বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন নিয়ে সাধারণবিত্ত সংসারী বাঙালী বরাবরই একটু বিপন্ন, একটু বিব্রত বোধ করে। কারণটা হলো গিফট্ বাছাই। এখন অবশ্য ব্যাপারটা অনেকটাই সরল হয়ে গেছে গিফট্ কার্ড, গিফট্ কুপন ইত্যাদির সুবাদে। কিন্তু চার পাঁচ দশক আগে, যখন গিফট্ নয়, উপহার দেওয়ার চল ছিল, তখন ব্যাপারটা মোটেও অত সরল ছিল না। বিয়ের নেমন্তন্ন পেলে প্রথমেই একটা অধিবেশন বসত। নিমন্ত্রিতের সঙ্গে নিমন্ত্রণকারীর সম্পর্কটা কতটা কাছের বা কতটা দূরের তার চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করা হতো। সেটার একটা সমাধানে পৌঁছলে, তারপর শুরু হতো আলোচনা- তর্ক- বিতর্ক— মতানৈক্য-মনোমালিন্যের এক ‘মেগা সিরিয়াল’, উপহার সামগ্রী নির্বাচন করা নিয়ে।
নির্বাচনের সেই ঝোড়ো পর্বে উপহারের প্রার্থী হিসেবে উঠে আসত গয়নাগাটি, শাড়ি ঘড়ি, বাসনকোসন, ঘরকন্না ,ঘর সাজানোর খুঁটিনাটি, হরেক কিসিমের সামগ্রী। তার মধ্যে থাকতো বই। হ্যাঁ, বিয়েবাড়ির উপহারের ঝুড়িতে বইও থাকত।

বিয়ের নেমন্তন্নে যাঁরা বই দিতেন, তাঁদের মোটামুটি দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যেত। একটা শ্রেণী ছিলেন, যাঁরা সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা-টর্চা করতেন। এঁরা উপহার হিসেবে পছন্দ করতেন বঙ্কিমবাবু, রবিবাবু, শরৎবাবু (তখন এই নামেই তাঁরা বেশী পরিচিত বা উল্লিখিত হতেন) প্রমূখের লেখা উপন্যাস, কবিতা, গল্প-সংকলন। নববধূ উপহার পেতেন বঙ্কিমবাবুর দুর্গেশনন্দিনী বা কপালকুণ্ডলা, রবিবাবুর শেষের কবিতা বা দীপিকা ইত্যাদি।
আরেক শ্রেণীর উপহারদাতা ছিলেন যাঁরা সাহিত্যের অত খোঁজখবর রাখতেন না। সেসময়ে বিয়ের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য যেসব বই বাজারে জনপ্রিয় ছিল, সেগুলির মধ্যে থেকেই বেছে-বুঝে নিতেন নিজেদের সামর্থ্য ও রুচি অনুসারে। উপহারের বইয়ের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় ছিল প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর লেখা উপন্যাসগুলি। তাঁর ভাঙাগড়া, ব্রতচারিণী, মহীয়সী নারী, ব্যথিতা ধরিত্রী, বিজিতা প্রভৃতি উপন্যাসগুলির বিয়ের বাজারে খুব চাহিদা ছিল। ভারতবর্ষ পত্রিকায় তাঁর বিয়ের উপহারের উপন্যাসের বিজ্ঞাপন বেরোত।
যেসব উপন্যাসের চাহিদা বিয়ের বাজারে তালিকার শীর্ষে ছিল, সেগুলির নামগুলি ছিল লক্ষ্যণীয়ভাবে আকর্ষণীয়। যেমন, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ছিনিমিনি’, নারায়ণ ভট্টাচার্যের ‘অভিমান’, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রূপের ফাঁদ’। আজ থেকে সত্তর আশী বছর আগে মহিলা মহলে অনুরূপা দেবীর বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। বিয়ের আসরে তাঁর ‘পথের সাথী’ বা ‘বাগদত্তা’ উপন্যাসের ভালোই কাটতি ছিল।

সেসব দিনের বিয়েতে খোঁপায় জড়ানো রজনীগন্ধা জুঁইয়ের মালার সৌরভ, খোঁপা বিলাসিনীদের বেনারসী শাড়ীর মৃদু খসখস ধ্বনি , সানাইয়ের পোঁ , কান্তা প্রিয়া সেন্টের চড়া সুবাস- এইসবের সঙ্গে দিব্যি মিলেমিশে যেত উপহারের স্তূপের মধ্যে রঙীন মোড়কে মোড়া উপহারের নতুন বই। নতুন কনে বা তাঁর উৎসুক কোন ননদিনী রাশি রাশি এটা সেটা ছোট বড়ো নানান উপহারের মোড়ক খুলতে খুলতে আবিষ্কার করতেন কোন প্রিয়জনের দেওয়া ‘মধুযামিনী’ কিংবা ‘স্ত্রী’। প্রথমটি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস, দ্বিতীয়টি অনুরূপা দেবীর। কোন অলস দুপুরের বিরল অবসরে নববধূ পিঠে খোলা চুল এলিয়ে সাগ্রহে পড়তো কোন পরিচিতজন বা স্বল্প পরিচিত কারোর উপহার দিয়ে যাওয়া মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জানি তুমি আসবে’। নববিবাহিতার তরুণী হৃদয় উদ্বেলিত হতো সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের ‘শুক্লবসনা সুন্দরী’, বা ‘তোমায় আমি ভালবাসি’ পড়ে। কেউ হয়তো তাঁর বন্ধু অথবা বান্ধবীর হাতে বিয়ের উপহার তুলে দিতেন প্রবোধ কুমার সান্যালের ‘প্রিয় বান্ধবী’, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘বিজয়িনী’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দম্পতি’ কিংবা প্রতিভা বসু বুদ্ধদেব বসুর ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ বইটি নবদম্পতির হাতে তুলে দিয়ে বেশ রোম্যান্টিকতা আনতেন কোন কোন নিমন্ত্রিত।
যে সব উপহারদাতা একটু রক্ষণশীল, তাঁদের কাছে প্রেমের উপন্যাসের থেকে অগ্রাধিকার পেত ব্রতকথা জাতীয় বই। এই ধরনের বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ‘ভারতের নারী’, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মেয়েদের ব্রতকথা’, পরমেশপ্রসন্ন রায়ের সংকলিত ‘মেয়েলী ব্রত ও কথা’। একটা সমস্যা অবশ্য মাঝে মাঝে হতো, হয়তো দেখা যেত যে একই বই দুখানা পাওয়া গেছে।
অনেক প্রকাশকের মতো দেব সাহিত্য কুটীর থেকেও এই ধরনের বই অনেক প্রকাশিত হতো, বিজ্ঞাপনে যেগুলিকে উল্লেখ করা হত— ‘মধু যামিনীর শ্রেষ্ঠ উপহার’।
ছয় সাত দশক আগে উপহারের বইগুলির দাম কত ছিল, তা জানার কৌতূহল এখনকার পাঠকের থাকা স্বাভাবিক।তাই দুই একখানার মূল্যের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ১৯৪৮ সালে বৃন্দাবন ধর বুক হাউস থেকে প্রকাশিত ‘বিজয়িনী’ বইটির মূল্য ছিল দুই টাকা। ১৯৫৭ সালে মডার্ন বুক এজেন্সীর ‘ভারতের নারী’ বইটি দুই টাকাতেই পাওয়া যেত। দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘হে মোর মানসী’ আর প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর লেখা ‘ঘরের লক্ষী’ বইয়ের দাম ছিল পাঁচ টাকা। সেসময়ের প্রখ্যাত প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স থেকে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত ‘প্রিয় বান্ধবী’ বইটির মূল্য ছিল তিন টাকা। এগুলি সবই ছিল ‘হার্ড বাউন্ড’ বই, মলাটে রঙীন ছবি দেওয়া।
তৎকালীন প্রখ্যাত কোন কোন প্রকাশক উপহারের বইয়ের ডিলুক্স সংস্করণ প্রকাশ করতেন। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স থেকে শরৎচন্দ্রের অনেক বইয়ের শোভন সংস্করণ প্রকাশিত হতো, যেগুলির উপহার হিসেবে ভালো চাহিদা ছিল , বিশেষ করে স্বচ্ছল পরিবারের কাছে।

তখন একটা চল ছিল, বইতে ফুলপাতার অলংকরণ করা ‘উপহার’ লেখা আলাদা একটা পাতা থাকত। সেখানে প্রাপকের নাম লিখে উপহারদাতা তাঁর নাম স্বাক্ষর করে দিতেন। কবিত্ব করে কেউ কেউ সেখানে ঝর্ণা কলমের কালিতে লিখতেন— বিদায় বেলায় এই মিনতি মনে রেখো ভাই,/চলার পথে তোমার মতো বন্ধু যেন পাই।
তবে বেশীর ভাগই গতানুগতিক বাঁধাধরা গৎ লিখতেন, ‘অমুকের শুভ পরিণয় উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা অথবা আশীর্ব্বাদ সহ’।
মধুযামিনীর উপহার এর বাজার পাওয়ার জন্যে অনেক সুযোগসন্ধানী অনামী নতুন লেখকও তাঁদের উপহার মার্কা প্রেমের উপন্যাস নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতেন। কোন কোন প্রকাশক জনপ্রিয় লেখক-লেখিকার একই নামের আনকোরা কোন লেখকের সস্তা লেখা ছাপিয়ে লক্ষ্মীলাভের সুযোগ খুঁজতেন। এই নকলের জ্বালায় বিব্রত হয়ে সেকালের জনপ্রিয় লেখিকা প্রভাবতী দেবী সরস্বতীকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়েছিল, ‘ইদানীংকালে বাজারে আমার নাম নকল করিয়া বহু উপন্যাস ও অন্যান্য রচনা প্রকাশিত হইতেছে। পাঠক-পাঠিকা, প্রকাশক ও পৃষ্ঠপোষকগণের অবগতির জন্য তাঁহাদের আমি জানাইতেছি, আমার লিখিত উপন্যাস ও অন্যান্য রচনাদিতে আমার নাম সহি করা থাকিবে। যাহাতে তাঁহারা সতর্ক হইতে পারিবেন’।
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। কালের প্রবাহে পুরোন দশকগুলি মহাকালের মহাসমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। নতুন যুগে নতুন রুচির সঙ্গে তাল রেখে ‘বিয়েবাড়ি’ ব্যাপারটিরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উপহার হিসেবে একদা সমাদৃত বিগত সময়ের সাহিত্যের পাতাগুলিও মলিন, বিবর্ণ হয়ে গেছে। প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, অনুরূপা দেবী, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জলধর সেন প্রভৃতি যে সমস্ত সাহিত্যিকদের যে সকল রচনার এক সময়ে বিয়ের আসরে এত সমাদর ছিল, আজ সেসবই বিস্মৃত, অনাদৃত। আধুনিক বিয়ের “গিফট বাস্কেট” থেকে বই নির্বাসিত। উপহারের বই এখন স্মৃতির সংগ্রহশালায়।
সঙ্গে দেওয়া বইয়ের ছবিগুলো সবই আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। বইগুলি আমার মা সাত দশক আগে তাঁর বিয়েতে উপহার পেয়েছিলেন।
তথ্যসাহায্য : বিস্মৃত এক সরস্বতী (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ আগস্ট ২০১৯)