মঞ্জুষা শব্দ আমরা আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনে খুব একটা ব্যবহার করি না। মঞ্জুষা বললে মোটামুটি সকলেই বোঝেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হস্তশিল্পের দোকান। যদিও মঞ্জুষার প্রকৃত অর্থ এক ধরনের ঝুড়ি, যার উপরে ঢাকা আছে, জলে ভাসবে কিন্তু ভিতরে জল ঢুকবে না। আমরা যে ‘বাক্স-পেঁটরা’ বলি, মঞ্জুষা হল সেই পেঁটরা। কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের চতুর্থ খণ্ডের শান্তিপর্বের ‘ফুটনোটে’ মঞ্জুষার অর্থ পেঁটরা লিখে বলা আছে, ‘পেটরা এরূপ কৌশলে নির্মিত যে জলে ডুবিয়াও যায় না বা বায়ুরুদ্ধ হয় না’। এই মঞ্জুষায় করেই সূর্য্যপুত্র, সদ্যোজাত কর্ণকে গঙ্গার স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন কুন্তি। ফলে কেউ যদি আপনার ঝুড়ি দেখে প্রশ্ন করে মঞ্জুষায় কী আছে, চমকে উঠবেন না। বাঙালির বোঁচকা-বুঁচকি লট-বহর বা বাক্স-পেঁটরার বিবর্তন নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, হোল্ডঅল-এর কথা। আমরা ছেলেবালায় বলতাম হোলডোল। এখন নেটে সার্চ দিলেও ৭০-এর দশক পর্যন্ত বাঙালির বেড়ানোর সঙ্গী সেই হোলডোলের ছবি সহজে পাওয়া যায় না। তখন ট্রেনে চড়া মানেই ছিল এক বা একাধিক ‘হোলডোল’। যারা হোলডোল দেখেননি, তাঁদের বোঝানো কঠিন জিনিটা ঠিক কী ছিল? তাতে লেপ, তোশক, অন্তত ৪টি বড় মাপের বালিস, তোয়ালে, গামছা, খবরের কাগজে মোড়া পরিবারের সবার চটি, মাসিক পত্রিকা, বই পত্তরও ঢুকে যেত। বাঁধা অবস্থায় দেখতে অনেকটা শুইয়ে রাখা পিচের ড্রামের মতো ছিল। দুটো বড়ো ‘বকলেস’ লাগানো বেল্ট। কষে বাঁধতে হত। ওটা বাঁধার সময় বাবাদের ডাক পড়ত। এবং প্রায়ই টানাটানিতে একটা বেল্ট যেত ছিঁড়ে। তখন মায়ের কাপড়ের পাড় দিয়ে সাময়িক সামাল দেওয়া হত পরিস্থিতি। সঙ্গে থাকত ট্রাঙ্ক। মানে লোহার বাক্স। তাতে তিন চার জায়গায় তালা লাগানোর ব্যবস্থা।
ট্রেনে ট্রাঙ্ক নিয়ে যাওয়া বন্ধ হয় মোটামুটি সত্তরের দশকের গোড়া থেকে। তখন ধীরে ধীরে লালচে চামড়ার নানা মাপের স্যুটকেস আসছে বাজারে। যারা কলকাতায় থাকতেন না, তারা পাড়ার কেউ কলকাতা গেলে স্যুটকেস আনতে দিতেন তখন। সেই সব স্যুটকেসে কাপড়ের ঢাকা পরানো থাকত। ছোট ছোট তালা লাগানোর ব্যবস্থাও থাকতো স্যুটকেসে। যাদের বাড়িতে স্যুটকেস ছিল না তারা বেশ হীনম্মন্যতায় ভূগত। সুটকেস খুলেই একটা চামড়ার গন্ধ বেরোতো।

ট্রেনে উঠলে ‘হোলডোল’, ট্রাঙ্ক বা স্যুটকেসের সঙ্গে থাকত বালতি ব্যাগ। বেতের, পরে এল বেতের মতো প্লাস্টিকে বোনা বালতি ব্যাগ। তাতে থাকত মিষ্টি, রুটি, কৌট ভর্তি বিস্কুট, কলা, আলুর দম, মাংস। হাত মোছার কাপড়, হজমের ওষুধ, পানের বাক্স, সব থেকে ছোটজনের খেলনা, লুডো, তাস। তখন জলের বোতল হত লোহার। ঢাকাটা সরু চেন দিয়ে বোতলের সঙ্গে জোড়া। বোতলটা সেনা বাহিনীর কম্বলের মতো এক ধরনের কাপড় দিয়ে মোড়া থাকত। যাতে জল বেশি ক্ষণ ঠান্ডা থাকে। বড়ো স্টেশন এলে যারা তখন খালি বোতল হাতে দৌড়ে গিয়ে জল আনতে পারত, তাদের ছিল আলাদা গুরুত্ব। তখন এক ধরনের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ অনেকে নিতেন, যেগুলিকে বলা হত ‘কিট ব্যাগ’। এর মধ্যে যাদের কিট ব্যাগে ‘কেএলএম’ বা ‘বিওএসি’ লেখা থাকত, তাদের হাঁটা চলাই বদলে যেত। ধরেই নেওয়া হত এরা মাঝে মাঝে প্লেনে যাতায়াত করে।
৮০-র দশকে এসে অ্যাটাচি বাঙালির বাক্স-পেঁটরা জগতে বড় পরিবর্ত এনে দিল। তখন সকাল ন’টায় যে বাঙালি মুখে ফিলটার উইলস নিয়ে হাতে অ্যাটাচি দুলিয়ে মিনি বাসে উঠে ৬৫ পয়সা বা ৮০ পয়সার টিকিট কেটে অফিস যেত, তাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত ডাবল ডেকার চড়িয়েরা। কী সব অ্যাটাচি। এক সঙ্গে দু’হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ফড়াক করে ঢাকা খুলে উঁচু হয়ে যেত। সেই ফাঁক দিয়ে দেখা যেত ডায়রি, পেন, টাই, আরভেসে আসত সুগন্ধ। এর মধ্যে যাঁরা সিপিএম নয় কিন্তু বামপন্থী, তাঁদের তখন দেখেছি মিনি বাস ব্যাপারটাকে শুরুর দিকে মোটেই ভাল চোখে দেখতেন না। তাঁরা মনে করতেন, যাত্রীদের মধ্যে শ্রেণি বিভাজন হচ্ছে।

আম বাঙলি চাকা লাগানো লাগেজ নেওয়া শুরু করল ২০০০ সালের পর। আর মিনারেল ওয়াটার তার পর পরই। তবে চাকাওয়ালা লাগেজের চল হলেও প্রথম প্রথম স্টেশন ময়লা, এই অজুহাতে ওই সব লাগেজ কুলির মাথাতেই যাতায়াত করত।
দিন কয়েক আগে ব্যাঙ্গালুরু থেকে ফিরে লাগেজ সংগ্রহের জন্য অনেকক্ষণ কনভেয়ার বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। তখনই লক্ষ্য করলাম প্রায় ৯০ ভাগ লাগেজ এখন চাকায় চলে। একটা স্মার্টফোন বা ট্যাবে হাজারটা অপশন এখন। পার্সে ক্যাশ টাকার বদলে কার্ড। এই সব পরিবর্তন কিন্তু প্রায় নিঃশব্দে আমাদের জীবন-যাত্রা বদলে দিচ্ছে। যেমন, নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, তবু ধারণা থেকে বলা যায়, যত দিন যাচ্ছে, হয়তো কর্মসূত্রে, তবু, মানুষের একাকী-যাত্রা বেড়েই চলেছে। জীবনে গতি বেড়েই চলেছে। বহু পরিবার এখন যৌথভাবে সবাই মিলে সারা বছরে যত কিলোমিটার যাতায়াত করে, একক ভাবে ওই পরিবারের একেক জন সদস্য কর্মসূত্রে তার চেয়ে অনেক বেশি কিলোমিটার যাতায়াত করেন। লাগেজ বা বাক্স-পেঁটরার আকার ওজন রং সবই বদলে যাচ্ছে জীবনের এই গতির সঙ্গে। আর এগুলো সবই হয়তো আমাদের প্রতিদিনই আরও একটু বেশি করে একলা করে দেয়।