রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতাটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতেই হচ্ছে, —
“মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা
সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।
ভারতসমুদ্রের তীরে
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে
আজ নেই, কোনো এক নগরী ছিলো একদিন,
কোনো এক প্রাসাদ ছিলো;
মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ:
পারস্য গালিচা, কাশ্মীরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা,
আর তুমি নারী —
এই সব ছিলো সেই জগতে একদিন।”
গুজরাটি ভাষায় লোথাল মানে মৃতের ঢিবি। মহেঞ্জোদারো শব্দটির অর্থও মৃতের ঢিবি। এটি অবশ্য সিন্ধি ভাষায়।
তাহলে তামিলে কি কোনও অর্থ হয় না? দেখা যাচ্ছে, তামিলে লট্টি মানে বড় দণ্ড। জাহাজঘাটায় বা নৌবন্দরে যারা কাজ করত, তাদের হাতে থাকত বড় লাঠির মত দণ্ড। একেই প্রয়োজনে নৌকার লগি বা দাঁড় হিসেবে ব্যবহার করা হত। তাই লট্টি থেকে লোট্টাল হয়ে লোথাল আসতেই পারে।
সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা তথা হরপ্পাসভ্যতা ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম নগর সভ্যতাগুলোর একটি, যা খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিকাশ লাভ করে। উন্নত নগর পরিকল্পনা, সুসংবদ্ধ বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য এই সভ্যতা সুপরিচিত। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, ধোলাভিরা ও লোথাল — এই সভ্যতার অন্তর্গত বহু গুরুত্বপূর্ণ নগরীর মধ্যে লোথাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ছিল একটি প্রাচীন সমুদ্রবন্দর নগর এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও স্থাপত্য ক্ষেত্রে এর অনন্য অবদান রয়েছে।
লোথাল বর্তমান ভারতের গুজরাট রাজ্যের আমেদাবাদ জেলার ভাল অঞ্চলে, খাম্বাত উপসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত। এটি ১৯৫৪ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং ১৯৫৫ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগ (ASI) এস.আর.রাও-এর নেতৃত্বে এর খননকাজ সম্পন্ন করে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৪০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত এই শহরটি ছিল সিন্ধু সভ্যতার দক্ষিণতম নগরীগুলোর একটি এবং এটি নদীপথ ও সমুদ্রপথে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
লোথালের এই ভৌগোলিক সুবিধা, — নদীর মোহনার পাশে অবস্থান, এটিকে একটি কার্যকর সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তুলেছিল এবং বিদেশি বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
লোথালও অন্যান্য হরপ্পীয় শহরের মতো সুপরিকল্পিত ছিল। শহরটি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল — উচ্চ নগর (অ্যাক্রোপলিস) এবং নিম্ন নগর। উচ্চ নগর ছিল একটি উঁচু ভিত্তির ওপর নির্মিত এবং এটি প্রশাসনিক ও অভিজাত শ্রেণির আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিম্ন নগর ছিল সাধারণ মানুষের বসবাসের স্থান, যেখানে কর্মশালা, বাজার ও আবাসস্থল ছিল।
নগরটির রাস্তাগুলো একটি গ্রিড-প্যাটার্নে সাজানো ছিল এবং বাড়িগুলোতে ব্যবহৃত ইটগুলো ছিল একই মাপের। উন্নত নিকাশিনালা ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু জলবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে হরপ্পীয়রা যে স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দিত, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় লোথালে।
লোথালের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ডকইয়ার্ড বা জাহাজঘাটা, যা বিশ্বের প্রাচীনতম ডকইয়ার্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় ২১৮ মিটার দীর্ঘ ও ৩৭ মিটার প্রশস্ত এই গঠনটি একটি প্রাচীন নদীপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যাতে জোয়ারভাটার সময় নৌকা আসা-যাওয়া করতে পারত। এই ডকইয়ার্ডে একটি স্লুইস গেট বা জলনিয়ন্ত্রণ গেট ছিল, যা জলের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতো।
এই প্রকৌশল কীর্তি প্রমাণ করে যে হরপ্পীয়রা জলবিজ্ঞানে যথেষ্ট দক্ষ ছিল এবং তারা জোয়ার-ভাটার বিজ্ঞান ভালোভাবে জানত। এটি লোথালকে একটি শক্তিশালী সমুদ্রবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল।
লোথাল ছিল সিন্ধু সভ্যতার একটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। এখানে মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) সঙ্গে বাণিজ্যের বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে — যেমন: মেসোপটেমীয় সিলমোহর ও দ্রব্যাদি। এখানে মূলত পাথরের গয়না, কাচের পুঁতি, ধাতব দ্রব্য ও মৃৎপাত্র তৈরি হতো এবং সেগুলো বিদেশে রপ্তানি করা হতো।
লোথালের কারিগরেরা অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বিশেষ করে কার্নেলিয়ান পাথরের পুঁতির জন্য এই শহর বিখ্যাত ছিল। এখানে পাওয়া গেছে বহু কর্মশালা, যেখানে চুল্লি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ব্যবহৃত হতো। অর্থনৈতিক লেনদেনে ব্যবহৃত হতো মানক মাপে নির্মিত পাথরের বাটখারা, যা প্রমাণ করে যে এখানে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।
শহরটিতে বড় বড় গুদামঘরও পাওয়া গেছে, যেখানে নানাপ্রকার দ্রব্য সংরক্ষিত হতো। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে লোথাল কেবল উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের দিক থেকেও অত্যন্ত দক্ষ ছিল।
লোথালে আবিষ্কৃত নিদর্শনসমূহ এই শহরের অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক মনোভাবের পরিচয় দেয়। টেরাকোটার মূর্তি, খেলনা, প্রাণীর প্রতিকৃতি, মৃৎপাত্র ও সিলমোহর — সবই শিল্পকুশলতার নিদর্শন। একটি বিখ্যাত আবিষ্কার হলো টেরাকোটার একটি জাহাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, যা লোথালের সামুদ্রিক চরিত্রের প্রমাণ।
এখানে পাওয়া মৃৎপাত্রগুলোতে জ্যামিতিক ও প্রাণীচিত্র আঁকা ছিল। তদুপরি, ফায়েন্স নামক একটি কৃত্রিম পদার্থ দিয়ে গয়না নির্মাণের মাধ্যমে হরপ্পীয়দের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রমাণ মেলে।
এছাড়াও, লোথালে যে সিলমোহর ও হরপ্পীয় লিপি পাওয়া গেছে, তা প্রমাণ করে যে এখানে প্রশাসনিক লেনদেনের জন্য লিখিত নথিপত্র ব্যবহৃত হতো। যদিও হরপ্পা লিপির স্বরূপ আজও অজ্ঞাত, তবু এর ব্যাপক ব্যবহার শহরের সাংগঠনিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
লোথালের নগর পরিকল্পনা, ডকইয়ার্ড, ওজন-মাপের বাটখারা ব্যবহার এবং সিলমোহর — সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত সমাজের চিত্র তুলে ধরে। যদিও কোনো রাজপ্রাসাদ বা বিশাল মন্দির পাওয়া যায়নি, তথাপি শহরের পরিকাঠামো ও সার্বজনীন নির্মাণকর্মের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এখানে একটি সুসংবদ্ধ ও দায়িত্ববান প্রশাসনিক কাঠামো ছিল।
শ্রমের বিভাজনও স্পষ্ট, — কারিগর, ব্যবসায়ী, কৃষক ও প্রশাসক, — সবাই নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করত। এটি একটি জটিল এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন।
খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে লোথাল ও অন্যান্য হরপ্পীয় শহরগুলির পতন ঘটে। এর পিছনে বিভিন্ন কারণ বলা হয়েছে — আবহাওয়ার পরিবর্তন, ভূমিকম্প, নদীর প্রবাহ পরিবর্তন, বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পতন। লোথালের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, নদীপথ পরিবর্তনের ফলে ডকইয়ার্ড বালুচরে পূর্ণ হয়ে যায় এবং শহরের বাণিজ্য বিপর্যস্ত হয়।
তবে, এর উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। লোথাল আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে একটি জাদুঘরও রয়েছে, যা পর্যটক ও গবেষকদের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণার জন্যও প্রস্তাবিত হয়েছে।
লোথাল ছিল সিন্ধু সভ্যতার প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নগর পরিকল্পনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এর ডকইয়ার্ড, গ্রিডভিত্তিক নগরব্যবস্থা, উন্নত নিষ্কাশন ও শিল্পকর্ম প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের প্রমাণ বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে প্রায় ৪০০০ বছর আগে হরপ্পীয়রা নৌ-বাণিজ্য, নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিতে কতটা দক্ষ ছিল।
লোথাল শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, বরং এটি প্রাচীন ভারতের বাণিজকেন্দ্র হিসেবে সমধিক প্রসিদ্ধ ছিল।
ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের ভাষায়, — “কেবলমাত্র ছোট নৌকা, তাও উজানি পালের হাওয়ায় এখানে নোঙর করতে পারে। আর প্রকৃত সমুদ্রবন্দর অবশ্যই দূরে ছিল। ঘগগরের নিকটে মধ্যযুগে খাম্বাটের বন্দর হিসেবে যে সমুদ্রবন্দরটি ব্যবহৃত হতো, সেখানেই কোথাও হয়তো এই বন্দরটির অবস্থান ছিল।”
হরপ্পাসভ্যতার বন্দর হিসেবে অতীতে লোথাল বন্দরের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। লোথাল গুজরাটের প্রাচীন কাম্বে এবং বর্তমানে খাম্বাটের কাছে অবস্থিত। এখানকার জমি ছিল লোনা। সেই যুগে এখানে বাবলা আর তেঁতুল গাছের সংখ্যা ছিল বেশি। এর কাছাকাছি নাল সরোবর নামে একটি জলাভূমি অবস্থিত। কাম্বে উপসাগর থেকে একটি খাঁড়ি মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করত। সেখান থেকে লোথালে প্রবেশের একটি জলপথ ছিল। মূল কেন্দ্রটি ৪০০×৩০০ মিটার এবং ১৩ মিটার চওড়া ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। ঠিক কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল, তা আজও অজানা।
কেন্দ্রটি পুরনো একটি নদীখাতে অবস্থিত। এই নদীখাতকে ঘিরে একটি শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। আগেই বলা হয়েছে, কেন্দ্রের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলকে অ্যাক্রোপলিস বলা হয়, আর বাকি অংশটুকু হলো নিম্ন-শহর। শহরের শাসকরা অ্যাক্রোপলিসে বাস করতেন। এখানে পাকা স্নানাগার, নোংরা জল ও ময়লা নিষ্কাশনের জন্য নর্দমা, পানীয় জলের কূপ, গুদামঘর অবস্থিত ছিল। জানাই আছে, নিম্ন শহর দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে ধনী, সাধারণ ব্যবসায়ী এবং কারিগরেরা বাস করত। আবাসিক এলাকাটি বাজারের উভয় পাশে অবস্থিত ছিল। লোথালের সমৃদ্ধির বছরগুলোতে নিম্ন শহরটি পর্যায়ক্রমে প্রসারিত হয়েছিল। এখানে সন্ধানে মিলেছে একাধিক পাকা সড়কের। এর মধ্যে একটি সড়ক ১৩ মিটার প্রশস্ত। একসময় সিন্ধুসভ্যতার বণিকদের কথাবার্তায় মুখরিত থাকত এই জায়গা।

শহর প্রধানের ব্যক্তিগত শৌচাগার ও স্নানাগার
লোথালের প্রত্নক্ষেত্র থেকে আবিষ্কৃত পোড়া ইটের তৈরি ঘরবাড়িগুলো বেশ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। একটি বাড়ির ঘর থেকে একটি শাঁখ, পাথরের শিল, একটি নোড়া উদ্ধার করা গেছে। ধারণা, এখানে পুঁতি তৈরির কারখানাও ছিল। এখানের এক বাড়িতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া গেছে। নোংরা জল বাইরের জালায় গিয়ে পড়ার ব্যবস্থাও ছিল। তবে আয়তনের দিক দিয়ে লোথাল ছিল হরপ্পা বা মহেনজোদাড়োর চেয়ে ছোট। যেহেতু অনুমান করা হচ্ছে এটি একটি আন্তঃবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তাই স্বাভাবিকভাবে এখানে ছোট ছোট নৌকাই নোঙর করতো। আবার এও বলা হচ্ছে, এটি ক্ষুদ্র একটি নৌ-বন্দর হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, এর থেকে আরও দূরে সমুদ্রের কাছে বড় বন্দর ছিল। সেই বন্দরে দূর থেকে আগত নাবিকেরা তাদের বড় বড় জাহাজ ভেড়াতো।

লোথালের বন্দরঘাট
লোথাল ব্যবহৃত হতো উপ-বন্দর হিসেবে। বন্দর হিসেবে লোথালের আয়তন ছিল বেশ ছোট। এটি ছিল ২১২ থেকে ২১৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৩৫ থেকে ৩৭ মিটার প্রশস্ত। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত ছোট একটি জলাধার সমুদ্রবন্দর হয় কী করে? আবার এর চারপাশ ইট দিয়ে বাঁধানো। অনেক বড় পুকুরও তো এর থেকে বড় হয়। উত্তর হিসেবে ইতিহাসবিদরা বলেছেন, সম্ভবত সমুদ্রের কাছে নয়, বরং দূরবর্তী কোনো স্থানের সঙ্গে এই নিম্নভূমির সংযোগ সুদূর অতীতে ছিল। যে কারণে একে ছোট বন্দর বা উপ-বন্দর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এটি কি তাহলে ছিল বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলে সিন্ধুসভ্যতার বন্দরনগরী সুতকাগেনদর?

