‘আমার যে গান তোমার পরশ পাবে
থাকে কোথায় গহন মনের ভাবে।’
দীর্ঘদিনের সুগভীর রবীন্দ্রচর্চা ব্যতীত রবীন্দ্রসংগীতের প্রেক্ষিতেতিহাস ও বাণী-বাহিত সুরের প্রকৃত অন্তর্নিহিতার্থ উপলব্ধি কতখানি সম্ভব? বিশেষত বঙ্গীয় নবপ্রজন্মের অনাগ্রহী বৃহদংশ কী রবীন্দ্রনাথের গান থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখছে? রবি ঠাকুরের কথা-সুর তাদের মনোযোগ সেভাবে আকর্ষণ করতে পারছে না? এমনকি উচ্চশিক্ষিত সংস্কৃতিবান পরিবারের ‘হুল্লাল্লা’-প্রিয় আধুনিক প্রজন্মও আকৃষ্ট হচ্ছে কৃত্রিম, যান্ত্রিক ‘মেশিন-গান’-এ!
রবীন্দ্রসংগীত যেন দুই ভুবনের গান। অর্থাৎ শ্রোতার ভুবন ও শিল্পীর ভুবন। সূক্ষ্মানুভূতিসম্পন্ন শ্রোতামাত্রের কাছেই রবীন্দ্রনাথের গান শোকের শান্তি, নৈরাশ্যের সান্ত্বনা, কর্মের উদ্দীপনা, প্রেমের প্রেরণা, বিপদের সঙ্গী। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্যি, অধিকাংশ শিল্পীই নিঃসংকোচে, নির্দ্বিধায় সমস্ত পর্যায়ের রবীন্দ্রসংগীত গাইতে অক্ষম! তাঁদের কন্ঠসামর্থ সীমিত, ‘তোলা গানের সঞ্চয়’ স্বল্প! অনেকক্ষেত্রেই উভয় ভুবনবাসীর কাছেই ২২১৩-টি রবীন্দ্রসংগীত রচনার ভিন্ন-ভিন্নতর প্রেক্ষাপট ও মর্মার্থ অ-বোধগম্য!
রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি গানের অন্তরালে রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কথা ও সুরের বয়ন-কাহিনী। তৎসাময়িক কবিমনের মানসপট, অন্তর্লোকের ভাব-কল্পজগত, বাহ্যিক ঘটনাক্রম ও অবচেতনার অভিঘাত। বহু বিশেষজ্ঞের দীর্ঘ চর্চায় তার স্বল্পাংশ অবগত হওয়া সম্ভব হয়েছে, কিছুটা তথ্যনির্ভরতায়, কিছুটা অনুমান নির্ভরতায়। তথ্য আহৃত হয়েছে তাঁর জীবনী, চিঠিপত্র, বক্তৃতা, অন্যান্য রচনা, নিকট-জনের স্মৃতিচারণ, যাপনের পরিবেশ-প্রেক্ষিতের বিশ্লেষণে। আর, এখনো বহুসংখ্যক রবি-গানের পশ্চাতেতিহাসের বৃহদংশ রয়ে গেছে অজানা!
তিনি ঠিক কী ভেবে গানের কথা রচনা করেছিলেন, ঠিক কীভাবে, কোন সুরের স্মৃতি মাথায় রেখে বা না রেখেই করেছিলেন সুরারোপ? মনোগহনে সুর ভেবে কথা রচেছেন, না গান রচনার পর সুরারোপ করেছেন? প্রকৃতপক্ষে ক্ষেত্রবিশেষে উভয় পদ্ধতিতেই রচিত হয়েছিল তাঁর ‘আপন গান’। কে বা কারা, কবির কী কী নির্দেশ মেনে রচনা করে দিয়েছিলেন স্বরলিপি? কবির দেওয়া যথাযথ ‘সুর’ মেনে সত্যিই কী রচিত হয়েছিল স্বরলিপি? না, কোনো কোনো স্বরলিপিকার রচনাকালে অল্প-স্বল্প পরিবর্তনও করেছিলেন কবির দেওয়া সুরের? কারণ, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ স্বরলিপি রচনার পদ্ধতি জানতেন না! কেন যে শিখে নেন নি? স্বরলিপি রচনা কী তাঁর কাছে মশারি টাঙানোর মতই বিরক্তিকর কাজ ছিল, তাই? তাহলে হয়তো রবীন্দ্রসংগীতের গায়ন-বিশুদ্ধতা নিয়ে এত বিতর্ক থাকতো না! বেশ কিছু গানে (১৯৪টি) স্বয়ং স্রষ্টা সুরারোপ করেছিলেন, কিন্তু শ্রুতি-গ্রাহকযন্ত্র না থাকায় এবং যথাকালে স্বরলিপি-রচনা সম্ভব হয় নি বলে, তার সুর চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে।
গীতবিতান-এর সূচিপত্রে ২২১৩-টি গানের মুদ্রিতরূপ পাওয়া যায়। ঈষৎ পাঠান্তরে পুনরাবৃত্ত গান ৯৬-টি। ওই ৯৬-টি বাদ দিলে, মোট গানের সংখ্যা দাঁড়ায় — ২১১৭-টি। তার মধ্যে সুরারোপিত সংলাপ ২০৪-টি, সেগুলি সাধারণত স্বতন্ত্রভাবে গাওয়া হয় না, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যের অন্তর্ভুক্ত। স্বরলিপিহীন গান ১৯৪-টি। স্বরলিপি-মেনে গাওয়া সম্ভব, এমন গানের সংখ্যা — ১৭১৯-টি। ৬৫-খণ্ডের স্বরবিতানে ছড়িয়ে রয়েছে তার স্বরলিপি। ভাঙাগান এর সংখ্যা — ২৪২, ব্রহ্মসংগীতের সংখ্যা — ৪৩৩। পূজা, স্বদেশ, প্রেম, প্রকৃতি, বিচিত্র এবং আনুষ্ঠানিক, এই ছয়টি পর্যায়ে কবি গানগুলি গীতবিতান সংকলনের বিষয়বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে গিয়েছেন।
এই ছয়টি পর্যায়ের উপবিভাগগুলিতে গানের সংখ্যা যথাক্রমে, — ভূমিকা (১), পূজা (৬১৭), স্বদেশ (৪৬), প্রেম (৩৯৫), প্রকৃতি (২৮৩), বিচিত্র (১৪০), আনুষ্ঠানিক (২১), গীতিনাট্য (১৯), নৃত্যনাট্য (১৬), ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী (২০), নাট্যগীতি (১৩১), জাতীয় সংগীত (১৬), পূজা ও প্রার্থনা (৮৩), আনুষ্ঠানিক সংগীত (১৭), প্রেম ও প্রকৃতি (১০১), পরিশিষ্ট (১৫) [নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’ এবং ‘পরিশোধ’ গীতিনাট্যের সুরারোপিত সংলাপ ব্যতীত, গান] পুনরাবৃত্ত গান বাদে, মোট ১৯২১টি গান। (দ্র. ‘গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার’ — পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার)
২২১৩-টি রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে আমরা এতাবৎ কাল পর্যন্ত বিভিন্ন খ্যাত-অখ্যাতনামা শিল্পীদের কন্ঠে ঘুরেফিরে সাকুল্যে দু-তিনশো রবীন্দ্রসংগীত শুনে থাকি। অবশিষ্ট গানগুলি আমরা তেমন শুনি না, কেন? যতই ‘গীতবিতান আর্কাইভ’, বা ‘একলা গীতবিতান স্বাগতালক্ষ্মী’ থাকুন না কেন? জনপ্রিয়তার বিচারে, আমাদের ব্যক্তিক আবেগ ছুঁয়ে যাওয়া ‘সহিতের ভাবের’ নিরিখে, অবশিষ্ট গান গুলির সঙ্গে আমাদের ‘নির্জন একক’ তার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি গুলি খুঁজে পায় না? না অধিকাংশ জনপ্রিয়-কন্ঠ তা গেয়ে শোনান নি বলে, সহজলভ্য নয় বলে, আমরাও উদাসীন থাকি? সাকুল্যে, গড়ে এক-ষষ্ঠমাংশ রবীন্দ্রসংগীত ঘুরেফিরে শুনলেও, ছয়টি পর্যায়ের আপাত গূঢ়-কঠিনার্থের, ব্রহ্ম ও পূজা বিষয়ক, ধীরলয়ের, উচ্চাঙ্গের আরও প্রায় চোদ্দোশো রবীন্দ্রসংগীতকে আমরা শ্রুত-বর্জিত করেই রেখেছি।
রবীন্দ্রসংগীতার্থকে ভালোভাবে বুঝতে, তার বাণীবিশ্বের অতলতা আত্মস্থ করতে, অজানা-অসীম কৌতূহল চরিতার্থ করতে, আমাদের প্রয়োজন হয়, ‘রবীন্দ্রনাথের গানের-গল্প’ জানার। অর্থাৎ, রবীন্দ্র-জীবনের গতিপ্রকৃতি, শোক-তাপ, ভৌগোলিক অবস্থান, মনোজগতের ছানবিন, ঋতুকাল, তাঁর পড়া-শোনার ব্যাপ্তি, সুর ও সংগীতের শ্রবণ-স্মৃতি, তৎকালীন ম্যুড, নির্দিষ্ট গান রচনার তাগিদ, উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা — এ সমস্তই প্রকৃত মননশীল শ্রোতা ও গায়কের জিজ্ঞাস্য হতে পারে, রবীন্দ্রসংগীত-সুধাপ্রেমীদের কাছেও তা আন্তরিক জ্ঞাতব্যের বিষয়।
এযাবৎ প্রকাশিত রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক পাঁচ-শতাধিক গ্রন্থ এবং সহস্রাধিক প্রবন্ধে রবি ঠাকুরের শ-তিনেক গানের অন্তরাল-কাহিনি জানা গেলেও, অধিকাংশই এখনো অজানা! আর ভবিষ্যতে কোনও দিন তা যথাযথভাবে জ্ঞাত হবে বলে মনে হয় না! কিয়দংশ রবি-গানের রচনা-প্রেক্ষিত ও অন্তর্নিহিতার্থ সাধারণের আয়ত্তাধীন ও বোধগম্য হলেও, বঙ্গভাষী শ্রোতৃমণ্ডলীর বৃহদংশের কাছেই তা অনধিগম্য!
মধ্যবিত্ত শিক্ষিত রুচিসম্পন্ন বাঙালিদের একাংশের কাছে রবীন্দ্রসংগীত আজ অতি প্রিয়, শ্রদ্ধেয়, সর্বদা স্মরণীয়। জীবনের নানা ওঠা-পড়ায় আনন্দ-বিষাদে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজনে অবশ্য ব্যবহার্য সম্পদ। যে কোনো সংগীতের রসপিপাসুদের মধ্যেই রসবোধ, রসগ্রহণ, রুচিভেদ, বুদ্ধি-বিবেচনা, শিক্ষা ও গ্রহণ-সামর্থের বিচারে শ্রেণিবিভাজন অনিবার্য! রাবীন্দ্রিক কথা-সুর ও শিল্পীকন্ঠের সুদূরপ্রসারী অভিঘাত তাই সর্বস্তরের শ্রোতার কাছে সমানুভবের নয়!
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানের এবং নবপ্রজন্মের তথাকথিত রবীন্দ্রসংগীত-প্রেমী বৃহদংশের শ্রোতা; এমনকি শিল্পী-গায়ক, শ্রুত ও গেয়-সংগীতের প্রেক্ষিতেতিহাস সম্পর্কে উদাসীন, রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গান-এর নিহিতার্থ উপলব্ধি করতে অপারগ, এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক গবেষণাধর্মী গ্রন্থপাঠেও অনাগ্রহী! তাহলে কী এবার এই কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তার চ্যাট-বট-এর যন্ত্রযুগে, একালের রবীন্দ্রসংগীত-বিশেষজ্ঞদের ‘সহজে রবীন্দ্রসংগীত বোঝার মেড-ইজি’ লেখার সময় এসে গেছে? মূলত রবীন্দ্রসংগীতে ডিগ্রি প্রত্যাশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রায় ‘মেড-ইজি-তুল্য নোটবই’ গোছের দু-একটি বই যে লেখা হয় নি, তা নয়! সৌভাগ্য, তা বেশি লোকের হাতে পৌঁছনোর আগেই; বাজার থেকে চৌপাট হয়ে গেছে! রবীন্দ্রনাথের জীবনেতিহাস, রচিত সাহিত্যের প্রেক্ষিতেতিহাস, কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত না জেনে, শুধু গুটিকয় রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে-শুনেই ঘাড় নাড়তে নাড়তে রবীন্দ্রসংগীতের সমঝদার বোদ্ধা হওয়া সম্ভব? আর, গায়িয়েরাও বলিহারি! একশো গান না ‘তুলেই’, কোনো কোনো রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ‘প্রখ্যাত’ তকমা লাগিয়ে নিচ্ছেন! তাঁর কাছে যে আরও দু-হাজার রবিবাবুর গান অনায়ত্ত রয়ে গেল, তা সম্পূর্ণ চেপে গিয়েই শ্রোতাদের হাততালি কুড়োচ্ছেন! শ্রোতৃবৃন্দও তথৈবচ!
‘গীতালি’র একটি অনুষ্ঠানে প্রফুল্লচন্দ্র মহলানবিশকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন —
“আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়তো আছে — তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি — তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য।” (সংগীতচিন্তা। গীতালি। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কপিরাইট উঠে যাওয়ার পর কীভাবে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গানকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তার অনেকগুলি প্রমাণ রয়েছে অনতিঅতীতের কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রে, ব্যাণ্ডের সিডিতে, ‘বাংলা-বম্বে-খ্যাত’ গায়কের এলবামে। স্রষ্টার অবর্তমানে, তাঁর বিনা অনুমোদনে চারটি কবিতায় সুরারোপ করেছেন এক বিখ্যাত কন্ঠের অধিকারী! স্বয়ং কবি যা কোনও দিন অনুমোদন করতেন বলে মনে হয় না! আবার সেই খ্যাতকণ্ঠ ভুল কথায় রেকর্ড করেছেন ‘যখন ভাঙল মিলন মেলা’ গানটি! রবীন্দ্র-গানের তথাকথিত স্বঘোষিত বোদ্ধা-গাইয়ের কন্ঠে বিকৃতি! এমনই তার অবক্ষয়! মেনে নিতে কষ্ট হয়। সময় এসেছে, নিজেদের সংশোধন করে নেওয়ার।
প্রতিটি শ্রুত-রবীন্দ্রসংগীতের যথাযথ প্রেক্ষিতেতিহাস ও গূঢ়-নিহিতার্থ না জেনেই হয়তো রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া যায়, গান শোনা যায়, ঠিকই! কিন্তু অনুভূতিলোকে সবটা হৃদয়ঙ্গম করা যায় কী? অথবা সমস্ত ব্যঞ্জনাময় তাৎপর্য, রাগ-সুর-তাল-এর ব্যাকরণ জেনে, গানের বাণীর অন্তর্নিহিতার্থ কী আদৌ সাধারণের পক্ষে উপলব্ধি সম্ভব? আমাদের এই জানা-না জানায়, বোঝা না-বোঝার অর্ধ-উপলব্ধিতেই কেটে যাবে জীবন! সুর ও বাণীর নব নব উপলব্ধ-ব্যঞ্জনা যুগে যুগে কালে কালে, ব্যক্তিভেদে, বয়সান্তরে ভিন্ন-ভিন্নতর অর্থোপলব্ধি বয়ে আনবে আমাদের অন্তরমহলে।
শুভাশিস মণ্ডল, সহ শিক্ষক (বাংলা), কসবা চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল, কসবা, কলকাতা
শ্রুতি নয়, দৃষ্টি। ভাবনা নয়, উল্লাস। ব্যক্তি নয়, সমষ্টি। একান্ত নয়, সর্বজনীন। ইহাই জনগণের প্রবনতা। রবীন্দ্রনাথ তাহারই অন্তর্গত।
তা হয়তো ঠিক! সে জন্যই তাঁর গান ‘নির্জন এককের’! সবক্ষেত্রে সমষ্টির নয়। পরমান্নের স্বাদ উনিশ-বিশ ব্যষ্টির কাছে এক হতে পারে, রবীন্দ্রসংগীতের স্বাদ সমষ্টির কাছে এক নয়! ‘সত্য যে কঠিন’!
অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সত্য তুলে ধরা হয়েছে। এখন কোনো তরুণ প্রজন্মের যুবক যুবতীকে প্রশ্ন করলে তারা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিনয় রায় অথবা মালতী ঘোষালের নামই বলতেই পারে না। আর কয়েকটা বাঁধাধরা বহুলপ্রচলিত গান অনবরত শিল্পীরা পরিবেশন করে চলেছেন যুগরুচি ও চাহিদাকে মান্যতা দিয়ে। কোনো কঠিন ধ্রুপদ অঙ্গের বা টপ্পাঙ্গের গান দৈবাৎ কোনো শিল্পী পরম্পরা মেনে পরিবেশন করতে চাইলেই তাঁর কপালে বিশেষ কোনো প্রাপ্তিযোগ ঘটে না। আসলে সস্তা জিনিসের ঝাঁঝ বেশি। তাই মূল ধারার রবীন্দ্রসংগীত ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বিকৃতির পথও প্রশস্ত হচ্ছে।
‘বেপথু’দের রবীন্দ্রানুগ পথে ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেজন্য অপ্রিয় সত্য বলতে হবে, কাউকে কাউকে…
এক কঠিন সময়ের মধ্যে আমরা আছি এখন। ঠিক-বেঠিক-এর ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে অতি দ্রুত। মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের সময়কালে কবিগুরুকে সঠিকভাবে সটীক উপস্থাপন দরকার। মনের আনন্দে আপনমনে যিনি গান তাঁর ক্ষেত্রে এই ঠিকভুলের মাপকাঠি প্রযোজ্য নয়। কিন্তু যাঁরা জনসমক্ষে শিল্পী পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে খেয়ালখুশি মতো গান, তাঁদেরকে বয়কট করা উচিত। কিন্তু কেই বা এগিয়ে আসবে! যা চলছে চারপাশে!
এজন্য শুধু দু-দশটি রবীন্দ্রসংগীত ‘তুলে’ই রেকর্ড করে ফেললে চলবে না! আর, স্টেজ পেলেই গাওয়া চলবে না!
তার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক বিস্তারিত পড়াশোনাও প্রয়োজন, গায়ক এবং শ্রোতা উভয়েরই। তবেই কিছুটা ‘প্রকৃত উপলব্ধি’ সম্ভব।
সঠিক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু বর্তমানে যুব সমাজের কাছে জীবনের মূল্যবোধ একেবারে পাল্টে গেছে। তাই তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনদর্শন বুঝতে অপারগ। আর সংকলন প্রকাশ করেন যাঁরা, রেকর্ড করেন যারা, শিল্পীদেরও আরও সচেতনতার প্রয়োজন। গানগুলো বিক্রিত না করে আধুনিক শ্রোতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন করা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন আবশ্যক।
রবীন্দ্র-জীবনদর্শন, তাঁর সংগীত, তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ডের প্রকৃত বিদগ্ধ ব্যাখ্যাতাদের আরও সক্রিয় হয়ে, সঠিক পথে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভাবতে সাহায্য করতে হবে। ক্রমাগত নানান উপায়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রবীন্দ্রভাবধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ রুচির মানসিকতা গঠনে, বাঁচিয়ে রাখতে হবে।