যে ঘটনা গল্প বিশেষে লিখি। সে ঘটনা বহুদিনের, গোঁসাই তার যজমান নিত্যকে বলে, নিত্য গোপালপুরের শোভারামকে বলে, শোভারাম গৌরকে বলে। এ প্রকারে ঘটনা পরম্পরা আসে। প্রকাশ থাক যে গোঁসাই এ গল্পের একটি চরিত্র। সে চরিত্রর নাম মামা।
মনসাপাতার কাজল পরে বসে নবীন বালা, বেশ দুম্সো চেহারা তার হাতে মোটা মোটা তাগা, গলায় পাটিহার। মেয়ের গয়নাও কিছু পরেছে।—বয়েস হয়েছে। দু-একটা গোঁফ আছে এই মেয়েমানুষটির।
গামছা পরে গায়ে একটা নামাবলী। চাঁদি কিত্তুনি কৃষ্ণের অস্রাত্তরশতনাম এখন সুর করে পড়ে।
নবীনবালা বললে, “হ্যাঁরে ঠিক বলেছিস তো দেখিস অধম্ম করাস নি বাপু ভরা সন্ধেবেলা…”
হুকোতে টান দিয়ে সুকো গয়লানী বললে, “হগগা তুমি বেশ দেখতে পাচ্ছো…”
নবীনবালা তার প্রতি উত্তর দিলে—“ঠাওর করছি, কেমন যেন খোলা খোলা…”
নিজের কোলের গয়নার পুঁটলিটা সামলে ধরলে। গয়নার পুঁটলি না তো প্যাচার খপ্পর।
“নাঃ ভরা সন্ধেবেলা বললে কিনা তাই, এখন ফুটফুটে জোচনা…”
“তা বলেছি বলেছি, তাতে কি এত অশুদ্দু হয়েছে লা শুনি।”
এমত সময় গোলমাল সত্যিই ভালো লাগে না, এবং সেইহেতু টনার মা অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে বললে, “ভ্যালা জ্বালারে বাপু, তোদের কি কাণ্ডজ্ঞান? তিনকাল গিয়ে এককাল ঠেকলো তবু কোঁদল করা গেলো না, দেখ না লো দেখ না, দেখলেও তো পুন্নি হয়,, সুকো, হুকোটা দেতো।”
নীচে জলকেলি হয়।
সকলেই এখানকার গহনার পুঁটলি সামলে একটু মনোযোগ দিলে ফের। জল থই পুকুর। পুকুরটা সমস্ত পাথর দিয়ে মোড়া, শাদা পাথর, দু-একটা পদ্ম ফোটা, ধারে ধারে যে সব পরীমূর্তি ছায়া পড়েছে কালো কালো যেহেতু চাঁদের আলো এখন দিব্য। সেই জলে চাঁদের আলো এবং জলের তলে যে পাথর তাও দেখা যাবে। কিন্তু জল ঈষৎ নড়ে, ওরা যারা সাঁতার দেয় ফলে জল দ্রুত সঞ্চালিত। একুনে বারোজন নবোঢ়া ষোড়শী, প্রত্যেকের সারা গায় চাঁদের আলো সাঁতার দেয় জলকেলি করে এখন এর মধ্যে সব থেকে যে মেয়েটি সুন্দর সে মেয়েটি পরানী। পরানীর দেহ অদ্ভূত দেহ, পরানীর চুল লম্বা, এখন আলুলায়িত, গা-টা অদ্ভুত ফরশা, নাভি পর্যন্ত উঠেছে কালো মসৃণ একটি রেখা, তলপেটটা নিটোল। অনেক মন্দিরের দেওয়ালে অমন চেহারা দেখা যায়। পরানীকে ভারি সুন্দর দেখতে। ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিল এবার বসল, আধখানা তার জলে আধখানা তার উপরে, পাশেই দুলো মিত্তির…।
চাতালে ফেলা গোঁসাই মদ ঢেলে দুলোকে এগিয়ে দিলে। ফেলা গোঁসাই মদের ভাঁড়ারি। সে বললে, “ভাগ্নে…”
“দাও।”
পরানী সোহাগ করে বললে, “আমার ভারি লজ্জা করে—”
“মামা পরানী কি বলে গো, বলে লজ্জা!”
এ কথায় গোঁসাই মৃদু হাসলে, বাবু হাসল বললে, “লজ্জা কিগো—”
“না সত্যি বলছি, বড্ড লজ্জা করে…”
“আমার বাগানে বাদুড় পর্যন্ত ঢুকতে পায় না তার আবার লোক, পরানী বাগানটা কত বড় জানো, মামা—”
“সাতচল্লিশ বিঘে দুকাঠা দুছটাক…”
“তবে?”
“হ্যাঁ বলতে পারো চাঁদটা নেমে আসে, যদি, যদি…দেখো ঠোনাকে বেড়ে দেখতে হয়েছে শালী দিব্যি সাঁতার কাটে—কি যে বলে মামা…কি বলে…বলতো—”
“মৎস্য কুমারী—”
“হ্যাঁ হ্যাঁ কিন্তু সে যদি সত্যি বলো মামা, সে লাগে পরানীকে। তুমি জিজ্ঞেস করছিলে আমি এমন হঠাৎ উদাস হয়ে গেলুম কেন?”
এবার পরানী হাঁটুতে মুখটা আড় করে রেখে শুনে।
“পরানী যখন সাঁতার দিয়ে ঘাটের কাছে আসছে তখন মনে হয় যেন বা কোন বিদ্যুৎ মনুষ্য দেহ ধারণ করেছে, সেই সাঁতার দিয়ে আসছে আমি থ হয়ে গেলুম, আচ্ছা মামা পরানী আজম্মে কি ছিল?” এ রহস্যটুকু বাবুকে বিহ্বল করেছে হয়তো আর একটা আঁধার তার জানতে সেই হেতু ইচ্ছা।
দুলোবাবু বললে, “বলো মামা।”
“তুমিই বলো” ফেলা গোঁসাই চতুর লোক মোসায়েব লোক সে এমত প্রশ্ন এতাবৎ কখনো সে শুনে নি ফলে কি সে সঠিক উত্তর তাও সে জানবেই-বা কেমনে।
পরানী এখনো হাঁটুতে মুখটা আড় করে রেখে, বাবুর দিকে চেয়ে, বাবু বললে সলজ্জ ভাবে, “আচ্ছা মামা পরানী আজম্মে বিদুৎ ছিল এদ্ম হতে পারে…” বলে বাবু মৃদু পরানীর দিকে চেয়ে হাসল। পরানীর চুল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ে।
“হতে পারে—বিদ্যুৎ ছিল।”
“কিন্তু কি পাপে বেশ্যার ঘরে জন্ম নিলে, বলো…”
এবার ফেলা গোঁসাই দুলোবাবুর ঘাড়ে দায়িত্বটা চাপিয়ে দিলে, বললে, “তুমিই বলো ভাগ্নে…!”
“আমিও জানি না, আচ্ছা পরানী তুই বল… কোন পাপে তোর…”
পরানী মুখ তুলে হাসলে, হাসলে গালে টোল খায়, বললে, “তুমিই বলো না গো আমি তো আর বিধাতা পুরুষ নই…”
“তুই যদি বলতে পারিস তোকে পাঁচ মোহর…”
“যদি না পারি”—
“তাহলে মামা?
ফেলা গোঁসাই বললে, “পাঁচ জুতি।”
ফেলার হাত থেকে বাবু গেলাসটা নিয়েছেন। এ গেলাসটা কাচের অদ্ভূত কাজ করা। বোধ হয় পশ্চিমের কেউ বলে মুর্শিদাবাদের দুলো মিত্তির বললে, “কি রাজি?” পরানী হেসে বলল, “আমি জুতোই খাবো গো জুতোই খাবো তোমার হাতে এমন দিনে জুতো খাওয়াও ভারি পুন্নির গো বাবু…”
বাবু এ কথায় এমত কথায় পরানীর পটলচেরা চোখের দিকে চাইল, যখন পরানী তার দিকে চেয়ে। এবার বাবু আড় হয়ে আড়চোখে চাঁদের প্রতি চাইলে, চাঁদটা অদ্ভুত সবুজ, এ দেখা নির্ঘাত।
শ্বেত পাথরে পুকুর থেকে কলধ্বনি উঠে, একটা রুপোর কলসী ভাসছে, আর যে কটা তা তার আর মেয়েরা নিয়ে সাঁতার দেয় কালো চুল ভাসে কভু বা মুখের উপর পড়ে সেই হেতু—হাত দিয়ে সরিয়ে দিল, গুরু নিতম্বের রেখা, তার ডৌলত্ব শন্দের মতোই পশ্চিমে পুবে, উত্তরে দক্ষিণে প্রতিধ্বনিত হয় আকাশ মার্গেও।
“কি গো বাবু উদিকে চেয়ে চেয়ে কি দেখো!”
“রকম দেখি, বলে সে হাসল।”
“কৈগো, আমায় তো কোলে টেনে নিলে না যে বড়” পরানী অভিমান করেছে যেমন।
যদিও যে পরানীর দেহ শীত শীত, যত সে জোর করে যত জোর করে চাপে ততই উষ্ণ, শুধু যা চুল সেখানের ভিজে ভাবে আঁট হয়ে আছে। পরানী দেহের মধ্যে আরো যেমন অনেক অনেক দেহ আছে পরানী এখন দেহ থেকে দেহান্তরে আবছায়া হয়ে হয়ে যায়, এ বাহুবন্ধন সে তো মুক্ত নীল আকাশ এমতোই শাদা পাথরে, একজন পুরুষ এবং তারই কোলের মধ্যে একটি ডাগর যুবতী, এর মুখটা ওর মুখে, বুকটা ওর বুকে, শুধু যা চুলটা সে চুল অদ্ভুত লম্বা ঘুরে গেছে গিয়ে বাবুর পিঠে। “ওপাশে জল থই, নবোঢ়া মেয়েরা জলকেলি করে।”
এমত দৃশ্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে তারা সকলে শ্রীহরি শ্রীহরি দিলে গয়নার পুঁটলি সামলে। এরা সকলেই শহর ও গঞ্জের বুড়ো এলো রাড়।
শশী নাপতিনী কানের দুলের পাথর খসে পড়েছে কি না পড়েছে, সেটা অনুভব করতে করতে বললে, ‘দেখ্লো দেখ্, চাঁদি তোর মেয়ের বরাত খুলল, মেয়ে তোর জাদু জানে লো, হয়তো সব সম্পত্তি লিখে দেবে’।
সুকো বললে—হ্যাঁরা ওইটি পরানী তো—”
‘‘পরানী নয়তো কোন জনা—দেখলি পেটে সেই কালো সুতোর মতন রেখা—”
চাঁদি কিত্তুনীর কথাটা লাগসই লাগে, সেহেতু যদি আশা করলে না ফলে, সেই কারণেই নিতান্ত সে উত্তর করলে “সবই গোবিন্দর ইচ্ছে রে ভাই, তারকনাথের ইচ্ছে তবে যা দেখলুম তাতে ছার জন্ম সফল হল, “বলে চতুর্দিকে চাইলে।”
সবাই একটু চুপ।
সুকো গয়লনী বললে, “তবে যা থাকে কপালে তবু বলব, হাজার হোক তুই মা তো তোর বসে বসে এ সব দেখা হয় নি।”
নবীনবালা বললে, “কেন দেখবে না লো শুনি, ঢপ যাত্রা ন্যাংটো মদ্দর মাতলামি দেখতে পারি আর এ দেখতে দোষ…”
“দোষ নয় কো তবে হাজার হোক মা তো…”
“আমি তো বাপু সেই থেকে কেষ্ট নাম জপচি আর দেখছি, তবে পাপটা কোথায়…যেমন ওর কথা।”
“হ্যাঁ বুঝতুম যদি বেজা ঢ্যামনা ডেকে নিয়ে দুজনে দু দু ছিলিম খেয়ে নেত্যো করত তবে সে না হয় এক কথা…” টোনার মা বললে।
“পাপ কোথায়, বলতো, বলতো, তোমরা পাঁচজন!”—
“পাপ না মুণ্ড!”
