করোনা আর লকডাউনের জেড়ে অনেক কিছু যেমন থেমে গিয়েছে অন্যদিকে যা কিছু চলছে সেসবও পিছিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য; প্রায় ২ বছর পিছিয়ে গেছে হস্তশিল্পে (হ্যান্ডলুম) জাতীয় পুরস্কার দান প্রক্রিয়া। জানা গিয়েছে ২০১৮ সালে বুননশিল্প-র জন্য জাতীয় পুরস্কার দানের আবেদন পত্র পাঠানোর জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু তারপরেই করোনা পরিস্থিতির জন্য পিছিয়ে যায় সমস্ত প্রক্রিয়া। অবশেষে কেন্দ্রের ডেভলপমেন্ট কমিশনার (হস্তশিল্প) মারফত খবর আসে ২০১৮ সালের জাতীয় হস্তশিল্প পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জালার সবং এলাকার সারতা গ্রামের দুই গৃহবধূ গৌরী দাস ও গৌরী জানা। তার মানে জোড়া রাষ্ট্রপতি পুরস্কার আসছে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে। আসছে সবংয়ের দুই দূর্গা গৌরী জানা ও গৌরী দাসের হাত ধরে। নয়া দিল্লির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের পরিচিত আধিকারিকদের কাছ থেকে দুটি পরিবারই জেনেছে এই খবর। আর জানার পরই খুশির বন্যা দুই পরিবারে।

দুই গৌরী, গৌরী জানা, গৌরী দাস
প্রসঙ্গত, এই দুই গৌরী দীর্ঘদিন ধরেই মসলিনের কাজ করছেন। মসলিনের সূক্ষ কাজ হয় মাদুর কাঠি দিয়ে। বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করছেন। বাড়ির অন্য সদস্যরাও এই কাজ করেন। ডেবরা অঞ্চলের বাসিন্দা গৌরী জানা জানালেন তাঁর শ্বশুরমশাইও মসলিনের কাজ করতেন। তাঁর কাজের উৎকর্ষতার জন্য দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে পুরস্কৃত করেছিলেন। গৌরী দেবী বিয়ের আগে তাঁর ছেলেবেলাতেই তাঁর বাবার কাছে এই কাজ শিখেছিলেন। তখন তিনি তাঁর বাবাকে মসলিনের কাজে সহায়তা করতেন। গৌরী দেবীর দাদাও মসলিনের কাজের জন্য ১৯৮৯ সালে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। গৌরী দেবী বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে এসেও তাঁর স্বামীর সঙ্গে হাত লাগান। তাঁর স্বামী তাপসকুমার জানাও মসলিনের কাজের জন্য ২০১৬ সালে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এবার গৌরী দেবী নিজেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন।

অন্যদিকে সবং-এর আরেক দুর্গা গৌরী দাসও মসলিনের কাজের জন্য জাতীয় পুরস্কারের সম্মান অর্জন করলেন। তাঁর কাজের হাতেখড়ি তাঁর শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে। তাঁর স্বামীও এই কাজ করেন। তবে গৌরী দাসের কাজের কদর অনেক বেশি। এখনও সরকারিভাবে এই খবরটি সম্প্রচারিত হয়নি। ফলে প্রকাশও পায়নি সেই ভাবে। যেহেতু ডেভলালমেন্ট কমিশনারের সূত্র থেকে এই খবর পাওয়া গিয়েছে তাই এর সত্যতা নিশ্চিত। পাশাপাশি একই ভাবে সবংয়ে হস্তশিল্পের উন্নতি ও প্রসার নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া কলকাতার একটি সংগঠন ‘বাংলা নাটক ডট কম’ সূত্রেও নিশ্চিত করা হয়েছে এই সংবাদ। নয়া দিল্লির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের পরিচিত আধিকারিকদের কাছ থেকে দুটি পরিবারই জেনেছে এই খবর। আর জানার পরই খুশির বন্যা দুই পরিবারে।
প্রসঙ্গত, সবংয়ের মাদুরের বিশ্ব পরিচিতি ছিল আগেই। ১৯৯২ সালে এই সারতা গ্রাম থেকে মাদুর শিল্পের ওপর প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন পুষ্পরানী জানা। পুষ্পরানী জানা জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর তা আরও বেশি সমাদৃত হয়। যেহেতু ভারতের রাষ্ট্রপতি স্বয়ং এই পুরস্কার প্রদান করেন তাই এই পুরস্কার রাষ্ট্রপতি পুরস্কার নামেও পরিচিতি লাভ করে।

এরপর বিভিন্ন সময়ে পুরস্কার পেয়েছেন অলক জানা ও মিঠু জানা-সহ আরও অনেকে। সারা দেশ থেকে মোট ২২ জন প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিলেন। নগদ ১ লক্ষ টাকা পুরস্কার মূল্য ছাড়াও রয়েছে স্মারক, সম্মানপত্র, শাল ইত্যাদি। এবারের প্রতিযোগিতায় গৌরী দাস এবং গৌরী জানা দু-জনেই পাঠিয়েছিলেন তাঁদের হাতে বোনা মসলন্দ (Mashland) যা স্থানীয় ভাষায় মছলন্দি বলেই পরিচিত। গৌরী দাস তাঁর মসলন্দটির দু-পাশে যে নকশা বুনেছেন তাই মন কেড়ে নিয়েছে বিচারকদের। তার চেয়েও বড় কথা মাত্র ২৫০ গ্রাম ওজনের এই মাদুর কেউ অনায়াসে তার পার্সে ভরে নিতে পারেন। অন্যদিকে গৌরী জানার মসলন্দটিতে মাদুর কাঠি দিয়ে এঁকেছেন রামায়ণের সীতা হরনের পালা। চেরা মাদুরের কাঠি দিয়ে বোনা সেই অনুপম শিল্প সৌন্দর্য জিতে নিয়েছে বিচারকদের মন।
রাজ্যের জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী তথা সবং বিধায়ক মানস রঞ্জন ভূইঁয়া জানিয়েছেন, “আমি কৃতজ্ঞ সবংয়ের শিল্পীদের প্রতি। বারেবারে সবংকে জাতির দরবারে, বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁরা। এর আগেও ৮জন এই রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন। সবংয়ের মাদুর শিল্প ও শিল্পীদের জন্য আমরা নিবেদিত। ভারতের মোট মাদুরের ৫২% উৎপন্ন করে সবং। এখানকার মসলন্দি বিশ্ব বিখ্যাত। সবংয়ের ২ লক্ষ ৯২ হাজার মানুষের মধ্যে ১ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ মাদুর শিল্পের সঙ্গে জড়িত। যাঁরা মাদুর কাঠির চাষ থেকে মাদুর তৈরি এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।”
মন্ত্রী শ্রী ভূঁইয়া আরও বলেন, “সবংয়ের প্রাক্তন বিধায়ক গীতা ভূইঁয়া তাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন এখানে মাদুর হাব তৈরির জন্য। রুইনানে সেই হাবের জমি চিহ্নিত হয়েছে। সেখানে মাদুরশিল্পের পাশাপাশি মাদুর গাছের গোড়া থেকে নির্যাস সংগ্ৰহ করে সুগন্ধি ও ধুপ ইত্যাদি নানা প্রকার কর্মকান্ড হবে। মাদুরের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত ব্যক্তি যাদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা তাঁদের আমরা শ্রমিক হিসেবেও পরিচিতি দিতে চাইছি যাতে শ্রমদপ্তরের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা তাঁরা পেতে পারেন।