ভাঁজো ব্রত
ভাদ্রমাসের ইন্দ্র দ্বাদশীর ইন্দ্রপুজো উপলক্ষে ভাঁজো ব্রত উদযাপন হয়। গ্রামের বাইরের কোনো স্থানে কিছু মাটির ঢেলা মেয়েরা যথন সংগ্রহ করেন, তখন কাছাকাছি গ্রমের যুবকেরাও উপস্থিত হয়ে দুই দল কপট যুদ্ধে মুখোমুখি হয়। এক দল, সাধারণতঃ মেয়েরাই মাটির স্তুপ দখল করে গ্রামে ফিরে যায়। জড়োকরা মাটি ব্রতীনীরা কোনো দেবস্থানে নিয়ে যায়। এই মাটি পরিস্কার করে মাটির সরাতে নদী থেকে আনা বালি আর গৃহস্থের মাটির ভিত থেকে ইঁদুর মাটি সংগ্রহ করে তাতে যব, কলাই প্রভৃতি পঞ্চশষ্যর বীজ রোপণ করেন কুমারী মেয়েরা। একি শষ্য পাতা বলে। এটি এরপর কোনো পবিত্ত স্থানে রাখা হয়। সাতদিন পর, আটদিনের দিন তা থেকে যে অঙ্কুরোদ্গম হয়, তা নিয়ে নানান ছড়া কেটে ব্রত পালন করেন তাঁরা। সে দিন একটি মাটির মূর্তিকে শাড়ি পরিয়ে তাকে নারী রূপ দেওয়া হয়। সন্ধ্যেবেলা অঙ্কুরিত বীজসুদ্ধ পাত্রকে মাটির মূর্তির চারদিকে রাখা হয়। পুরোহিত এবার অঙ্কুরিত চারাগাছের পুজো সম্পন্ন করেন। পুজে শেষ হলে ব্রতীনিরা মূর্তি আর চারাগাছের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে নৃত্য করেন।

এই পথে যাও ভাঁজো, এই পথে যাও, বেনা গাছে কড়ি আছে দুধ কিন্যা খাও।
ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ের মু্র্শিদাবাদের বিন্দারপুর, জজান প্রভৃতি গ্রামে পালিত হয় এই ব্রত একে বলে ভাঁজো বা ভাঁজুই ব্রত। অনেকে আবার একে শষ্য পাতার ব্রত বা শাষপাতার ব্রতও বলে থাকেন। আদতে এটি একটি পর্যাপ্ত পরিমাণে শষ্যকামনার ব্রত। নাচগানছড়ায় অংশ নেন অঞ্চলের কুমারীরাই। কয়েকটি উদাহরণ–ধূপ দিলাম, ধুনুচি দিলাম ধুপের ধুনো খাও রে ভাঁজু ধুপের ধুনো খাও অথবা ঘি নাও মুটে মুটে জল খাও ঠোঁটে ঠোঁটে অকুমারী মেয়ে ভাঁজুই পেতেছি ইত্যাদি। ঘরের দাওয়ায় আলপনা দিয়ে ভাঁজু পাতা থেকে শুরু করে ভাঁজুর বিয়ে, তাকে নিয়ে নানান রঙ্গ তামাশা এমনকী নদী বা অন্যকোনও জলশয়ে বিসর্জন ঘটনা পর্যন্ত নানান ছড়া বা শোলোক আছে। তার সঙ্গে কাঁসি, ঢোলোক ক্যাওড়া সানাই বাজিয়ে মোয়েদের নাচের প্রচলন ছিল বেশ কিছুদিন আগেও। জনসমাজে বিশ্বাস এই ব্রতে লুকিয়ে থাকে কুমারী মেয়েদের ভবিষ্যত জীবনের নানান ইঙ্গিত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানান লেখায় এরই পূর্বসূরী পূর্ববঙ্গের ভাদুলি ব্রতের সঙ্গে এর আগে পরিচিত হয়েছি।

তিস্তার ভেদৈ খেলি বা মেছেনি ব্রত
উত্তরবঙ্গের লোকজীবনে তিস্তা নদীর প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে জলপাইগুড়ি জেলায়–কখোনো সে দুকুল ভাসায় কখোনো আবার সবুজে সবুজে ভরে দিয়ে সভ্যতার বিকাশের সঙ্গী হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গে তাই তিস্তার বড় আদর–তাকে সোহাগে রাখার, তাকে আদরে রাখার। তিস্তাকে তাই আদর করে সম্বোধন করা হয় বুড়ি নামসহযোগে। উত্তরবঙ্গীয়রা তাই তিস্তাবুড়ির খ্যাপামি নিয়ে ছড়া কাটে, গান বাঁধে, ঘটা করে পুজো দেয়। তিস্তাবুড়ির এই ব্রত স্থানীয় ভাষায় বরত্ রূপে চিহ্নিত। এই গানের সঙ্গে নাচেন কিশোরীরা। একে বলে মেচেনি বা মেছুনিখেলি। বেত বা বাঁশএর একটি ছোট ঝাঁপি লাল কাপড়ে মোড়া–তার মধ্যে তেল সিঁদুর মাখানো একটি ফুলদিয়ে সাজানো ঘট বসানো। এটি তিস্তা মাই (মাও)-এর প্রতীক। একে বড় ছাতা দিয়ে খর-বৈশাখের প্রখর রোদ্দুর থেকে আড়াল করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চলে এ নাচ। বয়স্কারা তাঁদের ঘিরে তালি দিয়ে তাল রাখেন। করতালও বাজে। মেয়েরা খাটো শাড়ি পরে তাতেই ঊর্ধাঙ্গ জড়িয়ে কোমর বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচে। সামনের দিকে ঝুঁকে দুই হাতে শাড়ির আঁচল, স্থানীয় লব্জে ফোতা বা পাটানি, মাটিতে ছুঁইয়ে দেয়। আবার সোজা হয়ে উঠে হাতে তালি দেয়। এক তাই থাপুনি (তালি) নাচ বলে। নাচটিকে বলে নাচানিয়া। এচটি গানের কলি–বড় বাড়িখন দেখিয়া আইলম লখমীমাও। বড় পিড়াখন পাতিয়া দাও। লখমী মাওক আমার সিন্দুর দেয় হে। সিন্দুর না থাকে যদি ইট ভাঙিয়া দাও হে। অথবা তিস্তাবুড়ির নামান গেহেচে আনন্দে বরিয়া নেওগে বড়য় হাউসালি, হামার পঞ্চ বাহিনী।
