড়ি চন্ডী : আসানসোল অঞ্চলের খুবই জাগ্রত দেবী হলেন ঘাগড়বুড়ি চন্ডী। যেসব মহিলাদের সন্তান না হয় তারা ঘাগড়বুড়ির কাছে মানত রাখেন।
সুদূর অতীতে আসানসোল ছিল আসান, শাল, সেগুন, মূর্গা, পলাশ বিভিন্ন পর্ণমোচী বৃক্ষ অধ্যূষিত কোল , মুন্ডা ,ওঁরাও ,সাঁওতাল , শবর প্রমূখ অনার্য সম্প্রদায়ের বাসভূমি।নুনী নদীর উত্তর পাড়ের অপেক্ষাকৃত উচু জমিতে এদের বাস। তখন থেকেই সাঁওতাল জনজাতির মধ্যে বৃক্ষ ও শিলা পূজার প্রচলন ছিল।মা ঘাগড়বুড়ি চন্ডী তারই একটি ঐতিহাসিক সাক্ষর। ঘাগড়বুড়ি মাতা চন্ডীকে নিয়ে বহু জনশ্রুতি প্রচলিত। কথিত আছে, এক গরীব ব্রাহ্মণ আত্মহত্যা করতে গিয়ে ঘাঘড়া পরিহিতা এক বৃদ্ধাকে দেখতে পান। সেই বৃদ্ধা ব্রাহ্মণকে আত্মহত্যা করতে নিষেধ করেন বরং তাঁর হাতে তিনটি শিলাখন্ড তুলে দিয়ে নির্দেশ দেন এগুলিকে চণ্ডীজ্ঞানে নিত্যপুজো করতে। পুজো করার ফলে ব্রাহ্মণের অবস্থা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে।

এই ব্রাহ্মণের নাম কাঙ্গাল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে চক্রবর্তী পরিবারই বংশ পরম্পরায় মন্দিরে সেবাইত হিসেবে নিযুক্ত আছেন।ঘাগড়া পরিহিতা ছিলেন বলে সেই দেবীর নাম ঘাগড়বুড়ি চন্ডী। গর্ভগৃহে তিনটি শিলা অবস্থিত। ডানে শিব, বাঁয়ে অন্নপূর্ণা, মাঝে দেবী ঘাগড়বুড়ি চন্ডী। প্রতিবছর পয়লা মাঘে এখানে মেলা বসে।
বোড়াইচণ্ডী : চন্দননগরে শ্ৰীমন্ত সওদাগর প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীবোড়াইচণ্ডী মাতার মন্দির। ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন মন্দিরটিতে অষ্টধাতুর চতুর্ভূজা মায়ের মূর্তি রয়েছে। দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা। বোড়াইচন্ডীতলা তখন শ্মশান। এমন স্থানেই এক সন্ন্যাসী ধ্যান করতেন। তিনি স্বপ্নে এক প্রস্তর মুক্তি পান। যা আজও মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে নিমকাঠের মূর্তির উপর অষ্টধাতুর পাত দিয়ে মোড়া মূর্তির পিছনে রাখা আছে। গঙ্গা এখন সরে গেছে। শ্রীমন্ত সওদাগর নিশ্চিত বড়াইচণ্ডী শ্মশানে দেবী বোড়াইচণ্ডীর পূজা করে সিংহলে আটক পিতাকে মুক্ত করার জন্য সন্ধানে যান। শোনা যায় সেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে শ্রীমন্ত সওদাগরের সাক্ষাৎকার হয়েছিলো।
কোন এক সময় চন্ডী এবং দুর্গা আলাদা দেবী ছিলেন। তারপর কালের স্রোতে অসুরবিনাশিনী চন্ডী, দুর্গা ও পার্বতী এক হয়ে গেলেন। দ্বাদশ শতাব্দী পর থেকে চণ্ডী মূর্তির সঙ্গে একটি গোধিকা বা গোসাপকেও দেখা গেল। যদিও এই গোসাপ বৃত্তান্ত চন্ডীমঙ্গলের কালকেতু ফুল্লরা উপাখ্যানে আছে।
যে চন্ডী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে প্রতিষ্ঠিত তিনি কিন্তু বাংলার মেয়েলি ব্রতকথা জুড়ে যে গ্রাম্য চন্ডীর প্রচার আছে, তারা এক নয়। তিনি মোটেও অসুরবিনাশিনী চন্ডী নন। পুরাতত্ত্ববিদরা মনে করেন উপজাতিদের মধ্যে চান্ডী নাম্নী এক শিকারী দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। ছোটনাগপুরের নানা উপজাতির মধ্যে এই দেবীর পূজা এখনো হয়ে থাকে।আবার কেউ বলেন চন্ডীমঙ্গলের চন্ডী অস্ট্রিক বা দ্রাবিড় গোষ্ঠীভুক্ত। কোন দেবদেবী তাঁর থান, মন্দির সম্পর্কে জানতে হলে সেই স্থানের ভৌগলিক অবস্থান জনজাতি এবং তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে আগে জানা দরকার। কারণ এরমধ্যেই নিহিত থাকে সেই দেবীর প্রতিষ্ঠা ও পূজাঅর্চনার ইতিহাস। মূলতঃ প্রতিটি আখ্যানে দেখা গেছে মঙ্গলচন্ডীর পুজোয় সকলের মঙ্গলই হয়। যে এই দেবীর ব্রত করে তার কখনো চোখের জল পড়ে না, চিরকাল সুখে কাটে।।

“জৈসা ললিত কান্তাক্ষা, দেবী মঙ্গল চন্ডীকা। বরদাভয় হস্তা চ দ্বিভুজা গৌর দেহিকা, রক্তবস্ত্র শনস্থা চ রতনৌজ্জ্বল মন্ডিতা।। রক্তকৌশীয় বসনা স্মিত বক্ত্রা শুভাননা, নব যৌবন সম্পনা, চারবঙ্গীন ললিতপ্রভা।। ঔঁ হ্রীং স্রীং মঙ্গলচন্ডীকায়ৈ নমঃ।”
তথ্য ঋণ : ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়- হাওড়া শহরের ইতিবৃত্ত, হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ (২য় খণ্ড) : সুধীরকুমার মিত্র, ড. সুকুমার সেনের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অন্যান্য