মোবাইল কানে রেখে অপেক্ষা করতে থাকি। নয়ডা শহরের একশো উনিশ নম্বর সেক্টরের পাঞ্চাল কমপ্লেক্সের এই সতেরো তলার একটা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমার চোখের সামনে এখন দূরের কুয়াশা ঢাকা গমক্ষেত, না দেখতে পাওয়া কোনও গ্রামের দিকে চলে যেতে থাকা কাঁচা রাস্তা। সাইকেলে যেতে থাকা একটা লোক অস্পষ্ট হতে হতে এইমাত্র একেবারে অদৃশ্য হল। কুয়াশা জড়িয়ে গমক্ষেতের সবুজ দানাগুলি যেন জড়সড় হয়ে শুধুমাত্র সূর্যের বেরিয়ে আসার জন্যই অপেক্ষা করছে।
রিং হয়ে যাচ্ছে ফোনে। মা কি তাহলে রান্না করছে? নাকি পুকুরে? ঘাটের গায়ে নুয়ে-পড়া সবেদার ডালে মায়ের সাদা কাপড়টা কি ঝুলছে? নাকি স্নান হয়ে গেছে আগেই, হয়তো ঠাকুর দিচ্ছে। শীত-গ্রীষ্ম যাই হোক মায়ের ঠাকুর দেওয়ার সময়ের বদল হওয়ার কথা তো নয়! মাঘের এই কনকনে ঠান্ডাতেও মা ঠিক সেই সকালেই স্নান করে ঠাকুর দিয়ে তবে—। আমারই ভুল, মা তাহলে রান্নাই করছে, উনুনের সামনে বসে থাকাতেই হয়তো ফোনের শব্দ—। হয়তো নদীবাঁধের জঙ্গল থেকে নিয়ে আসা পালা থেকে ডাল ভেঙে ভেঙে উনুনে গুঁজছে। আর সেই ডাল ভাঙার পটপট শব্দে মোবাইলের আওয়াজ—। কিন্তু ফোনটা বারান্দার চৌকিতে থাকলে মায়ের তো শব্দটা না শোনার কথা নয়। রিং হয়ে হয়ে একেবারে চুপ হওয়ার পর ফের ‘মা’ বলে সেভ করা জায়গায় আঙুল ছোঁয়াই, আর মায়ের ফোন থেকে আমার ফোনে এসে পৌঁছানো রিং-এর আওয়াজ থেকে আমাদের সুন্দরবনের গ্রামের বাড়ির সেই উঠোন, পুকুর, খালপাড় বা আমাদের সেই খড়ে-ছাওয়া মাটির বাড়ির কোনও চিহ্ন আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করি। রিং-টোনে আমাদের সেই ঘর বা পুকুর কি উঠোনের কোনও সাড়া পেলেই আমি যেন মাকে খুঁজে পাব ঠিক। মোবাইলের ফাঁক-ফোকর বেয়ে শব্দ ধরে ধরে বাতাসের স্তর থেকে স্তরে ভেসে আমি আমাদের নদী-জঙ্গল ভেদ করে, সেই রাস্তা,বাঁধ পার হয়ে একেবারে ঘর লাগোয়া হালদারদের জমি, আর হালদারদের জমির জলকাদায় নামব না বলে বাঁধ বরাবর আর একটু এগিয়ে তালগাছের পাশ দিয়ে বাঁধ থেকে নেমে আমাদের উঠোনে যাওয়ার রাস্তায়—।
উঠোন ছাড়িয়ে খালপাড়ের জঙ্গল। জলের দিকে ঝুঁকে পড়া সজনের ডাল। আম, সবেদা, বেল। খালপাড় ঘেঁষে ধান ঝেড়ে গাদা করা খড়। আমাদের বাস্তুসাপটা দেখি খড়ের গাদার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে। দাঁড়াশ। ও কি শীতঘুমে যায়নি এখনও? নাকি সেই অঘ্রানের পরপর ঘুমে গিয়ে একটু আগেই জেগে উঠল। ওর এখন খিদে খুব। একটু এঁকেবেঁকে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে খালপাড়ের সেই সজনে গাছের দিকেই। সজনে গাছ বেয়ে তার মানে উঠবে, উঠে চুপচাপ ডালের গায়ে জড়িয়ে মুখটাকে বাড়িয়ে অপেক্ষা করবে। একটা শালিক কেমন ঝামেলা শুরু করল দেখ ওর সঙ্গে। তাহলে কি সজনে গাছের ডালে সেই যে বাসাটা এই শালিকটারই? পাখিটা দাঁড়াশের লেজে ঠোকরাচ্ছে, আর একবার করে ঠুকরেই একটু লাফিয়ে পিছনে সরে যাচ্ছে। আর দাঁড়াশটাও বিরক্ত হয়ে একেবারে গাছের গোড়া বেয়ে উঠতে গিয়েও ফের ওই অতদূর থেকে মাথাটাকে পিছনে বাঁকিয়ে এনে শালিকটাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছে। একটা শব্দ হল না? হ্যাঁ। যেন এই এতক্ষণে—, ‘মা, ও মা, তোমাকে কতক্ষণ ধরে—।’ না, আমারই ভুল, কেউ ধরেনি তো, ফোনের রিং এখনও সেই একই সময়ের ফাঁক দিয়ে দিয়ে বেজেই যাচ্ছে। মা কি তাহলে বুঝতে পারছে না? মানে ফোনের আওয়াজ শুনেও—। এমন হয় তো! হালদার বাড়ির বড় বউ বা অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে মাকে ভুল ধরিয়ে দিত ঠিক। হয়তো বলত, ‘ও মাসি, তোমার ফোন তো সেই কখন থেকে—।’ সেই বড় বউ বা কেউ যদি এখন আওয়াজ খেয়াল করে বারান্দার চৌকির উপর রেখে দেওয়া গামছাটা সরিয়ে মাকে বলে, ‘ওই তো—।’ তক্ষুনি মা অবাক হবে খুব, বলে উঠবে, ‘গামছাটাকে আবার ফোনের উপর কে রাখল বল তো এখানে?’ মাকে কে আর মনে করিয়ে দেবে যে মা নিজেই একটু আগে—।
পায়রাগুলি বারান্দার মাথায় রাখা টঙ-এর খোপে বকবকম শব্দ করছে । খালের দিক থেকে একটা বেজি ছুটে এল না গোয়াল ঘরের দিকে? পাম্পের শব্দ আসছে একটানা, প্রায় শুকিয়ে আসা খাল থেকে খরোটি চাষের জন্য যে পারছে জল তুলে নিচ্ছে। খালের গা থেকে নুয়ে-পড়া শিরীষ, বেল বা আমের ডালের নিচে জাল হাতে দাঁড়িয়ে প্রফুল্লকাকু নির্ঘাত একটা কোনও ঘাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। একবার সন্দেহ করার মতো জল কেঁপে উঠলেই কাঁধের জালটাকে—। কিন্তু মা গেল কোথায়? গ্রাম থেকে হাজার মাইল দূরে সতেরো তলার একটা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনের হতে থাকা রিং টোন বেয়ে বেয়ে আমাদের বিনোদপুর গ্রামের বাড়িটার উঠোন, গোয়ালঘর, পুকুরঘাট তন্ন-তন্ন করে খুঁজতে থাকি। বারান্দার দিকের মাটির দেওয়ালে জানালার গায়ে গায়ে চৌকির উপরেই তো রাখা থাকে ছোট ফোনটা। যেন ফোনটাকে পেলেই মাকে খুঁজে পাওয়ার অসুবিধে থাকে না আর।
আমাদের ঘর, ঠিক করে বললে, রাস্তার দিকে একেবারে পিছন ফেরানো। রাস্তা মানে বাঁধ। বাঁধ থেকে উঠোন পর্যন্ত পৌঁছতে হাঁটা কমাতে চাইলে আগে হালদারদের জমিতে নামতে হবে, আর রাস্তা থেকে সেই জমিতে নামার প্রায় খাড়া পথে নিজেকে সামলানোর জন্য বাঁধের গা থেকে জমিতে হেলে-পড়া শিরীষের গাছটাকে আঁকড়ে ধরতেই হবে তোমাকে। এবার দু’পাশের হাল করা জমির মাঝখান দিয়ে আল ধরে ধরে আমাদের উঠোন। আর রোয়ার জন্য তৈরি করা খালের পাম্প করা জলে একেবারে কাদা কাদা হয়ে যাওয়া জমি এড়াতে চাইলে হালদারদের জমিতে না নেমে বরং এগোও আর একটু। বাঁধের দুপাশে বেড়ে ওঠা বাবলার কাঁটাওয়ালা ডালগুলি অবশ্য জামা-প্যান্ট ধরে টানাটানি করবে ঠিক। ডানদিকে থেকে কে যেন কিছু বলে উঠল না? ও, ওটা ফলু মাইতির মা, বাগান থেকে উচ্ছে তুলছে। নাতিটাকে বকে উঠল কী জন্য কে জানে। উচ্ছের বাগান জুড়ে প্যান্ডেল, প্যান্ডেল মানে বাঁশের কঞ্চি বা দূরের জঙ্গল থেকে চুরি করে আনা বানি বা গরান কি গেঁওয়া গাছের সরু সরু ডাল। সুতলি দিয়ে বাঁধা এই ডালপালা বা বাঁশের কঞ্চিগুলিকে উচ্ছে বা করলার নরম আর সরু লতাগুলি আঁকড়ে ধরে বড় হবে। এই প্যান্ডেলের গোড়ায় লংকা বা বেগুনের চারা। আছে ঢেঁড়সও। উচ্ছের প্যান্ডেল জড়িয়ে ছড়িয়ে যাওয়া সবুজ লতানো গাছগুলির আড়ালে ফলু মাইতির মা বা ওর নাতির কাউকেই কিন্তু বাঁধের উপরকার এই রাস্তা থেকে চোখে পড়বে না। চোখে পড়ার মধ্যে উচ্ছের প্যান্ডেল ছাড়িয়ে মনি দুয়ারিদের জমি। ডানদিকে চাষের জল ধরে রাখার পুকুর একটা। ওটা দুয়ারিদেরই। পুকুর ছাড়িয়ে পাছুয়ার খাল। এই খাল আসলে নদীই ছিল নাকি কোনও কালে। এখন একেবারে জোয়ার-ভাঁটা বন্ধ করার জন্য লকগেট দিয়ে বেঁধে দেওয়া। খালের ওপারটা হাজারবিঘা। মানে হাইস্কুল পাড়া।
ঘুঘু ডাকছে কোথাও? ফোনের রিং টোন ধরে ধরে হাজার মাইল দূরের এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েও আমি টের পাচ্ছি। একেবারে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। ধারে কাছেই। একটা হাঁড়িচাচা পুকুরের ওপারের ফণিমনসার ঝোপের ছায়ায় যেন আমাকে দেখেই লাফ দিয়ে অদৃশ্য হল। মায়ের সাধের সাদা গরু দুর্গা অনেক আগে থাকতেই কিন্তু দেখে নিয়েছে আমাকে। রিং টোন ধরে ধরে বাতাসে ভাসতে ভাসতে এ শহর ও গ্রাম, এ নদী ও পুকুর ঠেলে— । বাঁধ থেকে নামার মুখে তালগাছের গোড়ায় দূর্গা এখন চেনা মুখ পেয়ে হয়তো একটু আদর পাওয়ার জন্যই আয়েশ করে উঠে দাঁড়াল। অর্থাৎ থামতে হবে আমাকে। গলায় হাত বোলানো শুরু করতেই দুর্গা চোখ বুঁজল। মাথাটাকে আমার পেটে ঠেকিয়ে ঘষা শুরু করল। এটা ওর বরাবরের অভ্যেস। জিজ্ঞেস করি, ‘খেয়েছিস তো সকালে?’ ও যেন ঘাড় নাড়ল। আমি জানি ভোরবেলা উঠে মায়ের প্রথম কাজই হল দুর্গাকে গোয়াল থেকে বের করে মুখের সামনে খোল-ভুঁষির গামলা রেখে এই তাল গাছের গোড়ায় পুকুর পাড়ের ফাঁকা জমিটাতে খুঁটি পুঁতে রেখে যাওয়া। মাথার উপর শিমুল আর সবেদা গাছের ছায়া। দুর্গা একেবারে ওর ইচ্ছেমতো যেন ছায়া বা দরকারে শীতের রোদের উত্তাপ নিতে পারে। শুধুমাত্র ফোনটা আছে কোথায় দেখার জন্য এবার আমাকে পুকুরের পাড় ধরে উঠোনে যাওয়ার সরু পথ ধরতে হবে। উঠোনে পৌঁছনোর আগেই ডেকে উঠি, ‘মা—।’ পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকল না কেউ? তার মানে ফলুর মায়ের সঙ্গে হয়তো সেই উচ্ছে বাগানেই দাঁড়িয়ে বা বসে—। এখন আমি দেখতে না পেলেও মা হয়তো সেই প্যান্ডেলের আড়াল থেকে আমাকে লক্ষ করেছে। বা, ফলুর মা-ই হয়তো উচ্ছের প্যান্ডেলের আড়াল থেকে আমাকে বাঁধের উপরের রাস্তায় দেখতে পেয়ে মাকে বলে উঠেছে, ‘মাসি,তোমার খোকাকে দেখলাম মনে হল, হ্যাঁ, খোকাই—।’ আর মা তা শুনে—। কিন্তু কোথায় কী, কেউ নেই তো! শুধু উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কায় তালপাতায় খরখর খরখর—। আসলে তালগাছের পাতাগুলিই আচমকা বাতাসে যেমন শব্দ তোলে। ডানদিকে পুকুরের হাঁসগুলিকে ঘাটের দিকে সাঁতার কাটতে দেখেই কেমন ভুল হয় ভাবো, যেন পুকুর ঘাটে বাসন ধুতে থাকা মাকে দেখে, যেন বাসনের গা থেকে ঝরে পড়া ভাত বা অন্য কিছুর লোভে—। ওদের তো শুধু মাকে দেখতে পেলেই হল একবার। হাঁসগুলি সত্যি মায়ের ন্যাওটা খুব। মাকে দেখামাত্রই ভাববে এই বুঝি একটা-দুটো গুগলি-শামুক—। আর মায়ের পায়ে পায়ে লেগে থেকে প্যাঁক-প্যাঁক—। ভাবলাম হাঁসগুলি ঘাটে ফিরছে যখন তাহলে মা নির্ঘাত—।এক্ষুনি হয়তো গোয়াল ঘরের পাশ দিয়ে সাদা কাপড় পরা—।আমাদের ঘর থেকে ঘুরপথে না গিয়ে পুকুরে যাওয়ার ওই একটাই তো পথ, কিন্তু না তো, হাঁসগুলি ঘাটের দিকে না গিয়ে ফের পিছন ফিরছে। ফের জলে ডুব লাগিয়ে ভেসে উঠছে ভুঁস করে। না, পুকুরঘাটে মা নেই তাহলে। উঠোন ছাড়িয়ে দক্ষিণে খালের দিকেই হয়ত। কত যে কাজ থাকে মায়ের। জঙ্গলের শুকনো ডালপালা বা তাল কি নারকেলের ড্যাগলা—, আর এটা ভেবে ফের ডেকে উঠলাম,‘মা—’। আর অমনি সবেদা গাছের ডালপাতার আড়ালে বসে থাকা একঝাঁক শালিক চেঁচামিচি শুরু করল খুব। ওরা হয়ত আজ একটু আগে আগেই দূরের জমি-জঙ্গল ছেড়ে ঘরে ফিরেছে। বা, মা হয়ত ওদের জন্য কিছু সর্ষে দানা বা চাল—। শালিকগুলি যেন আমার ‘মা’ ডাক শুনেই চমকে উঠল। ধারেকাছে আমিই তার মানে একলা মানুষ। সূর্যটা এখন খালের ধারের ইউক্যালিপটাসগুলির মাথার আড়ালে। বাতাসে নড়তে থাকা নকশা করা পাতাগুলির ফাঁক-ফোকর দিয়ে মাঘের রোদ মাঝে মধ্যেই উঁকি মেরে একবার করে দেখে নিচ্ছে আমাকে। পিছন ফিরলে পুকুরের জলে এখন হালকা ঢেউগুলিই চোখে পড়ছে শুধু। হাঁসগুলি তার মানে পুকুরের ধার ঘেঁষেই কোথাও। একটা গান না? রেডিয়ো বাজছে খুব কাছেই কোথাও। গান শুনছে কেউ। তার মানে মা। মা-ই। রেডিয়ো চালু রেখে হয়ত চুপচাপ বসে। রেডিয়ো মানে এফ এম। উঠোনে ঢোকার মুখে মাথা নিচু করে ছোট জানালাটা দিয়ে ঘরের ভিতরটাও দেখে নিতে পারা যায় আগে থেকে। থাক দেখব না, বরং দু’-এক পা এগিয়ে একেবারে বারান্দাতেই ধরব মাকে। কিন্তু কোথায় কী? মা নেই তো। রেডিয়োটা একাই বেজে যাচ্ছে নিজের মতো করে। কোনও গান। বাংলা। কোনও মেয়েই। আর গানটাও যেন অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে যাচ্ছে মাকে। কখনও বা এক দমকায় চলে যাচ্ছে সেই খালের দিকে, গিয়ে সেই নিমগাছের গুঁড়ি ধরে ঢাল বেয়ে বেয়ে জল পর্যন্ত নেমে ফের একছুটে পেছন ফিরে এই বারান্দায় এসে বসছে। বা বারান্দা ছেড়ে ঘর, ঘরের খাট, টেবিল, ধানের বস্তা, প্লাস্টিকের চেয়ার। মাটির দেওয়ালে পেরেক পুঁতে ঝুলিয়ে রাখা বাবার ছবি। গানটি যেন ফাঁকা ঘরে একবার ছুঁয়েও যায় বাবার ছবিটাকে। ছবিটার গায়ে ঝুলে থাকা শুকনো মালাটা নড়ে উঠল না?
সুন্দরবনের গ্রাম বিনোদপুর থেকে আমি অন্তত হাজার মাইল দূরে। নয়ডা সেক্টর একশো উনিশ। নয়াদিল্লি স্টেশনে নেমে মেট্রো ধরে একেবারে সেক্টর আঠারো। এরপর চাত্তাবাজার থেকে অটো বা গাড়ি—। সকাল সাড়ে দশ বা এগারো মানে দেশ-গ্রামে এখন ভরা দুপুর। জমি-জিরেতে কাজের লোকজনেরা এখন ঘর থেকে পাঠানো খাবার খুলবে। সেই ভোর থেকে জমিতে কাজ করতে থাকা মানুষজন এখন মাঘের দুপুরেও ছায়ায় বসবে। কুয়াশা না থাকলে আমার এই পাঞ্চাল কমপ্লেক্সের ‘ই’ ব্লকের সতেরো তলার এই চার নম্বর ফ্ল্যাটের একেবারে বাইরের দিকের এই ব্যালকনি থেকে এখনও আকাশের গায়ে গায়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। কুয়াশাটা এই বেলা সাড়ে দশ বা এগারোটাতেও কাটতে চাইছে না যেন কিছুতেই। যেন তুমুল ব্যস্ত এই শহরটার ভিতরে কোথাও জমার মতো ফাঁক-ফোকর না পেয়ে আমার ব্যালকনি থেকে দেখতে পাওয়া এই জায়গাটা থেকে আর সরতে চাইছে না কোনও মতেই। এখনও পর্যন্ত কুঠিবাড়ি বা টাওয়ার বাড়ি গজিয়ে না ওঠা এই এলাকাকে ওদের যেন পছন্দ খুব। আগেকার একটা কোনও গ্রামের নাম খুইয়ে চোখের সামনে পড়ে থাকা জায়গাটার নাম সেক্টর একশো সতেরো হয়ে থাকলেও এখানে অনেকটা দূর পর্যন্ত এখনও কোথাও গমক্ষেতের সবুজ,কোথাও বা ঝোপ-জঙ্গল। বা গাছ একটা দুটো করে। বট, অশ্বত্থ, নিম। আবার কোথাও বা মাটি থেকে উঠে যাওয়া পিলারের মাথায় শেড আর শেডের নীচে বা মাথায় কাজ করতে থাকা অস্পষ্ট মানুষ। কোথাও বা ছড়ানো-ছেটানো জমির স্রেফ শূন্যতা। শূন্যতা মানে সে জমি এখন শুধুমাত্র অপেক্ষায়, কবে তার বুক ফুঁড়ে পিলার গাঁথা হবে, শেড উঠবে, কবে জেসিবি গাড়িগুলি জায়গায় জায়গায় ঘুরে মাটি খুঁড়ে—।
রিং হয়ে হয়ে ফোন একেবারে চুপ করে গেলে মা ফোন ধরেছে ভেবে আমি চেঁচিয়ে উঠি, ‘হ্যালো—, হ্যালো মা—।’ কোনও সাড়া না পেয়ে আবার আবার আমি বলতে থাকি, ‘হ্যালো—, হ্যালো—।’
দেখি, বিকেল হয়ে গেছে, আর কখন যে আমার সতেরোতলার সেই ব্যালকনি ছেড়ে আমি সত্যিই নীচে নেমে এসেছি, গমক্ষেত বা দূরের উঠতে থাকা শেডগুলির এদিক ওদিকের ছড়িয়ে থাকা শূন্যতা পার হয়ে, শেডগুলির ওপারের না দেখা গ্রামগুলি ছাড়িয়ে, মেট্রোর ফ্লাই-ওভার ছাড়িয়ে নিউ দিল্লি স্টেশন পৌঁছে গেছি, বা নিউদিল্লি স্টেশন হয়ে ট্রেনের ঘট-ঘটাং ধ্বনির মধ্যে একেবারে সত্যিসত্যিই—, জানালার বাইরে পিছনে পড়ে যেতে থাকা ফাঁকা প্ল্যাটফর্মগুলিকে ফেলে কখন যেন, কখন যেন নদীর পর নদী, ব্রিজের পর ব্রিজ বা ক্রমে কাছে আসতে চেয়ে পরক্ষণেই দূরে চলে যেতে থাকা পাহাড় বা জঙ্গল পিছনে ফেলে, হাওড়া শেয়ালদা হয়ে কখন যেন বিকেল-রাত-সকাল-দুপুর পার করে আমি আমাদের সত্যিকারের মথুরাপুর রেল স্টেশনে পৌঁছে গেছি। এরপর ট্রেকার, মোটর ভ্যান হয়ে নদী। ঠাকুরান নদীর ফাঁকা খেয়াঘাট। অনেক দিন পর দেখতে পেয়ে ঘাটের চায়ের দোকানের পরিমলদা বলে উঠল, ‘ছিলি কোথায় এতদিন? নৌকা তো এইমাত্র ছাড়ল রে খোকা, এবার চা খা একটা বসে।’ দেখি, সত্যিই ভটভট শব্দ তুলে মানুষ, সাইকেল, মোটর বাইক আর ছাগল-গরু নিয়ে নৌকো তখন মাঝনদীতে। এরপর পরিমলদার দোকানের চা, একটা সিগারেট। পরিমলদার মুখে দেশের গল্প, চাষ-আবাদের কথা বা কোন মেলায় কোন গাজন পার্টি। আর এই গাজন আর যাত্রাপার্টিগুলির ভালমন্দের তুলনা শুনতে শুনতেই ফের ভটভট-ভটভট ধ্বনি কানে আসে। তার মানে নৌকো ছাড়ল ওপারের ঘাট থেকে। এরপর আমার নদী, ভাটার টানে উথাল-পাথাল নৌকো। এরপর মোটর-ভ্যানের একনাগাড়ে হতে থাকা ভটভট ধ্বনির মধ্যে ডুবে গিয়ে পাঁচমাথার মোড় হয়ে, বাঁধের রাস্তা ধরে দু’পাশের উচ্ছের প্যান্ডেল আর লাঙ্গল দেওয়া জমি পিছনে ফেলে রেখে কখন যেন আমাদের পুকুর পার ছাড়িয়ে একেবারে আমাদের সত্যিকারের বারান্দার পাশে উঠোনের কোণে এসে দাঁড়িয়েছি! দেখি হালদার বাড়ির বড় বউই। হয়ত গল্প করছিল মায়ের সঙ্গে। এই এতক্ষণে নামছে বারান্দা থেকে।
হালদার বাড়ির বড় বউ চলে যাওয়ার পর, লম্ফ জ্বালিয়ে মা যখন আলোটাকে চৌকির উপর রেখে হাঁসগুলিকে পুকুর থেকে তুলে আনবে বলে বারান্দা থেকে নামছে, দেখে উঠোনের কোণে কে যেন দাঁড়িয়ে। বলে উঠল, ‘খোকা না? অন্ধকারে কী করছিস?’ কী আশ্চর্য দেখ, মা যেন জানতই আমি আসব। বলল, ‘চাদরটা গায়ে দে তো আগে, কেমন বাতাস বইছে দেখছিস উত্তরের?’ বলে নিজের চাদরটা—।
—উফ মা, আমি কি ছোট আছি এখনও? সোয়েটার আছে ব্যাগে, তিনদিন ধরে তোমাকে ফোনে কতবার—, সকাল থেকে রাত, ট্রেন থেকেও—, কোথায় থাকো বল তো?
উঠোনে দাঁড়িয়েই কোনও মতে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে বারান্দার চৌকির উপর রেখে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, মা কোথায়, কেউই নেই তো! আমাকে না বুঝতে দিয়ে কখন যেন সন্ধে নেমে পড়েছে চারপাশে। একটু আগে ছেড়ে আসা বাঁধের উপর দিয়ে ‘টিং-টিং-’ শব্দ তুলে সাইকেল চালিয়ে চলে যেতে থাকা একটা লোককে এই উঠোন থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না আর। ‘ট্টি-ট্টি,ট্টি-ট্টি-’ ডাক তুলে একঝাঁক টিয়ে ওপারের নদী-জঙ্গলের দিক থেকে এসে উঠোনের কোণে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেন অবাক হল খুব। যেন নিজেদের মধ্যে বলে নিল কিছু। খালের ওপারে শাঁখ বেজে উঠল কোথাও। দক্ষিণের কলাবাগানের পাশে হালদারবাড়ির কুঞ্জকাকুর জমিতে হাল করার মেসিনের শব্দ হচ্ছে ‘ভটভট’, কেউ তার মানে ওখানে আছে নিশ্চিত অল্প আলোয় যদিও বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। ডেকে উঠলাম, ‘মা-।’ জঙ্গলের আড়ালে নেমে আসা অন্ধকারে খালের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একটা কোনও পাখি ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ’ শব্দ তুলে নদীবাঁধের দিকে উড়ে গেল। অনেক দূরে কোথাও কীর্তন হচ্ছে যেন। কীর্তনের হো-হো রব জেগে উঠেই উধাও হচ্ছে। দরজায় তালা ঝুলছে দেখা গেলেও চাবি ছাড়াই ঘরে ঢুকতে অসুবিধে হওয়ার কথা তো নয়। মায়ের সব অভ্যাস একেবারে মুখস্থ। চাবি না লাগিয়ে তালাটাকে শুধুমাত্র দরজার কড়ায় ঝুলিয়ে রেখে দেওয়াটাই মায়ের রেওয়াজ। অন্ধকারে এই বারান্দায় চুপচাপ বসে না থেকে এখন আমি অনায়াসেই ঘরে ঢুকে লম্ফটা জ্বালিয়ে নিতে পারি। অনায়াসেই রেডিয়োটা চালিয়ে—। আর বাঁধের রাস্তা থেকেই রেডিয়োর গান বা জানালার ফাঁক গলে গিয়ে হালদারদের কাদাকাদা জমিতে পড়ে থাকা হালকা হলুদ আলো দেখে মা ঠিক অবাক হবে। ভাববে কে এল রে বাবা! কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেছে দেখেও ফিরবে না মা? প্রদীপ দেবে না তুলসীতলায়? ঘুম পাড়াবে না ঠাকুরকে? শাঁখ বাজাবে না?
—কে গো আপনি অন্ধকারে বসে?
লোকটাকে বোঝা যাচ্ছে না ভাল করে। আজ কোন তিথি কে জানে? পুর্ণিমা বা তার আশেপাশের কিছু হলেও সন্ধের শুরুতে আকাশের আলো তুমি টের পাবে না কিছুতেই। এমনকী পূর্ণিমা হলেও সেই আলো পেতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে ঘন্টা খানেক। বারান্দা ছেড়ে উঠোনে নেমে বললাম, ‘মা কোথায় গো?’ দেখি কুঞ্জকাকু। পা ভর্তি কাদা। বলল, ‘খোকা না?’ কুঞ্জকাকুর কথার জবাব না দিয়ে ফের জানতে চাইলাম, ‘মা কোথায় গেছে?’
—বলছি, কিন্তু মাসি জানে না তোর কথা? মানে তুই যে আসছিস—। ফোন করে দিসনি আগে থেকে?
দেশগ্রামের মানুষজনের এই এক অভ্যাস। আসল কথা না বলে—। বললাম,‘তিনদিন ধরে ফোন করে করে—।’
—বলে তো গেল তোদের কোন কুটুমবাড়ির কথা। না আসা অবধি তোর বড়কাকিকে ঘরদোর সামলাতে বলল। তোর বড়কাকি ছিল তো একটু আগেও, এই হাঁস, গরু, পায়রা ঢুকিয়ে ঘরে গেল এইমাত্র। রাতে আমিই—, একটা বাড়ি তো আর ফাঁকা রাখা যায় না দিনের পর দিন। ফোন করে নে তো মাকে!
জানি পাব না, মানে, দেখছি তো ক’দিন ধরে। কোথায় যে আমাদের কোন কুটুম বা সে বাড়িতে মায়ের কী যে দরকার তা শুধু মা-ই জানে, তবু আমি এসেছি জানলে মা নিশ্চয়ই—। রিং করা মাত্রই কুঞ্জকাকু বলে উঠল, ‘আরে ফোন করছিস কাকে, ফোন তো বাজছে সামনেই।’ দেখি সত্যিই তো, বারান্দার গায়ে জানালার কাছেই চৌকির উপর আলো জ্বলছে কীসের। আর কান থেকে ফোনটাকে সরাতেই বুঝি অনেক দূরে কোথাকার কোন কুটুম বাড়িতে নয়, মায়ের ফোন একেবারে আমার পাশেই। মোবাইলের কথা ভুলেই গেছে মা। ফেলে গেছে বাড়িতেই।