নিম্ন শহর
আবার অনেকে এই দাবিও উত্থাপন করেন যে, এটি ছিল সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য একটি জলাধার। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেও অনেকে গণ্ডগোল পাকাবে। কারণ, সেচের জল সরবরাহের জন্য এমন জটিল স্থাপত্য গড়ে তোলার কোনো প্রয়োজনই নেই। ক্ষুদ্র অ্যাক্রোপলিসের ভেতরে পুষ্করিণীর কাছে অবস্থিত গুদামঘরে কাদা ইটের একটি পাটাতন রয়েছে। সম-আকারে অসংখ্য কাদা-ইটের খাড়াভিতের উপর পাটাতনটি স্থাপিত। এখানে কাঠের খাঁচার মধ্যে পণ্যের বস্তা সার সার করে রাখা থাকত। এই জায়গা থেকে প্রায় ৬৫টি সীলমোহর উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তৎকালীন সময়ে লোথাল বন্দর যে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নগর পরিকল্পনা
তখনকার রাস্তাগুলো ছিল কাঁকর বা পোড়ামাটির নুড়ি বিছানো অথবা কাদা-ইট আর বালির কাঁকর দিয়ে বাঁধানো। সুপ্রশস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নালির জল প্রবাহিত হয়ে একটি নর্দমার ডোবা এবং জাহাজঘাটায় গিয়ে পড়ত। এখানে পুঁতি তৈরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পুঁতির কারখানায় দশটি ঘর এবং কাজ করার জন্য বড় একটি উঠান ছিল। একসাথে একাধিক কারিগর যাতে সচ্ছন্দে কাজ করতে পারে, সেজন্য পাঁচটি চুল্লি এবং বেসিনের ব্যবস্থা ছিল। পুরো শহরকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছিল কাদামাটির ইট দ্বারা নির্মিত প্রাচীর। লোথাল বন্দরের কাহিনী মৌর্য যুগের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আলোচনায় খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, মৌর্য যুগের আগেও সমুদ্রবন্দর হিসেবে লোথালের কথা বেশ কিছু জায়গায় উঠে এসেছে।

লোথালের একটি প্রাচীন কূপ
সিন্ধু সভ্যতার সময়ে ব্রোঞ্জ যুগের একটি মানচিত্র থেকে অনুমান করা হচ্ছে, লোথাল সমুদ্রের নিকটবর্তী এক স্থানে অবস্থিত ছিল। বিশেষ কোনো ছোট নদীর সাথে লোথালের সংযোগ ছিল। সমুদ্র থেকে ছোট নদীপথে নৌকায় করে লোথালে পণ্য পরিবহন করা হতো।
এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক-ঐতিহাসিক অতুল সুর বলেছেন, — “বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল গুজরাটের অন্তর্ভুক্ত লোথাল। এখানে ছিল প্রাচীন জগতের এই বিরাট পোতাশ্রয়। বাঙালী বণিকরাও যে লোথাল থেকে আরও অগ্রসর হয়ে ওই পথে নিজেরা ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহের সাথে বাণিজ্য করতে যেত, এর প্রমাণও আছে।”
এই তথ্য থেকে আরেকটা যুক্তির উদয় হয় যে, লোথাল ছোট নৌ-বন্দর ছিল না। আয়তনের দিক দিয়ে বেশ বড় বন্দরই ছিল। তবে তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল হরপ্পার যুগ পর্বেই। পরবর্তীতে হয়তো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে লোথাল পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন সেটাকে পুনঃখননের মাধ্যমে বড় আয়তনে নতুন বন্দর হিসেবে রূপ দেওয়া হতে পারে। হয়তো তা পূর্বেকার স্থানে না হয়ে, গুজরাটের অন্য কোনো স্থানে তৈরি করা হয়েছিল।

লোথালের জলনির্গমন-প্রণালী
সিন্ধুসভ্যতার সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত এ অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যবস্থা পাকাপোক্ত ছিল অনেক দেশের সঙ্গে। লোথালে প্রচুর গুদাম ঘরের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাই, লোথালকে অনেকে বাণিজ্যিক শহর হিসেবেও অভিহিত করেন। লোথালের গুদামঘর থেকে পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া গেছে। পণ্য ও দ্রব্যাদির পাত্রের মুখ বন্ধ করে সিল মারা হতো। কোথাকার পণ্য কোথায় যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করার জন্যই এই ব্যবস্থা। যেটাকে বর্তমান যুগের বিভিন্ন কোম্পানির পার্সেলের সাথে তুলনা করা যায়। সিলের ছাপ যেসব পণ্যের উপর অঙ্কিত ছিল, সেসব পণ্য সিন্ধু নদ হয়ে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোথালে উপনীত হতো। বণিকদের কোলাহলে মুখরিত হত বন্দরনগরী।

জলকপাট বা স্লুইসগেটের ধ্বংসাবশেষ
লোথালে বৃহৎ কোনো বন্দরের সন্ধান না পাওয়া গেলেও এটাকে ছোটখাটো নৌ-বন্দর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই বন্দর সিন্ধুর বিভিন্ন শাখানদী থেকে আসা পণ্যবাহী নৌকা অন্তত বর্ষায় লোথালের বন্দরে প্রবেশ করতে পারত। সবরমতি নদী দিয়ে এই বন্দর আরবসাগরের উপকূলবর্তী ধোলাভিরার সাথে যোগাযোগ রাখত। এই বন্দরের মারফত সিন্ধুসভ্যতার মানুষ মেসোপটেমিয়া, মিশর ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য যাতায়াত করতে পারত। মধ্যবর্তী বন্দর ছিল সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদরে। মেসোপটেমিয়ায় প্রাপ্ত ষাঁড়ের ছবিওয়ালা সিলমোহর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের অকাট্য প্রমাণ। ধাতুপাত্র, স্বর্ণ, গহনা এবং সজ্জিত অলঙ্কার, ওজন পরিমাপের বাটখারা, সিলমোহর, মাটির পাত্র লোথালের মানুষজনের রুচিশীল সংস্কৃতির প্রমাণ তুলে ধরে। লোথাল থেকে পুঁতি, রত্নপাথর, হাতির দাঁত রপ্তানি করা হতো। চাষাবাদ করে লোথালের বাসিন্দাদের জীবনে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি বলে, বন্দরের আয়ই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। মূলত নৌবাণিজ্যই ছিল তাদের জীবিকা।
লোথালের সঙ্গে বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলে দাস্ত নদীর তীরে অবস্থিত হরপ্পাসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদরের সম্পর্ক ও যোগাযোগ কীরকম ছিল, তা জানা দরকার। এবিষয়ে তুলনামূলক আলোচনা না করলেই নয়
লোথাল ও সুতকাগেনদর ছিল সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার (Indus Valley Civilization) দুটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। উভয় নগরীই এই প্রাচীন সভ্যতার বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ভৌগোলিক অবস্থান-
বন্দর হিসাবে কার্যকারিতা :
লোথাল:
সুতকাগেনদর:
৩. বাণিজ্যিক সম্পর্ক:
এগুলি সড়ক বা উপকূলীয় পথে প্রথমে সুতকাগেনদরের মাধ্যমে পশ্চিমে, ও লোথালের মাধ্যমে পূর্ব ও দক্ষিণে সমুদ্রপথে পরিবাহিত হতো। লোথাল থেকেও পণ্য সুতকাগেনদর হয়ে মেসোপটেমিয়ায় রপ্তানি হত।
৪. সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য:
মনে হয়, লোথাল, ধোলাভিরা হয়ে পণ্য আরবসাগরীয় নৌপথে চলে যেত মাকরান উপকূলের সুতকাগেনদরে। সেখান থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে মেসোপটেমিয়ার ব্যবিলন পর্যন্ত চলে যেত। লোথাল, ধোলাভিরা ও সুতকাগেনদর ছিল একই যাত্রাপথের তিনটি বিন্দু। একটিকে বাদ দিলে বৃত্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।