বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের স্ত্রী হিন্দু ছিলেন। মধুসূদন দত্ত ধর্ম বদলেছিলেন, বিয়ে করেছিলেন প্রথমে রেবেকাকে পরে হেনরিয়েটা। অন্নদাশঙ্কর রায় বিয়ে করেছিলেন খ্রিস্টান মহিলাকে যাঁর পরে নাম হয়েছিল লীলা রায়। যাঁর নামে বালিগঞ্জের কাছে লীলারায় সরণী নামে রাস্তা আছে। বিজেপি নেতাদের মতে এসব হল লাভ জিহাদ। হিন্দুত্ববাদীরা প্রেম-ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না।
ভারতে প্রেম করে বিয়ে, মানে যাকে আমরা বলি ‘চয়েস ম্যারেজ’, এর সংখ্যাটা কত হতে পারে? ১০০ জনে চার জন মাত্র। ভারতে মাত্র ৪ শতাংশ বিয়ে হল অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। তাতেও গা জ্বলছে হিন্দুত্ববাদীদের। তারা চায় বিয়ে-টিয়ে ওসব মেয়েরা নিজেরা ঠিক করার যোগ্য নয়। রামমোহন যখন সতীদাহ রদের জন্য লড়াই করছেন, তখন যারা মেয়েদের পুড়িয়ে মারা পক্ষে ছিল, তাদের যুক্তি ছিল মেয়েরা হল ‘অল্পবুদ্ধির’ মানুষ। স্বামী মারা গেলে পৃথিবীতে তারা একা চলতে অক্ষম। ১৮১৮-১৯ সাল নাগাদ যখন রামমোহন রায় সহমরণের মতো নৃশংস প্রথা বন্ধ করতে যুক্তি সাজাচ্ছেন, লড়াই করছেন সমাজের রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে, তখন সমাজপতিরা সহমরণের পক্ষে মত দিতে গিয়ে বলেছিলেন, স্ত্রীলোকদের স্বামীর সঙ্গে সহমরণে পাঠানো হয় কারণ তারা প্রাকৃতিক নিয়মেই আল্পবুদ্ধি, তাদের অন্তঃকরণে স্থিরতা নাই, বিশ্বাসের অযোগ্য এবং ধর্মজ্ঞানশূন্য। যারা হিন্দু সমাজের সেকাল নিয়ে অহঙ্কার বোধ করেন, তারা নিশ্চয়ই লজ্জিত হবেন এই কথাগুলি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। এই অভিযোগের জবাবে রামমোহন বললেন, “স্ত্রীলোকের বুদ্ধির পরীক্ষা কোন কালে লইয়াছেন, যে অনায়াসেই তাহাদিগকে অল্পবুদ্ধি কহেন? কারণ বিদ্যাশিক্ষা এবং জ্ঞান শিক্ষা দিলে পরে ব্যক্তি যদি অনুভব ও গ্রহণ করিতে না পারে, তখন তাহাকে অল্পবুদ্ধি কহা সম্ভব হয়; আপনারা বিদ্যা শিক্ষা জ্ঞানোপদেশ স্ত্রীলোককে প্রায় দেন নাই, তবে তাহারা বুদ্ধিহীন হয় ইহা কিরূপে নিশ্চয় করেন?” স্ত্রীলোকদের অন্তঃকরণের স্থিরতা না থাকা নিয়ে সমাজপতিদের যে বক্তব্য তার জবাবে রামমোহন বললেন, “যে দেশে পুরুষ মৃত্যুর নাম শুনিলে মৃতপ্রায় হয়, তথাকার স্ত্রীলোক অন্তঃকরণের স্থৈর্য দ্বারা স্বামীর উদ্দেশে অগ্নিপ্রবেশ করিতে উদ্যত হয়, ইহা প্রতক্ষ দেখেন, তথাচ কহেন যে তাহাদের অন্তঃকরণে স্থৈর্য নাই।”
হিন্দুত্ববাদীরা এখনও সেই যুগেই পড়ে রয়েছে। তারা চায় মেয়েরা কেবল রাখি বেঁধে যাবে ছেলেদের হাতে। যাকে বলা হয় ‘রক্ষা বন্ধন’। স্বাধীনতা তাদের দরকার নেই। কবিতা কৃষ্ণাণ তাঁর বই ‘ফিয়ারলেস ফ্রিডম’-এ রাখি বন্ধন নিয়ে চোখ খুলে দেওয়ার মতো কিছু কথা বলেছেন। কবিতা কৃষ্ণাণের মতে রাখিবন্ধন হল একটা ‘আইডিওলজি’ এবং পুরুষরাইরা যে মেয়েদের অভিভাবক, মেয়েদের দিয়ে সেটা স্বীকার করানোর অনুষ্ঠান। যেখানে বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বেঁধে বলে ভাই যেন তাকে রক্ষা করে। তাই এর নাম ‘রক্ষাবন্ধন’। এই অনুষ্ঠান, কবিতা কৃষ্ণানের মতে, মেয়েদের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়। এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বলা হয়, মেয়েরা নিজেদের রক্ষা করতে অপারগ। তাই ঘরই হল তাদের আসল জায়গা। যে কথা হিন্দুত্বাদীরা প্রতিনিয়ত বলে থাকে। কিন্তু মেয়েরা দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসছে। পছন্দ মতো সম্পর্ক তৈরি করছেন। এটাই না-পসন্দ হিন্দুত্ববাদীদের। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে তাই আইন আনা হচ্ছে লাভ জিহাদ রুখতে। আজ তারা লাভজিহাদের কথা বলছে। কাল তারা মেয়েদের বাইরে বারোনো আটকানোর চেষ্টা করবে। পরের দিন বলবে, ঘরই হল মেয়েদের প্রকৃত জায়গা। সেটাই পরম্মপরা। লাভজিহাদ নিয়ে একটা মিথ্যে প্রচার চালানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ভিন ধর্মের বিয়ে আসলে প্রেম ভালোবাসা নয়, ষড়যন্ত্র। আগেই বলেছি, ভারতে মাত্র চার শতাংশ বিয়ে ছেলে-মেয়েদের নিজেদের পছন্দে হয়। তার মধ্যে ভিন ধর্মের ছেলে-মেয়ের বিয়ে এতই কম সংখ্যায় যে, কোনও শতাংশের হিসেবের মধ্যেই তা আসে না। তবু এই নিয়ে প্রচার চলছে রাজ্যে রাজ্যে। ভয় দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে মুসলমানরা এই ধরনের বিয়ের মাধ্যমে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়িয়ে একদিন ভারত দখল করে নেবে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ২০ শতাংশেরও কম। আর দেশের সেন্সাস রিপোর্ট বলছে, মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার এখন ভারতের সব ধর্মের মধ্যে সর্বনিম্ন। হিন্দু জনসংখ্যার মতোই মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারও কমছে। ২০০১ থেকে ২০১১, এই দুই জনগণনার বিচারে ১০ বছরে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯.৯ থেকে কমে হয়েছে ১৬.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ওই ১০ বছরে ২৯.৫ থেকে কমে হয়েছে ২৪.৬। অর্থাৎ ৫ শতাংশ কমেছে। ভারতের সব ধর্মের মানুষের বিচারেই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন সব থেকে কম। এই হার থেকে বিশেষজ্ঞদের মত, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের মৃত্যুহার এবং জন্মহার সমান হয়ে যাবে। এই তথ্য সরকারি। যে কেউ সেন্সাস রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে দেশটা মুসলিম প্রধান দেশ হয়ে যাবে এই ভ্রান্ত ধারণা সুকৌশলে ছড়িয়ে যাচ্ছে হিন্দুত্বাদীরা।
লাভ জিহাদ অর্ডিনান্সের সাহায্য ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে যোগী-রাজ্যের পুলিশ। লাভ জিহাদ নিয়ে অশ্লিল হুঙ্কার দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান। তিনি বলেছেন, কেউ যদি লাভজিহাদের পরিকল্পনা করে, তাহলে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই লাভজিহাদের অতীতটা এইরকম। প্রায় দশ বছর আগে, ২০১০ সালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘জনজাগৃতি সমিতি’ আদালতে অভিযোগ জানিয়েছিল, কর্নাটক থেকে ৩০ হাজার হিন্দু যুবতী নিখৌঁজ হয়ে গিয়েছেন। তাদেরকে মুসলিম যুবকেরা তুলে গিয়েছে ধর্মন্তরণ এবং বিয়ের জন্য। আদালতের নির্দেশে কর্নাটক পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তের পর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ৩০ হাজার নয়, নিখোঁজের সংখ্যা ৪০৪ জন। এই ৪০৪ জন যুবতীর মধ্যে ৩৩২ জনের ঠিকানা পুলিশ খুঁজে বের করতে সফল হয়। এই ৩৩২ জনের মধ্যে একজনও মুসলিম যুবককে বিয়ে করবেন বলে বাড়ি থেকে পালাননি। এঁরা হিন্দু ধর্মে উঁচুজাত, নিচুজাতের যে কুতসিৎ বর্ণ ভেদ আছে মানুষে মানুষে, সেই ভেদাভেদ মানেন না বলে এরা প্রত্যেকেই বাড়ির অমতে ইন্টারকাস্ট বা ভিন্ন বর্ণে বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর বাড়িতে অশান্তি এড়াতে পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে সংসার করছিলেন। এই হচ্ছে ফেক নিউজের কারবারিদের তথাকথিত ৩০ হাজার হিন্দু যুবতী অপহরণের পিছনের আসল কাহিনী। এই যে জনসংখ্যা বেড়ে দেশটা মুসলিম হয়ে যাবে, ১৯০৯ সালে এই মিথ্যা প্রথম যিনি বই লিখে ছড়িয়েছিলেন তাঁর নাম কর্নেল ইউ এন মুখার্জি। এই বইয়ের বহু সংস্করণ পরে ছেপেছিল হিন্দুমহাসভা। অল্প সংখকের থেকে ভয়। সংখ্যায় যারা কম তারা দেশ দখল করে নেবে, এই ধরনের প্রচার গণতন্ত্র বিরোধীরা বহু বছর ধরে দেশে দেশে করে এসেছে। উত্তরপ্রদেশ সহ যে তিনটি বিজেপিশাসিত রাজ্যে এই লাভ জিহাদের চিৎকার শুরু হয়েছে, তারা কিন্তু এখানেই থামবে না। সিএএ, এনআরসি, কাশ্মীর থেকে ৩৭০ প্রত্যাহার, লাভজিহাদ, বিজেপির এই সব অ্যাজেন্ডাই একসূত্রে গাঁথা। এর ফলে দেশবাসীর মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন আরও স্পষ্ট হবে। আশার কথা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে লাভ জিহাদকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়েছে। সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষই তাকিয়ে থাকবে লাভজিহাদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকে।