এখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই বাংলাদেশকেই বলা হত পূর্ববঙ্গ। সেই পূর্ববঙ্গের মুড়াপাড়া গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদাররা ছিলেন ধনে-জনে আভিজাত্যে বিখ্যাত।
এই জমিদার পরিবারের তৎকালীন প্রধান পুরুষ ছিলেন পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়—যিনি অন্যসব দিক থেকে সুখী মানুষ হলেও একটা ব্যাপারে তিনি সবসময় ভিতরে ভিতরে দুঃখের জ্বালা বহন করতেন। বাইরে তিনি সদাহাস্যময় কিন্তু ভিতরে তাঁর দীর্ঘশ্বাসের ঝড়। কারণ, তাঁর দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তিনি তখনও কোনও পুত্রসন্তানের জনক হতে পারেননি। ফলে সকলের আড়ালে তিনি মাঝে মাঝেই হতাশায় আক্রান্ত হয়ে পড়তেন, অবসাদে বিপন্ন বোধ করতেন এবং এই জমিদারির ভবিষ্যৎ ভেবে বিমর্ষ হয়ে পড়তেন।
জীবনের এরকমই এক সঙ্কটাপন্ন সময়ে তিনি লোকমুখে শুনলেন, ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বারদী গ্রামে একজন বিস্ময়কর অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রহ্মচারী বাস করেন। নাম তাঁর লোকনাথ ব্রহ্মচারী। তাঁর আসল বয়স কেউ জানে না, তবে সবাই বলে, তাঁর বয়স নাকি দেড়শ বছর। তাঁর চোখের পলক পড়ে না, চোখের তারা স্থির। সুদীর্ঘকাল হিমালয়ে বরফের বুকে বসে সাধনা করে তিনি সমতলে নেমে এসেছেন। এখন অবস্থান করছেন বারদী গ্রামে। এই বারদী গ্রামের নাগবাবুরাও তাঁর পরম ভক্ত।
মুড়াপাড়ার জমিদার পূর্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লোকমুখে শুনেছেন, লোকনাথ বাবার কৃপায় নাকি অন্ধব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে, বোবা কথা বলতে সমর্থ হয়েছে, খোঁড়া ব্যক্তি স্বাভাবিক মানুষের মতো হেঁটে চলার শক্তি ফিরে পেযেছে। এসব শুনে পূর্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে নতুন আশা সঞ্চারিত হল। তিনি একদিন সপরিবারে গিয়ে হাজির হলেন বারদীতে। বারদীর জমিদার নাগবাবুরা ব্রহ্মচারীর জন্য একটা আশ্রম তৈরি করে দিয়েছেন। পূর্ণচন্দ্র সেই আশ্রমে গিয়ে লোকনাথের শরণাপন্ন হলেন ; কাতরস্বরে বললেন, ‘আপনি করুণা না করা পর্যন্ত আমরা এখান থেকে একচুলও নড়ব না।’
পূর্ণবাবুর এই আর্তি ও ভক্তিতে লোকনাথ ব্রহ্মচারী প্রীত হলেন। তিনি পূর্ণবাবুকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তোরা ঘরে ফিরে যা। আমি তোদের ঘরে যাচ্ছি।’
লোকনাথের এই আদেশ পেয়ে পূর্ণবাবু মনের আনন্দে মুড়াপাড়ায় নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। তিনি মনে মনে একথা ভেবে নিশ্চিন্ত হলেন যে, লোকনাথ যখন কৃপা করেছেন প্রসন্ন হয়েছেন, তখন আর চিন্তা নেই। এবার তিনি বহু প্রার্থিত পুত্রসন্তানের মুখ দর্শন করতে নিশ্চয়ই পারবেন।
এই ঘটনার দশমাস পরেই মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়িতে শোনা গেল আনন্দ কোলাহল। পূর্ণবাবু পুত্রসন্তান লাভ করার আনন্দে দান-ধ্যান শুরু করে দিলেন। সেই নবজাতকের নাম রাখা হয় কেশবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনিই পরবর্তীকালে পূর্ণবাবুর উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন।
প্রথম দিকে যদিও তাঁকে সবাই ‘বারদীর ব্রহ্মচারী’ বলতেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর পুণ্য-প্রভা ও তপোবনের কথা দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে সংসার জ্বালায় তপ্ত-তাপিত কত মানুষ সঙ্কট মুক্তির আশায় তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। সবাই জানতেন, বারদীর আশ্রমে গিয়ে বাবা লোকনাথের আশ্রয় নিলেই সব জ্বালার অবসান, সব দুঃখের সমাপন।
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্মস্থান নিয়ে তাঁর ভক্তদের মধ্যে চলেছে এক চরম বিভ্রান্তিকর দাবি ও পাল্টা দাবি। একদল বলছেন, বারাসত মহকুমার চাকলা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, অন্যদল বলছেন বারাসত মহকুমার কচুয়া গ্রামে। তবে জন্ম তাঁর যেখানেই হোক—তাঁর লীলাক্ষেত্র হচ্ছে ঢাকা জেলার বারদী গ্রাম। বাংলা ১১৩৭ সালে (ইংরেজি ১৭৩০ সাল) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকানাই ঘোষাল এবং মাতা কমলাদেবী। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ পুত্র। পিতার সংকল্প অনুসারে মাতার সম্মতিতে তিনি মাত্র এগারো বছর বয়সে উপনয়নের দিনই আচার্য দীক্ষাগুরু ভগবান গাঙ্গুলির কাছে গৃহত্যগের সংকল্প ও ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা গ্রহণ করেন।
ঢাকা জেলার সব থেকে বড় জমিদার ভাওয়ালের রাজারা। সেই রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা একসময় সমগ্র দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। ভাওয়াল রাজাদের যেমন ছিল প্রভাব, তেমনি ছিল প্রতিপত্তি। এই জমিদার পরিবারের তৎকালীন রাজা খেতাবধারী ছিলেন রাজেন্দ্রনারায়ণ বাহাদুর। তিনি অনেকের মুখেই শুনেছেন, বারদীর ওই বিস্ময়কর অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রহ্মচারীর কথা। তিনি শুনেছেন, দেশ-দেশান্তর থেকে দলে দলে কৃপাপ্রার্থী মানুষ আসছেন বারদীতে।
এতসব কাহিনী শুনেটুনে একদিন ভাওয়ালের স্বনামধন্য রাজারও বাসনা হল বারদীতে গিয়ে ব্রহ্মচারীকে দর্শন করার। যেমন ইচ্ছা, তেমনিই কাজ।
যথাসময়ে পাত্র-মিত্র সভাসদ নিয়ে তিনি সপরিবারে বারদী যাত্রা করলেন। যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গীদের তিনি বললেন, ‘দেখ হে বাপু, ওই ব্রহ্মচারীর জাত-গোত্র কিছুই যখন জানা যায় না,—তখন ভূমিষ্ঠ হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করা, কিংবা পায়ের ধুলো নেওয়া একদম উচিত হবে না।’ রাজা যত বলেন, পারিষদরা বলেন, তার থেকেও বেশি। সবাই গলা বাড়িয়ে রাজার কথায় সায় দিলেন।
তারপর একসময় তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন বারদীর আশ্রমে। সবার আগে রাজা বাহাদুর এগিয়ে গেলেন লোকনাথ ব্রহ্মচারীর কাছে। লোকনাথের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ভুলেই গেলেন প্রণাম করার ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের কথা। বরং তিনিই সকলের আগে এগিয়ে গিয়ে লোকনাথকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন এবং পায়ের ধুলো নিলেন।
প্রণাম করার পরই তাঁর বিস্ময় গেল সহস্রগুণ বেড়ে, রাজাবাহাদুরের কাণ্ড দেখে লোকনাথ হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, ‘কেন বাবা! প্রণাম করবে না বলে তো মনে মনে স্থির করে এসেছিল !’ শুধু রাজাবাহাদুরই নন, ব্রহ্মচারীর মুখে একথা শুনে উপস্থিত পাত্র-মিত্র সভাসদ—সকলেই বিস্ময়ে হতবাক্। তাঁরা ভেবেই পেলেন না, লোকনাথ এ কথা জানলেন কিভাবে?
পরবর্তীকালে ভাওয়ালের রাজা, বৈষয়িক, দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক ইত্যাদি যে কোনও ব্যাপারে যখনই কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি ছুটে যেতেন বারদীতে। তিনি মনে করতেন, বাবা লোকনাথ হচ্ছেন শিবকল্প মহাপুরুষ।
আমরা যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময় এ দেশে সবেমাত্র ফোটো তোলার যন্ত্রপাতি এসেছে। রাজাবাহাদুরও একটা ক্যামেরা কিনেছেন। একদিন তিনি হাতীর পিঠে সব যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁর রাজধানী জয়দেবপুর থেকে বারদীতে গিয়ে হাজির। উদ্দেশ্য—বাবা লোকনাথের একটা ছবি তুলবেন। সেদিন তিনি বাবা লোকনাথের যে ছবি তুলে নিয়ে এসেছিলেন, সেইটি এই শিবকল্প মহাপুরুষের একমাত্র ছবি—যেটা আমরা সর্বত্র দেখতে পাই।
মহান সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন তাঁর ভক্ত। বিজয়কৃষ্ণ ঢাকাতে আশ্রম স্থাপন করে তাঁর ভক্তি সাধনায় মগ্ন ছিলেন। আর মাঝে মাঝে যেতেন বারদীতে। সেবার বিজয়কৃষ্ণ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিভ্রমণ করতে বেরিয়েছেন। হঠাৎ দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেখানে চিকিৎসার যতটুকু ব্যবস্থা করা যায়, সবই করা হল—কিন্তু তাঁর দৈহিক অবস্থার কিছুমাত্র উন্নতি হল না। একসময় তাঁর সেবকরা এই মহাসাধকের বেঁচে ওঠার সব আশাই ছেড়ে দিলেন।
সেই দুঃসংবাদ যথাসময়ে ঢাকায় এল। বিজয়কৃষ্ণের পরম ভক্ত ছিলেন শ্যামাচরণ বক্সী। তিনি গুরুর জীবন সংশয়ের এই দুঃসংবাদ শুনে পাগলের মতো হয়ে গেলেন। শেষপর্যন্ত তাঁর মনে পড়ল অগতির গতি বারদীর বাবা লোকনাথের কথা। তিনি আর সময় নষ্ট না করে ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির হলেন লোকনাথ বাবার আশ্রমে। লোকনাথের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বললেন, ‘দোহাই আপনার, আমার গুরুদেবের জীবন রক্ষা করুন।’
ভক্ত শিষ্য শ্যামাচরণের কান্নায় লোকনাথের মন গলল। তিনি বললেন, দেখা যাক, কি হয়। শুদ্ধ হয়ে ফিরে এসে পরবর্তীসময়ে বিজয়কৃষ্ণ বলেছেন, তিনি যখন মৃতপ্রায় হয়ে শয্যায় শুয়ে ছিলেন, তখন তাঁর সেবকরা দেখেছেন, তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন লোকনাথ। সেদিন এক অলৌকিক যোগবলে লোকনাথ সুক্ষ্মশরীরে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিজয়কৃষ্ণের শয্যাপার্শ্বে এবং তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন।
বারদীতে ছাব্বিশ বছর এই অলৌকিক লীলায় মগ্ন থেকে তিনি বাংলা ১২৯৭ সালের ১৯ জ্যৈষ্ঠ বেলা সাড়ে দশটায় নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন।