ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব তাঁর ‘Indus Valley Civilisation’ বইয়ে সুতকাজেনডোর নিয়ে তিনটিমাত্র বাক্য লিখেছেন। তবে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়, “কাজেই সিন্ধু বসতি যে সুদূর পশ্চিম অবধি মাক্রান সমুদ্রতীরবর্তী সোটকাকোহ-এর মতো স্থানে এবং পাকিস্তান-ইরানের সীমান্তপ্রদেশের নিকটবর্তী সুতকাজেন-ডোর-এর শক্তিশালী সমৃদ্ধ বসতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তার একটি ব্যাখ্যা অবশ্যই পাওয়া যাবে। সুতকাজেন-ডোর-এর বিপরীত দিকে, ওমান উপসাগরের উপরে ওমানে (প্রাচীন মাগান?) অবস্থিত ছিল রাস অল-জুনাইন ক্ষেত্র।”
সিন্ধু সভ্যতা তথা হরপ্পাসভ্যতা, বিশ্বের প্রাচীনতম শহরভিত্তিক সভ্যতাগুলোর একটি, খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। এই সভ্যতার বহু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের মধ্যে সুত্কাগেনদোর একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তানে অবস্থিত, ইরান সীমান্তের খুব কাছে। ধারণা করা হয়, এটি ছিল সিন্ধু সভ্যতার পশ্চিমতম প্রহরীচৌকি বা বন্দরনগরী, এবং মেসোপটেমিয়া ও পারস্য উপসাগর অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে এটি সামুদ্রিক বাণিজ্যে যুক্ত ছিল।
তবে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের মতো সুত্কাগেনদোরও বারবার লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট কারণ, যা একদিকে এই স্থানের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে, অন্যদিকে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্পষ্ট করে।
লুণ্ঠনকারীরা সাধারণত এমন বস্তু খোঁজেন যেগুলোর বাজারমূল্য অনেক বেশি — যেমন মনিপুঁতির মালা, পোড়ামাটির মূর্তি, অলংকৃত পাত্র, ধাতব সরঞ্জাম, সিলমোহর, বা গহনা। সুত্কাগেনদোর যেহেতু সিন্ধু সভ্যতার অংশ, সেহেতু এখানে এমন বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোর অনেকটাই আজও মাটির নিচে অগোচরে রয়েছে।
এই প্রত্নবস্তুগুলো কালোবাজারে বিক্রি হয়, যেখানে সংগ্রাহকরা সেগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য কিনে নেন, ফলে এগুলো গবেষণার আওতার বাইরে চলে যায়, এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হয়।
সুত্কাগেনদোর বেলুচিস্তানের একান্ত দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। এই প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারের নজরদারি অত্যন্ত সীমিত। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলো রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল সেখানে নেই। ফলে লুণ্ঠনকারীরা প্রায় নির্ভয়ে কাজ চালাতে পারে।
তাছাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চোরাচালানচক্র সক্রিয় থাকায় প্রত্নসম্পদের অপহরণ আরও সহজ হয়ে ওঠে।
সুত্কাগেনদোর সংলগ্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ হয়তো এই স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। অনেক সময় অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে তারা প্রত্নসম্পদের সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না। জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেকেই লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বা দালালদের কাছে প্রত্নবস্তু বিক্রি করে দেন।
সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ না থাকলে এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া কঠিন।
মহেঞ্জোদারো বা হরপ্পার মতো স্থলগুলি বহু গবেষণা ও খননের আওতায় এসেছে, কিন্তু সুত্কাগেনদোর এখনো তুলনামূলকভাবে অগবেষিত। ১৯৬০-এর পর কোনও খননকার্য হয়নি সেখানে। জায়গাটি হেরিটেজ কর্তৃপক্ষ দ্বারা সংরক্ষিতও নয়। ফলে লুণ্ঠনকারীরা এখানে সহজেই খনন করতে পারে, এবং সেগুলো নিয়ে যাওয়ার পর সেগুলোর উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্র, জরিপ, বা নথিপত্রের অভাবের ফলে লুণ্ঠিত বস্তুগুলোকে শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার করাও কঠিন।
ইন্দাস সভ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। কারণ এই সভ্যতার লিপির আজও পাঠোদ্ধার হয়নি এবং অনেক দিক অজানা রয়ে গেছে। ফলে এই সভ্যতার প্রত্নবস্তু সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সুত্কাগেনদোর মতো কম পরিচিত স্থান থেকে প্রাপ্ত বস্তুসমূহ কালোবাজারে “নতুন আবিষ্কার” হিসেবে মূল্য পায়।
সুত্কাগেনদোর লুণ্ঠন কেবল ওই দেশের একক ক্ষতি নয়, এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি চুরি হওয়া বস্তু মানবজাতির অতীতকে জানার সুযোগকে সীমিত করে দেয়। এই প্রত্নলুণ্ঠন রোধ করতে হলে প্রয়োজন বহুমাত্রিক উদ্যোগ — সরকারি তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ প্রত্নবস্তুর বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং এইসব প্রত্নস্থানকে বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসেবে সম্মানিত করা।
যতদিন এসব ব্যবস্থা গৃহীত না হয়, ততদিন সুত্কাগেনদোরের মতো প্রত্নস্থান লুণ্ঠনকারীদের হাতে প্রতিনিয়ত নিঃশেষ হতে থাকবে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করা পর্যন্ত।