‘লুচি কচুরী মতিচুর শোভিতং/ জিলেপি সন্দেশ গজা বিরজিতম্।’
ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্রকে অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সরস্বতী পুজো নিয়ে শ্লোক রচনা করতে বলেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের মনোযোগ গেল পুজোর প্রসাদ বৈচিত্র্যের ওপর। তারই সরস বর্ণনা দিয়ে শ্লোক রচনা করেছিলেন তিনি, আর তার শুরুতেই লুচি!
কেবল বিদ্যাসাগর নন। সমস্ত বাঙালির ভোজনের পাতে আর সেই সঙ্গে মনের পটে যে পদটির বিশেষ পদমর্যাদা আছে সেটি হলো লুচি, যার স্বাদ গন্ধের ময়ান জড়িয়ে আছে বাঙালী জীবনের পরতে পরতে। বাঙালীর জীবনে ‘লুচিময়তা’ যে কতখানি, তা বোঝা যায় শ্রী অরবিন্দের একটি উপমায়। যোগীর নিরাসক্ত মনোভাব বোঝাবার জন্য তিনি বলেছেন— ‘যোগী রুটি ও লুচির স্বাদের তফাৎ বোঝে, কিন্তু কোনটাতেই আসক্ত হয় না’।
একাদশ শতকে পালযুগের বিখ্যাত চিকিৎসক চক্রপাণি দত্তের ‘দ্রব্যগুণ’ গ্রন্থে লুচির বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণিত শষ্কুলী হলো লুচির আদি রূপ। সে যুগে তিন প্রকার শষ্কুলী ছিল- খাস্তা, সাপ্তা আর পুরি। ময়দায় ময়ান দিয়ে ঘিয়ে ভাজলে হয় খাস্তা লুচি। ময়ান না দিলে হয়ে যায় সাপ্তা লুচি, এটি এখন অপ্রচলিত হয়ে গেছে। আর ময়দার বদলে আটা দিলে হয় পুরি।
শ্বেত শুভ্র খাস্তা ফুলকো লুচি নিয়ে বাঙালির পাতে রোম্যান্টিকতার শেষ নেই, কলকাতার ঘটি বাড়িতে যার আদুরে নাম ছিল ‘নুচি’। বাঙালির পাতে ভালোমন্দ খাওয়া বলতে বা কাউকে আদর আপ্যায়ন তোয়াজ করে খাওয়াতে চাইলে লুচির কথাই মনে আসে। ‘চাওয়া পাওয়া’ ছায়াছবির সেই দৃশ্যটা মনে করুন, যেখানে তুলসী চক্রবর্তী রাজলক্ষ্মী দেবীকে বলছেন, ‘এই খবরটা তোমাকেই বের করতে হবে। তুমিই পারবে। এবেলা পোলাও, ওবেলা লুচি খাইয়ে গোপন খবরটা তুমিই নিতে পারবে গিন্নি।’

বনস্পতি ঘি বা সাদা তেলে ভাজা নয়, খানদানি লুচি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা, নিদেনপক্ষে সাদা ঘি বা ভয়সা ঘি। কলকাতার অনেক বাড়ির হেঁসেলে শোভা পেত শ্রী ঘি, বিশ্বেশ্বরী ঘি বা ভাদয়া ঘি এর টিন, মূলত লুচির জন্যই নিবেদিত। ‘ফলার’-এর আবশ্যিক অঙ্গ ছিল ঘিয়ে ভাজা লুচি, সঙ্গে ছানা, মণ্ডা ইত্যাদি থাকত। তাকে বলা হতো পাকা ফলার। রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’ নাটকে তারই সরস বিবরণ :— ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি, দুচারি আদার কুচি/ কচুরি তাহাতে খান দুই।/ ছকা আর শাকভাজা, মতিচূর বঁদে খাজা/ ফলারের জোগাড় বড়ই॥
