বছর শেষ হলে লোকসভা ভোট, তার আগে যে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোট; তার মধ্যে মধ্যপ্রদেশ অন্যতম। শুক্রবার মধ্যপ্রদেশের ২৩০টি আসন ছাড়াও ছত্তিশগড়ের দ্বিতীয় দফার ৭০ আসনে ভোট হল। এদিনের ভোটে দুই রাজ্যেই ছিল কংগ্রেস বনাম বিজেপি, যুযুঝান দুই পক্ষের লড়াই। মধ্যপ্রদেশে ভোটের লড়াইতে বিজেপি নিজেদের গদি ধরে রাখতে সক্ষম হয় কিনা আর ছত্তিশগড় থেকে কংগ্রেসকে হঠাতে পারে কিনা সেদিকেই গোটা দেশ তাকিয়ে। মধ্যপ্রদেশে ২৩০ টি বিধানসভা আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৫.৬ কোটি, তার মধ্যে ২.৮৮ কোটি পুরুষ ও ২.৭২ কোটি মহিলা ভোটার। তার মানে এ রাজ্যের ভোটে মহিলা ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের ভোটে আরও একটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কৃষক, কারণ ২৩০টি বিধানসভার মধ্যে ১৫০টির ভোটাররাই হলেন কৃষক। সেদিকে তাকিয়েই বিজেপি তাদের ইস্তাহারে কন্যাসন্তানকে দু’লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য, কৃষিপণ্যে সহায়ক-মূল্য বাড়ানো ছাড়াও কৃষক সম্মাননিধি প্রকল্পে প্রত্যেক কৃষককে ১২ হাজার টাকা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসও মহিলাদের ১৫০০ টাকা আর্থিক সাহায্য, দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে ২০২০-এই দু’বছর বাদ দিলে মধ্য প্রদেশে একটানা ২০ বছর শাসন ক্ষমতায় রয়েছে শিবরাজ সিং সরকার। কিন্তু কংগ্রেস মনে করছে এবারের ভোটে সেই শাসনের অবসান হবে। প্রসঙ্গত, এত বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকা স্বত্বেও শিবরাজকে তাঁর দল মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী বলে ঘোষণা করেনি। অবশ্য শিবরাজ নিজেও বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার মতো তাঁর থেকেও যোগ্য নেতা তাঁর রাজ্যের বিজেপি দলে আছে। এই আবহের কারণেই কংগ্রেস মনে করছে এবারের পাল্লা তাদের দিকেই ঝুঁকে আছে। মধ্যপ্রদেশের বুধনি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান। তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রার্থী করেছে অভিনেতা মস্তালকে। যিনি ২০০৮ সালে টেলিভিশন ধারাবাহিক রামায়ণ(২)-তে হনুমানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এর পাশাপাশি কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথকে তাঁর নিজের গড় ছিন্দওয়াড়া থেকেই প্রার্থী করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী বিবেক বান্টি। যিনি বিজেপি দলের প্রাক্তন সভাপতি। ২০১৯ সালের বিধানসভা ভোটে বান্টি সাহু কমল নাথের কাছে ২৮ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। কমলনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েও বিদ্রোহী নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার সঙ্গে ২২ জন কংগ্রেস বিধায়ক দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় কমল নাথ সরকারের পতন হয়। বিজেপি সরকার গড়ে শিবরাজ সিং চৌহানের নেতৃত্বে।
মধ্যপ্রদেশের গত দুটি বিধানসভা (২০১৩ ও ২০১৮) ভোটে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে এ রাজ্যের ২৩০টি আসনের মধ্যে ১৬৫টি পেয়েছিল বিজেপি আর কংগ্রেস পেয়েছিল ৫৮টি। শতাংশের হিসাবে বিজেপি পেয়েছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ আর কংগ্রেস ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। তার মানে দুটি দলের মধ্যে ফারাক ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৮-র বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের ঝুলিতে যায় ৪১ শতাংশের কিছু বেশি আর বিজেপির ঝুলিতে যায় ৪০.৮ শতাংশ ভোট। ফলাফল হয় কংগ্রেস পায় ১১৪, বিজেপি ১০৯, বিএসপি ২ এবং নির্দল ও অন্যেরা ৫টি আসন। এবার বিজেপিকে হটাতে কংগ্রেসের মূল শক্তি দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথ এবং দিগ্বিজয় সিংহের জুড়ি, মধ্যপ্রদেশের রাজনীতিতে যে দুজন ‘বীরু-জয় জোড়ি’ বলে পরিচিতি পেয়েছেন। অতীতে তাঁদের গোষ্ঠীলড়াই ছিল কিন্তু জ্যোতিরাদিত্য দল ছাড়ার পর সেটা নেই বললেই চলে। দিগ্বিজয়-তো প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, কংগ্রেস ভোটে জিতলে কমল নাথই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে জানা গিয়েছে ১৯৯৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দু’দফার মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয়ের ইচ্ছে এবার তাঁর ছেলে তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জয়বর্ধন উপমুখ্যমন্ত্রী হন, হয়তো সে কারণেই কমল নাথকে এগিয়ে রাখছেন।
অন্যদিকে, ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের চিন্তা ভূপেশ বঘেল বনাম টিএস দেও সিং। গতবার প্রতিশ্রুতি পেয়েও টিএস দেও সিং শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি। এবার কংগ্রেস জিতলে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জোর দাবি জানাবেন, সেকথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া ভুপেশ বঘেলের নাম জড়িয়েছে মহাদেব বেটিং অ্যাপ কেলেঙ্কারিতে। সেই কারণে আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যে বিজেপির জয় কিছুটা হলেও সহজ হতে পারে। যদিও ২০১৩ সালে ঝিরম ঘাঁটি মাওবাদী হামলায় ছত্তিশগড়ের কংগ্রেস নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ভূপেশ বাঘেলই দলকে ফের তুলে ধরেছিলেন। ২০১৮ সালে রমন সিংয়ের বিজেপি সরকারকে হটিয়ে বহু বছর পর ফের ছত্তিশগড়ে ক্ষমতা দখল করে কংগ্রেস। ছত্তিসগড়ে গত বিধানসভা ভোটের ফলাফল জানাচ্ছে, ৯০টির মধ্যে ৬৮টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস।ছত্তিশগড়ে বিলাসপুর অঞ্চলের ২৪টি আসনই ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে। গতবার কংগ্রেস একাই ১২টি আসন পেয়ে বিজেপিকে হারিয়ে দিয়েছিল। ভূপেশ বাঘেল ও টিএস সিং দেওর দ্বন্দ্ব থাকলেও ছত্তিশগড়ে আদিবাসী ভোটারদের ভোট টানতে পারলে কংগ্রেসের জয় পাওয়া কঠিন হবে না। কিন্তু এবার ভোটে লড়ছে প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা অরবিন্দ নেতামের নেতৃত্বাধীন সর্ব আদিবাসী সমাজ এবার ‘হামার রাজ পার্টি’। কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে তারা থাবা বসালে বিজেপির লাভ। এছাড়াও আছে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি দল।