সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়, হারিয়ে যায় অনেক কিছু। কিছুর লেখাজোকা থাকে, কিছু থাকে স্মৃতিতে আর বেশিরভাগই মিলিয়ে যায় কালের অতল গহ্বরে! তাই আজ মনে হল এই রকম একটি হারিয়ে যাওয়ার গল্প নিয়ে কিছু কথা লিখি।

দিনে দিনে একটা একটা করে হাতের তাঁত বন্ধ হচ্ছে ফুলিয়ার তাঁতিপাড়ায়! দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে একটানা একটি বিশেষ আঙ্গিকের টাঙ্গাইল শাড়ি বুনে যাওয়ার পর সেই কাজকে বন্ধ করতে হল। কোরা জমিনে লাল চওড়া ভেলভেট পাড়, সাথে সামান্য নকশা- এই শাড়ি দীর্ঘদিন একনাগাড়ে বুনলেন ফুলিয়া চটকাতলার বাসিন্দা শ্রীগৌরাঙ্গ বসাক। শুরু করেছিলেন ৩৫০ টাকা থেকে, শেষ হল ১১০০ টাকায় এসে। যখন থেকে পাওয়ারলুম এবং তারপরে রেপিয়ার মেশিন এসে হস্তচালিত তাঁতশিল্পের বাজারকে গ্রাস করতে শুরু করেছে সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল লড়াই। এতদিন পর্যন্ত নিজের চোয়াল শক্ত করে নিজের পুঁজিতে বুনে গেছেন এই শাড়ি। সুদীর্ঘ লকডাউনের সময়ও তাঁর তাঁত কিন্তু থেমে থাকেনি। ভরসা ছিল, শাড়ি একদিন ঠিক বেরিয়ে যাবে। গিয়েছিলও তাই।

কিন্তু এখন আর ভরসা করে চালিয়ে যেতে পারছেন না। কারণ পুঁজি শেষ, ঘরে প্রচুর শাড়ি জমে গেছে। যিনি কাপড় নিতেন তিনি দু’বছর আগের দাম দিতে চাইছেন। কিন্তু সেই দামে কাপড় দেওয়া আর সম্ভব নয়, খরচ বেড়ে হয়ে গেছে প্রায় দ্বিগুণ! অগত্যা বন্ধ করতে হল!

এই রকম তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁতিপাড়ায় নতুন কিছু নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অহরহ ঘটছে এই ঘটনা। তাহলে হঠাৎ কেন এই শাড়িটা নিয়েই লিখতে বসলাম? কারণ একটানা এত বছর একটা নকশা সম্ভবত কেউ এখনও বোনেননি। তাছাড়া এটি ছিল আদি টাঙ্গাইল ঘরাণার শাড়ি যেখানে নকশার থেকেও বয়নের উৎকর্ষতাই ছিল প্রধান বিচার্য। আর গৌরাঙ্গ বসাকের এই শাড়ি সম্ভবত আর কেউ বুনতেও পারবেন না! ইতিপূর্বে ২-৩ জন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন তো আবার নিজের জোড়া টানা কেটে এনে তাঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন বোনার জন্য।

গৌরাঙ্গ বসাক আর তাঁর স্ত্রী শিবানী বসাক — দুটি মানুষ দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পরম যত্নে, ভালোবাসায় বয়ে নিয়ে গিয়েছেন টাঙ্গাইল ঘরাণার ঐতিহ্য। যন্ত্রের দাপটে আজ তাঁরা অসহায়! কিন্তু এই দু’জন মানুষ তাঁতকে ছাড়তে পারছেন না। কারণ সে উপায় তাঁদের নেই। ঘরে জমে আছে প্রায় দুশো কাপড়, বিক্রি হবে কিনা জানা নেই! তবুও পরম যত্নে, মমতায় আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছেন সেগুলো। কারণ তাঁরা মনে করেন, এই শাড়ি তাঁদের লক্ষ্মী। ফলে তুলনামূলকভাবে যে শাড়ি বাজারে চলছে বলে তাঁরা অনুমান করছেন, আপাতত সামান্য কিছু পুঁজি জোগাড় করে সেই কাজই শুরু করতে চলেছেন। তাঁত বন্ধ করার উপায় নেই, তাহলে যে পেটও বন্ধ হয়ে যাবে!
গৌরাঙ্গ বসাক Mobile No. 6297156734