সুকুমার রায় জানিয়েছেন, ‘খাস্তা লুচি বেলতে ভালো’। লুচি বেলা নিয়ে যদি কবিতা হয়, তার পরিবেশন আর ভোজন কাব্যময় হবে না? রুচিশীল বাঙালীর পাতে লুচির ‘লুচিশীল’ পরিবেশন এক দিবারাত্রির কাব্য! পুরনো পরিবারে খাবার ঘরে দেখা যেত এক স্বপ্নবিলাস— ধবধবে শ্বেত পাথরের বা ঝকঝকে কাঁসার থালায় পরিবেশিত ছোট ছোট নিষ্কলঙ্ক শুভ্র গরম গরম লুচি! উত্তর কলকাতার অনেক বাড়িতে রোববারের জলখাবার মানেই বোঝাত গরম গরম লুচি, ঘিয়ে ভাজা, ফুলকো। আঙুলের খোঁচায় লুচির ভুঁড়ি ফাটিয়ে দিতেই নাকে আসত ভেতরের গরম হাওয়ায় ঘিয়ের ঘ্রাণ। তখনই বোঝা যেত ঘ্রাণে অর্দ্ধভোজন কাকে বলে! এককালে পূজা পার্বণে দেখা মিলত সবুজ কলাপাতার প্রেক্ষাপটে ঘিয়ে ভাজা সাদা লুচি— সেও তো এক কবিতা! বাঙালীর ভ্রমণে যখন বিশ্বায়ন আসেনি, তখন ভ্রমণে রোম্যান্স ছিল টিফিন ক্যারিয়ারে, থাক থাক লুচির দিস্তের ভাঁজে ভাঁজে।
কেবল কিসে পরিবেশিত হচ্ছে তা নয়, লুচি কিসের সঙ্গে পরিবেশিত হবে, তাও বিবেচনার বিষয়। সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে লুচি খুব উন্নাসিক— রুটির মতো সবার সঙ্গে তার খাপ খায় না।
তিন চার দশক আগেও বাঙালির বিয়ে বাড়িতে সবুজ কলাপাতার ফিল্ডে নিয়মিত ওপেনার ছিল লুচি আর বোঁটাসুদ্ধ লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা, ফিল্ডার হিসেবে থাকত নুন আর এক কুচি পাতিলেবু। এখনো দুর্গা পুজোর অষ্টমীর দিনে লুচি, বেগুনভাজা, আর নারকেল কুচি দিয়ে ঘন সোনালী রঙের ছোলার ডাল প্রায় সার্বজনীন। কিংবা লুচি-আলুর দম জুটি, ব্যোমকেশ-অজিত জুটির মতোই যা সুপরিচিত। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশের বিখ্যাত কাহিনী ‘শজারুর কাঁটা’তে একটি নির্ভেজাল বাঙালি ঘরোয়া ভোজন দৃশ্যের বর্ণনা আছে— ‘দীপা একপ্রান্তে বসে দেখতে লাগল, নকুল দুটি প্লেটে খাবার সাজাচ্ছে; লুচিভাজা, আলুরদম, বাড়িতে তৈরী সন্দেশ।’ এছাড়া তো আছেই লুচির সঙ্গে আলুভাজা— যেন বিসমিল্লা খানের সানাইয়ের সঙ্গে শান্তাপ্রসাদের তবলা সঙ্গত!