এ দিন গেল। অনেক রাতে জলকেলি শেষ হয়। বাকি রাতটুকু মদ আর গাঁজা, গাঁজা আর মদ। পরানী শুধু মোদক খায়।
দুই
চৈত্র মাস পুন্নিমা আজ। আজ দিন বড় ভালো এক হাট লোক চানে যাবে, এক হাট লোক ব্রত উদ্যাপন করবে। ঘরে যাদের লক্ষ্মী আছেন তাদের ঘরে সত্যনারায়ণ পাঁচালী শুনবে সিন্নি পাবে। এরা দরিদ্রদের সেবা করবেই ব্রাহ্মণকে দান করবে। চোত মাসের আজ পূর্ণিমা যে, অতএব।
চাঁদি কিত্তুনী সন্ন্যাস নিয়েছে তাই তার কাপড়ে রঙ গেরুয়া। গলা লগ্ন একটা চাবি বাঁধা মোটা সুতো। চাঁদি বাবা তারকনাথকে ম্মরণ করে তবে জল গ্রহণ করে, দিনে রেতে একটা মালসা চড়ে। গঙ্গায় চান করে উঠে সিঁড়ির একধারে ইঢ দিয়ে উনুন করে চাল ফোটায়। পরানী কাছ থেকে জোগাড় দিচ্ছে চাঁদি তার দেওয়া জিনিশগুলো গঙ্গাজল ছিটিয়ে নেয়।
পরানীর গা-গাতরে যেন-বা নোনা ধরেছে, সাড় তো ছার অবশ সারা দেহ। গতকাল সে কি যে গেছে সে আর কি বলবে, যেহেতুক গতকাল জলকেলি হয়েছিল, দুলো মিত্তির এখনো ঘুমোয়। এই ঘাট সেখানে পরানী বসে গঙ্গার উপর সেটা দুলো মিত্তিরের বাগান বাড়ির মধ্যে।
একটা কলাপাতায় অনেক ফল একছড়া কলি বউ কলা, ওদিকে মালসা, কিছু শুকনো কাঠ—। তারই দু একধাপ উপরে পরানী বসে, চাঁদি কিত্তুনীর এখন চান সারা। আসতে আসতে সে উঠে, কোমরে কাপড় জড়ানো অন্যধারটা সে নিঙড়োয় তখনোই হঠাৎ কোত্থেকে এক হনুমান, তাকে দেখে পরানী তো ভয়ে ত্রাহি জড়সড়। হনুমান আরো এগিয়ে এল, সুঁটকো শরৎ কিত্তুনী হে হে করে সাত তাড়াতাড়ি দৌড়ে আসতে গেল, কাপড়টা যে কখন তার খুলে গেছ নীচের ধাপে পড়ে আছে তা তার খেয়াল নেই অবশ্য বেশ্যার কাপড় পরাটাই আশ্চর্যের। সে দৌড়ে তার ফলগুলো রক্ষা করতে যাবে ততক্ষণাৎ হনুমানটা ফলের পাতাটা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কষে এক থাপড় কিত্তুনীর মুখে। থাপড় খেয়ে কোথায় মাগি বসে পড়বি তা নয় উদোম ন্যাংটো অবস্থা নাচতে লাগল আর সেই সেকি হুউসাউর ধুম—ও মাগো—আমার কি হবে গো। হনুমান কলা নিয়ে উধাও।
ওপাশে গঙ্গা, সিঁড়ির ধাপে ন্যাংটো সুঁটকো একটু মেয়ে মানুষের নেত্যো অদ্ভুত বিষদৃশ্য বলি বোধ হয়। এমনও যে পরানী সেও বিরক্ত ও পাশে উপরে বারান্দায় সকলে হেসে খুন। চাঁদির খেয়াল হল সে বলল, “আর এক মুহূর্ত এখানে থাকব না, কি অলুক্ষুণে জায়গারে বাবা। আমি আর এক দণ্ডও এখানে থাকব না।”
ফেলা গোঁসাই এখানে এসে পড়ে বললে, “মাগি হল্লা কচ্ছিস কোন আক্কেলে, ভাগ্নের যদি এখন কাঁচা ঘুম ভেঙে যায় তো তোকে আর রক্ষে রাখবে না, চুলের ঝুটি ধরে বার করে দেবে!”
কাপড়টা তুলে এখন চাঁদি কিত্তুনী ভালো করে জড়ায়, এবং সেই সময় বললে, “হ্যাঁরে ড্যাক্রা আমি
যদি যাই তোদের লৈকো বিলেস হয় কি করে শুনি।”
আজ নৌকা বিলাস।
তিন
ফেলা গোঁসাই নামকরা বজ্জাত, কাঁচা করে বললে, “তোর শুধ…আর কেউ বুঝি…না, আর-মেয়েগুলোর কি গা-গতর নেই, লৈকো বিলেস তাদের দিয়েই হবে।”
“তুই থাম না মা,” আহা এক হাট লোকের সামনে বাঁদরে একটা কলা নিয়েছে বলে একগঙ্গা রোদে ন্যাংটো হয়ে নাচতে যার লজ্জা করে না তার অবার অত কিসের—” কেননা পরানী ভাবছিল যত চেপে যায় ততই ভালো, তখন সে ভালোভাবে স্পষ্টত চেয়ে দেখলে মায়ের মুখে হনুমানের পাঁচ আঙুলের দাগ। কষে মেরেছে বৈকি।
“তুইও অমন করে আমায় বলবি পোড়ারমুখো মেয়ে, তোর মতো বজ্জাত মেয়েকে আতুড়ে নুন দিয়ে মারা উচিত ছিল। বজ্জাতের ধাড়ি ওলাউঠো হোক তোর ওলাউঠো হোক…”
“তোর বুকে হাঁটু দিয়ে বলব একশো বার বলবে, বজ্জাত মাগি” ফেলা গোঁসাই বললে আরো বললে, “ভালো চাস তো চুপ কর, এ্যা বাঁদরে মেরেছে তো ভালোই করেছে, তোর স্বগ্গ বাস হবে, কোথায় লোক পুজো দেয় তা নয় চ্যাঁচাবে…হনুমান কে জানিস! ভক্ত শ্রেষ্ঠ—সে তোর কলা নিয়েছে থাপ্পড় মেরেছে তোর বাপের ভাগ্গি, শালী তোর বাপেরই ঠিক নেই তো আর কি বুঝবি। জানিস তো খালি চাপ দিয়ে মোহর আদায় করতে…।”
চাঁদি কিত্তুনীকে যখন সত্যিই হনুমানটা থাপ্পড়টা মারে তখন তার অতটা লাগে নি কেননা যেহেতু এর থেকে বেদম্ মার সে ইহ জীবনে খেয়েছে কিন্তু থাপ্লড় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় যদি সে পারে এ ব্যাপার নিয়ে বাড়ি মাথায় করতে তাহলে হয়তো-বা বাবু তাকে হয়তো চন্দ্রহার দেবেন। কিন্তু ফেলা গোঁসাইর মূর্তি দেখে তার মাথা ঠিক হল।
ফেলা বললে, “পরানী যা যা একটু জিরিয়ে নিগে যা, এখানে আর ভ্যাজারাঙ ভ্যাজারাঙ করতে হবে না।” আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “বৃষ্টি বোধ হয় হবে না কি বল্। ওরে বিন্দে ফুলগুলোতে এক ঘড়া জল দিয়ে দে আর দেখ্, ভজুকে বলবি নৌকোটা যেন ছায়ায় নিয়ে যায় ওই পাকুড় গাছের তলে, ওখানে ফুল দিয়ে সাজায়, না হলে ফুলগুলো শুকিয়ে যাবে…।”
চৈত্র মাস এখনকার হাওয়া দুস্তর খারাপ, চুল এলোমেলো বসন আলুথালু পরানী লজ্জায় মাথা নিচু ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে, সোনা মুখে তার রোদ লেগেছে, ভিতর থেকে কে যেমন আঘাত করেছে নিত্য, গালটা লাল। ক্রমে সে উঠে এসেছে। পিঠটা থেকে কাপড় সরিয়ে নিয়ে পাথরের মেঝেতে শুয়ে পড়ল, পাথরের মেঝেতে আম কাঠালের বনের ছায়া জমে ঠাণ্ডা উপরন্তু নরম যেমন। ওদিকে খানিক দূরে পালঙ্কে, একটি গৌর দেহ তার চুলগুলো উড়ে, একজনা হাওয়া করে। বাবু ঘুম থেকে উঠলেই সে বলবে, ঘটনাটা, বলে সে বলবে আমি চলে যাব, ইতিমধ্যেই যেতুম কিন্তু তুমি তো ঘুমিয়ে, না বলে যাওয়াটা…। সে সাতপাঁচ ভাবছে যখন—তখন দেখে কি বড় বড় দুটো চোখ, চোখ নয়তো চোখের ভেতর দুটো এখনো ভাত হয় নি এমন দুটি ছোট ছোট ছেলে। এতে পরানী থ।
এখন একমাত্র যা নড়ে তা ওই পাখাটা ফলে চুল, উপরে ঝড়ের কাচ এবং চোত মাসে ফলে বাগান হাহা করে। একটু একটু পাখির শব্দ আসে, কাদের কথার শব্দ পাওয়া যায়, হ্যাঁ ওগুলো গঙ্গা ঢেউ, যে পাখিটা শব্দ করে সেটা কাঠঠোকরা, ঝাড়ের কাচের শব্দ এখন এটা কোকিল, যেহেতু এখন বসন্ত কাল। বেলা বেড়েছে।
বাবু মৃদু হেসে বললে, “তুই যে এখানে শুয়ে—”
“কেন, শুতে নেই?”
“তা কেন,” বাবু কিছু জানতে চেয়েছিল।