শীতের কলকাতা মানেই কমলালেবু, ভুটিয়া বাজারের সোয়েটার, পার্ক স্ট্রিটের কেক আর আলতো রোদ মেখে ঘুরে বেড়ানো। এই প্রেমের মরশুমে ঘোরার আদর্শ যায়গা হলো স্থাপত্য, লেক আর সবুজ গালিচায় ঘেরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হোক বা বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা বা প্রেম… ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সবেতেই অতুলনীয়।
আজ গল্প হোক কলকাতার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ, লর্ড কার্জনের স্বপ্নের স্মৃতিসৌধকে নিয়ে।
তখন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন। দেড়শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের পর উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপত্যের নিদর্শন গড়ে তুলতে পারেনি ব্রিটিশ রাজ। মহারানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর সংবাদের খবর এলো ১৯০১ সালে। এতদিন ধরে যে কল্পনা কার্জনকে অশান্ত করে রেখেছিল তখন তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার সুযোগ উপস্থিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, দুটি জাতির যে যোগসূত্র স্থাপন করে এই মহান সাম্রাজ্য, তার সংমিশ্রণের পশ্চাতে মহারানী ভিক্টোরিয়ার দূরদৃষ্টি প্রভাব অনস্বীকার্য। মহারানীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ-এর উদ্দেশ্যে স্মৃতিসৌধ স্থাপনের জন্য তিনি এগিয়ে এলেন। মাসখানেকের মধ্যেই একটি জরুরী বৈঠক ডেকে একটি আবেদন রাখালেন যে, মহারানীর এমন একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হবে যেখানে ব্রিটিশ কিম্বা ভারতীয়, ধনী কিম্বা গরিব সকলের প্রবেশাধিকার অবাধ থাকবে।

কিন্তু এমন স্মৃতিসৌধ যা কার্জন সাহেব কল্পনা করেছেন তার তৈরি পেছনে রয়েছে বিরাট খরচ। লর্ড কার্জনের তহবিলের আবেদনে ভারতের সরকারী কর্মকর্তা, জমিদার, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ জনগণ উদারভাবে সাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে এগিয়ে এলেন দেশীয় রাজারা। এরা সরকারের দুর্ভিক্ষ কিংবা বন্যা তহবিলে লক্ষ্যাধিক মুদ্রা অনুদান দিতে কখনো পিছপা হননি। মহারাজ সিন্ধিয়া দিলেন ৭০ হাজার পাউন্ড, কাশ্মীরের মহারাজা দিলেন ১ লক্ষ পাউন্ড। বৃটিশ হর্তাকর্তাদের গা ঘেঁষে থাকার জন্য রাজাদের প্রয়াসে কার্জনের পথ মসৃণ হয়ে আসে। তিনি ঘোষণা করেন ১০ হাজার পাউন্ড আর তার বেশি অনুদান যে কেউ দেবে, তাদের নাম স্মৃতিসৌধের মর্মরগাত্রে খোদিত থাকবে। সেই আমলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মোট ব্যয় হয়েছিলো এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা।
এবার সমস্যা হলো কোথায় তৈরি হবে স্মৃতিসৌধ আর কাকে দিয়ে তৈরি হবে তাজমহলের মত একটি কালজয়ী স্থাপত্য! তাজমহলের মত সৃষ্টির স্বপ্ন কার্জনের মধ্যে সর্বদা খোঁচা দিতে লাগলো। তাজমহলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে সে চেষ্টায় লেগে পড়লেন কার্জন সাহেব। ব্রিটিশ ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান স্যার উইলিয়াম এমার্সনের উপর দায়িত্ব দেওয়া হলো নকশার। ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীর সঙ্গে মুঘল শিল্পকলা যুক্ত করে স্মৃতিসৌধের নকশা প্রস্তুত করেন এমার্সন। যদিও স্থাপত্যে মিশরীয়, ভেনেটিয়ান এবং ডেকানি সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট। এমন বৈচিত্রময় স্থাপত্যের নিদর্শন ভারতে অদ্বিতীয়।

কলকাতা ময়দানের দক্ষিণ ভাগে ক্যাথিড্রল অ্যাভিনিউয়ের ওপরে যেখানে একটি জেলখানা ছিল, ৬৪ একর জমিতে ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধ তৈরি হবে বলে ঠিক করা হলো। স্মৃতিসৌধ তৈরির জন্য জেলখানাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল আলিপুরে (যেটি এখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেল (মিউজিয়াম) নামে পরিচিত)।
সৌধনির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হলো মার্টিন এন্ড বার্ণ কোম্পানি নামে কলকাতার এক নামী সংস্থাকে। এই সংস্থার যুগ্ম মালিকদের একজন ছিলেন স্যার রাজেন মুখার্জি। সৌধ নির্মাণের পর ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধি দেন।

সৌধ নির্মানের মার্বেল পাথর আনা হলো যোধপুর এর মাকরানার খনি থেকে যে পাথর সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয় তাজমহলে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯০৬ সালে স্মৃতিসৌধ নির্মাণে কাজ শুরু হয়, সৌধটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন রাজা পঞ্চম জর্জ। যদিও অফিসিয়ালি নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯১০ সাল থেকে কাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল আরো ১১ বছর অবশেষে ১৯২১ সালে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নির্মাণ শেষ হয়। সবুজ ঘাসে ঢাকা বৃক্ষের ছায়ায় ঘেরা সৌধ সংলগ্ন অপরূপ প্রাকৃতিক বাগানটির নকশা প্রস্তুত করেছিলেন লর্ড রেডেসডেল ও স্যার জন প্রেইন। বাগানের প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনেই রয়েছে রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তি।
৮ ফুট উঁচু, ৩৯৬ ফুট লম্বা এবং ২২৮ ফুট চওড়া কেন্দ্রীয় সৌধের চারিদিকে চারটি টাওয়ার। মূল চুড়াকে ঘিরে রয়েছে সাতটি প্রতিটি মূর্তি যেগুলি শিল্প, স্থাপত্য, দাক্ষিণ্য, ন্যায়বিচার, মাতৃত্ব, বিদ্যা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। সৌধের প্রধান হলের ঠিক মাথায় উপর একটি মার্কারি ভরা ব্রোঞ্জের গ্লোব। তার ওপর দাঁড়িয়ে ছয়টন ওজনের দুটি পাখনাওয়ালা একটি নারীর মূর্তি যার বাম হাতে একটি লম্বা শিঙা, ডান হাতে একগুচ্ছফুল। বায়ুপ্রবাহ শক্তিশালী হলেই চারিদিকে ঘুরতে থাকে বল বিয়ারিং দিয়ে আটকানো সেই মূর্তি। সেই আমলে একে নিয়ে নানা গুজব রটেছিল। অনেকেই বলতেন এই পরী নাকি ব্রিটিশদের চর, উচুঁতে দাঁড়িয়ে গোটা দেশের নজরদারি করছে।

স্মৃতিসৌধের ভিতরে রয়েছে ২৫টি গ্যালারি যেখানে রয়েছে প্রখ্যাত চিত্রকর টমাস ড্যানিয়েলের আঁকা পুরনো কলকাতার ছবি, রয়েছে নানান সংরক্ষিত শিল্প, অংকন শিল্প ও ক্যামেরাবন্দী ছবি, রয়েছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের রচনার চিত্রিত দুর্লভ সংস্করণ, ব্রিটিশ রাজ পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তির তৈলচিত্র ইত্যাদি। এছাড়া গ্যালারিতে রয়েছে বিপিন বিহারী দত্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রাজা রামমোহন রায়, হাওড়া ব্রিজ, বেণীমাধব ভট্টাচার্যের দেবী কালীর বিখ্যাত চিত্রকর্ম। কেন্দ্রীয় গ্যালারিতে রয়েছে একটি পিয়ানো যা ভিক্টোরিয়ার দশ বছর বয়সে তাঁকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়।
২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ হাইকোর্টের একটি আদেশের পর, উদ্যানগুলির জন্য একটি এন্ট্রি ফি নেওয়া হয়। বর্তমানে উদ্যানে ও মেমোরিয়ালে প্রবেশের জন্য জনপিছু ২০ ও ৩০ টাকা নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বায়ু দূষণের কারণে স্মৃতিসৌধের ধবধবে সাদা পাথর ক্রমশ কালো হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৩ সালে ধবধবে সাদা শ্বেত পাথরের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে সম্পূর্ণ কালো রং করে দেওয়া হয়েছিল জাপানি সৈন্যদের বোমা আক্রমনের ভয়ে। কারণ শ্বেত পাথরের ইমারত বহুদূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি সতর্কতা স্বরূপ ভিক্টোরিয়ার ছবি প্রকাশও বন্ধ করা হয়।
ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের উত্তর দিকে অবস্থিত কুইন্স ওয়ে, ডান্সিং ফাউন্টেন, তারপর বিস্তীর্ণ ব্রিগেড প্যারেড ময়দান, দক্ষিণে আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস রোড এবং কলকাতার বিখ্যাত এসএসকেএম হসপিটাল। পূর্বে কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল, এমপি বিড়লা তারামণ্ডল একাডেমি অফ ফাইন আর্টস এবং রবীন্দ্র সদন এবং পশ্চিমে রয়েছে কলকাতা রেসকোর্স ময়দান।
কুড়ি বছর লেগেছিল লর্ড কার্জনের স্বপ্নের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরি হতে। এই শীতে ইচ্ছা হলেই ঘুরে আসতে পারেন ময়দানের সবুজ গালিচায় মোড়া কলকাতার হার্টথ্রব ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে।