[ভদ্রবিত্ত স্বার্থ বিরোধী বড় লেখা, এড়িয়ে যান]
অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ঔপনবেশিক কাঠামোগত শিক্ষা এবং তার সংগে জুড়ে থাকা উৎপাদন ব্যবস্থা বিষয়ে আমাদের কারিগরদের মত জানতে চেয়েছিলেন। যে ভদ্রবিত্ত সমাজ শিক্ষা, পড়া, জ্ঞান, পাঠ ইত্যাদি শব্দর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, তাদের সঙ্গে শিক্ষা বিষয়ে আলাপই বৃথা। যে শহুরে সমাজ গ্রামীন জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার বলতে নিরক্ষতা দূরীকরণের মত ঔপনিবেশিক প্রকল্প রচনা করে, যে ভদ্র সমাজ শিক্ষা, জ্ঞান বলতে উপনিবেশের শেখানো শুধুই অক্ষর জ্ঞান বোঝে এবং কাটা কাটা শদে অ-শি-ক্ষি-ত, নি-র-ক্ষ-র শব্দ উচ্চারণ করে, যে সমাজ প্রযুক্তি বুঝতে বিদ্যুৎ চালিত প্রযুক্তি বোঝে, যে সমাজ মনে করে ব্রিটিশ না এলে এ বাংলা উচ্ছন্নে যেত, যে লুঠেরা হিন্দুত্ববাদী, ইসলামোফোবিক, অভদ্রলোকবিরোধী, মহিলাবিদ্বেষী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সহযোগী হয়, সেই জাতিরাষ্ট্রীয় ভদ্রবিত্ত সমাজের সঙ্গে শিক্ষা বিষয়ে কোন রকম বিতর্কে যাওয়াই ঝঞ্ঝাটের এবং সেই সমাজের বোধ বুদ্ধি, উদ্দেশ্য বিধেয় নিয়েই প্রশ্ন ওঠা দরকার। তার আর উপনিবেশের তৈরি করে দেওয়া যুক্তি কাঠামোর বাইরে বেরোনোর সাধ্য নেই। সে একদা পালক ইওরোপবিদ্য ধারনাকেই ধ্রুব ধরে তুমুল বিতর্ক, কুতর্কে লিপ্ত হয়। তবুও এ বিষয়ে কিছু কথা বলতে মন চাইছে, কিছুটা অন্তরের তাড়নায় আর কিছুটা ছোটলোকেদের দৃষ্টিতে বর্তমান পড়াশোনা চাকরি ইত্যাদি পাওয়ার চেষ্টা এবং তার প্রতিষেধক হিসেবে কারিগর অর্থনীতিকে দেখছি সেটি জানানো দরকার বলে মনে হয়েছে, তাই।
এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, সদ্য প্রয়াত কারিগর শ্রেষ্ঠ, সংগঠক মধুমঙ্গল মালাকারের সক্রিয় উদ্যমে ৫ বছর আগে কারিগরদের সংগঠন বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ কারিগরি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করেছিল। সেটি আপাতত ঠাণ্ডা ঘরে পড়ে আছে।
আমরা যারা শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান-আদিবাসী নির্ভর বাংলার জ্ঞান দক্ষতা পরম্পরা নির্ভর কারিগরি উৎপাদন ব্যবস্থা জানা বোঝা বোঝানোর ছাত্র, তারা এই চাকরিবিহীন ঔপনিবেশিক মনমোহনী-মোদি উন্নয়নের যাঁতাকলে পড়া প্রাথমিকভাবে চাকরিমুখী ভদ্র সমাজকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি, মেকলের আগেই ব্রিটিশ উপনিবেশ লুঠের সাম্রাজ্য ব্যবস্থাপনার জন্যে যে ভদ্র-ঔপনিবেশিক সমাজনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়, সেই লুঠ চলা সত্ত্বেও কেন ডিজিটাল পুঁজি করোনার বাহানায় ভদ্রবিত্তের কোটি কোটি চাকরি খেয়ে নিচ্ছে। অথচ কর্পোরেটের লুঠত লাভের পরিমান লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কর্পোরেট ডিজিটাল পুঁজি জানে নতুন সময়ে তার লুঠ ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্যে আজ আর মধ্যবিত্ত ছানাপোনার দক্ষতা প্রয়োজন নেই, একটা ৫০০ কোটির কারখানা চালাতে ৫০ জনও লাগে না। ব্যাঙ্কে করণিকের কেদারার পরিমান কমছে, টাকা দেওয়ার কাউন্টার প্রায়ভ্যানিশ, শাখায় করণিক-আধিকারিকের সংখ্যা কমছে গুণোত্তর প্রগতিতে। একজন নামকা ওয়াস্তে ছোটলোক সমাজের নিরাপত্তারক্ষী নামক মানুষকে ঠুঁটো জগন্নাথ সাজিয়ে রেখে না রেখে, টাকা দেওয়ার নেওয়ার যন্ত্রকে ঝুঁটি ধরে এটিএম নাম দিয়ে রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়েছে কর্পোরেট – যে ব্যবস্থাটি ব্যাঙ্কে একদা জালে ঘেরা সুরক্ষিত থাকত। ব্যাঙ্কে ভদ্রবিত্তের ছানাপোনাদের চাকরি পাওয়া তো দূরস্থান, তার জমা টাকা রাস্তার মোড়ে নির্মোক অবস্থায় রক্ষীবিহীন হয়ে পড়ে আছে। ভদ্রবিত্তকে বোঝানো হয়েছে টাকা তোলার নাকি এটাই সব থেকে ভাল রাস্তা, এটাই উন্নয়ন। অথচ মাত্র ৫০ বছর আগে ইন্দিরা গান্ধি ব্যাঙ্ক, কয়লা খনি, তেল কোম্পানি জাতীয়করণের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত পোষণ এবং কর্পোরেট লুণ্ঠনের তোষনীয় ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিলেন।
ডিজিটাল কর্পোরেটরা জানে কোভিদ তাদের স্বার্থপূরণ করছে – কোভিদ তাদের স্বার্থ দেখছে না তারাই নিজের স্বার্থ পূরণে কোভিদ লেলিয়ে দিয়েছে সে বিতর্কে না ঢুকে বলতে পারি কোভিদ ভদ্রবিত্তের চাকরির মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে। ভদ্রবিত্তকে কর্পোরেট যোগ্য করার জন্যে প্রাথমিক শ্রেণী থেকে স্নাতক পর্যন্ত চাষী কারিগর হকারদের দেয় ট্যাক্সে পড়িয়ে উচ্চতমশিক্ষায় তাদের পকেট কাটার যে কল বানিয়ে রেখেছে কর্পোরেট, সেই শিক্ষাই আর কাজে লাগবে না। কারন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স। চাকরি এখন শস্তার বাড়ি বসে গিগ ইকনমির। হাতেগোণা ব্যবস্থাপনার কাজ, কিছু গবেষণার কাজ ছাড়া সামগ্রিক কর্পোরেট চাকরি দালালিতে ভদ্রবিত্ত সত্যকারের উদ্বৃত্ত। কর্পোরেট জানে সে কী চাইছে।
কিন্তু ভদ্রবিত্তের মন রাখার জন্যে ইওরোপ কর্পোরেটদের উচ্চট্যাক্স বসাবার কথা ভাবছে। কিন্তু টেবলের তলায় ইন্সেন্টিভ, বেলআউটের নামে কোটি কোটি ডলার কর্পোরেটের সিন্দুকে জমা হয় – সে খবর ভদ্রবিত্ত রাখে? রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই কর্পোরেট চালিত। রাষ্ট্র, কর্পোরেট নির্ভর বলেই, কর্পোরেটরা আজ লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা কর বকেয়া রাখে। বকেয়া সহজে মকুবও হয় প্রগতির দোহাই দিয়ে। একই সঙ্গে শিল্পপতি নামক লুঠেরারা ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা মেরে ইওরোপ আমেরিকা আফ্রিকায় পালিয়ে যায় রাষ্ট্র পোষিত নানান রক্ষা কবচকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। এই গোটা ব্যবস্থাটাই পরিচালিত হয় কর্পোরেটিয় ঔপনিবেশিক মেকলিয় শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিতে – যে শিক্ষার মৌল উদ্দেশ্য যে কোন উপায়ে ইওরোপ আমেরিকার অর্থনীতির সশক্তিকরণ করা।
এমতাবস্থায় ১৯৯২ পরবর্তী সময়ে কি মেকলিয় লুঠেরাদের সাহায্যকারী ভদ্রবিত্তের চাকরির দালালি ব্যবস্থার ক্রমান্বয়ে পতন ঘটছে না? ইউপিএ, এনডিএ উভয়েই বিশাল অর্থনৈতিক প্রগতির দাবি করে, কিন্তু চাকরি তৈরির পরিবেশ তৈরি হয় না, চাকরির বৃদ্ধি ঋণাত্মকসূচকে দাঁড়ায়। অথচ ভদ্রবিত্ত, তাঁদের শিক্ষা তাত্ত্বিক, তাঁদের শিক্ষা ঐতিহাসিক, সাংবাদিককুল ব্যস্ত এবং আঁকড়ে পড়ে আছেন মেকলিয় পড়াশোনার কাঠামো বিশ্লেষণে – তারা খুব বেশি হলে টুকটাক বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন সাধনে তৎপর। আগেই বলা গিয়েছে এই ব্যবস্থাটি তৈরি হয়ে ছিল মূলত বড় পুঁজি বিনিয়োগ নির্ভর করে, ইওরোপিয় লুঠেরা কর্পোরেট জ্ঞানচর্চা নির্ভর পড়াশোনার জগতে, যার উদ্দেশ্য লুঠের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থাপক আর করণিক তৈরি করা। যে শিক্ষিতদের কাজ নানান ছেঁদো প্রগতির যুক্তি সাজিয়ে ইওরোপ, আমেরিকার পুষ্টি সাধন এবং নিজের দেশে ইওরোপ আমেরিকার জীবনযাত্রার শেকড় যতটা পারা যায় রোপন করা। ইওরোপিয়রা শিল্পায়নের(যাকে প্রগতিশীলেরা, সুশীলেরা, বামেরা, মার্ক্সীয়রা শিল্প বিপ্লব বলতে ভালবাসে) প্রথম দিন থেকেই নিজেদের দেশের চাষা আর পশুপালক আর কারিগরদের প্রায় বিনামূল্যের বিপুল বিশাল কারখানার শ্রমিক অর্থাৎ দাস বানিয়ে ফেলেছে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর শ্রম প্রতিস্থাপনের দিকে নজর দেওয়া বড় পুঁজি বিপুল শ্রম প্রতিস্থাপনকারী যন্ত্র আবিষ্কার করে, উচ্ছেদ হওয়া চাষী কারিগর আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে বেরোনো “শিক্ষিত” ভদ্রবিত্তদের চাকরি দেওয়ার জন্যে। হাস্যকর হল এই শ্রম প্রতিস্থাপনকে ভদ্রবিত্ত আর কর্পোরেট বড় গলায় প্রগতি আখ্যা দিয়েছে এবং আগামী দিনে এই শ্রম প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি তার চূড়ান্ত রূপ এআই প্রয়োগের দিকে আরও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে যন্ত্র চালাবার মানুষই আর লাগবে না। এটাও ঠিক আপনারা নিতান্তই অল্পাংশ ছোটলোক চাষা বা কারিগরদের গাঁইয়াদের একরোখো কিছু সন্তানকে মেকলিয় মগজধোলাই করে প্রশাসনিকস্তরে নিয়ে এসে বড় পুঁজির খাদ্য দিতে চাষা আর কারিগর উচ্ছেদের কাজ করিয়ে নিতে পারেন। সেই দক্ষতা আপনাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে – এবং এ বাবদে আপনারা ঔপনিবেশিকদের থেকেও এক কাঠি সরেস এবং উপযুক্ত গুরুমারা বিদ্যাও আয়ত্ত করেছেন। কিন্তু তাতেও বড় পুঁজির কত্তাদের মন ভিজছে না। আপনারা সন্তানসন্ততিদের প্রশাসনে পাঠিয়ে বড় পুঁজির পরিকল্পনায় চাষা-কারিগর-ছোটলোকেদের উচ্ছেদ করছেন, অন্যদিকে আপনাদের সন্তানসন্ততিদের চাকরিবাকরি সমূলে উচ্ছেদ করে দিতে উদ্যমী কর্পোরেট প্রণোদিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা। তাই দাদারা দিদিরা, বড় পুঁজির দালালি(কনসালট্যান্সি বললে হয়ত শোনায় ভাল) চাকরি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকে কি নিয়ে নতুন করে নাড়াচাড়া করা দরকার নেই? (আগামীকাল সমাপ্ত)