তুচ্ছ জিনিস নিয়ে আমরা মাতামাতি করি, কিন্তু বহু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেগুলির উপযুক্ত সংরক্ষণ, প্রচার, প্রসার জরুরি ছিল তা আমাদের মনোযোগ পায়না। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড এবং সুকিয়া স্ট্রিটের মোড়ে শতবর্ষেরও বেশি প্রাচীন রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিং রুমের ভবনটির দিকে তাকালে এই সত্যটা নতুন করে মনে পড়ে। জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলি ধন্য এই বাড়িটি বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। নোবেল পাওয়ার পর এই লাইব্রেরিতেই কলকাতায় প্রথম সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল কবিকে। ওপরের নামজাদা ব্যক্তিত্বরা ছাড়াও এই লাইব্রেরিতে নিয়মিত আসতেন ভগিনী নিবেদিতা, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রাজশেখর বসু, লর্ড এস পি সিনহা (যার নামে লর্ড সিনহা রোড) প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য’র মত বিদ্বৎজনেরা।

গোটা জায়গাটাতেই যেন একটা গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত ব্যাপার! এ ফুটে উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি বিজড়িত রায় বাড়ি, ও ফুটে জগদীশ চন্দ্র বসু ও অবলা বসুদের বাড়ি। অথচ এমন একটা জায়গায় থাকা লাইব্রেরি ভবনটি আজ সংস্কারের অভাবে মলিন! কলকাতায় ভাল হলের এখন বড়ই অভাব। কিন্তু লাইব্রেরি হলটি প্রায়শই বন্ধ থাকে। তবে একটু উদ্যোগ নিলেই তা চালু করা যায়। ৭০ এর দশকের শেষদিকেও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বহু নাট্য ব্যক্তিত্ব রামমোহন লাইব্রেরি হলে নিয়মিত অভিনয় করেছেন।
এটা ঘটনা যে দীর্ঘ সময়কালে লাইব্রেরি ভবন সংস্কার ও মেরামতির জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাড়ি ও হলটির আরও আধুনিকীকরণ এবং সংস্কারের দরকার। উত্তর কলকাতার অধিকাংশ হল ও প্রেক্ষাগৃহ এখন বন্ধ। এই সময়ে হলটি সংস্কার করে নিয়মিত অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থা করা গেলে সেই অভাব অনেকটাই মিটবে। বিশেষ করে শিয়ালদহ স্টেশন কাছাকাছি হওয়ার ফলে এখানে যাতায়াতও অনেক সহজ। সংস্কার ও আধুনিকীকরণের জন্য রাজ্য সরকারের হেরিটেজ কমিশনের গাইড লাইন অনুযায়ী একটা প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা পেলে একাজ এগোতে পারে।

লাইব্রেরিতে পুরনো আমলের বহু বই, দুষ্প্রাপ্য দলিল-দস্তাবেজ এবং মনিষীদের স্মৃতি বিজড়িত সামগ্রী রয়েছে। অনেকে সেসব দেখতে চান। কিন্তু লোকের অভাব থাকায় দেখানো যায়না। সরকার লাইব্রেরিকে সহায়তা করেছেন। তবুও এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি সহায়তাও যথেষ্ট নয়। তাই আগ্রহী মানুষদের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন গ্রন্থাগারের পরিচালকরা। ইতিহাস তো শুধু পাঠ নয় বরং তার সঙ্গে একটা সক্রিয় প্রচেষ্টাও জড়িয়ে থাকে। রাজা রামমোহন রায়ের ২৫০তম জন্ম শতবর্ষে তাঁর নামাঙ্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে সহায়তা করে আমরা ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
নিশ্চয় ই এই প্রতিষ্ঠানের সংষ্কার ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। যদি রামমোহন অনুরাগী জনসাধারণকে নিয়ে এই প্রচেষ্টা চালানো হয় তবে আমরা এতে যোগ দিতে পারি। আমি এই সংবাদটি রামমোহন অনুরাগীদের জানাচ্ছি।
সাথে আছি।