অওধের শেষ বদনসীব নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্। যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী, তখনো তাঁর শখ-শৌখিনতা যায় নি। লখনৌয়ের তখৎ ছেড়ে তিনি কোলকাতার পথে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে চলেছে অসংখ্য বেগম, বাঁদি, নোকরচাকর, বাবুর্চি, গায়ক, নর্তক, বাজনদার আর এক দাস্তানগো। সে গল্পবলিয়ে। উর্দুতে দাস্তানগো কথার অর্থ গল্পকার বা storyteller ।
জনাব মীর রেজ্জাক হলেন নবাবের খাস দাস্তানগো। রোজ রাতে রেজ্জাক সাহেবের দাস্তানগোই ছাড়া যে নবাবের ঘুম আসেনা! রসিক নবাব সবথেকে শুনতে ভালোবাসেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনী। সে গল্প শুনেই গান বাঁধেন নবাব। তাঁর সুর, কথা আর ভাবের মূর্ছনায় ঠুমরী প্রাণ পায়। ঠুমক ওঠে বাঈজীর রূপোর ঘুঙরুতে। স্বপ্নবিলাসী নবাবের স্বপ্নের যোগানদার রেজ্জাক। সে হয়ে ওঠে নবাবের নিজস্ব সম্পদ।
একসময় লখনৌয়ের গলি-মহল্লা, চৌক, আফিমখানাতে সে গল্প শুনিয়ে বেড়াত। তার গল্প বলার টানে ভীড় করত বিভিন্ন বয়স, নানা পেশার নানান ধরনের মানুষ। আফিমখানায় আসা মানুষগুলি আফিমের নেশায় ভীড় করত না, রেজ্জাকের গল্পের টানে তা বলা মুশকিল ছিল। রেজ্জাক তার এই গুণটি রপ্ত করেছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। তার বাপ ঠাকুর্দাও দাস্তানগোই করে মানুষের মন ভোলাত, দু-পয়সা রোজগার করত।

অনেক আগে প্রায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রেজ্জাকের পূর্বপুরুষের মত আরো অনেকেই পারস্যে নাকি এই দাস্তানগোই বা গল্প শুনিয়েই মশহুর হয়েছিল। কেমন করে সে দাস্তানগোরা তাদের দাস্তান নিয়ে হিন্দুস্তান পৌঁছেছিল সে কথা অবশ্য রেজ্জাকের অজানা। তবে, গজল, শেরশায়রী, গুলাবী আতর, শরাব, কিংখাব, কাবাব, বিরিয়ানির মত দাস্তানগোইও জনপ্রিয়তা লাভ করছিল হিন্দুস্তানের জমিতে।
রেজ্জাক তার শ্রোতাদের শোনাত আরব্য রজনীর কিস্সা, লায়লা মজনুর মোহব্বতের দাস্তান, হিতোপদেশের গল্প, আর বদলে যাওয়া সময়ের কাহানী। তার কণ্ঠস্বরের উঁচুনীচু প্রয়োগে, গল্পের চরিত্রদের সুখ-দুঃখ-বেদনা এমন করে ফুটে উঠত যে লোকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত তার দাস্তানগোই। নবাবের কোনো খাস আদমী কোনো চৌকে রেজ্জাকের দাস্তানগোই শুনে নবাবকে এত্তেলা দেয়। বাদশা নিজে তাকে ডেকে পাঠান। তারপর থেকে নবাবের দরবারে রেজ্জাক খাস কলাকার।
দরবারে সে যখন দাস্তানগোই পেশ করে, তখন তার সঙ্গে থাকে তার দলবল। সফেদ তখ্তে, বজ্রাসনে বসে রেজ্জাক মেহফিল জমায়। সে থাকে দলের মধ্যমণি হয়ে। পরনে তার তখন নিদাগ সাদা চিকনের কলিদার আঙ্গারাখা। মাথায় কুড়ুশকাঠিতে বোনা জালিদার টুপি। মেহন্দি রাঙানো লালচে দাড়ি। কানের তুলোয় কনৌজের গুলাবি আতরের খুশবু। চোখে সুর্মা। খয়ের সিক্ত পানে লাল ঠোঁট। মজলিশ জমে যায় তার উপস্থাপনায়। হাতের মুদ্রায়। কণ্ঠস্বরের নাটকীয় প্রয়োগে। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে বারবার বাহবাই দেয়। রেজ্জাক টুপি খুলে, মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করে।

তার গল্প বলার কায়দা এমনি যে, লোকে একই কিস্সা বারবার শুনতে চায়। কিন্তু রেজ্জাকের তা না-পসন্দ। সে শোনাতে চায় তার শ্রোতাদের নতুন গল্প, নয়া দাস্তান। জীবনের গল্প। সমাজ বদলের গল্প।
তাই তো বাদশার সঙ্গে সেও ভাগ্যাণ্বেষণে বেড়িয়েছে। মনে তার নয়া তামান্না। নবাবের শহরের খাস নবাবের পেয়ারের রেজ্জাকের লখনৌয়ের আয়েশ-আরাম ছেড়ে যেতে তার বিন্দুমাত্র দর্দ নেই। সে হামেশা তলাশ করে নতুন দাস্তান। নয়া চমক। নতুন শহরে সে আলবৎ পাবে নয়া দিলচস্প কাহানী। পাবে নতুন গল্প শোনার লোক।

একুশটি তোপধ্বনি দিয়ে ভারতের শেষ নবাবকে অভ্যর্থনা জানানো হয় কোলকাতায়। মেটিয়াবুরুজের অভ্যন্তরে তিনি তাঁর ঠাটবাট, নাচগান নিয়ে লখনৌয়ের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ গড়ে তোলেন। আর দাস্তানগো মীর রেজ্জাক? সে কোলকাতার অলিগলি ঘুরে বেড়ায়। নতুন শহরে তার নয়া জিন্দেগী। এখানে আজনবী মানুষ। তাদের আজীব ঠাটবাট। সে গল্প বুনতে থাকে। অলিগলি মহল্লার বাঁকে বাঁকে সে খুঁজে পায় নতুন দাস্তান। কত রঙবেরঙের কিসসা কাহিনী।

কোলকাতায় তখন দিন বদলের পালা শুরু হয়েছে! একদিকে চলছে বাবুগিরি। জুড়ি-গাড়ি, পায়রা ওড়ানো, বেড়ালের বিয়ে, বাঈ নাচ, থিয়েটার, দোল-দুর্গোৎসবের মোচ্ছব। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ইঙ্গবঙ্গ সমাজ। তারা ইংরিজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বসনে-ভূষণে, চালচলনে ইংরেজদের নকলনবিশি করছেন। কেউ কেউ নিজের ধর্ম ছেড়ে খ্রীস্টান হচ্ছেন। সমাজের অচলায়তন তারা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে ফেলতে চান। অন্যদিকে আছেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, রাণী রাসমণির মত কিছু মানুষ যাঁরা সমাজের কল্যাণে রত। আছে লালমুখো ইংরেজ, দোকানদারি থেকে যারা এদেশের প্রভু হয়ে উঠেছে। গল্প, গল্পের চরিত্রের কোন অভাব নেই রেজ্জাকের কাছে। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে, ময়দানে, চৌরঙ্গীর সাহেব পাড়ায়, গোলদিঘির কলেজ পাড়ায়, বাগবাজার, চিৎপুরের বাবুদের পাড়ায়, খিদিরপুরের জাহাজ ঘাটায় মেটিয়াবুরুজের মুসলমান পল্লিতে কেবল গল্পই গল্প…. রেজ্জাকের গল্পের ঝুলি ভরে ওঠে। তার দাস্তানগোইতে নতুন নতুন চমক আসে! সেখানে ঊর্দুর সঙ্গে মিশে যায় বাংলা, ইংরিজী শব্দ। নতুন কায়দা, নতুন শৈলিতে সে পেশ করে বেশ কিমতি কাহানী …. জন্ম হয় এক নতুন ধারার দাস্তানগোই।
গল্প বলার গল্প… খুব সুন্দর।
ধন্যবাদ। খুব খুশি হলাম
বেশ ভালো লাগল নন্দিনীর দাস্তানগোই
ভালোলাগা জানানোর জন্যে ধন্যবাদ ????
এক আনোখা দাস্তান ????
শুকরিয়া????♥️
ভালো লাগলো। এরপর কি হলো নতুন দস্তান?
লেখা ভালোলাগার জন্যে ধন্যবাদ। নতুন শহরে নয়া দস্তান তো সেজে উঠবেই!