| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মেকলিয় শিক্ষা এবং বাড়ন্ত চাকরি যুগে ভদ্রবিত্ত (শেষ পর্ব) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫০৪ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

কতগুলো ভাবনা এ প্রসঙ্গে ভাগ করে নেওয়া দরকার

১) আমরা কারিগর সঙ্গঠনের পক্ষে অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গীতে বাংলার সামগ্রিক শিক্ষা বিষয়টা পর্যালোচনা করছি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ছিল জ্ঞান, শ্রুতি, দক্ষতা আর স্থানীয় বাজার নির্ভর অপ্রাতিষ্ঠানিক, যাকে চোখে দ্যাখা যায় না এমন শিক্ষা দান কাঠামো আজও টিকে আছে। এই দক্ষ জ্ঞানী পরম্পরার কারিগরদের বাজারটা বিশাল বড়। বাংলায় অন্তত ৫% পরম্পরার কারিগর আছেন, যারা অন্তত এক-দেড় লক্ষ কোটি টাকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব বরাবরই অনেক বেশি, এবং প্রাধান্যের ছিল সেদিনও, আজও আছে। এ প্রসঙ্গে আপনাদের পড়তে অনুরোধ করব উইলিয়াম এডামের ১৮৩৬ সালের শিক্ষা সমীক্ষা, সেটি নিয়ে ধরমপালজী লিখেছিলেন দ্য বিউটিফুল ট্রি নামক বই।

২) মনমোহনী অর্থনীতিতে কর্পোরেট আর রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রে চাকরির সুযোগ কমছে দ্রুত। পলাশীর পর বিস্তৃত লুঠের আবহে, লুঠ কাণ্ডের ছোট তরফ মধ্যবিত্তকে তৈরি করা হয়েছিল কোম্পানির বৃদ্ধি পেতে থাকা উপমহাদেশিয় একচেটিয়া ব্যবসা সামলাতে। সেই কাঠামো নানান পরিক্ষা নিরীক্ষা মার্ফত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল ইওরোপিয় সাম্রাজ্য মেকলের উদ্যমে ভদ্রবিত্তকে ইওরোপমন্যতার স্বপ্ন দেখিয়ে। আজ ইওরোপ নেই কিন্তু ছদ্মঔপনিবেশিকতা দিনের পর দিন আরও গভীরে শেকড় গাড়ছে ভদ্রবিত্তের মনে আর সমাজে। উপনিবেশ সময়ে সাম্রাজ্যের ব্যবসা বাণিজ্য, আদতে লুঠ সামলানোর জন্যে যে শেকড় বিহীন শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল মুষ্টিমেয় মানুষকে সাহেবমন্য হবার স্বপ্ন দেখিয়ে, সেই মুষ্টিমেয় ভদ্রবিত্ত সেই কেন্দ্রিভূত লুঠেরা ইওরোপিয় কাঠামো, ভাবনা উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পরেও আরও গভীরভাবে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। কিন্তু যে ব্যপ্ত সুযোগ ছিল অতীতে এমনকি সাতের দশকে রাষ্ট্রীয় উদ্যমে ব্যাঙ্ক এবং বেশ কিছু কোম্পানি রাষ্ট্রীয় করণের ভর্তুকি মার্ফত মধ্যবিত্ত পোষা হয়েছিল, সেই সুযোগ আজ আর কি আছে? সেটা ভাববেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ হয়ত বাড়ছে – বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে – যেগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য করণিক তৈরি। কিন্তু তার পরে সেই পাশ করে বেরোনো ছাত্রছাত্রীরা কি করবে? চাকরি কই?

৩) এ বাংলার সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা চলে মুষ্টিমেয় স্নাতক আর স্নাতকোত্তরদের দিয়ে। বাংলায় ১০ কোটি জনসংখ্যার ২৫ লক্ষ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হয় প্রতি বছর। মাধ্যমিকে আসে এর অর্ধেকের আশেপাশে ১৩ লক্ষ। অর্থাৎ খসে গ্যাল অর্ধেক ছাত্র ছাত্রী মাধ্যমিক দিতে না দিতেই। উচ্চমাধ্যমিকে আরও পাঁচ লক্ষ খসে যায় – পরীক্ষা দ্যায় ৮ লক্ষ। সেখান স্নাতকস্তরে কত পরীক্ষা দেয় ভগাই জানেন। যে পাঠ্যক্রম উপনিবেশ মেকলিয় নিদানে নানান প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীদের জ্ঞানে গড়ে উঠেছে, আজ, অর্থাৎ ২০২২এ, কোভিদ পরিবেশের আগে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোয় প্রত্যেক বছর ২৪ লক্ষ সে যাওয়া ছেলেমেয়ে ব্রাত্য হয়ে যেত। নাহ সমাজগুরুদের এই অস্বস্তির প্রশ্ন করছি না যে, প্রত্যেক বছর শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে খসে যাওয়া ২৪ লক্ষ শিশু, বালক বালিকা, যুবক যুবতীরা কোথায় যায় সে তথ্য তারা জানেন কি না। শুধু বলতে চাইছি এই মেকলিয় প্রাতিষ্ঠানিক ভদ্রলোকিয় শিক্ষা ব্যবস্থা আদতে তৈরি হয়েছে বড় পুঁজির লুঠ চালাতে হাতে গোণা কয়েক হাজার জীবিত ভদ্রলোকিয় স্নাতক নাটবল্টু তৈরি করার কাজে। ফি বছর উদ্বৃত্ত হয়ে খসে যাওয়া ২৪ লক্ষ ছাত্রছাত্রী ছোটলোকেদের নিয়ে মাঝে মধ্যে আপনারা ভেবেছেন কিন্তু ব্যবস্থার কাঠামো বদলানোর কথা ভাবেন নি। মনে রাখবেন, খসে যাওয়াদের অধিকাংশই এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতিরেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন। সংখ্যালঘিষ্ঠ ভদ্রবিত্ত ক্ষমতাভোগী ভর্তুকিভোগী আপনারা এই প্রাতিষ্ঠানিকতা ব্যতিরেকে জল ছাড়া মাছ।

৪) কারিগর উৎপাদন ব্যবস্থা সূত্রে বলতে পারি প্রথগত শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যালয়ছুট হয়ে বাংলার অধিকাংশ বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান ও আদিবাসী যুবকযুবতী চাকরি পাওয়ার আশা ত্যাগ করে কিন্তু অপ্রথাগত ক্ষেত্রে রোজগারের দিকে বেশি ঝোঁকেন – এদের বড় অংশ প্রথাগত শিক্ষা নিতে নিতে ছেড়ে দিয়েছেন। পরম্পরাগতভাবে এঁরা বাংলার চাষী-কারিগর-হকার ব্যবস্থার অংশ। বহুকালের গ্রাম উৎপাদন ব্যবস্থার স্বাধীন মানসিকতায় সব সময় পরাধীনতা খাপ খায় না। কারিগরি বা অপ্রথাগত শিক্ষা দক্ষতা আর জ্ঞান অর্জন করতে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় না। সামাজিক/পারিবারিক/গোষ্ঠীগত/গুরুগত জ্ঞান আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকা দক্ষতা শাকরেদগিরি করেই অর্জন করেন। তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়া যায় খোলা বাজার অর্থনীতিতে – না আমি এই বড় পুঁজির ঘোমটা দেওয়া ছদ্ম-একচেটিয়া খোলাবাজার অর্থনীতির কথা বলছি না। এই শিক্ষা নিতে বড় কোন বিপুল বড় কাঠামোর প্রয়োজন হয় না – চার-ছয় ঘন্টার ক্লাসের জন্যে কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যালয় নামক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তাকে তৈরি করে ফেলে রাখতে হয় না বাকি ১৮ ঘন্টা। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় দাতা আর গ্রহীতার মধ্যে বিন্দুমাত্র ব্যবধান তৈরি হয় না। শাকররেদ/চ্যালাকে স্বপ্ন দেখানো হয় না তাকে বড় কিছু জীবনে করতে হবে – অন্তত আমেরিকার ইওরোপকে সেবা দেওয়ার জন্যে তাকে বিশ্বের কোণায় কোণায় ছুটে যাওয়ার জন্যে নিবেদিতপ্রাণ করা হয় না। এই শিক্ষা, কাঠামো নিরপেক্ষ, স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি, কারিগরি, কৃষ্টি নির্ভর। যে শিক্ষা কাঠামো দেখাও যায় না, অনুভবও করা যায় না। কারিগর, চাষী হকারদের পড়া, শোনা, জ্ঞান অর্জন নিজেদের এলাকায়, পরীক্ষাও মাঠে-ঘাটে। শিক্ষা দেয় সমাজ, পরীক্ষা নেয় প্রকৃতি। কারিগর, চাষী হকার রোজ সমাজের কাছে দক্ষতা জ্ঞানের পরীক্ষা দেয়, নিজের ভাষায়, নিজের সমাজে, নিজেদের মানুষদের সামনে। তাকে রোজ হাজার হাজার মানুষ বাজয়ে নেয় – এবং সে নিজে রোজ রোজ দক্ষ থেকে দক্ষতর হতে থাকে কোনও তথাকথিত পুঁজিস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ছাড়াই।

৫) এই খোলা মেলার সুযোগটা কিন্তু প্রথাগত শিক্ষা দ্যায় না, পড়ুয়া যত ওপরের দিকে পড়াশোনা করতে থাকে কয়েকজন হাতে গোনা শিক্ষার্থী বাদ দিয়ে অধিকাংশ পরনির্ভর হয়ে ওঠেন। তাকে এই বিপুল বিশাল অপচয়ী কাঠামো, জীবন বিচ্ছিন্ন, শুধুই লুঠ ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে তৈরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম সারা জীবন তাড়া করে নিয়ে বেড়ায়। এই কাঠামো সামাজিক গোষ্ঠী বিনিয়োগে হয় না, তাকে নির্ভর করতে হয়, হয় সরকারি না হয় কর্পোররেট বিনিয়োগের ওপরে।

৬) এই মেকলিয় ঔপনিবেশিক পাঠ্যব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে এটি কোনভাবেই পড়ুয়াকে স্বনির্ভর হতে প্রণোদনা দ্যায় না – সে চাকরি করুক, দালালি করুক, ব্যবসাই করুক অথবা উৎপাদন ব্যবস্থা নিজে বানাক তাকে পুঁজি, পুঁজি নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি, তার বাজারের ওপর নির্ভর করতেই হয়। কারণ পড়ুয়া পুঁজি ব্যবস্থা নিরপেক্ষ হলেই, ভাবতে শিখলেই, দেশিয় বাজারের জোরের বাস্তবতা বুঝতে শিখলেই ঔপনিবেশিক অর্থনীতির মাথায় বাজ। শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচী, শব্দ-বাক্য গঠন(চাষী মেথর “ভাই” কিন্তু ডাক্তার “বাবু”, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাংলাকে অধমর্ণ বানানো লুঠেরা মেকলিয় যুগ আধুনিক, বাংলাকে সোনার বাংলা বানানো নবাবি মুঘল সুলতানি যুগ ইসলামি, পালযুগ হিন্দু; মধ্যবিত্ত ধ্রুপদীতার বাইরে সব ফোক, ইওরোপ আন্তর্জাতিক কিন্তু বাংলা আঞ্চলিক, কর্পরেট কৃষি আধুনিক কিন্তু বিষ ছাড়া কৃষি প্রিমিটিভ, প্যান্ট শার্ট আধুনিক কিন্তু পাজামা, লুঙ্গি ধুতি পিছিয়ে পড়া ইত্যাদি ইত্যাদি), পড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গী, উদ্দেশ্য কোনটাই পড়ুয়ার বাজার, এলাকার বাজার উৎপাদন ব্যবস্থা, তার জ্ঞানচর্চা, তার জীবনযাত্রা এককণাও জানায় না, বরং হীনমন্যতা জাগাতে সাহায্য করে। ভিলায়ের লৌহ ইস্পাত শিল্প নিয়ে যে অকার্যকর কর্পোরেটিয় জ্ঞান অর্জন করে পড়ুয়া, তার বিপরীতে নিজের বা পাশের এলাকার অসুর বা বিশ্বকর্মার বা কামারদের লোহা শিল্প নিয়ে জ্ঞানলাভ করে না। সে জানতেই পারে না বড় কারখানায় জং ছাড়া লোহা ইসপাত বানানো যায় না, কিন্তু দেশিয় ধাতুবিদেরা অস্থায়ী চুল্লিতে অক্লেশে জং ছাড়া লোহা আজও বানায়। ভাল কাপড় আজও মিলে হয় না। মেকলিয় পাঠ্যব্যবস্থায় তাকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বলে দেওয়া হয় সে ছাড়া আর সব উৎপাদন ব্যবস্থা অকার্যকর প্রাচীন অনর্থনৈতিক। ফলে সে প্রথম থেকেই শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরদ্বীপ দেশের বাজারের ওপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকে – অথচ হাজার হাজার বছর ধরে ব্রিটিশপূর্ব সময়ে হকার কারিগর এশিয়া আফ্রিকায় কাঁহা কাঁহা মুল্লুক গেছেন, ডাচ অর্থনীতিবিদেরা ব্রিটিশপূর্ব বিতরণ ব্যবস্থাকে পেডলার্স ইকনমি বলছেন – যদিও সেটা সম্পূর্ণ সত্য নয়, কিন্তু এর বড় অংশই বাস্তব। যে বাজার ভদ্রবিত্তের অজানা – অথচ সে সেই বাজারে তাকে ঢুকতেই হবে, কারণ পাঠ্যক্রম সেভাবেই মগজ ধোলাই করেছে, অন্য বাজারের কথা জানেন না, জানলেও বিশ্বাস করে না। অথচ বড় পুঁজির চক্রব্যুহের বাজারে তাকে ঢুকতে জুতোর শুকতলা খইয়ে ফেলতে হয়।

৭) অথচ তথাকথিত অশিক্ষিতরা, বা স্থানীয়রা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্পোরেট বাজারের বাইরে, স্থানীয় বাজারগুলোতেই সোনা ফলাচ্ছেন। দিনাজপুরের বড় থেকে অত্যন্ত ছোট আকারের অধিকাংশ যানপরিবহন ব্যবস্থা মুসলমান পরিবারের দখলে, মধুদার ভাইপো ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে পড়ছে কিন্তু শোলা কেটে কারিগরি উতপাদনে সে সমান দক্ষ। সে এখনই মাসে দশ হাজার টাকা রোজগার করে। কারিগর সংগঠন হিসেবে আমরা সদস্যদের নানান পণ্য বিতরণ করছি তেমনি পরম্পরার প্রায় হারিয়ে যাওয়া নানান পণ্য তৈরিও করছি, বিক্রিও করছি। এটাই রাস্তা।

৮) এই অপ্রথাগত অমেকলিয় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে ৯০% মানুষের বাংলার গ্রামীন উৎপাদন ব্যবস্থা ইওরোপের পাগান উৎপাদন ব্যবস্থার দশা প্রাপ্ত হয় নি। যে সব অধিকাংশ যুবা-যুবতী তার জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন প্রথাগত পাঠ ব্যবস্থায় সফল হয় না তারা গ্রামীন উৎপাদন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়তে পারে সহজেই।

ফলে কেন এই শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্রমুখী নয় সে আলোচনা আর বিশ্লেষণে না ঢুকে ওপর ওপর দেখার প্রবণতা আছে। শেষ বয়সে বিদ্যাসাগর মশাই বুঝেছিলেন এই পাঠ্যব্যবস্থা বাবু তৈরি করে – কিন্তু তখন আর তার কিছু করার ছিল না, তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন সাগরপারের সংখ্যালঘিষ্ঠ কিন্তু ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলায় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কর্পোরেটিয় ব্যবস্থার শেকড় চরাতে।

৯) আমরা কারিগরেরা যেহেতু একদা সোনার বাংলা গড়েছিলাম পাদশাহ, নবাব, রাজাদের সঙ্গে নিয়ে, আমরা এই অপ্রাতিষ্ঠনিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটু রকমফের করানোর চেষ্টায় আছি। ভাবনাচিন্তা চলছে, সুযোগ এলে জানানো যেতে পারে। এই এক্সক্লুসিভ মেকলিয় পড়াশোনার বাইরে কয়েক হাজার বছরের পরীক্ষিত ইনক্লুসিভ শিক্ষা ব্যবস্থাতে ভদ্রদের অংশগ্রহন ১০০% সুনিশ্চিত করব।

১০) ২০২১এ জিতে এসে মমতা সরকার ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় খুলতে আকুল। বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় যে কেন্দ্রিভূত কাঠামোয় চলে সেখানে শহুরে আনন্দবাজারী ইংরেজি শিক্ষিত ঔপনিবেশিক ইওরোপমন্য উচ্চবর্নিক ভদ্রছানার বাইরে গাঁইয়াদের প্রবেশ দুস্কর, যে জন্যে ২৫ লক্ষ প্রাথমিকে ভর্তি হলেও মাত্র ৮০ হাজার স্নাতক পরীক্ষায় বসে, স্নাতকোত্তরে কত বসে এবং কত পাস করে সে হিসেব কষা হয় নি। বাকি সব স্তরে স্তরে বিপুলাকারে খসে যায়। কেন? নিজেকে প্রশ্ন করুন যারা শিক্ষা নিতে পেরেছেন আর যারা পারেন নি তারাও – আমরা চাষী হকার কারিগরেরা প্রতিদিন নিজেদেরকে প্রশ্ন করি আর শিখি। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রণত হয়ে শিখি হকার আর কারিগরদের জ্ঞান, জীবন আর কর্ম দক্ষতা থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ব্যবস্থায় ছাত্রদের ঔপনিবেশিক পাঠের ছাঁকনিতে ছেঁটে ফেলে যে আনন্দবাজারী ইংরেজি শিক্ষিত ঔপনিবেশিক ইওরোপমন্য উচ্চবর্নিক মাঠাদের পাওয়া যাচ্ছে তারাই কি মেধাবী?

১১) অনেকেই চাইছেন/ভাবছেন এই ছেঁটে যাওয়া গাঁইয়াদের একাংশ কারিগরি নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে। এমন কি ভারত সরকারও চাইছে, বাংলা সরকারও চাইছে। এটা করতে গেলে শুধু ঔপনিবেশিক পড়াশোনার কাঠামোর তাত্ত্বিক অবস্থান বিরোধিতা করলে হবে না অথবা পাঠ্যক্রমও বদল করলে হবে না, গোটা পাঠ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রবিরোধিতা জরুরি। প্রাথমিকভাবে সংখ্যালঘিষ্ঠ বিদ্যুৎ নির্ভর কারিগরি ব্যবস্থার পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ কারিগরিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেটা প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের কাছে বেশ কয়েকটা এনজিও এসেছিল যারা NSDCর পঞ্জীকৃত। তারা কোটি কোটি টাকা সাহায্য পায়। মুল উদ্দেশ্য গ্রামীনদের কর্পোরেট ব্যবস্থায় টেনে নিয়ে আসা। আমরা ওদের বোঝাতেই পারলাম না, যে ব্যবস্থা চাকরি ছাঁতাই করছে, সেই ব্যবস্থা নতুন করে ঔপনিবেশিক মডেলে ভুয়া উদ্যম নিচ্ছে গাঁইয়াদের শিক্ষিত দারোয়ান ইত্যাদি হিসেবে তৈরি করতে। গ্রাম থেকে যাওয়া অধিকাংশ “শিক্ষিত” কর্মপ্রার্থী কিছু দিন কাজ করেই ফিরে আসছে গ্রামে, তার শহরের জীবন আর মাইনেয় পোষাচ্ছে না। গোটা NSDCর প্রকল্প ব্যর্থ। কারণ গ্রামীন কারিগরি নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহী নয়। তারা ঔপনিবেশিকদের মত চাকরি দিতে চায় – এমপ্লয়েবিলিটি প্রকল্প সফল করার বড় শর্ত। আমরা কারিগরেরা চাকরি চাই না – আমরা তো দক্ষ, আমরা তো আমাদের বাজারকেই বাঁচিয়ে রেখেছি – আমরা চাকরি করতে যাব কেন? ফলে হল না কাজ।

১২) এই কারিগরদের যদি বিদ্যালয় ব্যবস্থায় পেতে হয়, তাহলে বিদ্যালয়কে মানসিকভাবে সমস্ত ঔপনিবেশিক গুমোর ছেঁটে ফেলে যেতে হবে পড়ুয়ার কাছে তবেই পড়ুয়া পড়তে পারবে – ছাত্রদের চারদিকের চারটে দেওয়াল হঠিয়ে দিতে হবে। গুরু/সমাজ/পরিবার ইত্যাদির কাছে সাকরেদি করে যে শিক্ষা দক্ষতা অর্জন করল গাঁইয়া কারিগর, সে তার দক্ষতার পরীক্ষা দেয় রোজ, তার ক্রেতার কাছে, সমাজের কাছে, বাজারের। সে পাঠ নেয় সমাজ, পরিবার গুরুর কাছে, তার মত করে। সমাজ, গুরু তাকে সিলেবাস গিলিয়ে দেন না। এই যে মেকলিয় চাকরিজীবি তৈরি করা ঔপনিবেশিক কেন্দ্রিভূত পাঠ ব্যবস্থা গাঁইয়া কারিগরের জীবনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। পাঠটা তৈরি হয়েছে কর্পোরেট বা রাষ্ট্রের কেন্দ্রবদ্ধতা মেনে নিয়ে বিদেশের কর্পোরেটদের জন্যে চাকরি দালালি করতে। এই কারিগরি পড়াশোনা সামাজিকভাবে উদ্যমী হতে উতসাহ দেয় না। এগুলি না হলে কোন গাঁইয়ার প্রাতিষ্ঠনিক পড়াশোনা ব্যবস্থা ব্যর্থ হবে।

হাজার হাজার বছর ধরে তার মত করে টিকে থাকবে গাঁইয়া অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান দক্ষতা চর্চা নিয়ে। আর শহুরেরদের জন্যে থাকবে বর্তমান ২৫০ বছরের লুঠেরা ইওরোপিয় ব্যবস্থা – যে ব্যবস্থা কাজ করে মূলত বিদেশের বাজার দখল করতে। আমরা টিকে থেকেছি কয়েক হাজার বছর। সেরিবা সেরিবান প্রায় আড়াই হাজার বছরের গপ্প। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আড়াইশ বছর। আপনারা অতদিন টিকুন।

আমরা নতুন করে ভেবে দেখি যে বাস্তব অবস্থায় আমরা দাঁড়িয়ে আছে যে চাকরিবিহীন উন্নয়নের অর্থনীতিতে আমরা প্রবেশ করেছি সেটাকে আরও বেশি গুরুত্বদিয়ে আগামী দিনে ছদ্ম বেকার তৈরির অবস্থা তৈরি করব না কি গ্রামীন সত্যিকারের স্বনির্ভর মানুষ তৈরি করার কারিগরি অর্থনীতি আর শিক্ষাব্যবস্থার জন্যে ঝাঁপাব।

সমস্যা হল ভদ্রবিত্তরা শুধু একটা অবস্থায় কন্ডিশনড হয়ে আছি। কারিগরি ব্যবস্থা বিলয় হবে কি হবে না এটা সময় বলবে। আমরা শুধু বলছি, আমরা হাজার হাজার বছর টিকে থেকেছি। আমরা প্রমান করে দিয়েছি আমরা টিকে থাকতে পারি। সে প্রমান/পরীক্ষা আজও কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে এবং তাকে টিকিয়ে রাখা শিক্ষা ব্যবস্থাকে দিতে হয় নি। সময় বলবে সে টিকে থাকবে কি না। শুধু ভাবতে বলব কোন একদিন যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি হয় ৫০ ক্রোশের বাইরে সেই অঞ্চলের উৎপাদন বিক্রি করা যাবে না দূষণ ইত্যাদির কারণে, তাহলেই রাষ্ট্রীয় মদতে কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা সম্বল করে বেঁচে থাকা সব কর্পোরেট গুমোর ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। আজ আমরা ভদ্ররা উচ্চ প্রযুক্তি হিসেবে যা ব্যবহার করছি তা রাষ্ট্রের সামরিক ভরতুকিতে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় চলে সামরিক ভর্তুকিতে কর্পোরেটদের জন্যে প্রযুক্তি বুদ্ধি বিকাশ করতে।

সেই ভরতুকি যদি কোন দিন উঠে যাওয়ার অবস্থা হয়, তাহলে ভদ্রদের কি হবে ভাবতে অনুরোধ করছি।

বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজ এই অপ্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে জোরদার করছেন – শুধু কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য ছোট ছোট বিরিয়ানি দোকানের দিকে লক্ষ্য রাখুন – কিভাবে তারা প্রতিটা বাজার বুঝে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। ভাগাড় কাণ্ডের পরে আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম তারা নেই হয়ে যাবেন। আজও তাঁরা বহাল তবিয়তে আছেন।

সেই ভর্তুকিবিহীন কারিগরিটাই আমাদের বাংলার কারিগরদের জ্ঞান আর দক্ষতার জোর। সেই জোরদার অপ্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় ভদ্রবিত্ত আপনার ছানাপোনাকে জুততে হবে। অন্য পন্থা নেই।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev