ইমাজিনারি ওমিক্রন দুয়ারে কড়া নাড়ছে। করোনার প্রশাসনিক হুমকি এখনও যায় নি। আপনার দেহের সুরক্ষা বাড়ানো জরুরি। মাছের টক আপনাকে এই কাজে অসামান্য সাহায্য করতে পারে।
মেদিনীপুরের সমুদ্রে উপকূলে মাছের/নিরামিষ টক প্রায় সব বাড়ির রোজ দিনের সেব্য। টক হয় তেঁতুল, কাঁচা আম বা আমসি দিয়ে। গরমে আমিষ বা নিরামিষ টক শুধু উপাদেয়ই নয়, শরীর রক্ষায় এর কোনও জুড়ি নেই।
মেদিনীপুর (বর্তমানে পূর্ব উপসর্গ যুক্ত) অঞ্চলের উপকূলে গরমে কাঁচা আম, বাড়িতে রাখা ন্যুনতম এক/দেড় বছরের পুরোনো তেঁতুল, বা আগের বছরের আমসি দিয়ে টক রান্না হয়।
টকে সাধারণত নানান ধরণের তরিতরকারি পড়ে — যেমন আলু, বেগুণ, লাউ, সজনে ডাঁটা, কচু, ঢেঁড়স, ইত্যাদি। আপনার টক যা খেতে মন চায় দিন।
সঙ্গে বড়ি ভেজে দিলে আরও খোলতাই হবে।
শুধু বড়ি দিয়েও খোলতাই টক হয়। তবে সেটা আমচুর [শুকনো আম] দিয়ে ভাল হয়।

প্রক্রিয়া
মাছ কাটা
মাথা আর লেজা বাদ দিয়ে মাছ মাঝারি আকারে কেটে নুন মাখিয়ে সাঁতলে রাখুন, বেশি ভাজবেন না। পাঙ্গাসের সব থেকে বড় গুণ হল তেলতেলে, নরম, এবং সুস্বাদু। একটু হাল্কা কাদা কাদা গন্ধ হয় বলে অনেকে খান না। আমার খুবই প্রিয়। শোল যদি হয় তাহলে কাঁচা আমের সঙ্গে রাঁধুন। আম-শোল মেদিনীপুরের ডেলিকেসি।
চিংড়ি হলে কুচো চিংড়ি নিন। হাল্কা ভেজে রাখুন। তেঁতুলের টকের সঙ্গে যায়।
ইচ্ছে হলে পোস্তবাটা দিন। আমি খুবই পছন্দ করি। তবে সেটা কাঁচা আমের সঙ্গে হতে হবে। এতে তরকারি ঘণ হয়। মাঝেমধ্যে এই প্রক্রিয়ায় রান্না করে দেখতে পারেন।
টকের মূল উপকরণ
আম দিয়ে যদি টক খেতে চান কাঁচা আম ফালি করে কাটুন। ছাল রাখা না রাখা আপনার অভিরুচি। আমি টকে ছাল খেতে ভালবাসি, যদি না খুব মোটা হয়।
তেঁতুল হলে এক খাবলা নিয়ে কাপে ভিজিয়ে চটকে চটকে কাথ বার করে কাই দানাগুলি বার করে ফেলে দিন। দুএকবার খেতে খেতে বুঝে যাবেন যতটা টক আপনি পছন্দ করেন, তার জন্যে কত তেঁতুল লাগবে।
আমসি হলে শুধু জলে ডুবিয়ে রাখুন।

তরকারি কাটা
আলু, কচু কাটুন একটু মোটা চাকা চাকা করে।
ঢেঁড়স কাটুন ডুমো ডুমো করে।
লাউ হলে এক দেড় ইঞ্চির আকারে।
ডাঁটা আঙ্গুল প্রমান, বেগুন ফালি করে।
এগুলো সাঁতলে নিতে পারেন, নাও পারেন।
টকে দুতিন রকম তরকারি দিন। মাঝে মধ্যে কম্বিনেশন বদলান।
রান্না
উনুনে কড়া বসিয়ে স্বাদ মত সরষের তেল দিন। তেল বেশ গরম হলে এক চামচে সরষে ফোড়ন দিন, সঙ্গে দুচারটে শুকনো লঙ্কা নিন। নাড়াচাড়া করতে থাকুন।ক্রমশঃ সরষে ফুটে করার বাইরে বার হয়ে আসতে থাকলে জল ঢেলে দিন চার পাঁচ কাপ। আমি টকের জল খেতে ভাল বাসি, জল একটু বেশিই দিই। হলুদ দিন। দেখবেন সরষেগুলো আর তেল জলে ভেসে উঠেছে।
জল ফুটলে সাঁতলানো/না-সাঁতলানো তরকারি দিন।
পোস্তবাটা যদি দিতে ইচ্ছে করে দিন। তরকারি ঘণ হবে।
টকের জন্যে বরাদ্দ আম/তেঁতুল/আমসি দিন।স্বাদ মত নুন দিন।
এবারে মাছ দিয়ে গরমে ফোটাতে থাকুন।
মিনিট ১৫/২০ ফুটলে তরকারি মাছ ইত্যাদি যদি সুসেদ্ধ হয়, তাহলে এক চামচে চিনি দিন (আমরা মেদিনীপুরিয়া, আমরা চিনি খাই না)। নামিয়ে বাটিতে ঢালুন।
ওপরে এক দু-চামচ কাঁচা সরিষার তেল দিন।
ঠাণ্ডা হলে ভাতের সঙ্গে শেষ পাতে খান।
অমৃত কোথায় লাগে!
নিমবেগুন
[পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করতে পারব না। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ এটা পরিষ্কার। শিশুটিকে অন্তত পৃথিবীর বাসযোগ্য করার চেষ্টা করি]
আপনার দেহের সংক্রমণ রোধের ক্ষমতা সুদৃঢ় হলেই করোনা কেন যে কোনও ভাইরাস এবং অন্যান্য জীবাণু আক্রমণ আপনি রুখতে পারবেন। আপনার দেহে মরশুমি নানান রোগ প্রতিরোধ সুরক্ষা জরুরি। বিষাক্ত তরিতরকারি এবং দানা শস্য আপনার শরীরের অমূল্য প্রতিরোধ ক্ষমতা তিলে তিলে দুর্বল করে দেয়। এর সঙ্গে রয়েছে জল, বাতাস এবং শব্দ দূষণের মধ্যে বেঁচে থাকা। মা দিদি দিদিমা আম্মা ফুফারা বহুকাল ধরে প্রাথমিক পারিবারিক স্বাস্থ্য রক্ষা করেছেন শুধুই মশলা এবং আশেপাশে গজিয়ে ওঠা দানা শস্য, ফসল, শাকপাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে। গত সপ্তাহের নিমপাতা ভাজা রান্না বলার পরে আমার মা, দিদিমার থেকে শেখা এবং রান্না করা দ্বিতীয় একটি নিমপাতা নির্ভর রান্না নিমবেগুনের কথা বলব।

উপাদান
নিমপাতা(শুকনো বা টাটকা), কাঁটা বেগুণ, আলু, সজনে ডাঁটা, পাঁচ ফোড়ন, শুকনো লঙ্কা(অনেকে পছন্দ করেন না, কারোর বাড়ি তিতোর সঙ্গে লঙ্কা খাওয়া নিষেধ আছে’ আমি সেবন করি) করকচ নুন
তরকারি কাটা
কাঁটা/সাদা/কালো বেগুণ ডুমোডুমো করে কেটে, ধুয়ে করকচ নুন মাখিয় রাখুন
আলু পছন্দ মত ডুমো ডুমো করে কেটে বা লম্বা ফালি করে কেটে(আমি লম্বাকার পছন্দ করি) হাল্কা করকচ নুন মাখিয়ে রাখুন
প্রমানাকারের সজনে ডাঁটা পাঁচটা/ছটা টুকরো করে কেটে রাখুন
প্রক্রিয়া-১
** ডুমোডুমো করে কাটা কাঁটা বেগুণ হাল্কা ভেজে রাখুন। বেগুন ভাজার সময় একটু জলের ছিটে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ভাজলে তেল কম লাগে।
** আলু লম্বা লম্বা/ডুমো ডুমো করে কেটে আধা ভাজুন।
** কাটা সজনে প্রয়োজনমত ডাঁটা সেদ্ধ করুন।

প্রক্রিয়া-২
১। আঁচ জ্বালিয়ে লোহার কড়াই বসান
২। সরষের তেল দিন
৩। তেল গরম হলে পাঁচ ফোড়ন দিন, খান দুয়েক শুকনো লঙ্কা দিন
৪।ফোড়নগুলো কালো হয়ে এলে, লঙ্কাদুটো লাল থেকে কালো হলে এক মুঠো শুকনো/টাটকা[ধোয়া] নিমপাতা দিন নাড়তে থাকুন মিনিটখানেক
৫। প্রথমে সেদ্ধ ডাঁটা দিন, নাড়তে থাকুন,
৬। ডাঁটার সোঁদা গন্ধ চলে গেলে ডাঁটায় নিমপাতা মাখামাখি হয়ে গেলে
৭। আধাসেদ্ধ আলু দিন; মিনিট দুয়েক নাড়াচাড়া করুন; আলুতে নিমপাতা মাখামাখি হয়ে গেলে
৮। আধসেদ্ধ বেগুন দিন আরও মিনিট দুয়েক নেড়ে একটি পাত্র ঢাকা দিন
৯। মাঝে মাঝে পরীক্ষা করুন সব কটা উপাদান সেদ্ধ হল কীনা
১০। যদি দেখেন ডাঁটার লম্বা আঁশগুলো ছেড়ে যাওয়ার মত বেশ নরম হয়েছে,
১১। আলু সুসেদ্ধ হয়েছে
১২। এবং বেগুনের ভেতরের ভুতিগুলি ছেড়ে যাচ্ছে বুঝবেন তরকারি আপনার তৈরি
১৩। মনে রাখবেন ভাজার সময় লবন দেবেন না কারণ আলু, বেগুনে নুন মাখিয়ে রেখেছিলেন
১৪। আঁচ বন্ধ করে গরম কড়াইতে রান্নাটা, গরম উনুনে ঢাকা দিয়ে বসিয়ে রেখেদিন আধাঘন্টা।
রান্নাটা নামিয়ে নিন একটি কাঁসার জাম বাটিতে।
প্রথম পদ হিসেবে পরিবেশন গরম ভাতে করুন।
অমৃত কাকে বলে