সাংসারিক কল্যাণে দেবীর অশেষ কৃপা পেতে বঙ্গে মেয়েরা জৈষ্ঠ্য মাসের প্রতি মঙ্গলবার মঙ্গলচন্ডীর ব্রত পালন করেন। মঙ্গল শব্দের অর্থ ‘কল্যাণ’, ভক্তের মঙ্গল করেন বলেই দেবী মঙ্গলচন্ডীকা। ঘটে দেবীর পূজা করে ব্রতকথা শোনা এবং চিঁড়ের ফলার আহার করা এই ব্রতের রীতি। দেবীচণ্ডী বরাভয়দাত্রী জননী। দেবাদিদেব শিবও মঙ্গলচন্ডীর পূজা করেছিলেন।
চণ্ডীর ধারণাটি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে।
বাঙালির মঙ্গলচন্ডী লক্ষ্মী সরস্বতী আর মহিষমর্দিনীর মিলিত রূপ। বাংলার বিভিন্ন স্থানে দেবীচণ্ডী বিভিন্ন বিচিত্র নাম ও প্রতীকে আরাধিতা। যেমন — ওলাইচন্ডী, ঢেলাই চন্ডী, কুলাইচন্ডী, জয়মহুলা চন্ডী, নাটাই চন্ডী, জোতচন্ডী, উলাইচণ্ডী, কমলাচন্ডী, মাকরচন্ডী, গুড়গুড়াইচন্ডী ইত্যাদি। এখন অব্দি প্রায় ১০৩ রকমের চণ্ডীর উল্লেখ পাওয়া গেছে। কোথাও তিনি গ্রাম্য দেবী কোথাও আবার কুলদেবী, কোথাও তিনি গৃহদেবী রূপে পূজিতা। তিনি বিচিত্র শক্তি মত্তার অধিকারিনীদেবী। তিনি একধারে বৈদিক পৌরাণিক এবং লৌকিক ভাবনা সঞ্জাত মহামাতৃকা। মূলতঃ চণ্ডীর ধারণাটি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে। তিনি অলৌকিক থেকে লৌকিকভাবে মানুষের বিশ্বাসে মিশে অপার মাতৃমহিমায় পূজিত হন। তাই চণ্ডীর পূজাও বিভিন্ন প্রকার। যেমন —
উলাইচন্ডী : নদীয়া জেলার উলা বীরনগর গ্রামের লৌকিক হিন্দু দেবী।প্রাক-বৌদ্ধযুগের বাংলার লোকায়ত ধর্মাচরণের সঙ্গে এই দেবীর গভীর সম্পর্ক আছে। বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভবের পর থেকেই হিন্দুধর্মের উপরে এর প্রভাব পড়েছিল। পরবর্তীকালে মহাজান বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে লৌকিক সংস্কারের মিশ্রণে লৌকিক ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। এছাড়া নানান ধরনের বিশ্বাস, সমকালীন পরিস্থিতি ও চাহিদার উপর নির্ভর করে এই লৌকিক দেবীর উদ্ভব হয়।
ভাষাবিদদের মতে ‘উলা’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ শ্রেষ্ঠ বা জ্ঞানী, একদা বহু পন্ডিত এই অঞ্চলে বসবাস করতেন সম্ভবত তার থেকে নাম হয় উলা। আবুল ফজলের আইনি আকবরী” তে বত্রিশ (৩২) মহলের মধ্যে একটি গ্রাম উলা’র উল্লেখ রয়েছে। ১৮১৯-র ৮ মে সমাচার দর্পণ পত্রিকায় উলাগ্রামে উলাই চ্ণ্ডীর বার্ষিক পূজার খবর প্রকাশ পায়।

১৮২৪-২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত উলার দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ কাব্যে আছে :
অম্বিকা পশ্চিম পারে, শান্তিপুর পূর্বধারে,
রাখিল দক্ষিণে গুপ্তিপাড়া,
উল্লাসে উলায় গতি, বটমূলে ভগবতী,
চণ্ডিকা নহেন যথা ছাড়া।
বৈশাখেতে যাত্রা হয়, লক্ষ লোক কম নয়,
পূর্ণিমা তিথিতে পুণ্যচর,
নৃত্য গীত নানা নাট, দ্বিজ করে চণ্ডিপাঠ,
মানে যে, মানস সিদ্ধ হয়।’
বৈশাখ মাসে পূর্ণিমাতিথি থেকে তিন চারদিন বাৎসরিক পুজো উৎসবের আয়োজন হয় এখানে।
উলার পূর্বপ্রান্তে একটি অতি প্রাচীন বটবৃক্ষের নিচে দিয়ে বাঁধানো বেদীর ওপর সিন্দুর লিপ্ত পাথরের খন্ডটি হলেন দেবী চণ্ডী। এই পুজো এখানে কিভাবে শুরু হল কিম্বা এর প্রাচীনত্ম প্রমাণ করা সঠিকভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্য অনুসারে ধনপতি শ্রীমন্ত সদাগর গঙ্গার বুকে চেপে সিংহল যাচ্ছিলেন। মাঝে এলো প্রচন্ড ঝড়, নৌকা দুলতে লাগলো ভয়ানক ভাবে। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। সদাগর উলার পূর্ব দিকে গঙ্গাতীরে বড় বটগাছের তলায় একটি শিলাখণ্ডে দেবীচণ্ডীর পূজা করেন ও প্রকৃতির রোষ থেকে রক্ষা পান। সেই থেকে এখানে চন্ডী পুজো শুরু হয়।
আবার এমন গল্পও প্রচলিত আছে, শ্রীমন্ত সদাগরের সিংহল যাওয়ার পথে তার নৌকায় একটি পাথর খন্ড ভেসে এসে আটকে যায়। সদাগর দেবীর আদেশ পান, ওই পাথরখণ্ডই দেবী চণ্ডীর। প্রতি পুজো করার আদেশ পান। তখনই তিনি ওই খন্ডটির পুজো আরম্ভ করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না সুপ্রাচীন এই চন্ডী স্থান বাংলার চন্ডী চর্চার একটি উল্লেখযোগ্য স্থান।

তথ্য বলে ১৯৬৯ সালের ২৯ এপ্রিল চন্ডীমাতার এই বহু প্রাচীন শিলারূপটি নিখোঁজ হয়। বহু সন্ধানেও এটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশেষে নবদ্বীপ ও ভাটপাড়ার প্রধান পন্ডিতের বিধান অনুসারে সেই বছরেই ১৫ মে ঘট স্থাপন করে ও ঘটের পাশে বেশ কিছু শীলাখন্ডকে স্থাপন করে পুজো শুরু করা হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নামে সংকল্প করে ঘটে পূজোর সূচনা করা হয়।
কোন এক সময় প্রথমে হাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথমে শুয়োর বলি দিয়ে বটবৃক্ষমূলে শিলাখণ্ডে এই পুজো হতো। মনস্কামনা পূরণের জন্য বটবৃক্ষে এক টুকরো ঢিল বাঁধার রীতি এখনো রয়েছে। এরপর এটি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি ও উলার মুস্তৌফি জমিদার পরিবারের পূজায় পরিনত হয়। যা পরে সাধারণ মানুষের পূজা হয়ে যায়। বৈশাখী পূর্ণিমার তিথিতে দেবীচন্ডী উলা দক্ষিণপাড়া মহিষমর্দিনী, উত্তরপাড়ায় বিন্দুবাসিনী, মাঝেরপাড়ায় গণেশ জননী রূপে, পালিতপাড়া মুহুরিপাড়া ও ডোমপাড়ায় দশভূজা রূপে পূজিত হন।
বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সকাল থেকেই উলারচন্ডীতলায় ঘন্টাধ্বনি, উলুধ্বনি ও চন্ডীপাঠের মাধ্যমে পুজোর সূচনা হয়। হাজার হাজার ভক্তের সমাগমে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
পূজা উপলক্ষে বিশাল মেলাও এখানে বসে। এছাড়াও যাত্রা, তরজা, ঝুমুর গান, খ্যামটা খেউড়, বাইনাচ প্রভৃতি বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত। সেই আমলে স্থানীয় ধনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় ময়ূরপঙ্খীসঙ্ বার করে ব্যাঙ্গাত্মক গান গেয়ে একে অপরের দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলত। তবে সেই সংস্কৃতি এখনও লোপ পাইনি।।
ঢেলাই চন্ডী : খেজুর গাছে তেঁতুল গাছ বা যে কোনো বৃক্ষকেও ঢিল দিয়ে ঢেলাই চন্ডীর পূজা করা হয়। মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এই পুজো দেখা যায়। ব্রতীদের ধারণা গাছে ঢিল বাঁধলে চিঁছকাঁদুনে ছেলের কান্না বন্ধ হবে। শ্রী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বর্ণিত মাঝিপাড়ায় (নৈহাটী স্টেশন থেকে প্রায় দুই মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে) এগোলে গোয়ালফটক পল্লীতে, হালিশহর, কাঁচরাপাড়া প্রভৃতি জায়গায় এই ঢেলাই চন্ডীর পূজা হয়। দেবী চণ্ডীর ধ্যান মন্ত্রে এই পুজো করা হয়, নৈবেদ্য হিসেবে এক টুকরো ঢিল গাছের নিচে ছুড়ে দেওয়া হয়। অনেকেই এর সাথে দুধ ফলমূল পয়সা নিবেদন করে থাকে।

কঙ্কচন্ডী বা কানাই চন্ডী: মুর্শিদাবাদ জেলার কাগ্রাম এই পুজো দেখা যায়। গ্রামের নামটি এসে কাকের নামে। কাগ্রাম এসেছে কঙ্কচন্ডী থেকে। এই গ্রাম্যদেবীটি বহুল প্রাচীনতমা। উত্তরপাড়ায় নান্দনিক সংস্থার কাছে বর্তমানে রয়েছে কানাই চন্ডী দক্ষিণ দুয়ারী একটি মন্দির। দেবী চণ্ডীর এখানে কোন মূর্তি নেই। গর্ভগৃহে গামছা বাঁধা মাটির দুই হাঁড়িকেই কঙ্কচন্ডীর প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, দুই হাড়ির মাঝখানে রয়েছেন মঙ্গলচন্ডী।
দুর্গাপূজার দশমীর দিনে কানাইচন্ডীকে সাতাআনা দুর্গা মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। অন্নপূর্ণা পূজার সময়ও মন্দিরের সামনে বলি দেওয়া হতো। প্রাচীনতার লক্ষণ হিসেবে কিংবদন্তির জন্ম, কঙ্কচন্ডী সম্পর্কে সে রকম কিংবদন্তের শেষ নেই। জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করার পর ডাকাতেরা ধনরত্ন লুট করে পালানোর সময় কানাই চন্ডীর মন্দিরের কাছে এসে অন্ধ হয়ে যায় এবং মন্দিরে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। সকালে গ্রামবাসীরা এসে অবাক হয়ে পড়ে। ডাকাতেরা এখানে এসে অন্ধ বা কানা হয়ে গেছিল বলেই কঙ্কচন্ডীর অপর নাম কানাই চন্ডী। বর্তমানে এই মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ বিরাজমান।
১ কভার ছবি ওলাইচণ্ডী মাতা রনবাগপুর , হুগলী, ২ ওলাইচণ্ডী মাতা বীরনগর
excellent share!