পুরনো জমানার খাদ্যরসিকদের কাছে আদর ছিল লুচি-ক্ষীরের যুগলবন্দীর। একটু উন্নাসিক খাদ্যরসিক অবশ্য লুচি-রাবড়ি ছাড়া মুখ খুলতেন না। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পে অবশ্য লুচির সঙ্গে রাবড়ির বিকল্পের হদিস আছে। সেখানে শিশির ব্রজবাবুকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে ভালো খাওয়ারদাওয়ার ব্যাপারে সে কোন আপোস করবে না, ‘তবে হ্যাঁ, রাত্রে লুচির সঙ্গে রাবড়ির বদলে ভালো কাঁচাগোল্লা হলে তেমন কিছু আপত্তি তার নেই।’ কখনো কখনো লুচির দোসর হত হালুয়া বা মোহনভোগ। যাঁদের অত বাদবিচার নেই, তাঁরা লুচির সঙ্গে চিনি পেলেই খুশী।
পুরোন ঘরানার বাঙালী হেঁসেলে এখনো আছে লুচির সঙ্গে সাদা আলুচচ্চড়ি (ছেচকি)— কাঁচালঙ্কা আর কালোজিরের সঙ্গে একটু হিংয়ের ফোড়ন দেওয়া। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে এসে বনফুল জলখাবারের থালায় যা যা পেয়েছিলেন, তার প্রথম দুটি আইটেম ছিল গরম ফুলকো লুচি আর আলুর ছেচকি। এটি নাকি মহানায়কেরও খুব পছন্দের ছিল। শ্যামবাজারে হরিদাস মোদকের দোকানে লুচি আর খোসাসমেত আলুর তরকারির জুটি সুপার হিট।
আর সবার ওপরে তো আছেই লুচি-মাংস জুটি, সৌরভ-শচীন জুটির মতোই যা জনপ্রিয়তায় নট আউট। ফার্স্ট বুক অফ রিডিং এর প্রণেতা প্যারিচরণ সরকার ভালোবাসতেন পেটপুরে লুচি আর পাঁঠার মাংস খেতে। রবীন্দ্রনাথের সান্ধ্য আহারে লুচি বাঁধা বরাদ্দ ছিল। তাঁর পছন্দের ছিল লুচির সঙ্গে মধু।

গরম গরম লুচির মোহময়ী আবেদন তো আছেই। কিন্তু বাসী লুচির আবেদনও তাই বলে কিছু কম নয়, বিশেষ করে বিয়ে বাড়ির বাসী লুচির। সঙ্গে যদি অনুপান থাকে বোঁদে। লুচিরসিক বিদ্যাসাগরের বাসী লুচির প্রতি টান গরম লুচির চেয়ে কম ছিল না। শেষ জীবনে কার্মাটারে থাকার সময়ে একবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কথায় কথায় বিদ্যাসাগর জানতে পারলেন যে হরপ্রসাদ সঙ্গে এনেছেন দিস্তে কয়েক লুচি। হরপ্রসাদকে বললেন লুচি দিতে। হরপ্রসাদ একটু দ্বিধা করছিলেন, বাসী লুচি, কলাপাতায় মোড়া, কলাপাতার গন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বিদ্যাসাগর নাছোড়বান্দা। অতএব তাঁর কথামতো লুচিগুলো বার করে হাওয়ায় একটু রেখে দিলেন। খানিকক্ষণ পরে খোলা হাওয়ায় কলাপাতার গন্ধ উবে গেল। বিদ্যাসাগর পরমানন্দে কয়েকখানা লুচি খেলেন।
কলকাতায় অভিজাত বাড়িতে লুচির ব্যাস আড়াই-তিন ইঞ্চির বেশী নয়। এই লুচি খাওয়ার আলাদা কেতা আছে। তিন আঙুলে,- অর্থাৎ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে হয়। সত্যজিৎ রায়ের চারুলতায় ভূপতির লুচি খাওয়ার এই অভিজাত শৈলী সেলুলয়েডে কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে। দিনাজপুর জেলার কান্তনগরের ঠাকুরবাড়িতে তৈরি হতো বগি থালার আকারের লুচি। সেই লুচি দুই হাত দিয়ে ছিঁড়ে খেতে হতো। পলাশীর নন্দীদের ঠাকুরবাড়ির লুচি হতো গোল গোল তামার পয়সার আকারের, এক থেকে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের। ইংরেজ বাজারের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাওয়া যায় ‘হাতিপায়া’ লুচি, হাতির পায়ের মতোই দেখতে। জন্মাষ্টমীতে অনেক বাড়িতে তৈরী হয় তালের লুচি, সঙ্গতে তালের ক্ষীর। আর আছে বিশুদ্ধ বাঙাল সৃষ্টি— ল্যাস্যাইয়ের পায়েস, যা আদতে লুচির পায়েস।
সুতরাং আশ্চর্য কি যে বাংলা সাহিত্যের ভোজের পাতেও লুচির সুবাস ভুরভুর করবে! কিন্তু সে আলোচনা অন্যদিন, অন্য কোথাও। আজ শেষ করা যাক এই আশা নিয়ে যে আমাদের যেন কোনদিন বলতে না হয়— হায় লুচি, তোমার দিন গিয়াছে।
ঋণ : বাংলার খাবার : প্রণব রায়, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর : ইন্দ্র মিত্র, বাঙালির শীতের বিলাস : রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, কিছু তথ্য উইকিপেডিয়া থেকে গৃহীত।
লুচি সম্পর্কীয় মনোজ্ঞ তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হলো চতুর্দিকে গাওয়া ঘিয়ের লুচির আঘ্রাণে ম ম করছে! প্রবাদ প্রতিম সংগীত শিল্পী রামকুমার চট্টপাধ্যায় মহাশয় গীত লুচি এবং তার নিকটজনদের নিয়ে জনপ্রিয় গানটি মনে পড়ছে! তবে সত্যিই লুচি অনবদ্য, তুলনাহীন!
গাওয়া ঘী-এ ভাজা লুচি শেষ খেয়েছি মহাত্মা গান্ধী রোড আর স্ট্রান্ড রোডের সংযোগ হচ্ছে সেখানে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দোকানে। ইদানিং স্বাস্থ্যের কারণে ময়দা খাওয়া প্রায় উঠে গেছে। লুচির বদলে পুরি। আমার অখাদ্য লাগে। তাই খাই না। লুচির সঙ্গে হালুয়া। দুটোই লক্ষী ঘি/ঘী-এর। আহা!!
“অনেক দিন পর একটি তেলের বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে অরুণ বাবুর লুচি মুখে দেওয়া ।অনেক খাবারের মধ্যে অরুণ বাবুর অন্যতম একটি প্রিয় খাবার লুচি । দু ‘টুকরো লুচি মুখে পরার পর মনে হল,দীর্ঘ দিনের ক্ষুধার্ত বাঘ রক্তের স্বাদ পেলো।সেদিন রাতে ঘুম হলো না তরুণ বাবুর।যে অমৃতের স্বাধ তিনি পেয়েছেন,তা কিভাবে চেটে পুটে উপভোগ করা যায় তার ফন্দি ঘুরপাক খেতে লাগল অরুণ বাবুর মাথায়।
নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল টপকে কিভাবে পেটপুরে লুচি খেতে পারে তার একটি জবরদস্ত প্ল্যান ঠাওরে নিলেন অরুণ বাবু ।সেদিন শুটিং এর ফাকে কানাই কে ডেকে বললেন,”হ্যাঁ রে তোর বৌ তো বল্লি অনেক দিন ধরে সিনেমা দেখতে যাওয়ার বায়না ধরেছে,তা আজগে নিয়ে যা,আমার আজ একটু দেরি হবে যেতে ,তুই বরঞ্চ এখনই বেরিয়ে পর তাহলে ম্যাটিনি শো টা ধরতে পারবি, এই নে টাকাটা ধর,যা ঘুরে আয়”। ইতস্তত লাজুক মুখ করে কানাই বলল,”আচ্ছা স্যার,আপনি সাবধানে বাড়ি পৌছে যাবেন,আমি তাহলে আসলাম”।অরুণ বাবু বললেন,”হ্যাঁ আয় “।…….”…..”সংগৃহিত