শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী জয়রামবাটি গ্রামের রামচন্দ্র মুখার্জির কন্যা সারদার সাধারণ মানবীরূপ থেকে অসাধারণ দেবী রূপ-এ উত্তরণ, সাধারণ এক গ্রাম্যরমণীর আবরণ ভেদ করে যথার্থই বিশ্বজননীতে রূপান্তর আধুনিক কালের ধর্ম আন্দোলনের ইতিহাসে এক মহান অলৌকিক ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত।
এই দেবী-মানবীই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে শ্যামাসুন্দরীর কোল আলো করে। মা শ্যামাসুন্দরী সারাক্ষণ কন্যা সারদাকে (আদর করে ডাকতেন ‘সারু’) ঘরে রাখতে পারেন না, অভাবের সংসার। জমিতে তুলোর চাষ হয়, মাঠে যেতে হয় তুলো তুলতে। শিশুকন্যাকেও সঙ্গে নিযে যান। যখন তুলো তোলেন, শিশুকে শুইয়ে রাখেন খেতের মধ্যে। মা খেতে কাজ করেন, শিশু খেলে আপন মনে। শিশু সারদা একসময় ‘বালিকা’ হলেন। মা-কে সংসারের নিত্যকাজে সাহায্য করতে শিখলেন, তখনকার কথা পরে মা জয়রামবাটিতে ভক্তদের কাছে বলছেন, ‘ছেলেবেলায় দেখতুম, আমারই মত একটা মেয়ে সর্বদা আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকে আমার সকল কাজে সহায়তা করত—আমার সঙ্গে আমোদ-আহ্লাদ করত। কিন্তু অন্য লোক এলেই আর তাকে দেখতে পেতুম না। দশ-এগারো বছর পর্যন্ত এরকম হয়েছিল।’ (শ্রীমা সারদাদেবী, পৃঃ ২৫)।
বালিকা সারদা যখন জলে নেমে দলঘাস কাটতেন, দেখতেন সঙ্গিনী মেয়েও তাঁর সঙ্গে ঘাস কাটছে। ঘাস কাটা হলে আঁটি বেঁধে যখন পাড়ে রেখে আসতেন, দেখতেন ঐ মেয়েটি এক আঁটি ঘাস ইতিমধ্যেই কেটে রেখে গিয়েছে।
সেবার জয়রামবাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজা হচ্ছে। পূজা দেখতে অন্যান্য গ্রাম থেকে অনেকেই এসেছেন, এসেছেন হলুদে-পুকুর গ্রামের রামহৃদয় ঘোষালও। ঘোষালমশাই দেবী জগদ্ধাত্রীর সামনে ধ্যানরতা বালিকা সারদাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে স্বপ্নাবিষ্টের মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগলেন—কিন্তু বারবার দেখেও বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কে জগদ্ধাত্রী—ঐ মৃণ্ময়ী মূর্তি? নাকি এই চিন্ময়ী বালিকা। অবতারশক্তি সারদাদেবীর বাল্যলীলা প্রসঙ্গে স্বামী গম্ভীরানন্দজি বলেছেন, (শ্রীশ্রীমা সারদাদেবী, পৃঃ২৪-২৫) ‘দেবত্ব ও মানবত্বের অত্যাশ্চর্য মিশ্রণে মায়ের বাল্যলীলা বড়ই চমকপ্রদ;—সে সময়ে ঊর্ধ্বলোক হইতে ইহধামে সদ্যসমাগতা মা দেব মানবত্বের সন্ধিস্থলে অবস্থানপূর্বক এই মর্তলীলায় কোন্ ভাবের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করিবেন, তাহা যেন সহসা স্থির করিতে পারিতেছিলেন না।’
১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর (বাংলা ১২৬০ সালের ৮ পৌষ, কৃষ্ণা সপ্তমী) জননী সারদামণি জন্মগ্রহণ করেন। আর ১৮৫৯ সালের মে মাসে (বাংলা ১২৬৬) তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। পাত্রের বয়স ২৪, পাত্রীর ৬। বধূ সারদা যখন মাত্র ১৩ বছর বয়সে শ্বশুরালয় কামারপুকুরে আসেন, তখন গদাধর, অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণ অবস্থান করছেন তাঁর সাধন মন্দির দক্ষিণেশ্বরে। বাড়ির সামনেই বিশাল দীঘি—সবাই বলেন হালদারপুকুর। প্রতিদিন সেখানেই যেতে হত স্নানাদি সম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু বালিকা-বধূ সারদা ওই নির্জন হালদারপুকুরে একা একা স্নান করতে যেতে রীতিমত ভয় পেতেন। তাঁর এই মানসিক ভীতির কথা কাউকেই কোনওদিন প্রকাশ করেননি। কিন্তু হঠাৎ তিনি দেখলেন, হালদারপুকুরে স্নান করতে যাবার সময় একান্তই অপরিচিতা আটটি মেয়ে কোথা থেকে এসে তাঁকে সঙ্গ দিত। মা নিজের মুখেই সে কথা বলেছেন—‘হালদারপুকুরে নাইতে যাব, ভয় হত! খিড়কির ছোট দরজা দিয়ে বেরিয়ে ভাবছি নতুন বউ কি করে একলা নাইতে যাই। ভাবতে ভাবতে দেখি কি আটটা মেয়েমানুষ এল; আমিও রাস্তায় নামলুম। নামবার পরেই তারা চারজন আমার আগে, চারজন আমার পেছনে হয়ে, আমাকে মাঝে নিয়ে হালদারপুকুরের ঘাটে চলল। আমি স্নান করলুম, তারাও করলে। পরে আবার সেরকম করে বাড়ি ফিরে এল। ঐ সময়টায় যতদিন ওখানে ছিলুম, রোজ এইরকম হত। অনেকদিন মনে করেছি, মেয়েগুলি কারা আমার স্নানের সময় রোজই আসে; কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি।’
শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে সাধনায় নিমগ্ন। আর জয়রামবাটিতে জননী সারদামণি পতি-দর্শনের আশায় প্রতীক্ষার প্রহর গুণে চলেছেন। এদিকে গ্রামে কারা রটিয়ে দিয়েছে, সারদার বর একটা আস্ত পাগল। ফলে বিষাদে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে একটানা চারবছর কাটাতে হল সারদাকে। মাঝেমাঝেই ভাবতেন, যদি একবার সুযোগ পাওয়া যেত, তাহলে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে নিজের চোখেই দেখে আসতাম, সত্যি তিনি পাগল কিনা! অমন মানুষ কি কখনও পাগলও হতে পারে?
শেষপর্যন্ত একটা সুযোগও এসে গেল। এক পুণ্যস্নানের যোগ পড়ায় গ্রামের অনেকেই কলকাতায় যাচ্ছিলেন গঙ্গাস্নান করতে, সারদা তাঁর পিতা রামচন্দ্রকে নিয়ে সেই দলে যোগ দিলেন। এখন জয়রামবাটি থেকে বাসে কলকাতায় চলে আসা যায় সাড়ে তিন ঘন্টার মধ্যেই? তখন তো অবস্থা এরকম ছিল না। জয়রামবাটি থেকে পায়ে হেঁটে আসতে হত, পথ ছিল দুর্গম ও ভয়ঙ্কর। পথের মধ্যে থাকত চটি—সেখানেই লোকে রাত্রে বিশ্রাম নিত, খাওয়া-দাওয়া করত। একটানা তিনদিন লেগে যেত কলকাতায় পৌঁছতে।
সেবার উদ্বিগ্নচিত্তে মা চলেছেন দক্ষিণেশ্বরে। কিন্তু একটানা দুদিন পথ চলার পরই মা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। হাঁটবেন কি, বসবারও সাধ্য নেই তাঁর। জ্বরে একদম বেহুঁশ হয়ে পড়েছেন। অগত্যা যাত্রাবিরতি ঘটাতে বাধ্য হলেন রামচন্দ্র, পীড়িতা কন্যাকে নিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন এক নিকটবর্তী চটিতে—যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘর এবং ক্ষুধার অন্ন পাওয়া যায়। জ্বরে প্রায় অচেতন অবস্থায় মা সেখানেই শয্যা নিলেন—তাঁর দেহে জ্বরের প্রবল যন্ত্রণা, অন্তরে ততোধিক মনোবেদনা। এই অবস্থায় এক অলৌকিক দিব্যদর্শনের ফলে উভয় যন্ত্রণাই কিছুটা প্রশমিত হল। সেদিনের সেই দিব্যদর্শনের প্রসঙ্গে মা নিজেই পরবর্তীকালে বলেছেন, ‘জ্বরে যখন একেবারে বেহুঁশ, লজ্জাসরমরহিত হয়ে পড়ে আছি, তখন দেখলাম, পাশে একজন মেয়ে এসে বসল—মেয়েটির রঙ কালো,—কিন্তু এমন সুন্দররূপে কখনও দেখিনি!—বসে আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল—এমন নরম ঠাণ্ডা হাত, গায়ের যাবতীয় জ্বালা জুড়িয়ে যেতে লাগল। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কোথা থেকে আসছ গা?’ মেয়ে বলল, ‘আমি দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছি।’ শুনে অবাক হয়ে বললাম, ‘দক্ষিণেশ্বর থেকে! আমি মনে করেছিলাম দক্ষিণেশ্বরে যাব, তাঁকে (শ্রীরামকৃষ্ণকে) দেখব, তাঁর সেবা করব। কিন্তু পথে জ্বর হওয়ায়, আমার ভাগ্যে ওইসব আর হল না।’
‘মেয়ে বলল, সে কী! তুমি দক্ষিণেশ্বরে যাবে বৈকি, ভালো হয়ে সেখানে যাবে, তাঁকে দেখবে। তোমার জন্যই তো তাকে সেখানে আটকে রেখেছি।’ আমি বললাম, ‘বটে? তুমি আমাদের কে হও গা?’ মেয়ে বলল, ‘আমি তোমার বোন হই,’ আমি বললাম, ‘বটে? তাই তুমি এসেছ!’ ওইরূপ কথাবার্তার পরেই ঘুমিয়ে পড়লাম।’
পরদিন সকাল বেলায় সারদা মা দেখলেন, জ্বর সেরে গেছে। রাত ন’টা নাগাদ মা দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছলেন।
বিশ্বজননী সারদা ছিলেন সর্বজনের জননী—যেমন সন্ন্যাসী সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয়, তেমনি গৃহী ভক্তদের নির্ভয় অবলম্বন। আমরা সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তদের স্মৃতি কথন থেকে এমন অনেক ঘটনার কথা জানতে পারি, যাতে দেখা যায় মা তাঁর স্নেহের সন্তানদের কখনও ত্যাগ করেননি— যতদিন শরীর ছিল, ততদিন তো নয়ই, শরীর যাওয়ার পরও নয়। তিনি নিজের রূপ, নিজের যোগ-বিভূতি, বা নিজের অলৌকিকত্বকে সযত্নে আড়াল করে রেখেছিলেন, দেবী হয়েও মানবীরূপে সকলকে ধরা দিয়েছিলেন, তবু অনেকক্ষেত্রে তাঁর দেবীরূপ বিদ্যুৎ ঝলকের মত সর্বসমক্ষে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
রামকৃষ্ণ সংঘে সর্বজনশ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসী ছিলেন ভরত মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ)—যিনি দেহান্তরিত হয়েছেন। এই লেখক সেই দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী, যিনি ভরত মহারাজের পদপ্রান্তে বসে অনেক বিস্ময়কর ইতিবৃত্ত শুনেছেন বিভিন্ন সময়ে। সেরকমই এক ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। ভরত মহারাজ ছিলেন জননী সারদামণির দীক্ষিত সন্তান।

স্বামী অভয়ানন্দ (ভরত মহারাজ)
সেবার তিনি মানস সরোবরে যাত্রা করবেন। তাই যাত্রার আগের দিন মায়ের আশীর্বাদ নিতে গেছেন বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে (উদ্বোধনে)। তখন মা বিশেষ পীড়িতা। শ্যামাদাস কবিরাজ মশাই নিয়মিত এসে মায়ের চিকিৎসা করছেন। কাশীর সত্যানন্দ স্বামী আর ভরত মহারাজ মা-কে প্রণাম করতে গেলেন। মা সব শুনে বললেন, ‘বাবা, আমি শুনেছি, মানস বড় দুর্গম তীর্থ। খুব সাবধানে থাকবে। যা-ই কর—সর্বদা ঠাকুরকে ধরে থেকো।’ মায়ের শরীর ত্যাগের পূর্বে এটাই ভরত মহারাজের শেষ মাতৃদর্শন। কিন্তু কৃপাময়ী জননী তাঁর সন্তানকে শেষ সময়ে আরেকবার স্বপ্নদর্শন দিয়েছিলেন। অথচ ভরত মহারাজ নিজেই বলেছেন, ‘আমার সাধারণত দর্শন জাতীয় অভিজ্ঞতা হয় না। অথচ মায়ের কৃপায় সেটাই হয়েছিল।’
এই প্রসঙ্গে ‘ভরত মহারাজ’ বলেছেন, ‘মানসতীর্থে যাওয়ার পথে আলমোড়া জেলার ভিতর এক জায়গায় কয়েকদিন আমরা বিশ্রাম করেছিলাম। সেখানে কয়েকজন পরিচিত ব্যবসায়ীর আতিথ্য গ্রহণ করি। সেখানে একটা ছোট্ট বাড়িতে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়িতেই প্রথম অথবা দ্বিতীয় রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখি। ঘুমটা ভাঙার পর ঘড়িতে দেখেছিলাম, রাত তখন দুটো।’
আত্মগতস্বরে সেদিন ভরত মহারাজ বলেছিলেন, ‘স্বপ্নে দেখলাম শ্রীশ্রীমাকে। মা-কে যেন অপূর্ব সাজে সাজানো হয়েছে, চরণ দু’খানি আলতায় রাঙানো। সুন্দর, পরিষ্কার একটা শাড়ি পরনে, গলায় ফুলের মালা। মা-কে দীপ্তিময়ী দেখাচ্ছিল। যেখানে মা-কে এনে রাখা হয়েছে, সেই জায়গাটাও স্পষ্ট দেখেছিলাম। সে হল বেলুড়মঠের গঙ্গাতীরবর্তী সেই স্থান, যেখানে এখন তাঁর মন্দির। অনেক লোকের সমাবেশ সেখানে দেখলাম। কিন্তু মাকে ওরা কাঁধে করে বয়ে এনেছে, না গাড়িতে এনেছে, তা বুঝতে পারলাম না। ভিড়ের মধ্যে তিনজনকে স্পষ্ট চিনেছি : মাখন সেন, সুরেশ মজুমদার এবং ঐ দলের আর এক ভদ্রলোক, যার নাম এখন মনে করতে পারছি না।’
ভরত মহারাজ তন্ময় হয়ে বলে চলেছেন, ‘মানস থেকে ফেরবার পথে তাকলাকোটে বিশ্রাম করছিলাম। তাকলাকোট একটা বড় ব্যবসার জায়গা। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একজন কমিশনার ওখানে গিয়ে বাজারের দরদাম বেঁধে দিয়ে আসতেন। ওখানে থাকতেন তাঁবুতে। অফিসার পাঞ্জাবী। আমাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ভদ্রলোক তাঁর তাঁবুতে আমাদের নিয়ে গেলেন। সেখানে দু’একটি খবরের কাগজ আছে দেখতে পেলাম। পাঞ্জাব থেকে প্রকাশিত এক কাগজে দেখলাম, শ্রীশ্রীমা দেহত্যাগ করেছেন। পরে তারিখ মিলিয়ে দেখেছি, যেদিন আমার স্বপ্নদর্শন হয়েছিল, সেদিনই মা শরীর ত্যাগ করেছেন।’
এই দেবী মানবী লীলা সংবরণ করেন ১৯২০ সালের ২১ জুলাই রাত দেড়টায়।