পুকুর থেকে হাত-পা ধুয়ে এসে দরজা খুলল লোকটা। বলল, ‘আয় ভিতরে, জামা-প্যান্ট ছেড়ে পুকুরে গিয়ে—’ বলে দেশলাই কোথায় ছিল কে জানে,আগুন জ্বালল একটা। কেরোসিনের লম্ফটা হলুদ আলো নিয়ে ডানদিক-বাঁদিক করতে করতে একসময় কালো শীষ মাথায় নিয়ে একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাছুয়ার খালের ওপারে শেয়াল ডেকে উঠল কোথাও। একটা ডাকের পর দূরের আর একটা দল কী বুঝল কে জানে বেশ একটু সময় নিয়ে নদীবাঁধের দিক থেকে অনেকে মিলেই সাড়া দিল। পুকুরপাড়ের জামরুলের ডালে হঠাৎ করেই ঝটপট-ঝটপট শব্দ হল খুব। নির্ঘাত বাদুড়, কোনও কারণে ভয় পেয়ে—। অনেক দূরের সেই কীর্তনের হো-হো রব জেগে উঠল ফের। নদীর দিক থেকে ভটভট শব্দ আসছে একটা। মাছ ধরার ট্রলারই হবে কোনও। আজকের এই সন্ধে থেকে চলে মাঝরাতে সাগরে পৌঁছবে।
কুঞ্জকাকু ফিরে আসবে এক্ষুনি। যাওয়ার আগে রেডিওটা চালিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোদের তো আবার খবর শোনার অভ্যেস।’ ঘরের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে জুতোটা খুলব বলে মাথা নিচু করতেই গোবরের ঘ্রাণ। মা তার মানে যাওয়ার দিন পুরো মেঝে গোবর-লেপা করে গেছে। লম্ফের কাঁপা কাঁপা আলোয় মেঝের মাটি জুড়ে মায়ের হাতে তৈরি গোবর জলের ঘ্রাণ যেন ‘কী করছিস, কী করছিস’ বলে ধমকে উঠল আমাকে। কেন, কী হল? ‘জুতো পরে দুনিয়ার ময়লা নিয়ে—।’ ইস কী যে ভুল হয়ে গেল, আর তক্ষুনি বারান্দার টঙ-এর খোপে আটকে থাকা পায়রাগুলিও যেন বুঝল কিছু, বকবকম-বকবকম বলে যেন সায় দিল মাকে। জুতোটা খুলব বলে বারান্দায় এসে দেখি কালো কুকুরটা খবর পেয়ে গেছে কীভাবে। বারান্দায় উঠে এসে লেজ নাড়তে শুরু করেছে। একেবারে কাছে এসে আমার পায়ের পাতা, হাত আর কোমরের কাছাকাছি নাক রেখে ভ-ভৌ করে আহ্লাদের ডাক ছাড়ল একটা।
—দাঁড়া বাবা, হাত-পা ধুয়ে বসতে দে আগে—।
একটা শব্দ হল না ভিতরে? যেন খুব সাবধানে টেবিলের উপর থেকে কেউ তুলে নিল কিছু। কে? ইঁদুর ছাড়া কে হবে আর। আবার। এবার স্পষ্ট, কেউ যেন ঘরের ভিতর থেকে একেবারে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে আমাকে।একটা কোনও ছায়া সরে গেল না? কে? ভুল হল, আগে লম্ফটা হাতে নেওয়া উচিত ছিল। হতে পারে আমার বা কুঞ্জকাকুর আগেই কেউ—। তাড়াহুড়ায় ধাক্কা লাগল কীসে। হুড়মুড় শব্দে উপর থেকে নীচে পড়ল কিছু। আমার ধাক্কাতেই। ধানের বস্তার উপর পানের বাটা রেখে গিয়েছিল মা। এবার অন্ধকারে খেয়াল না করে—। ‘খোকা—।’ মা না? না, রেডিয়োতেই কেউ। কোনও নাটকই হবে। ‘তোর জ্বালায় তো ঘরে আস্তো থাকবে না কিছুই, ফেললি তো—?’ কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখি দেওয়ালের ছবি থেকে বাবা হাঁ করে তাকিয়ে। দেখছে আমাকে। যেন আমার এইসব কান্ড দেখে অবাক খুব। ধানের বস্তার বাঁদিকে আমার বিছানাটা কিন্তু টিপটাপ একেবারে। যেন আমি আসব জেনে আজ সকালেই পেতে রেখেছে মা। বিছানার চাদর,বালিশের ওয়্যার, কাঁথা। কাঁথা একেবারে মায়ের নিজের হাতের বোনা। পুরনো শাড়ির— সেই বাবার কিনে দেওয়া সবুজ-হলুদ-সাদা।কাঁথার গায়ে মায়ের শরীরের দুধ-দুধ ঘ্রাণ। সত্যিই কি মায়ের শরীরের সেই ঘ্রাণ, ভেবে, একটু নিচু হয়ে বিছানায় উবু হয়ে বসতে না বসতেই কেউ ধমকে উঠল আমাকে। কে? ‘দুনিয়া হাঁকরে বাইরে থেকে এসে হাত-পা না ধুয়েই তুই—।’ কেউ কি বলল, নাকি রেডিয়োর–?গোয়াল ঘরের দিকে শব্দ হল না কীসের? কেউ যেন ঢুকল না? ঘর ছেড়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি এই এতক্ষণে আকাশের আলো বারান্দায় নেমে এসেছে। শুধু তো বারান্দা নয়, উঠোন-পুকুর হয়ে চারপাশের সর্বত্রই। দক্ষিণের হালদারবাড়ির কুঞ্জকাকুর জমি হয়ে ওদিকে খালপাড়, এমনকী গাছ-পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে খালের তলানির কাদামাখা জলও চিকচিক করছে। আকাশের একদিকে গোল হয়ে ওঠা চাঁদ যেন আমার কান্ড দেখেই ঠায় দাঁড়িয়ে গেছে। দুর্গা হয়ত মশার হাত থেকে রেহাই পেতে লেজ আছড়াচ্ছে শরীরে। ওটা তাহলে লেজ আছড়ানোর শব্দই। ‘একটু ধোঁয়া দিয়ে দিতে পারলি না গোয়াল ঘরে? তোকে দিয়ে—।’ মা না? পুকুর ঘাটে শব্দ হল কীসের? থালা-বাসনের?
—মা?
—এর মধ্যে পড়া হয়ে গেল? এর মধ্যেই খিদে—? তোর বাবার কানে গেলে—।
রেডিয়োর মেয়েটিও মাকেই খুঁজছে নির্ঘাত। মায়ের জন্যই ওর সব কথা। মা কী করছে একা? বা ঠাকুরকে ঘুম পাড়ানো হল কিনা। বা মেলায় কী আছে আজ, গাজন না যাত্রা? কোন পার্টি? মেয়েটি ঠিক জিজ্ঞেস করবে মাকে। আর উত্তর না পেলেই যেন একটা গান চালিয়ে খুঁজতে শুরু করবে মাকে। একটা গান শেষ হয়ে আর একটা গান চালানোর আগে পর্যন্ত খুঁজেই যাবে। খালপাড় থেকে পুকুরঘাট, পুকুরঘাট থেকে নদীবাঁধ। আর মেয়েটিকে এদিক ওদিক করতে দেখে বারান্দার খোপের পায়রাগুলিও নামতে চাইবে টঙ থেকে, বারান্দা থেকে উড়ে উড়ে পুকুরপাড় বা বাঁধের ওপারের উচ্ছে বাগানে বা—। আর টঙ থেকে বেরোতে না পেরে বকবকম-বকবকম শব্দ তুলে গজগজ করবে খুব। আর হাঁসগুলিও প্যাঁকপ্যাঁক-প্যাঁকপ্যাঁক—। ধানের বস্তার উপর থেকে নীচে পড়ে যাওয়া পানের বাটা থেকে দেখি পানের গোছা আলগা হয়ে বা সুপুরি কাটার জাঁতি অন্ধকারে কোথায় কোথায় সব ছিটকে পড়েছে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া উত্তরের বাতাসে লম্ফের হলুদ আলো হঠাৎ এমন দাপাদাপি শুরু করল যে আমি সেই লম্ফ তুলে এনে যে ছিটকে ছড়িয়ে পড়া পান বা সুপুরি বা জাঁতিটাকে খোঁজার চেষ্টা করব তার আর উপায় নেই। মাটির মেঝেতে গোবর-জলে লেপার ছাপ হয়ে জেগে ওঠা রেখাগুলি আমার বুটের চাপে ধেবড়ে গেছে একেবারে। এমনকী বিছানার চাদরটাও কীভাবে কুঁচকে—। জানি, মা আমাকে হাতের কাছে একবার পেলে—। কুকুরটাও যেন বুঝে গেল কিছু। আদরের ডাক পালটে এবার ‘ভৌ-ভৌ-’ করে যেন ধমকেই উঠল আমাকে। হাঁসগুলিও বাক্সের ভিতর থেকে হঠাৎ করে চেঁচামিচি শুরু করল খুব। এবার বাবা বের হবে। বাবা এবার ‘খোকা—’ বলে হাঁক মেরে পড়ার খবর জানতে চাইবে। বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস, ইংরেজি। জানি, ছুটে পালানো ছাড়া আমার এখন আর গতি নেই কোনও । পুকুর পাড় ছাড়িয়ে, বাঁধ ছাড়িয়ে, কুঞ্জকাকুদের বাড়ি ছাড়িয়ে, পাঁচমাথার মোড় ছাড়িয়ে আমাকে এখন—। জানি, বাবার রাগ না পড়া পর্যন্ত একটা কথাও বলবে না মা। একেবারে মাথা গুঁজে বসে থাকবে। জানি, বাবাকে খাবার দিতে দিতেও মা ভাববে আমার কথা। বাবার আর ভাত লাগবে কিনা জানতে চেয়ে মা আনমনা হবে। ভাববে, সাড়া নেই কেন খোকার? গেল কোথায়? খাটের নীচে? নাকি গোয়ালঘরে দুর্গার গা ঘেঁষে কোথাও। জানি, বাবাকে কিছু না বুঝতে দিয়ে মা এরপর কেরোসিনের লম্ফ ওপর-নীচ করে ঘরের প্রত্যেকটা কোণা, খাটের নীচ থেকে ধানের বস্তা,গোয়ালঘর হয়ে খালপাড়—। এরপর বাবার বিছানার মশারিটা খাটিয়ে দরজাটা টেনে মাথার ঘোমটাটাকে বড় করে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে মা ঠিক বেরিয়ে পড়বে। উঠোন ছাড়িয়ে, পুকুর ছাড়িয়ে, বাঁধ ছাড়িয়ে, কুঞ্জকাকুদের বাড়ি ছাড়িয়ে, পাঁচমাথার মোড় ছাড়িয়ে কেরোসিনের লম্ফ হাতে একা একা—। পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, আমি জানি, মা আমাকে ঠিক খুঁজে বের করবে।
কুঞ্জকাকুকে বললাম, অফিসের কাজে একবেলার জন্যই কলকাতায় আসা, কাল সকালে খুব জরুরি একটা কাজ সেরে বিকেলের প্লেন ধরেই আমাকে—।
পাঁচমাথার মোড়ে গিয়ে একটা কোনও গাড়ি পেলে মাঝের খেয়া দিয়ে নদী পার হয়ে রাত ন’টার মধ্যে মথুরাপুর স্টেশন পৌঁছে যাব ঠিক। এরপর ট্রেনে শেয়ালদা—।
আকাশের পুব দিকে কাৎ হয়ে থাকা চাঁদ। দূরের সেই কীর্তনের হো-হো রব জেগে উঠল ফের। আবার ডুবেও গেল ঝপ করে। জানি, মা ফোন নিতে ভুলে গেছে, ফেলে গেছে বাড়িতে, জানি ধরবে না কেউ, তবু, মোবাইলের নম্বর টিপে ডাকতে থাকি মাকে, বলতে থাকি, ‘হ্যালো, হ্যালো মা—, শুনতে পাচ্ছ?’
অনবদ্য এক ছবি আঁকলেন। আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার ছেলেবেলার দিন গুলোতে।