স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা রূপে আয়ারল্যান্ডের তেজস্বিনীর মেয়ে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ১৮৯৫ সালে লন্ডন শহরে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাৎ পান এবং ১৮৯৮ সালে ভারতে চলে আসেন। একই বছর ২৫ মার্চ তিনি ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করলে স্বামী বিবেকানন্দ তার নামকরণ করেন নিবেদিতা। তিনি ছিলেন একজন অ্যাংলো-আইরিশ বংশোদ্ভুত সমাজকর্মী, লেখিকা, শিক্ষিকা। তার জন্ম ২৮ অক্টোবর ১৮৬৭।
‘বিবেকানন্দের প্রিয় শিষ্য’ এই পরিচয়টুকুই ছিল ভারতবর্ষে তাঁর একমাত্র সম্বল। রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের সম্পর্কের শীতলতার কথা, তাঁদের মধ্যেকার জমাট বাঁধা মেঘের গল্প সকলের জানা। আসলে বিবেকানন্দের যেমন পৌত্তলিক পরিচয়, রবীন্দ্রনাথের তেমনি অপৌত্তলিক, ব্রাহ্ম পরিচিতিই সামাজিকভাবে প্রবল ছিল। দুজনেই নিজের বলয়ে প্রতিষ্ঠান হয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। সেই কারণে বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতা হয়তো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু নিবেদিতা সহজেই ঠাকুরবাড়ির সেরা মানুষটির বন্ধু হয়ে উঠলেন। তাঁদের মতধারা ভিন্ন হলেও বন্ধুত্বের এক সহজ সেতু তৈরি হয়েছিল। যে বন্ধুত্বে কোনো মতপার্থক্য প্রভাব বিস্তার করেনি। দুজনের একটি সাধারণ ভালোবাসা ছিল—ভারতবর্ষ!দুজনেই নিজের মতো করে পরাধীন ভারতবর্ষকে মমত্বের স্পর্শে ভরাট করতেন। ভারতের বিপ্লববাদের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ ও নিবেদিতার ছিল আন্তরিক যোগ।
নিবেদিতার অতীত জীবন পূর্বজন্মের মতো যেন ফিকে হয়ে গেল। বাগবাজারের এক অখ্যাত গলি, একটি বালিকা বিদ্যালয় এবং সম্ভ্রমের দূরত্বে থাকা বিবেকানন্দ এই ছিল তাঁর ভুবন। তবে নিবেদিতা দখিনা বাতাসের মতোই ভারতে এলেন। স্ত্রীশিক্ষার প্রচার ঘটাচ্ছিলেন নিজের মতো করে।
রবীন্দ্রনাথ এই সময় ছোটো মেয়ে মীরার শিক্ষয়িত্রী রূপে নিবেদিতাকে চেয়েছিলেন। নিবেদিতা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূচনা হল তখন থেকেই। বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তেমন সংযোগ থাকে না নিবেদিতার। নিবেদিতা ভারতবর্ষের মধ্যেই খুঁজতে থাকেন বিবেকানন্দের সত্তা। যার জন্য দেশের শিকড় ছিঁড়ে চলে এসেছিলেন একদিন। সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের মধ্যে বিপ্লবী বিবেকানন্দের খোঁজ পেয়েছিলেন নিবেদিতা। রাজনীতি সচেতন নিবেদিতা গোপনে শুরু করলেন দেশের কাজ। ভারতের বিপ্লবীসমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ তৈরি হল তাঁর। এই সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয় কাকুজো ওকাকুরার। ওকাকুরা এশিয়াকে সঙ্গবদ্ধ ও শক্তিশালী করে পাশ্চাত্যের থেকে সম্মান পেতে চেয়েছিলেন। নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই ওকাকুরার মতো অখণ্ড এশিয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এই জায়গা থেকে তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক বিনিময় সম্ভব হয়েছিল। নিবেদিতা ও অরবিন্দের যোগাযোগ নিবেদিতার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। নিবেদিতার লেখা ‘Kali the Mother’ বইটির মৃত্যুদর্শন একসময় বিপ্লবীদের প্রেরণা ছিল। নিবেদিতার বিপ্লবী সত্তার অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও সেইসময় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে স্বদেশীদের নেত্রী মনে করতেন। গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য তিনি ছদ্মবেশের পরিকল্পনাও করেছিলেন। বিপ্লবের ক্ষেত্রে তাঁর মন্ত্রগুপ্তি ছিল দেখার মতো। বৈপ্লবিক মন্তব্য প্রকাশের জন্য গোপন প্রেসের প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন বিপ্লবীদের।
রাজদ্রোহের অভিযোগে যখন বালগঙ্গাধর তিলককে কারারুদ্ধ করা হয়, তখন সারা দেশের ক্ষোভের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মোকদ্দমা পরিচালনার অর্থ সংগ্রহ করেন। টাউন হলে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় ‘কন্ঠরোধ’ নামের প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধ পাঠ শুনে নিবেদিতা বুঝেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ শুধুই ড্রয়িংরুম বিলাসী কবি নন। দশের, দেশের সুখ দুঃখের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ। দেশকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার বন্ধুত্ব এক অন্য মাত্রা পেল। রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার চরিত্রটিকে অমরতা দিলেন ‘গোরা’ (Gora) উপন্যাসের গোরা চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিবেদিতাও রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী সমাজের পরিকল্পনা অনুসারে আন্দোলন শুরু করেন। আবশ্যিকভাবে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের কথা বলেন। অরবিন্দের ছোটো ভাই বারীন ঘোষকে দায়িত্ব দেওয়া হয় শহর ও গ্রামের বিপণন কেন্দ্রে স্বদেশী দ্রব্য সরবরাহের। নিবেদিতা শহরে কাজ শুরু করেন এবং রবীন্দ্রনাথ গ্রামে। স্বদেশী আন্দোলনের প্রথম যুগে রবীন্দ্রনাথ এবং নিবেদিতা শুধু বক্তার আসনে থাকেননি। তাঁরা ভারতবর্ষকে শিল্পে স্বাবলম্বী হতেও শিখিয়েছেন। নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক বাণীগুলিকে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে রঙিন করে লিখিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জোড়াসাঁকোয় দেখা করে তাঁর লেখা স্বদেশী সংগীতগুলির প্রশংসা করেন। তবে রবীন্দ্রনাথ দেশের জন্যও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দিতে চাননি। নিবেদিতার সঙ্গে এই বিষয়ে তাঁর মতপার্থক্যের কথা তিনি স্পষ্টভাবে বলেওছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “তোমার বিশ্বাস আছে, শক্তি আছে। তুমি হিংসাত্মক বিপ্লবের কথা বলিতে পার, কিন্তু তোমার চারিদিকে যে যুবকদল আসিয়া জুটিয়াছে তাহাদের বিশ্বাসও নাই, শক্তিও নাই। তাহারা হাতের কাছে যেমন তেমন একটা কাজ চায় মাত্র। তুমি না থাকিলে তাহারা কিছুই করিতে পারিবে না।”
রবীন্দ্রনাথই তাঁকে বলেছিলেন ‘লোকমাতা’! ভারতবাসীর সঙ্গে নিবেদিতার ছিল বাৎসল্যের সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ একথা উচ্চারণ করেছিলেন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। আরেকটি আর্কেটাইপ তিনি ব্যবহার করেছিলেন নিবেদিতার প্রসঙ্গে — শিবের জন্য তপস্যারত সতীর আর্কেটাইপ।
তবে এই মতপার্থক্য তাঁদের বন্ধুত্বে কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। নিবেদিতার লেখা ‘দ্য ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ’ এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভারতবাসীর সঙ্গে নিবেদিতার ছিল বাৎসল্যের সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ একথা উচ্চারণ করেছিলেন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। আরেকটি আর্কেটাইপ তিনি ব্যবহার করেছিলেন নিবেদিতার প্রসঙ্গে — শিবের জন্য তপস্যারত সতীর আর্কেটাইপ। “শিবের প্রতি সতীর গভীর সত্যকার প্রেম ছিল বলিয়াই তিনি অর্ধাশনে অনশনে অগ্নিতাপ সহ্য করিয়া আপনার অত্যন্ত সুকুমার দেহ ও চিত্তকে কঠিন তপস্যায় সমর্পণ করিয়াছিলেন। এই সতী নিবেদিতাও দিনের পর দিন যে তপস্যা করিয়াছিলেন তাহার কঠোরতা অসহ্য ছিল — মানুষের মধ্যে যে শিব আছেন সেই শিবকেই এই সতী সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথ সাবধানে কথা বলেছিলেন। তাই মানুষের মধ্যে শিবের উল্লেখ। গভীর বন্ধুত্বের কারণে নিবেদিতার বিবেকানন্দের প্রতি গভীর অনুরাগের কথা তাঁর অজানা ছিল না। একথা খুব সত্যি যে মেয়ে গভীর প্রেমের কারণে দেশ ছাড়তে পারে, সেই প্রেমের অসম্পূর্ণতা থেকে অন্য একটি দেশের জন্য একটা গোটা জীবন উৎসর্গ করতে পারে। নিবেদিতার বিপ্লববাদ সেই মহৎ প্রেমের প্রাণবন্ত দলিল।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা।