| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মা হতে চেয়েছিল স্বর্ণলতা? : ছোট গল্প লিখছেন মনজুরুল ইসলাম

Reporter
মনজুরুল ইসলাম / ৫০০ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১

মায়া ও বাস্তবতা দুটো ভিন্ন শব্দ। শব্দ দুটোর প্রয়োগ নিয়তই প্রভাবিত করে জীবনকে। কেউ মায়ার বাঁধনে ত্যাগ করে প্রত্যাশিত প্রাপ্তিকে, কেউবা মায়াকে অতিক্রম করে লড়াই করে বাস্তবতার সঙ্গে; নিশ্চিত করে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যকে। জীবনের লক্ষ্য কেমন হওয়া উচিত জানে না রফিকুল। জানবার প্রয়োজনও বোধ করে নি কখনো। ফলত; বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে স্বার্থ ত্যাগের বিষয়টি ভাবতে পারছে না এই মুহূর্তে। ভাববার কথাও নয়। অনবরত স্ত্রীর সাথে বোঝাপড়া করছে। স্ত্রী ও তার সিদ্ধান্ত একই বিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছে। কোনোভাবেই সন্তানকে নিজেদের হাতছাড়া করবার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছে না তারা। তবুও বারংবার মোতাহার হোসেনের মুখচ্ছবিটি ভেসে উঠছে তাদের মননে। যে মানুষটি তাদের সন্তানকে নিজ সন্তানের মতোই আগলিয়ে রেখেছিলেন এতদিন। ইচ্ছে করলেই হয়ত তিনি তাদের সন্তানকে ফিরিয়ে না দিয়ে চিরদিনের মতো রাখতে পারতেন নিজের কাছে। বস্তুত, সেটি তিনি করেন নি। সঙ্গত কারণেই তার কথা যতই ভাবছে ততই অস্থির হয়ে উঠছে দুজনই। সব ধরনের সুযোগ থাকবার পরেও একজন মানুষ এতটা স্বার্থহীন হতে পারেন কীভাবে? এই একটি নির্দিষ্ট ভাবনার কাছেই যেন বার বার পরাজিত হতে হচ্ছে ওদের।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল রফিকুল। পেশায় কাঠমিস্ত্রী। সীমিত উপার্জন দিয়েই চলে সংসার। বীরনগর ইউনিয়নসহ পাশ^বর্তী ইউনিয়নের সবার পরিচিতি রফিক। এক সময় কাবাডি খেলতো। জেলা কাবাডি দলের খেলোয়াড় হিসেবে যথেষ্ট সুনামও অর্জন করেছিল। হয়ত এ কারণেই তার এই পরিচিতি। সকাল থেকে রাত অবধি ব্যস্ত থাকে নিজস্ব গোলায়। পাঁচ সন্তানের বৃহৎ পরিবারটি সামলায় ফরিদা। রফিকুলের স্ত্রী। জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান পড়াশুনা করে গ্রামেরই একটি হাই স্কুলে। কনিষ্ঠ মেয়েটির বয়স দুইয়ের কাছাকাছি। চতুর্থ সন্তানটি পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। আপাতত এই সন্তানটিই তাদের চিন্তার মূল কারণ। ওর নাম অর্জন। প্রসবের সময় অনেক কষ্ট হয়েছিল বিধায় ডাক্তারের দেয়া নামটিই অক্ষুণ্ণ রেখেছে বাবা মা। প্রাথমিক অবস্থায় দুর্বল চেহারার হলেও ধীরে ধীরে পুষ্ট হয়েছে ও। টসটসে ফর্সা গাল, পুরু ঠোঁট, লোমশ ভ্রু ও ঘন চোখের পাতা। বড় বড় গোলাকার চোখ এবং মসৃণ নাকটি ওর মুখাবয়বটিকে করে তুলেছে পুতুলের মতো কোমল। লম্বা লম্বা চুলগুলি ওর কপাল পেরিয়ে ভ্রু অবধি আসতে চায়। যখনই হাসে ও তখনই বরফের মতো উজ্জ্বল সাদা দাঁত ও মুখাবয়বের সৌন্দর্যটি নীলকণ্ঠ ফুলের পাপড়ির মতো ফুটে উঠে। কিছুদিন পূর্বেও এত লাবণ্য ছিলো না ওর চেহারায়। কোনোভাবেই মেলানো যায় না ওকে ওর পূর্বের চেহারার সাথে। মজবুত গঠনের আট বছরের সৌম্য শরীরটি অনায়াসেই নজরে পড়ে সবার।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা যখন দল বেঁধে খেলাধুলা করে তখন খুব সহজেই ওর সৌন্দর্যটি ফুটে উঠে অনন্যরূপে। আপনজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশীরা ওকে দেখলেই হাত বুলায় ওর মসৃণ গালে। মাথা ছুঁয়ে প্রত্যাশা করে মঙ্গল কামনা। কখনো কখনো অপরিচিত মানুষজনও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওর মোহনীয় অবয়বটির দিকে। যদিও ওর পোশাক পরিচ্ছদ খুবই সাধারণ তবুও সেটি কোনো প্রভাব ফেলে না। ‘তোমাদের তো পাঁচ পাঁচটি সন্তান, আমাদেরকে একটি দত্তক দাও না।’ দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অনেকেই এমন প্রস্তাব করে রফিকুলকে। কিন্তু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাজী হয় না সে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও চেষ্টা করে সন্তানদের মানুষ করবার। আজ অবধি সেই প্রচেষ্টাটিই অক্ষুণ্ণ রেখেছে। সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করতে চেষ্টার ক্রটি রাখছে না। দায়িত্বশীল মিস্ত্রী হিসেবে সবার আস্থা অর্জন করেছে গ্রামে। অধিকাংশ লোকই তার কাছ থেকেই আসবাব সংশ্লিষ্ট কাজগুলি করে থাকে। কিন্তু এই একটি কারণেই বেশ কিছুদিন যাবৎ কাজে অমনোযোগী হয়ে পড়েছে রফিকুল। স্ত্রীও বিষণ্ণ চিন্তার গভীরতায় ডুবতে ডুবতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। দুজনারই মনোজগতের আধারজুড়ে একটি চিন্তাই ক্রিয়াশীল-সন্তানকে মোতাহার হোসেনের কাছে রাখবে নাকি নিজেদের কাছেই রেখে দিবে। এমন ভাবনায় ব্যাপৃত থাকতে থাকতেই বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হয়ে যায় ওদের।

গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত থেকে অবশেষে একটি স্থিরতায় আসতে পেরেছে রফিকুল। প্রাথমিক পর্যায়ে সন্তানকে কাছে রাখবার ইস্পাতদৃঢ় মানসিকতা থেকেও সরে এসেছে। স্ত্রীকেও বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে আসবার অব্যাহত প্রচেষ্টাটি অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। তার এই অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে ফরিদাও নমনীয় হয়েছে খানিকটা। অথচ এ ধরনের চিন্তা যে তাদের মানসিক গঠনের সাথে খাপ খাবে সেটি অকল্পনীয়। কিন্তু মোতাহারের পরিবারের অভাবনীয় ব্যক্তিত্বই যেন তাদেরকে বার বার এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাড়িত করেছে-এমন সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। একচালা দীর্ঘকায় একটি টিনের ঘরে বাস করে রফিকুলের পরিবার। ঘরের পেছন জুড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ ক্ষেত। পাশাপাশি আরো বেশ কিছু চালা ঘর রয়েছে যেখানে রফিকুলের মতো পরিবারের বসবাস। সবুজ ক্ষেত পেরিয়ে একটু সামনেই বীরনগর স্টেশন। বিস্তীর্ণ বারান্দায় খেলছে ছোট্ট মেয়েটি। আজও স্কুলে যায় নি অর্জন। শত প্রচেষ্টা সত্তে¡ও তাকে স্কুলমুখী করাতে পারে নি বাবা মা। শিক্ষা পল্লী স্কুল ছাড়া অন্য কোনো স্কুলে যাবে না বলে সাফ জানিয়েছে ও।

ঘরের ভেতর মূল চৌকিতে বসে আছে রফিকুল। পরনে ধূসর নীল-সাদা রঙের লুঙ্গি ও সাদা হাফ গেঞ্জি। পেশীবহুল চেহারাটি সহজেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বুকের ভেতর ঘন কালো লোমগুলিও দৃশ্যমানতার বাইরে যাচ্ছে না। চুলগুলি শুষ্ক ও এলোমেলো হলেও গভীরতাটি রয়েছে অটুট। ফোলা ডিমের মতো গোঁফজোড়া বেশ ঘন। দশটা পেরিয়ে গেলেও সেদিকে খেয়াল নেই তার। কালো মুখখানি বিষণ্ণতায় হয়ে গেছে অধিকতর কালো। বৃত্তাকার ট্যাবলেটের মতো গোল হয়ে আসা মুখের দাগগুলিও বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। তার পাশেই বসে ফরিদা। পড়নে পুরোনো ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া শাড়ী। পরিশ্রমী হাত দুটি বিছানার ওপর রেখে তাকিয়ে আছে রফিকুলের দিকে। হাতের চুড়িগুলির রঙ উঠে গেছে, বোঝা যাচ্ছে। এক সময়ের ধবধবে ফর্সা হাতদুটিও মলিন হয়ে এসেছে। সময় ও পরিশ্রমের ধারাবাহিকতায় কখন যে ওর ফর্সা মুখখানি শ্যামলা হয়ে গেছে হয়ত ও নিজেও তা লক্ষ করবার সময় পায় নি। রাজ্যের সকল চিন্তা যেন এসে ভর করছে ওর মুখখানিতে। ম্লান হয়ে আসা প্রিয় এই মুখখানির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রফিকুল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি শুনবার অপেক্ষায়। ‘চলো, যাই।’ বলেই রফিকুলের কাঁধে একটি হাত রেখে কেঁদে ফেললো ফরিদা। ওর দু’চোখ বেয়ে ঝরতে থাকলো দু’এক ফোঁটা করে অশ্রু। রফিকুল নিজেও আবেগ বিহ্বল হলেও শক্ত হবার চেষ্টা করলো। ফরিদার হাতটি নিজ কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়ে লোমশ বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো ওকে। বেশ কিছু সময় আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই রইলো ওরা দুজন। অতঃপর স্বাভাবিক হয়ে হাঁটতে থাকলো বীরনগর স্টেশনের দিকে। বিপ্লবগ্রাম শহরের উদ্দেশ্য।

দুই

ব্রহ্মপুত্র মেইল। একটি ট্রেনের নাম। তবে ট্রেনটির গতি ব্রহ্মপুত্রের মতো বহমান নয়। অত্যন্ত মন্থর। প্রতি স্টেশনেই দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ সময়। তবুও পিছিয়ে পড়া মানুষগুলির এটিই একমাত্র অবলম্বন। চলাচল করে উত্তরের বিপ্লবগ্রাম শহর থেকে পঞ্চগড় জেলার শেষ সীমানা পর্যন্ত। এই দূরত্ব পৌঁছতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তারপরও একটি আসনও ফাঁকা থাকে না। কষ্ট হলেও এই ট্রেনেই যাতায়াত করেন মোতাহার। যদিও উন্নত বাস যোগাযোগ রয়েছে তবুও সাধারণ মানুষগুলিকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখবেন, নিজ অনুভবকে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করবেন তাদের অনুভবের সাথে-এই প্রত্যাশায়। একদিন এই লাইনের ওপর দিয়েই আন্তঃনগর ট্রেন যাতায়াত করবে-সবার মতো এটিও তার স্বপ্ন। মূলত এই স্বপ্নটি পূরণের লক্ষ্যে নিজেকে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছেন দীর্ঘ সময়। দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে লেখালেখিতে যে এই ধরনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে সে বিষয়টিও এ পথে যাতায়াতের অন্যতম প্রেরণা। মূলত লেখালেখির স্পৃহা বৃদ্ধি পাবার পর থেকেই এ ধরনের পরিবেশে ভ্রমণের ইচ্ছেটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে তার। সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পড়েন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। চেষ্টা করেন সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনগুলিকে স্ব-চোখে অনুসন্ধান করার।

শিক্ষা পল্লী নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটিতে অবহেলিত শিশুদের পাশাপাশি আর্থিকভাবে সচ্ছল শিক্ষার্থীদেরও পাঠদান করেন। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। বিশ্বমানের পাঠদানের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করে আসছেন এ প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘসময়। শিক্ষাবিজ্ঞানের ধ্রুপদী সব গ্রন্থ এবং বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে তা তার প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। বাবা মা দুজনই ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সন্তানের এই স্বাধীনচেতা মনোভাবটিকে আজীবন শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন তারা। কখনোই সন্তানের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে সরকারি কিম্বা বেসরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্যে চাপ প্রয়োগ করেন নি। যতদিন বেঁচে ছিলেন তারাও শিক্ষা পল্লীর উৎকর্ষ সাধনে কাজ করেছিলেন। একমাত্র ছোট বোন ও ভগ্নিপতি একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক। বর্তমানে তারাও মোতাহারের এই প্রতিষ্ঠানটির উৎকর্ষ নিশ্চিত করবার জন্য বিভিন্নভাবে পরামর্শ প্রদান করছেন। সবমিলিয়ে সৃজনশীলতার আত্মপ্রতিভাকে প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তুলবার যেমন চেষ্টা করছেন তেমনি সমাজে অন্তরিত সমস্যাগুলিকে সমাধানের অভিপ্রায়ে লেখনী এবং আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন মোতাহার হোসেন। বিপ্লবগ্রাম শহরের সবার পরিচিত মোতাহার স্যার।

একটি কামরা। কামরাটিতে বাদামের খোসাসহ বিভিন্ন কাগজের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। বেশির ভাগ সিটের ফোমগুলি উঠে গেছে। ডান, বাম এবং উপরের অংশগুলি কোম্পানির বিজ্ঞাপনে পরিপূর্ণ। একটি সিটও ফাঁকা নেই। কিছু লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিগ্রহে ভরা মুখগুলি দেখেই বোধ হচ্ছে- ওরা শ্রমিক কিম্বা রিকশাওয়ালা। গন্তব্য রংপুর অথবা দিনাজপুর। কয়েকজন হকারও পায়চারি করছে বগির ভেতর। হকার, বাদামওয়ালা, ছোট বাচ্চার কান্নাকাটি এবং গরমের কারণে বগির ভেতরের পরিবেশটিতে ধারণ করেছে গুমোট রূপ। কামরার বাম দিকে জানালায় হাত রেখে একটি সিটে বসে আছেন মোতাহার। চোখে মোটা ফ্রেমের অপেক্ষাকৃত বড় আকারের চশমা। সেই চশমার ভেতর দিয়েই গভীরভাবে লক্ষ করছেন পুরো আবহটিকে। গরমের কারণে তার চওড়া কপালটি ঘেমে গেছে। চুল কম থাকায় মাথার টাকযুক্ত অংশের বিন্দু বিন্দু ঘামগুলি দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মেদহীন হওয়ায় এ ধরনের পরিবেশেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন। ব্যাগটি হাতেই রেখেছেন। ব্যাগের ভেতর মূল্যবান গ্রন্থ এবং একটি ডাইরি রয়েছে। বিশেষত ডাইরিটি সবসময়ই কাছে রাখেন তিনি। যখনই কোনো প্লট মাথায় আসে লিখে রাখেন মুহূর্তেই। প্রায় এক ঘণ্টার বিরতির পর পঞ্চগড় স্টেশন ত্যাগ করলো ট্রেনটি। কিছুক্ষণের মধ্যে শহর পেরিয়ে প্রবেশ করলো গ্রামের ভেতর। হু হু করে কামরার ভেতর প্রবেশ করতে থাকলো নির্মল বাতাস। কামরার ভেতরের ভ্যাপসা গুমোট আবহাওয়াটি উবে গেল নিমিষেই। জানালার দিকে দৃষ্টি রেখে অবিরাম প্রকৃতি উপভোগ করতে থাকলেন মোতাহার।

মিনিট বিশেক পর ট্রেনটি এসে থামলো বীরনগর স্টেশনে। নিভৃত পল্লীতে অবস্থিত স্টেশনটি। এই স্টেশনেও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেন-এটি জানতেন মোতাহার। তাই ব্যাগটি হাতে নিয়েই ট্রেন থেকে নামলেন, স্টেশনের পাশে বৃহৎ বটতলার নীচে বসবেন এই ভেবে। কিন্তু ট্রেনের আকস্মিক হুইসেল শুনে দ্রুত দিক পরিবর্তন করলেন। পঞ্চগড় স্টেশনে অতিরিক্ত বিলম্বের কারণে ট্রেন দ্রুত ছেড়ে দিলো- বুঝতে পারলেন মোতাহার। ট্রেনে উঠেই শুনতে পেলেন  আট বছর বয়সী একটি শিশুর কান্না। ক্রমেই কান্নার শব্দ বাড়তেই থাকলো শিশুটির। সবাই কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর দিলো না শিশুটি। অনবরত কেঁদেই চললো। ওর দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু নির্গত হতে থাকলো। পরনের হাফ গেঞ্জিটি সেই ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুতে ভিজে গেল। ট্রেন ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ‘দুষ্টামি করি ট্রেনের মইধ্যে উঠছিলো, ট্রেন ছাড়ি দিলে আর নামবার পারে নাই।’ কে যেন একজন বলে উঠলো। সবার মাঝে শিশুটিকে নিয়ে এক ধরনের আগ্রহ লক্ষিত হলো। কিন্তু কেউ তার কান্না থামাতে পারলো না। এর পূর্বে মোতাহার লক্ষ করেছিলেন, নিভৃত পল্লীতে অবস্থিত স্টেশনগুলিতে যখন দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন অবস্থান করে তখন ছোট ছোট বাচ্চারা ট্রেনে ওঠে আবার পরক্ষণেই নেমে পড়ে। পরিস্থিতি নেতিবাচক হতে পারে ভেবে উঠে দাঁড়ালেন মোতাহার। আসলেন শিশুটির কাছে। মাথায় হাত বুলোতে থাকলেন। মোতাহারকে দেখবার পর সবাই শান্ত হবার চেষ্টা করলো। ‘স্যার, তোমরা ছাওয়াটার একটা ব্যবস্থা করেন।’ কয়েকজন সমস্বরে বলে উঠলো। মোতাহার মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে শিশুটিকে নিজের কাছে নিয়ে আসলেন। ‘শিশুটিকে  ওর বাড়ীতে পৌঁছানোর জন্য যা যা করবার দরকার তাইই আমি করবো।’ বলেই নিজের কোলের মধ্যে বসিয়ে গভীরভাবে দেখতে থাকলেন শিশুটিকে। নানাভাবে বুঝিয়ে শান্ত করবার চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। বাড়ীর ঠিকানাসহ পরিবারের বিস্তারিত তথ্যও জেনে নিলেন।

শিশুটির নাম অর্জন। বীরনগর স্টেশন থেকে সামান্য দূরত্বে বাড়ী। সামনে কোনো স্টেশন না থাকায় ঠাকুরগাঁয়ে নেমে বাড়ীতে পৌঁছে দেবার কথা বলে আইসক্রীম ও চকলেট কিনে দিলেন। ব্যাপারটি অনেকের কাছেই আশ্চর্যের বোধ হলো। অবাক বিস্ময়ে দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করলো তারা। অপরিচিত একটি শিশুর পেছনে একশত টাকার মতো খরচ-কেউই ভাবতে পারছে না। দ্রুততার সাথেই আইসক্রীম ও চকলেট খেয়ে ফেললো অর্জন। ওর স্থির ভাব দেখে অবশেষে প্রশান্তি বোধ করলেন মোতাহার। জানালার পাশ দিয়ে পুনরায় অসীম প্রকৃতির দিকে নিবদ্ধ করলেন অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। বিস্তীর্ণ সবুজাভ ক্ষেত, ঘন সবুজ শালবন এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর ছোট ছোট নদীর শুদ্ধ সৌন্দর্য তার মনোজগতজুড়ে সৃষ্টি করলো অদ্ভুত এক ভালোলাগার। গতির মধ্যে দিয়ে দৃশ্যমান হওয়া নানা প্রকৃতির মানুষের গতিবিধি থেকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করলেন তাদের বিচিত্র জীবনের চালচিত্র। বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন বরাবরই তার ভালোলাগার বিষয়। এই ভালোলাগার ভেতরেই নানা ভাবনায় বৃত্তাবদ্ধ রাখলেন নিজেকে। প্রকৃতির এই মোহময় আবহ তার ভাবনাটিকে করে তুললো অধিকতর গভীর। অর্জনকে নিয়ে দেখতে শুরু করলেন নতুন স্বপ্ন। ওর দিকে তাকালেন আর একবার। তার বুকে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে ও। মাংসে ভরা ফর্সা নিস্পাপ মুখখানি দেখে অবাক হলেন। খাড়াখাড়া শক্ত চুলগুলি হাতের তালু দিয়ে স্পর্শ করলেন। মিষ্টি গালে ডান হাতের পাঁচটি আঙুল একত্রে আলতো করে ছুলেন। অর্জনের এই কোমল স্পর্শ দারুণভাবে শিহরিত করলো তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি ঠাকুরগাঁও স্টেশনে এসে পৌঁছবে, যাত্রীদের অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলেন। নিজে একবার নামবার প্রস্তুতি নিলেও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেন। অর্জন যাতে ঘুম থেকে না ওঠে-মনে মনে সেটিই কামনা করতে থাকলেন। সাধারণ যাত্রীদের মনোভঙ্গিটিকেও গুরত্ব দিয়ে অনুধাবনের চেষ্টা করলেন। যদি কেউ ওর কথা জিজ্ঞেস করে তবে কৌশলে উত্তর দেবেন- মনে মনে ভাবলেন। কিন্তু কেউই ওর দিকে তাকালো না। ট্রেন ঠাকুরগাঁয়ে পৌঁছামাত্রাই নামবার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করলো সবাই। বিষয়টি স্বস্তির মাত্রা বৃদ্ধি করলো মোতাহারের। পুনরায় জানালার পাশেই হকারের কাছ থেকে একটি চিপস ও জুসের বোতল কিনলেন অর্জনের জন্য।

এই মুহূর্তে মোতাহারের ভীষণভাবে মনে পড়তে থাকলো স্বর্ণলতার কথা। তার স্ত্রী। ভারী মিষ্টি এবং মায়াবী। চারিত্রিক বিশিষ্টতাকে যারা সৌন্দর্যের মানদন্ডে বিবেচনা করেন তাদের জন্য আদর্শ উদাহরণ তিনি। উচ্চ শিক্ষিত। শিক্ষকতা করেন তারই প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা পল্লীতে। বিয়ের এক যুগ পেরিয়েছে। দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে একসাথেই যান। ইতোমধ্যে দেশের সীমানা পেরিয়েছেন কয়েকবার। স্মৃতিতে সঞ্চয় করেছেন অজস্র বিরল মুহূর্ত। পূর্বে বেশ কয়েকবার পঞ্চগড় গিয়েছিলেন স্বর্ণলতা। এবারও মোতাহারের সাথে আসবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বিশেষ একটি কাজ থাকায় আসতে পারেন নি। দুজনের মধ্যে সম্পর্কের মাত্রাটি একটি আদর্শিক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু একটি সন্তান, একটি সন্তানের অভাবই তাদের হৃদয়ে অঙ্কিত কষ্টের কালো রেখাটিকে বিরামহীনভাবে স্ফীত করে চলেছে। দেশ বিদেশে বহুবার চিকিৎসা করিয়েছেন। ব্যর্থ হয়ে নিজেদের স্কুলে আর্থিকভাবে অস্চ্ছল পরিবারের সন্তানকে নির্দিষ্ট সময় পর ফেরত দেবার শর্তে দত্তকও চেয়েছেন। কিন্তু সফল হতে পারেন নি আজ অবধি।

ট্রেনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। পঞ্চগড়ের প্রায় সব যাত্রীই ঠাকুরগাঁয়ে নেমেছে এবং দিনাজপুরগামী যাত্রীতে ভরে গেছে ট্রেন-ভালো করে লক্ষ করেছেন মোতাহার।‘ আর কোনো শঙ্কা নেই।’ মানুষগুলির কথা ভেবে অপরাধবোধ নিয়ে ভাবতে থাকলেন মোতাহার। প্রচুর যাত্রী উঠেছে। তিলার্ধ পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই বগিতে। কিছু যাত্রী মোতাহারের সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। অস্বস্তি অনুভব করলেও অর্জনের দিকে তাকাতেই স্বস্তি বোধ করলেন মোতাহার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনটি শহর ছাড়লো। বাম হাতের কনুইটি পুনরায় জানালার ফ্রেমে রেখে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। রক্তিম সূর্যটি দেখবার পর দারুণভাবে উৎফুল্ল হলেন। সূর্যের রক্তিমাভা যেন পুরো প্রকৃতির উপর প্রক্ষিপ্ত হতে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত সূর্যের এই রক্তিমাভাটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। নিস্তরঙ্গ নীরবতার পাশাপাশি নিঃসীম আঁধারে ছেয়ে যাবে প্রকৃতি। নিজ জীবনে নবসূর্যরূপে উদিত হওয়া বাচ্চাটির দিকে তাকাতেই কিছুটা শিউরে উঠলেন মোতাহার। সূর্যের বিলীনতার মতো শিশুটি হারিয়ে যাবে না তো! আবারও মমত্বপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকলেন অর্জনকে। আলতো করে মাথায় হাতও বুলালেন। নিশ্চিত হারাবার সম্ভাবনাকে জানবার পরেও অনেকই সেই ক্ষণমুহূর্তের প্রশান্তিটিকে অর্জন করতে চায়, আবেগ তাড়িত হয়ে নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাটিকে সমর্পণ করে সেটিকে অর্জনের। যদিও সে নিজেও উপলব্ধি করতে পারে যা কখনোই সম্ভব নয়। তবুও সেই অসম্ভবের পেছনে ছুটতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। সব কিছু জানবার পরেও হয়ত পিতৃত্বের স্বাদ বঞ্চিত মোতাহার সেই অনিশ্চিত সম্ভাবনাটিকে নিশ্চিত করবার বৃথা চেষ্টায় যাত্রা করে চলেছেন আজ এই ঘন কৃষ্ণ সন্ধ্যায়, এই অতি সাধারণ ট্রেনের কামরায় বসে। ইতোমধ্যে দিনাজপুর ও রংপুর স্টেশন পেরিয়েছে ট্রেনটি। এখনো মোতাহার হোসেনের কোলে ঘুমোচ্ছে অর্জন। আর কিছুটা পথ পেরুলেই বিপ্লবগ্রাম। মোতাহারের স্বপ্নের শহর।

তিন

বিপ্লবগ্রাম উপশহরে মোতাহার হোসেনের বাড়ী। পৈত্রিক বাড়ীতেই থাকেন। বাড়ীটি দ্বিতলবিশিষ্ট। দোতলায় থাকেন তার পরিবার। নিচ তলায় ভাড়াটে। ফ্ল্যাটটি অত্যন্ত পরিপাটি। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বাবামায়ের পাঠকক্ষটি ব্যবহার করেন মোতাহার। পাঠকক্ষটি দেখবার মতো। কক্ষটির পাশেই রয়েছে একটি বারান্দা। বারান্দার গ্রিলের সাথেই জড়িয়ে থাকা সজনের ডালসহ পাতাগুলি যত্ন করেন মোতাহার। দেয়ালের কোল ঘেষে রোপণ করা ছোট্ট সজনে গাছটি বেশ দীর্ঘায়িত হয়েছে। প্রায়শই সবুজাভ পাতাগুলি হাত দিয়ে স্পর্শ করেন তিনি। বারান্দায় রাখা রকিং চেয়ারে বসে অনবরত ভেবে চলেছেন তিনি ইদানীং। কখনো সকাল বেলার নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার কখনোবা ঘনঘোর রাত্রিতে দুটি চোখ বন্ধ করে। বহুবার চেষ্টা করেছিলেন সত্যটিকে চাপিয়ে রেখে মিথ্যেকে প্রতিষ্ঠিত করবার। কিন্তু পারেন নি। বিবেকের কাছে হার মেনেছেন বারংবার।

বিশ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখনও অর্জন রয়ে গেছে তার বাসায়। ওকে শান্ত রাখবার জন্যে প্রথম দুদিন ভীষণ বেগ পেতে হয়েছিল তাদের। দত্তক নেবার কথা বলে গ্রামবাসীদের প্রাথমিক আগ্রহটিকেও শান্ত রেখেছিলেন। শুরুতে যে কোনো মূল্যে অর্জনকে ধরে রাখবার ইচ্ছে পোষণ করলেও এখন আর সে উদ্দেশ্যটিকে সমর্থন করতে পারছেন না মোতাহার। স্বর্ণলতার মা ডাকটি শুনবার অকৃত্রিম ইচ্ছেটিকেও পূরণ করতে আগ্রহ পোষণ করছেন না। অর্জনকে ঠাকুরগাঁও স্টেশন থেকে বীরনগর গ্রামে পৌঁছে না দেবার যে যন্ত্রণা মননের গহীনে পুষে চলেছেন সেটিকে আর স্থায়ী রূপ দিতে চান না তিনি। অথচ তার প্রাথমিক মতামতের ওপর ভিত্তি করেই দুজনই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন আবেগ ও ভালোবাসা দ্বারা প্রভাবিত করে যদি অর্জনকে তাদের কাছে রাখা যায়। স্বর্ণলতাও আশায় বুক বেঁধেছিলেন যখন জানতে পেরেছিলেন অর্জনদের বৃহৎ পরিবারের কথা। ওদের বাবামাকে অনুরোধ করলে হয়ত রাজীও হয়ে যেতে পারে। তাই ব্যস্ততার কথা বলে ক্রমেই দীর্ঘায়িত করে আসছিলেন অর্জনের অবস্থান। অবস্থানকালীন সময় থেকে আর্জ পর্যন্ত নিজ সন্তানের মতো অর্জনকে সর্বোচ্চ ভালোবাসার চাদরে মোড়াবার চেষ্টা করে এসেছেন স্বর্ণলতা।

এই বিশদিনের প্রতিদিনই শিক্ষা পল্লী স্কুলে ক্লাস করেছে অর্জন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের জন্যে যাত্রা করেছে নদীর তীরে, জনবহুল স্টেশনে, গহীন অরণ্যে অথবা বস্তিতে। বাস্তব অভিজ্ঞতাবিহীন পাঠ হয়ত একজন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি অর্জনে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলতে পারে না- এমন ভাবনা থেকেই শিক্ষা পল্লী স্কুলের এই উদ্যোগ। পাশাপাশি শিক্ষার ওপর নির্মিত অজস্র ভিডিওচিত্র দেখেছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টেরে। কীভাবে ফুল ফোটে, সূের্যর উদয় হয়, পাখিরা ডানা মেলে অসীম গগনে ছুটে চলে ইত্যাদি নানা দৃশ্যাবলীর। প্রতিদিন বিকেলবেলা খেলাধুলাও করেছে স্কুলের বিশাল মাঠে। শিক্ষকবৃন্দের আন্তরিকতায় বিমোহিত হয়েছে অর্জন। তাদের ঠোঁটে লেগে থাকা অকৃত্রিম অবিরল হাসির প্রভায় আশ্চর্যবোধ করেছে সে। তার গ্রামের স্কুলের সাথে যেন কিছুতেই মেলাতে পারছে না ও এই স্কুলটিকে। শিক্ষাগ্রহণের এমন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করবার কারণেই হয়ত ওকে আজ অবধি বিপ্লবগ্রামে রাখতে সক্ষম হয়েছেন মোতাহার ও স্বর্ণলতা। তবে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সময় বাবামায়ের কাছে যাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়ে এসেছে ও। স্বর্ণলতা সবসময়ই চেষ্টা করেছেন সময়টিকে দীর্ঘায়িত করবার কিন্তু মোতাহার শেষ পর্যন্ত সেটি করতে পারেন নি। স্বর্ণলতার অনুমতি নিয়েই স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে অর্জনের বাবামাকে বিপ্লবগ্রামে আসবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতিবাদ না করে বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন স্বর্ণলতা। তবে পৌঁছে গিয়েছিলেন নীরবতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। স্বাভাবিক থাকবার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে না পাবার যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে এসেছেন। একটিবার মা ডাক শুনবার প্রত্যাশায় নিজেকে সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎসর্গ করবার জন্য প্রস্তুত করে আসছিলেন দীর্ঘদিন।

মা ডাক শুনবার সেই সুযোগের সমাপ্তি ঘটে চলেছে আজ। দুপুর বেলা বীরনগর গ্রাম থেকে আসবে অর্জনের বাবা মা। ভীষণভাবে উল্লসিত অর্জন। চোখমুখ জুড়ে উৎফুল্লতার ছাপ। নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার চেষ্টা করছেন স্বর্ণলতা। ঘুম থেকে উঠেই তৈরী করেছেন নাস্তা। নাস্তা সেরে গুটি গুটি পায়ে মোতাহারের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে অর্জন। ওর পেছন পেছন এসেছেন স্বর্ণলতা। টের পেয়ে অর্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মোতাহার। কৃত্রিমভাবে চেষ্টা করলেন হাসবার।

‘আঙ্কেল, আমার বাবা মা কখন আসবে? ’ খুশির আবহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো অর্জন।

‘এই তো দুপুরে। কিন্তু বাবা, এখানে তোমার ভালো লাগছে না।’ মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মোতাহার।

‘প্রথম প্রথম কষ্ট হতো। কিন্তু এখন ভালো লাগছে। স্বর্ণ আন্টি, তুমি, তোমরা সবাই খুব ভালো। আর শিক্ষা পল্লী স্কুলটি অসাধারণ। অনবরত বলতে থাকলো অর্জন।

‘তোমার আন্টিকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে না।’

‘হবে, খুব কষ্ট হবে। তোমরা কিন্তু আসবে আমাদের বাড়ীতে।’ আড়ালে থেকে সবকিছুই শুনছিলেন স্বর্ণলতা। এতক্ষণ স্বাভাবিক থাকলেও এই কথাটি শুনবার পর আর স্বাভাবিক থাকতে পারলেন না তিনি। আঁচল দিয়ে মুখটি চেপে ধরে দ্রুত পাশের ঘরে চলে গেলেন।

আচ্ছা অর্জন, তোমার শিক্ষাপল্লী স্কুল কেন ভালো লেগেছে বলতে পারবে?

‘এখানকার শিক্ষকরা কত ভালো, মারে না শুধু আদর করে। পরীক্ষার চাপ কম, ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়ার কোনো দুশ্চিন্তা নেই, প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প, আবিস্কারের কত কাহিনী শোনায় স্যাররা, কত কত জায়গায় ঘুরে নিয়ে বেড়ায়, আর কী মজার মজার ভিডিও দেখায়।’ বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠলো অর্জন।

আর কি কি করায় শিক্ষকবা বলো বলো? নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন মোতাহার।

আর, আর— বলে মনে করতে থাকলো অর্জন। মনে পড়েছে— আমাদের যা বলতে ইচ্ছে, যে কাজ করতে মন চায়, তা করবার জন্য একটা সময় দেয়, বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়, বক্তৃতা কীভাবে দিতে হয় তাও শেখায়, আর কি ধৈর্য স্যারদের, না বোঝা অবধি অনর্গল বোঝাতে থাকেন। কাউকেই আলাদাভাবে অতিরিক্ত আদর করেন না। আচ্ছা আঙ্কেল, এমন স্কুল আমাদের গ্রামে নেই কেন? আমিও এমন স্কুলে পড়বো।’

‘হবে, তোমাদের গ্রামেও হবে। সময় লাগবে। আর তোমার বাবামা আসুক, তারা যদি রাজী হয় তবে তুমি এই স্কুলেই পড়বে।’কথাগুলি বলবার পরই অর্জনকে কোলে নিলেন মোতাহার। রকিং চেয়ারে বসা অবস্থায়ই আদর করে চললেন মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে। মনে মনে ভাবতে থাকলেন অর্জনের বাবামায়ের আসবার কথা। অর্জনকে এখানে রাখবার জন্যে সৃজিত রূপরেখার কথা। এই প্রথমবারের মতো কোনো আন্দোলনে স্ব-শরীরে হয়ত থাকতে পারবেন না তিনি। গণমানুষের মুক্তির জন্য বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনে নিবিড়ভাবে  সম্পৃক্ত মোতাহার। সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কীভাবে সর্বোৎকৃষ্ট নীতির উদ্ভাবন করা যায় সে লক্ষ্যেই গবেষণামূলক অধ্যয়নও করেন নিয়মিত। অধ্যয়ন ও ভ্রমণ না করলে যে একটি জনপদের উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব নয় সেটি অনুধাবন করেন প্রতিনিয়ত। আজকের আন্দোলনে তার অনুপস্থিতি নিয়ে ভাবলেও অন্যান্য কর্মীদের আশ্বাসে নিশ্চিত থাকতে পারলেন এ মুহূর্তে। স্বর্ণলতাকে সাহায্যের পাশাপাশি অপেক্ষা করতে থাকলেন অর্জনের বাবামায়ের জন্য।

চার

ঠিক মধ্যদুপুরেই আসলো অর্জনের বাবামা। সাথে ওর ছোট বোন। বাড়ীতে প্রবেশ করেই অর্জনকে দেখতে পেল ফরিদা। সঙ্গত কারণেই বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলো ছেলেকে। শুরু করলো স্বভাবজ কান্নাকাটি। আবেগমথিত কন্ঠে অনেক প্রশ্ন করলো অর্জনকে। অনবরত স্বর্ণলতার গায়ে হাত বুলিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকলো তাকে। স্বর্ণলতাও হাসোজ্জ্বলভাবে তাকে শান্ত করবার চেষ্টা করলেন। কিছুটা শান্ত হয়ে এলে ফরিদাকে ড্রইংরুমে রেখে রান্নাঘরে গেলেন স্বর্ণলতা। রফিকুল ও ফরিদা দুজনই বসলো পাশাপাশি। অত্যন্ত আড়ষ্ট হয়ে। কুশলাদি বিনিময় করে কথাবার্তা শুরু করলেন মোতাহার। তাদের যে একটি সন্তানের ভীষণ প্রয়োজন তা বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝাতে থাকলেন রফিকুল ও ফরিদাকে। স্বর্ণলতার মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করলেন বিস্তৃত পরিসরে। মনোযোগী শ্রোতা হয়ে রফিকুল ও ফরিদা শুনতে থাকলো তার কথাগুলি। চূড়ান্ত কথোপকথন সেরে খাবার পর্বটিও সম্পন্ন করলো। আপ্যায়নের আয়োজনে নিজেকে ব্যস্ত রাখায় স্বর্ণলতা এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তাছাড়া স্বামীর ওপর অগাধ আস্থা থাকায় প্রয়োজনও মনে করেন নি। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দ্বারা বোঝাবার মাধ্যমে রাজী করানোর চেষ্টা করেছেন মোতাহার। মোতাহারের অপ্রত্যাশিত শর্তগুলি শুনবার পর অনেকটা মুষড়ে পড়েছে অর্জনের বাবা-মা। অবাক বিস্ময়ে দুজন দুজনার দিকে তাকিয়েছে বারবার। বারান্দায় গিয়ে বেশ কিছু সময় পরামর্শও করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজী হতে পারে নি।

এখন পর্যন্ত বিষয়টি জানতে পারেন নি স্বর্ণলতা। বিকেলের ট্রেন ধরবার জন্য তাদের মধ্যে প্রচন্ড তাড়া লক্ষ করতে প্রাছেন মোতাহার। তাই বিদায় দেবার জন্য নিজেও প্রস্তুত হলেন। সোফায় বসে আছে অর্জনের বাবা ও মা। ছোট বোনটিকে নিয়ে বাড়ীর চতুর্দিকে ঘোরাফেরা করছে অর্জন। এই মুহূর্তে কথা বলবার সব ধরনের শক্তিই প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন মোতাহার। নাস্তার ট্রেটি টি টেবিলে রেখে তার পাশে বসলেন স্বর্ণলতা। বুটিকের কাজ করা সাদা রঙের শাড়ী পড়েছেন স্বর্ণলতা। শাড়ীর নিম্নাংশের সামান্য অংশ মেঝেতে লেগে রইলো। ডান হাতটি সোফার হাতলে রেখে তাকিয়ে রইলেন অর্জনের বাবামায়ের দিকে। তার মুখখানিতে বিনয়ের একটি ব্যক্ত ভাব ফুটে উঠলো। স্ত্রীর এমন চিন্তাক্লিষ্ট মুখাবয়বটি দেখবার পর বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলেন মোতাহার। হাতের ইশারায় অর্জনের বাবামাকে নাস্তা গ্রহণের কথা বলে নীরব রইলেন তিনি। ট্রেনের সময়ের কথা বিবেচনা করে অবশেষে কাঁপা কণ্ঠে বললেন-

‘শুধু বাচ্চাটাকে আমরা মানুষ করতে চাই। কোনোদিনও নিজের সন্তান বলে দাবী করবো না। যদি কখনো মনে হয় রাখবেন, দরজা খোলা রইলো।’ মোতাহারের অনুরোধের মমার্থ বুঝতে পেরে মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলেন স্বর্ণলতা। বিশ্বাস করতে চাইলেন না মোতাহারের কণ্ঠ নিঃসৃত ক্ষুরধার বাক্যগুলি। বাক্যগুলির প্রতিটি শব্দই যেন ধারলো ছুরি হয়ে তার অন্তকরণকে আঘাত করতে থাকলো। আঁধারময় জীবনে আলো হয়ে ছুটে আসা প্রবহমান খেয়াটি হারানোর যন্ত্রণা আপনাআপনি বিষণ্ণতার দ্বীপে নিয়ে যেতে থাকলো তাকে। মেঘলাকাশেও ভেসে ভেসে রূপোলী জ্যোৎস্নার আলোয় সিক্ত হবার যে তীব্র বাসনা, সেই তীব্র বাসনার নির্মম উপসংহারটি প্রত্যক্ষ করে নিজেকে হারিয়ে ফেললেন যেন।

বাসা থেকে বের হবার সকল প্রস্তুতি শেষ অর্জনের বাবা মার। বিদায় নিলো স্বর্ণলতার কাছ থেকে। অনবরত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বুবু সম্বোধন করলো স্বর্ণলতাকে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাটি অক্ষুণ্ণ রাখলেন স্বর্ণলতা। সদর দরজা অবধি এগিয়ে দেবার জন্য ওদের সাথে হাঁটতে থাকলেন। সিঁড়ি পেরিয়ে দ্রুততার সাথে মূল গেটের কাছে গেল সবাই। রয়ে গেলেন স্বর্ণলতা। ধীর পায়ে আস্তে আস্তে ড্রইংরুমের জানালার পাশে দাঁড়ালেন। হাতদুটি শক্ত করে ধরে রাখলেন জানালার গ্রিলে। দেহের ঊর্ধ্বাংশটি ঝুঁকে পড়লো গ্রিলের ওপর। তার মনছবিতে অর্জনকে নিয়ে আঁকা চিত্রগুলি যেন ক্রমেই ধূসর থেকে ধূসরতর হতে থাকলো। মোহনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে তার অন্তকরণে ঠাঁই নেয়া অর্জনের কোমল মুখখানি দেখলেন তিনি দূর থেকে। ফরিদার কোলে উঠলো অর্জন। পাশে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে রফিকুল। রিকশার চাকা ঘুরতে শুরু করলো। বেশ কিছুদূর এগিয়েও গেল। ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে এলো স্বর্ণলতার জীবনে চিরদিনের জন্যে দৃশ্যায়িত হওয়া শিশুটি। রিকশার পেছন পেছন এগুতে থাকলেন মোতাহার। স্বর্ণলতার কথা ভেবে বরফের মতো হিম হয়ে এসেছে তার বুকখানি। আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার নেই ভেবে নিজেকে শান্ত রাখবার চেষ্টা করলেন। এরই মাঝে তার মুঠোফোনে কলসুর বেজে উঠলো। ডিসপ্লেতে কলারের নামটি দেখে আঁতকে উঠলো। দ্রুত রিসিভ করতেই ওপার থেকে জোরালো কন্ঠ ভেসে উঠলো—

স্যার, আমাদের মিছিলে দুর্বৃত্তরা হামলা করেছে। কয়েকজন আহতও হয়েছে। মিছিল কি বন্ধ করবো নাকি চালিয়ে যাবো?’

না, বন্ধ করবে না। যতদিন বিপ্লবগ্রামে আন্তঃনগর ট্রেন আসবে না ততদিন অবধি আন্দোলন চলবেই। মিছিল নিয়ে তোমরা সোজা শাপলা চত্বরে চলে আসো। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌছাচ্ছি। এই বলে শাপলা চত্বরের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকলেন মোতাহার।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev